অনেক দিন আগের কথা। এক দরিদ্র ব্যক্তি বন থেকে কাঠ কেটে বাজারে বিক্রি করে কোনোরকমে সংসার চালাত। দরিদ্র হলেও সে ছিল নির্লোভ ও দয়ালু। একবার কাঠ কাটতে গিয়ে বনের মধ্যে সে একটি বড় বাক্স দেখতে পেল। সেটি ছিল গুপ্তধনের বাক্স। কিন্তু তা বেশ বড় আর ভারী হওয়ার কারণে সে একা উঠাতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পরে সেখান দিয়ে এক বণিক ব্যবসার মালামাল বিক্রি করে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিল। তার সাথে ছিল ব্যবসার কাজে ব্যবহৃত আটটি উট।
দরিদ্র ব্যক্তি বণিককে দেখে খুশি হয়ে বলল, আমি তোমাকে বড় একটি গুপ্তধনের বাক্সের সন্ধান দিতে পারি। তবে শর্ত হলো গুপ্তধনের জিনিস দিয়ে যে পরিমাণ উট বোঝাই করা যাবে তার অর্ধেক বা চার ভাগের এক ভাগ উট আমাকে দিতে হবে।
বণিক এ কথা শোনামাত্রই অর্ধেক উট দিতে রাজি হয়ে গেল। এরপর দুজনে মিলে গুপ্তধনের বাক্সটি খুলতে শুরু করল। খুলে দেখল তা সোনা ও রুপায় ভরপুর। তারা সোনা-রুপাগুলো উটের পিঠে রাখতে লাগল। এক এক করে আটটি উটই সোনা-রুপায় ভরে গেল।
বণিক তার পূর্বের কথা অনুযায়ী সোনা-রুপা বোঝাই করা চারটি উট দরিদ্র ব্যক্তিকে দিয়ে দিলো। এ ছাড়া বাক্সের মধ্যে একটি ছোট থলেও পাওয়া গেল। তাতে কয়েকটি মূল্যবান লাল পাথর ছিল। দরিদ্র ব্যক্তিটি যেহেতু গুপ্তধনের সংবাদ দিয়েছে তাই বণিক খুশি হয়ে তাকেই সেটি দিয়ে দিল।
একটু পরেই বণিকের মনে লোভ জেগে উঠল। তার মনে পড়ল, আরে সে তো চার ভাগের এক ভাগ উট নেয়ার ওপরও রাজি ছিল। আমি শুধু শুধু অর্ধেকে রাজি হয়েছি। এখন যদি তাকে বলি তাহলে হয়তো চার ভাগের এক ভাগের অতিরিক্ত যে অংশ সে নিয়েছে, তা আমায় ফিরিয়ে দিতে পারে।
এই ভেবে সে দরিদ্র ব্যক্তিকে ডেকে বলল, দেখো ভাই, মানছি আমি অর্ধেক উট দেয়ার কথা বলেছিলাম। কিন্তু তুমি নিজেই তো চার ভাগের এক ভাগ চেয়েছিলে। এখন তুমি তোমার কথার ওপর অটল থাক, আর আমাকে বাকি উট দুটো ফিরিয়ে দাও।
দরিদ্র ব্যক্তি ছিল সহজ সরল ও দয়ালু। তাই সে বলল, তুমি চাইলে এখনই দুটো উট নিয়ে নাও। বাকি যে দুটো থাকবে, তাই আমার জন্য যথেষ্ট।
বণিক তার থেকে উট নিয়ে নিলো। এখন সোনা-রুপা বোঝাই করা তার মোট ছয়টি উট হয়ে গেল। কিন্তু সে ছিল বড্ড চালাক ও লোভী। লোভের কারণে তখনো তার মন ভরেনি। তাই সে আবার চালাকি করে দরিদ্র ব্যক্তিকে বলল, দেখো ভাই, তুমি তো দরিদ্র মানুষ। তোমার তো এত সম্পদের প্রয়োজন নেই। আমি বণিক মানুষ। তোমার থেকে আমার খরচ কয়েক গুণ বেশি। তাই পরিবার পরিজন নিয়ে চলতে আমার খুব কষ্ট হয়ে যায়। তুমি তোমার বাকি উট দুটো আমাকে দিয়ে দাও। আমার পরিবার-পরিজন তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবে।
দরিদ্র ব্যক্তি বলল, আচ্ছা, তোমার যদি এই ইচ্ছাই হয় তাহলে নিয়ে যাও।
বণিক এ কথা শোনা মাত্রই তার অবশিষ্ট উট দুটো নিজের করে নিলো। এরপর সোনা-রুপা বোঝাই করা মোট আটটি উট নিয়ে বাড়ির পথ ধরল। তবুও যেন তার মন ভরল না। পথিমধ্যে তার মনে হলো, আমি যা পেয়েছি যদিও তা অনেক বেশি। কিন্তু দরিদ্র ব্যক্তির কাছে লাল পাথরের মূল্যবান যে থলেটি রয়েছে, যদি সেটিও আমি পাই তাহলে তো খুবই ভালো হয়।
এ ভাবনা আসামাত্রই সে উটগুলোকে এক জায়গায় রেখে দ্রুত দরিদ্র ব্যক্তির কাছে ফিরে গেল। সে ভাবল গিয়েই চলে আসবে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দরিদ্র ব্যক্তিকে দেখতে পেল না। ততক্ষণে সে অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল।
কিন্তু লোভ তখনো তার পিছু ছাড়েনি। তাই লোভের কারণে সারা দিন তাকে খুঁজতে লাগল। এদিকে সে তার উটগুলোর কথা একবারেই ভুলে গেল। উটগুলো এই সুযোগে যে যার মতো যেথায় খুশি চলে গেল।
একপর্যায়ে সন্ধ্যা নেমে এলো। সূর্য ডুবে যাওয়ায় সে বন থেকে বের হওয়ার পথ হারিয়ে ফেলল। তখন সে তার পাশের ঝোঁপ থেকে একটি বাঘের গর্জন শুনতে পেল। সে পালিয়ে যেতে চাইল ঠিক তখনই বাঘটি এসে তার ওপর আক্রমণ করল এবং মুহূর্তের মধ্যে তাকে খেয়ে ফেলল। তাই তো বলা হয় লোভ করা ভালো নয়!