২০১০ সাল। ২৫ মার্চ। সরকার এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার পুরনো হাইকোর্ট ভবনে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ প্রতিষ্ঠা করে। এ আদালতের গুরুত্বপূর্ণ সব বিচার কাভার করার সৌভাগ্য হয় আমার। ২০১০ সাল থেকে ২০১৩ এই সময়ের মধ্যে ঘটে নানা চাঞ্চল্যকর ঘটনাপ্রবাহ। সেসব অভিজ্ঞতার চুম্বক অংশ ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করব।

২.
আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন ১৯৭৩ এর ৬ ধারার বলে তিন সদস্যবিশিষ্ট ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হন বিচারপতি মো: নিজামুল হক। অন্য দুই বিচারকের দায়িত্ব পান বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীর ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ এ কে এম জহির আহমেদ। সৌভাগ্যক্রমে বিচারপতি এ কে এম জহির আহমেদ ছিলেন আমার পূর্বপরিচিত।
২০০৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বৈশাখী টেলিভিশনে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যুক্ত হই। এরপর থেকেই আইন বিটে সাংবাদিকতা শুরু করি। আমার কর্মক্ষেত্র ছিল ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালত, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত এবং সুপ্রিম কোর্ট। টিভি রিপোর্টিংয়ের ওপর দারুণ ঝোঁক এবং বাড়তি সক্রিয়তার কারণে খুব অল্প দিনেই আদালতগুলোতে সাংবাদিক হিসেবে আমার একটি শক্ত অবস্থান তৈরি হয়। অন্য গণমাধ্যমের সাংবাদিক থেকে শুরু করে আইনজীবী, বেঞ্চ অফিসার, এমনকি অনেক বিচারক ও বিচারপতির সাথেও তৈরি হয় দারুণ সখ্য।
একটি বিশেষ কারণে বিচারপতি জহির আহমেদ আমাকে ভীষণ পছন্দ করতেন। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম এক অনুষ্ঠানে আমার আব্বাকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করেছিলেন। সেই স্মৃতিচারণসহ আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয় বিচার-বিষয়ক ম্যাগাজিনে। সেই লেখায় আমার আব্বা মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কারণে পাকিস্তানি বাহিনী এবং তাদের এ দেশীয় দোসর কর্তৃক দাদার বাড়ি গবাদিপশুসহ পুড়িয়ে দেয়ার মর্মান্তিক ঘটনার উল্লেখ ছিল। ঘটনার সময়কাল ১৯৭১ সালের মে মাসের, স্পট নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের কুল্লøাগড়ার। ওই লেখাটি পড়ে আমাকে ফোন করে দেখা করতে বলেছিলেন জহির আহমেদ স্যার। মূলত এভাবেই তার সাথে একটি আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে উঠে। বিচারপতি জহির আহমেদ ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভীষণ দায়বদ্ধ এবং বিরল সৎ মানুষ।

৩.
২৭ আগস্ট ২০১২। সেদিন ছিল সোমবার। যথারীতি আমি ট্রাইব্যুনালে গেছি নিউজ কাভার করতে। হঠাৎ বিচারপতি জহির আহমেদের অফিস সহকারী সুমন আমাকে বললেন, স্যার আপনাকে খুঁজছে দ্রুত দেখা করেন।

আমি আদালত চত্বরেই ছিলাম। তাৎক্ষণিকভাবে স্যারের খাস কামরায় হাজির হলাম। বেশ বিধ্বস্ত দেখাচ্ছিল তাকে।
: স্যার, আসসালামু আলাইকুম।
: ওয়াইলাকুমুচ্ছালাম।
: কেমন আছেন?
: আরে ভালো আর থাকি কী করে! মালুম সাহেব (জেয়াদ আল মালুম, ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর) কি আজ কোনো ব্রিফিং করেছে?
: না করেনি। কেন কী হয়েছে?
: এরা যে কি করবে! ট্রাইব্যুনালকে ডুবাবে! সাঈদী সাহেবের মামলার চার্জগুলো পর্যন্ত ঠিকভাবে দাঁড় করাতে পারেনি এরা! এত অব্যবস্থাপনা! এভাবে কী হয় কোনো কিছু?
আমি চুপচাপ শুনছি কথাগুলো। আরো বেশ কিছু কথা বললেন। প্রসিকিউশন টিমের প্রতি ভীষণ ক্ষুব্ধ তিনি। একপর্যায়ে বললেন, মানিক, আমি আর ট্রাইব্যুনালে থাকছি না, ছেড়ে দিচ্ছি। এত অব্যবস্থাপনা আর ব্যর্থতার দায় তো আমি নিতে পারি না। ৩০ বছর সততার সাথে কাজ করেছি। এখন আর কোনো কালি লাগাতে চাই না।
আমি অবাক হয়ে গেলাম। বললাম-
: স্যার, এসব কী বলছেন? সারা দেশের মানুষ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে! তা ছাড়া আপনার মতো একজন দক্ষ বিচারপতি যদি না থাকে, তাহলে ট্রাইব্যুনাল তো শূন্য হয়ে যাবে! যাই হোক, ৩০ মিনিটের মধ্যে স্যারের রুম থেকে বিদায় নিলাম।
পরের দিন ২৮ আগস্ট ২০১২। মঙ্গলবার। সকাল সাড়ে ১০টায় ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শুরু হলে প্রতিদিনের মতো তাতে অংশ নেন বিচারপতি এ কে এম জহির আহমেদ। বেলা ১টায় বিরতিতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেন। স্যারের এই আকস্মিক পদত্যাগে অনেকের মন বিষণ্ন হয়ে যায়। সবাই বলাবলি করছিল, একজন সজ্জন গুণী বিচারক চলে গেলেন।

৪.
৫ নভেম্বর ২০১২। সকাল ১০টার সামান্য পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চত্বরে হইচই পড়ে গেল। গণমাধ্যমকর্মীরা দৌড়ে গেলাম ট্রাইব্যুনালের গেটে। দেখি, পুলিশের সাথে তুমুল তর্ক চলছে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের। অ্যাডোভেকেট তাজুল ইসলাম উচ্চস্বরে পুলিশকে বলছেন, আমার সাক্ষী সুখরঞ্জন বালিকে অপহরণ করলেন কেন? পুলিশও তাকে থামানোর চেষ্টা করছে।
কিছুক্ষণের মধ্যে ব্রিফিংয়ের আয়োজন করলেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আইনজীবীরা। আদালত চত্বর থেকে সুখরঞ্জন বালির নিখোঁজ হয়ে যাওয়া নিয়ে প্রথমে ব্রিফ করলেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তিনি তখন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। এরপর সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের জবাব দিলেন অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট মিজানুল ইসলাম। তাদের অভিযোগ, সুখরঞ্জন বালিকে কোর্টে আনার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নামিয়ে গুম করা হয়েছে।

আসামিপক্ষের ব্রিফিং শেষ হলে প্রসিকিউশন টিমও প্রেসমিটের আয়োজন করে। এ সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিউিটর অ্যাডভোকেট সৈয়দ হায়দার আলী। গোলাম আরিফ টিপু বলেন, আমি পুলিশ প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি কিন্তু সাক্ষী অপহরণের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এরপর আমরা আদালত চত্বরে দায়িত্বরত পুলিশ অফিসার সৈয়দ নজরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার নেই। তিনি সুখরঞ্জন বালিকে অপহরণের কথা অস্বীকার করেন।
তবে, সৌভাগ্যের বিষয় যে, দীর্ঘদিন ধরে লেগে থেকে সুখরঞ্জন বালির একটি সাক্ষাৎকার আমি নিতে পেরেছিলাম। তখনো সেই সাক্ষাৎকার প্রচার করিনি। ভেবেছিলাম, বিভিন্ন বিশেষ রিপোর্টে সিংক হিসেবে তার সাক্ষাৎকার ব্যবহার করব। সাক্ষাৎকারে বালিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি হলেন সরকারপক্ষের সাক্ষি কিন্তু আপনি কেন আসামির পক্ষে সাক্ষ্য দিতে চাচ্ছেন?
তিনি তখন বলেছিলেন, দেখুন আমি একজন সাধারণ মানুষ; আমি কোনো দল করি না; আমি কেবল ১৯৭১ সালে আমার ভাই কিভাবে খুন হয়েছিল সেই ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরতে চাই। যাই হোক, সেই সাক্ষাৎকার টিভিতে প্রচারিত হলে ব্যাপক আলোচিত হয় সর্বত্র। এখনো ইউটিউবে আছে ওই সাক্ষাৎকার।

৫.
৬ নভেম্বর ২০১২। মঙ্গলবার। সকালে হাইকোর্টের এনেক্স ভবনে যাই কী এক কাজে। হঠাৎ অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম স্যারের সাথে দেখা হয়। তিনি বলেন, মানিক তোমাকে খুঁজছিলাম। জরুরি কাজে। এখন তো কোর্টে কাজ আছে। বেলা ৩টার দিকে দেখা করো।
তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম স্যারের সাথে আমার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে যে কয়েকজন সাংবাদিক সুবিচার নিশ্চিত করতে আদালত চত্বরে সোচ্চার ছিলেন, তাদের মধ্যে আমি ছিলাম অন্যতম। সেই সময়ে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনার সাক্ষি আমি নিজে। ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদ কর্তৃক শেখ হাসিনার মামলা ইগনোর করা থেকে শুরু করে শত শত ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। ওই ভয়ঙ্কর সময়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার পক্ষে একজন রিপোর্টার হিসেবে যতটুকু অবস্থান নেয়া সম্ভব তার সবটুকুই নিয়েছিলাম। এ জন্য চাকরিচ্যুতির হুমকিও পেয়েছি।

তবে এত কিছুর পরও সেই সময়ে অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম, অ্যাডভোকেট বাছেত মজুমদার, ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ (পরে আইনমন্ত্রী), অ্যাডভোকেট শ ম রেজাউল করিম (বর্তমানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী), অ্যাডভোকেট জাফর আহমেদ (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি), অ্যাডভোকেট এম ইনায়েতুর রহীম (বর্তমানে আপিল বিভাগের বিচারপতি)সহ গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াকু অধিকাংশ আইনজীবীর স্নেহ ও বিরল ভালোবাসা পেয়েছি। সেই সময় থেকেই মূলত অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম স্যারের সাথে সখ্য।
বিকেলে মাহবুব স্যারের সাথে দেখা করতে গেলাম অ্যাটর্নি অফিসে তার চেম্বারে।
: মানিক, তোমার টেলিভিশনের চেয়ারম্যানের সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন?
: (হাসতে হাসতে বললাম) স্যার মালিক-শ্রমিকের সম্পর্ক। তিনি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আর আমি সামান্য রিপোর্টার। জানিয়ে রাখা ভালো, তখন আমি বৈশাখী টিভি ছেড়ে যুক্ত হয়েছি দিগন্ত টেলিভিশনে, বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে।
: শোনো, তাকে তো আমরা উদ্যোক্তা হিসেবে জানি। তিনি অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়েছেন। অনেক মানুষকে চাকরি দিয়েছেন। দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতে তার অবদান তো আমরা অস্বীকার করি না। কিন্তু সমস্যা হলো, তিনি যে দল করেন, সেই দলের মুক্তিযুদ্ধকালীন সব অপরাধ তো এখন তার ওপর বর্তাচ্ছে। দেশের স্বার্থে দলটা ছেড়ে দিলেই তো হয়।