নিতুদের বাড়ির পাশে সারি সারি করে লাগানো বেগুনগাছ। তাতে নীল রঙের ছোট ছোট ফুল ফুটেছে। নিতুর ফুল খুব পছন্দ। বাড়ির ওপাশ দিয়ে খেলতে যাওয়ার সময় মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে দু-একটা ফুল ছিঁড়ে দৌড়ে পালিয়ে যায়। মা খুব করে বারণ করেছে ফুল না ছিঁড়তে। কিন্তু ফুল দেখলে নিতু যে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারে না।
একদিন ফুল ছিঁড়তে যাবে ঠিক সে মুহূর্তে শুনতে পেলো কোথা থেকে যেন ভেসে আসছে চিঁ চিঁ শব্দ। নিতু ছোট মেয়ে। হঠাৎ অচেনা এমন শব্দ শুনে ভয় পেয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে গেল। সেদিন আর কোনো ফুলই ছেঁড়া হলো না।
পরের দিন আবার গেল সেখানে। তখনো শুনতে পেলো চিঁ চিঁ শব্দ। আশপাশে চোখ ফিরাতেই দেখল, নিতুর ঠিক সামনের বেগুন গাছটায় ছোট একটি পাখির বাসা। সেখান থেকেই এ শব্দ ভেসে আসছে। পাখির বাসার কাছে যেতেই একটি চড়ুই পাখি ফুড়ুৎ করে উড়ে গেল। নিতু বুঝতে পারল এটি চড়ুই পাখির বাসা। ভেতরে তাকাতেই দুটো চড়ুই ছানা চোখে পড়ল। ছানা দুটো চিঁ চিঁ করে ডাকছে। পাখির ছানাগুলোকে দেখে নিতুর যেন খুশির বাঁধ মানে না। এক দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে সব খুলে বলল।
মা তখন বলল, পাখিগুলো আমাদের এখানে বেড়াতে এসেছে। তাই পাখির বাসায় হাত দেবে না, পাখির ছানাগুলোকে ধরবে না, ওদের কষ্ট হয় এমন কিছু করবে না। নিতু মাথা হেলিয়ে আচ্ছা বলে আবার চলে গেল চড়ুই ছানাদের কাছে।
ছানাগুলো দেখে নিতুর বড্ড মায়া হলো। একটু সুযোগ পেলেই চলে যায় পাখির বাসার কাছে। ছানাগুলোকে একনজর দেখে আবার চলে আসে। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সন্ধ্যা পর্যন্ত কতবার যে ছানাগুলো দেখতে যায় তার কোনো হিসাব নেই। তবে নিতু মায়ের কথা মেনে চলত। ছানাদের ধরত না। শুধু দূর থেকে দেখে চলে আসত।
একদিন নিতুর মাথায় এক দুষ্ট বুদ্ধি এলো। বাসায় গিয়ে দেখে মা পাখিটা নেই। নিতু চুপিসারে ছানাগুলোকে নিয়ে ঘরে চলে এলো। এদিকে মা পাখিটা বাসায় এসে ছানাগুলো না পেয়ে খুব চেঁচামেচি শুরু করল।
নিতুর মা বুঝতে পারল, কিছু একটা হয়েছে। ঘরে এসে দেখে নিতু পাখির ছানা দুটোকে বিছানার ওপর রেখে আদর করছে, খাবার খাওয়াচ্ছে। কিন্তু ছানা দুটো না খেয়ে চিঁ চিঁ করে ডেকেই যাচ্ছিল। এদিকে মা পাখিটাও ছানা দুটোকে খুঁজতে বাড়ির ভেতর এসে পড়ল। যখন বুঝতে পারল ছানা দুটো এখানে তখন আরো বেশি জোরে চেঁচামেচি করতে লাগল।
মা নিতুকে আদর করে বলল, এমনটি করা তোমার একদমই উচিত হয়নি। আমরা যেমন আমাদের বাসায় ভালো থাকি, মা-বাবার আদরে থাকি। পাখির ছানাগুলোও তাদের বাসায় ভালো থাকে, তাদের মা-বাবার আদরে থাকে। এরপর বলল, মনে করো কেউ যদি তোমাকে আমাদের কাছ থেকে দূরে কোথাও নিয়ে যায়। তাহলে কি তুমি কষ্ট পাবে না? আমরা কষ্ট পাব না বলো?
নিতু নিজের ভুল বুঝতে পারল। কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, আমি তোমাদের ছাড়া কোথাও থাকতে পারব না।
মা বললেন, তাহলে যাও। এবার ছানাগুলোকে তাদের বাসায় রেখে এসো। ছানাদেরও কষ্ট হচ্ছে, মা পাখিটারও কষ্ট হচ্ছে।
নিতু ছানা দুটোকে ঘর থেকে বের করতেই দেখল, মা পাখিটা টিনের চালে বসে ডাকাডাকি করছে। নিতু ছানা দুটোকে তাদের বাসায় রেখে এলো। মা পাখিটাও ছানা দুটোকে পেয়ে খুব আদর করতে লাগল।
এরপর থেকে নিতু ছানা দুটোর খুব খেয়াল রাখতে লাগল। ঠিকমতো খোঁজখবর নিত। মাঝে মধ্যে নরম ভাত আর গুঁড়া চাল দিয়ে আসত ছানাদের। এভাবে দেখতে দেখতে ছানাগুলো বড় হয়ে উঠতে লাগল। নিতুরও ছানাদের সাথে খুব ভালো দিন কাটতে লাগল।