সত্য ইতিহাস কখনো বদলায় না। ইতিহাস ইতিহাসই থেকে যায়। বারবার ফিরে আসে। আমাদের সতর্ক করে দেয়। সত্যাসত্য, পাপ-পুণ্য, ন্যায়-অন্যায় জীবনযাপন কর্মপরিধি ও যাবতীয় ব্যাপারে ইতিহাস অত্যন্ত সজাগ ও যথাযথ। তিল পরিমাণ এদিক-সেদিক হওয়ার উপায় নেই। এ ব্যাপারে যুগে যুগে মহাপুরুষদের আবির্ভাব ঘটে। তাদের প্রদর্শিত পন্থা ও শাস্ত্রসূত্র একটি আলোকিত পথের সন্ধান দিয়েছে। তবুও ক্ষেত্রভেদে অত্যাচারী অনাচার এসে জড়ো হয়। মানুষের জীবনকে নানাভাবে বিষজর্জর করে তোলে। শাসক শোষক মানবসমাজকে নিঃশেষিত করে দেয়। অনাদিকাল থেকে অনুরূপ ধারাপ্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি এর করুণ পরিণতি সমানতালে চলে আসছে। কখনো কখনো তা অত্যন্ত ভয়াবহ আকার ধারণ করে। যা গোটা মানবসমাজকে স্তম্ভিত করে দেয়। লেখা হয় ইতিহাসের পুনরাবৃত্ত ইতিহাস। তবুও অনাচারকিষ্ট অনাহূত আবর্জনা এসে ইতিহাসকে ঢেকে ফেলতে চায়। কিছু আধিপত্যপ্রবণ ফ্যাসিস্ট বিকৃত চাওয়া-পাওয়ার মাধ্যমে তা কথাকথিত করতে উদ্যত হয়। যা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। প্রকৃতিগতভাবেই অবধারিত সত্য। ক্ষমতার মদমত্ততায় আবু জাহেল, নমরুদ, ফেরাউন, সাদ্দাদসহ অনেকেই ইতিহাসের এই ধারাপ্রবাহকে কলঙ্কিত করেছে। এতে তাদের জীবনে সকরুণ পরিণতি নেমে আসে। তবুও মানুষের চৈতন্য নেই।

সম্প্রতি বাংলাদেশে ছাত্রজনতার বিক্ষোভ বিদ্রোহ সে কথাই মনে করিয়ে দেয়। স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের মাধ্যমে প্রতিভাত হয়ে ওঠে। দীর্ঘকালের শাসন শোষণ নিপীড়ন নির্যাতনের পতন ছিল ভয়ঙ্কর। অনেকটাই বিরল ঘটনা, যা অভাবিত ও অকল্পনীয়। এতে প্রতীয়মান হয়, অত্যাচারের মাত্রাও ছিল ততোধিক। দুঃশাসনের রাহুগ্রাস পুরো সমাজজীবনকে জর্জরিত করে তোলে। বিচার, শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে সর্বত্র তা ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি মানুষের বাকস্বাধীনতা পর্যন্ত ছিনিয়ে নেয়া হয়। পাশাপাশি ভোটাধিকার, গণতন্ত্র, নির্বাচনী ব্যবস্থাও ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়ে। গুপ্তহত্যা, গুম, নির্যাতন, মামলা, মোকদ্দমা, থানা পুলিশের মাধ্যমে একটি ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়। বিরোধী দলমতের মানুষকে নির্মূল করার লক্ষ্যে যত সব ভয়ঙ্কর পন্থা গৃহীত হয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের যেন কোনো পথ নেই। যাবতীয় প্রতিবাদ প্রতিরোধের ভাষা স্তব্ধ হয়ে যায়। আপামর জনসাধারণ কেবলই পথ হাতড়ে বেড়ায়। আশা ভরসার পথ একে একে বন্ধ হয়ে যায়। এমনই এক অবস্থায় সবাইকে অবাক করে দিয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঘটে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে দোর্দণ্ড প্রতাপশালী দীর্ঘদিনের হাসিনা সরকারের নিঃসহায় পতন নেমে আসে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাত্র ৪৫ মিনিট সময়ে মধ্যে তড়িঘড়ি প্রাণভয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। অতঃপর গণভবন সংসদ ভবনের জনগণের আক্রোশের লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়ায়। পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে মারাত্মকভাবে। ইতিহাস আবারো নবতর যাত্রাযোগে ফিরে আসে। একটি দেশের সব পুলিশ পালিয়ে নিরাপত্তা খুঁজে বেড়ায়। যা বিশ্বে এক বিরল ঘটনা। দেশের সব শিক্ষার্থী রাস্তায় দাঁড়িয়ে ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করেছে। যা অকল্পনীয় অভাবিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। শেখ হাসিনার পরিধেয় বস্ত্রাদি, আসবাবপত্র ও সংসারের জিনিসপত্রও জনরোষ থেকে রেহাই পায়নি। যা স্বৈরাচারী শাসকের ইতিহাসে কিছু অভূতপূর্ব মাত্রা যুক্ত করেছে। একটি দেশের সরকার বরাবরই রাষ্ট্র তথা জনসাধারণের স্বার্থরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার ও নির্বাচনী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। যা হাসিনা সরকার তুচ্ছাতিতুচ্ছ ভেবে অবজ্ঞা করেছে; বরং ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থে বিবেচনা করা হয়। এতে ধীরে ধীরে মানুষের মনে ক্রমান্বয় ক্ষোভের মাত্রা বাড়তে থাকে। এর ফলেই রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো ভেঙে পড়ে। একটি অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বলা যায়, একেবারে লেজেগোবরে অবস্থা। একটি জাতির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষাব্যবস্থার ভ্রান্তিবিভ্রম পুরো জাতিগোষ্ঠীর কাঠামো তছনছ করে দেয়। আওয়ামী সরকারের সুদীর্ঘ সময়ে তা মারাত্মকভাবে লক্ষণীয়। এতটা দীর্ঘ রাজত্বকালেও হাসিনা সরকার একটি অভিন্ন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে পারেনি; বরং তা অনেকটা দলীয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেছে। এরই প্রাদুর্ভাব শাসনব্যবস্থার সর্বত্র মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। একে একে প্রশাসন, বিচার বিভাগ, স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ছাপিয়ে সবকিছুই আচ্ছন্ন করে ফেলে। এতে একটি রাষ্ট্রের সুসংহত কাঠামো ভেঙে পড়ে। এ অবস্থায় দুর্বৃত্ত দলবাজ, চাটুকার, তস্কর, সাম্রাজ্যবাদ ও অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটে। এতে বেসামাল ব্যবস্থাপনায় সরকার অস্তিত্ব রক্ষার্থে নানাবিধ অপকৌশল বেছে নেয়। পথের কাঁটা দূরীকরণার্থে ক্ষেত্রভেদে হত্যা-গুম বেছে নেয়। ফলে জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে মানুষ মারাত্মকভাবে অতিষ্ঠ হয়ে যায়। প্রাণপণ প্রতিবাদের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। পাশাপাশি অত্যাচারের মাত্রাও সমানতালে বেড়ে চলে। শুরু হয় অস্তিত্ব রক্ষার প্রাণপণ প্রয়াস। একপর্যায়ে তা বিস্ফরণোন্মুখ হয়ে ওঠে। এরই বহিঃপ্রকাশ সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ বিদ্রোহ। অতঃপর শতসহস্র প্রাণের বিনিময়ে আন্দোলনের সফলতা সম্ভবপর হয়ে ওঠে।