গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোতে টিভিতে দেখেছি সড়ক ফুটপাথ ওয়ালে, ফ্লাইওভারের থামে কিংবা অনেক বিল্ডিংয়ের দেয়ালে দেয়ালে লেখা হচ্ছে ৩১ জুলাই, ৩২ জুলাই, ৩৩ জুলাই, ৩৪ জুলাই, ৩৫ জুলাই ও ৩৬ জুলাই। আমি তো অবাক। ৩৬ জুলাই আবার হয় নাকি? জুলাইয়েকে টেনে লম্বা করে দিচ্ছে, যেন জুলাই আর থামবে না।
না, থামল ৩৬ জুলাইয়ে। নতুন চিন্তার এই ক্রিয়েটিভিটি আমাদের চোখের দৃষ্টিই কেবল নতুন করে তুলল না, মনের দরোজার কপাটও খুলে দিলো। আমরা সেই মুক্ত স্বাধীন দরোজা দিয়ে ঘর থেকে, মানে খোলা নতুন আকাশের নিচে এসে দাঁড়িয়ে দেখলাম এক নতুন বাংলাদেশ। এই নতুন বাংলাদেশ নতুন করে স্বাধীন হলো, দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা পেলাম আমরা।

থামার কারণ, যে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম, গণবিক্ষোভ করছিল ছাত্র-জনতা, সেই ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ৩৬ জুলাই, মানে ৫ আগস্ট পদত্যাগ করে পালিয়ে গেলেন ভারতে। তাকে ভারতে পালাতে দিয়েছে সেনাবাহিনী, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানরা। তারা এই পালানোর সুযোগ দেয়াতে আর কোনো রক্তপাত হয়নি। হয়নি বলাটা অন্যায় হচ্ছে। ৩৬ জুলাই পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট হাসিনার নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনীগুলো, বিশেষ করে পুলিশ হাজার হাজার শিক্ষার্থী-জনতাকে হত্যা করে যে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিয়েছে, তাদের কিছু অংশ তো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থা ছিল এবং পর্যায়ক্রমে মারা গেছে। মৃত্যুর এই ধারাবাহিক অপতৎপরতা চলছে ৩৬ আগস্ট পর্র্যন্ত, আনসারের পোশাকে আসা ফ্যাসিবাদের দোসররা হামলে পড়েছিল সচিবালয়ে। তারা সচিবালয় ঘেরাও করেছিল তথাকথিত দাবি নিয়ে, কিন্তু তাদের হিংস্র আক্রমণই প্রমাণ করেছে, তারা শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনতে চায়। আক্রমণকারীদের ৩৫০ জনকে আটক করে জেলে পাঠানো হয়েছে বটে, তবে আরো ১০ হাজারের মতো আনসার পলাতক রয়েছে, যারা শেখ হাসিনার ১৬ বছরে নিয়োগ পেয়েছিল। এই ঘটনার পর আনসারের ডিজি বলেছেন, ওরা আনসার ব্যাটালিয়নের নয়, তারা অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত। যে পথেই তারা পোশাক পাক না কেন, তারা যে ফিরে আসবে না আর গোলমাল পাকানোর জন্য, সে গ্যারান্টি কে দেবে? কে বা কারা দেবে তা আমরা জানি না। ১৬ বছরের দুঃশাসনের ভেতরে তো ফ্যাসিস্ট সরকার তার অনুগত উগ্র জাতীয়তাবাদীদের নিয়োগ করেছিল, যাতে কোনোরকম আন্দোলন গড়ে ও দানা বাঁধতে না পারে।

শিক্ষার্থীদের এই সৃজনী প্রতিভা আমার মনে ধাক্কা দিয়ে একটি বন্ধ দরোজা খুলে দিলো। আমি দেখতে পেলাম সেখানে রক্তলাল গোলাপের মতো তাজা শিশু-কিশোর যুবকদের লাশ। তাদের আর্ত-হাহাকার নেই। তারা বুলেটে বুলেটে ঝাঁজরা হয়ে ফুটে উঠেছে গোলাপি নয় লাল গোলাপ হয়ে।
আমরা যে বুলেটখেকো জাতি, সেটা কি ভুলে গেছে কেউ? না ভোলেনি। ১৯৭১ সালে আমরা শাসকদের বুলেট খেয়েছি অকাতরে। প্রাণ দিতে কসুর করেনি কোনো কিশোর, যুবক মুক্তিযোদ্ধা। দেশের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে তারা দেশ স্বাধীন করেছিল। কিন্তু তাদের সেই লাল-সবুজের পতাকাও লুটে নিয়েছিল ধনবাদী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে যায়নি সেই রক্তলাল স্বাধীনতার পতাকা।
পুঁজির ধর্ম আর শাসকদের রাজনৈতিক কালচার একই মোহনায় যখন উপনীত হয় তখন তার রূপান্তর ঘটে ফ্যাসিবাদে। আর লাভের আশায় ফ্যাসিবাদের সঙ্গ দেয় উগ্র জাতীয়তাবাদ। সেই জাতীয়তাবাদ এতটাই নগ্ন হয় যে, প্রকাশ্যে বলে ‘আপনার মৃত্যুর পরও আমি ও আমরা আপনার সাথে থাকব।’ কিন্তু হাসিনার পতন ও পলায়নের পর, সেই ধনপতির দেখা মিলছে না। একাত্তরে পাকিস্তানি শাসকদের বুলেট খেয়েছি আমরা অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধারা, অকাতরে প্রাণ দিতে কসুর করেনি কোনো কিশোর, যুবক যোদ্ধা। দেশের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিয়ে তারা দেশ স্বাধীন করেছিল। কিন্তু বিজয়ের অংশীদার হতে পারেনি। একটি দল ও তার নেতা মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানকে অস্বীকার করে নিজেদের সরকার গঠন করেছিল, যা ফ্যাসিস্টরা করে থাকে।
আজ মানে ৩৬ জুলাইয়ে আবারো হাজার হাজার কিশোর-যুবক ছাত্র-জনতা প্রাণ দিয়ে ইতিহাসে নাম লেখাল নতুন করে স্বাধীনতার- ৩৬ জুলাই ২০২৪।

এই স্বাধীনতাও কি বেহাত হয়ে যাবে? যদিও দেখা যাচ্ছে শান্তিতে নোবেলবিজয়ী অর্থনীতিবিদ, নারীর ক্ষমতায়নের নেতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের নেতৃত্বে আছেন। তার সাথে যুক্ত হয়েছেন এনজিও টাইপ ব্যক্তি ও মানবাধিকারকর্মী, যারা গরিবের অধিকার নিয়ে কাজ করেন বটে, তবে তারা গরিব নন। এরা মূলত শাসক ও শোষক শ্রেণীরই মধ্যে পুঁজির মেলবন্ধনকারী। এরাই মূলত পতিত স্বৈরাচারের কাঠামোর মধ্যে দ্বিতীয় স্বাধীনতার অর্জনকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। জনগণের বিপ্লব সাধিত হওয়ার পর কোনো ফ্যাসিস্ট সরকারের সাংবিধানিক কাঠামোর অন্তর্গত হতে পারে না। হলে, তা স্বৈরাচারকেই সহযোগ দেয়া হয়। এখানে কেবল ব্যক্তির বদল হয়েছে, কাঠামোর ও সেই মোতাবেক চিন্তার নতুন পথের সূচনা হয়নি। যদিও ক্ষমতাসীনরা বলছেন, তারা সংস্কার করবেন রাষ্ট্রযন্ত্র, তাহলে বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে ঢুকে গেলেন কেন? প্রথম থেকেই তো তা করা যেত। বঙ্গভবনে না গিয়ে জাতির আত্মত্যাগের প্রতীক শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে শপথ নিয়েই তো পতিত সরকারের পচা-দুর্গন্ধময় শাসন কাঁধে নিতে হতো না। ওই কাঠামোতে ঢুকে যাওয়া মানে তো পতিতকেই মেনে নেয়া। যখনই বঙ্গভবনে গেলেন বিপ্লবীরা, তাদের অর্জিত সাফল্য রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দিয়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় শপথ নিলেন। বিপ্লব কখনো প্রচল ঔপনিবেশিকতাকে প্রশ্রয় দেয় না, কাঁধে তুলে নিতে পারে না।

২.
তারা কেন ৩১ জুলাইয়ের পর পয়লা আগস্ট লিখল না? কারণ ওই ধারাবাহিকতা পচে যাওয়া ফ্যাসিজমের ঔপনিবেশিক চিহ্ন। উপনিবেশে ব্রিটিশ শোষকরা যেভাবে আমাদের সম্পদ লুটে নিয়ে গেছে, তেমনি ১৯৭১-উত্তর স্বাধীনতাকালেও শাসকগোষ্ঠী গরিবের সম্পদ শুষে নিয়েছে। ধনিক শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতায়, তারা দুস্থদের জন্য কোনো কাজ করে না। এটি সাধারণের মনে বিস্ময় জাগায়। তারা প্রচলিত ধ্যান ও ধারণার বশবর্তী, তাই চমকে উঠেছে ৩৬ জুলাই লেখা দেখে। যারা প্রচলিতকে মানতে চায় না, তাদের মনেই ওই ৩৬ জুলায়ের সৃষ্টি। ওই সৃজনের ধারাবাহিকতা হচ্ছে একটি উত্তর আধুনিকতার চিন্তার রূপ। তারা দেখেছে হাসিনার দানবীয় হত্যাযজ্ঞ থামেনি ৩১ জুলাইয়ের পর পয়লা আগস্টেও। তাই রক্তপিপাসুর এই যজ্ঞকে ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫ তারিখে টেনে নিয়ে গিয়ে চূড়ান্ত করেছে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন ও তার পলায়নকে।
ইতিহাসে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এই রকম নিকৃষ্ট পতন আর কোনো স্বৈরশাসকের হয়নি।

৩.
শিক্ষার্থী-জনতার এই সম্মিলিত আন্দোলন, কোটা সংস্কার আন্দোলন, ধীরে ধীরে গণবিক্ষোভে পরিণত হয়। সরকারের হিংস্রতা, হত্যা করে দমনের গতি যত বেগবান হয়েছে, ততই রুখে দাঁড়ানোর নৈতিক সাহস ও শক্তি তারা লাভ করেছে যেন কোথা থেকে। কিভাবে তারা এত সাহস অর্জন করল? তারা তো তখনো এই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের তিতা পাতাগুলোর নিষ্ঠুরতা দেখেনি, পড়েনি তেমনভাবে। তাহলে? তারা কি কেবল ১৬ বছরের রাজনৈতিক সরকারের অগণতান্ত্রিক রাজনীতির হিংস্রতা দেখেই শিখেছে যে কেমন হয় ফ্যাসিস্ট সরকারের রূপ ও তাদের লুটেরা-দখলি ধারা?
বুকিশ জ্ঞান আমাদের একটি নরম হিংস্র রূপ দেখায়। সেই রূপের হিংস্রতা অনুভব করা গেলেও, তারা প্রাণ ও রক্তের হোলি দেখে পরিপূর্ণভাবে স্বশিক্ষিত মানুষ হয়ে ওঠে। যেসব কিশোর-যুবা মেধাবীদের চাকরির জন্য আন্দোলন করছিল, যাতে বাবা-মায়ের জন্য তারা এমন একটি আয়ের, আশার উৎস হতে পারে, সেই তারাই দেখল হাসিনার বাবা শেখ মুজিব মুক্তিযোদ্ধার নামে, তাদের পোষ্যদের জন্য কোটার দরজা খুলেছে। সেই সাথে লাখ লাখ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে ভাতা দিয়ে লালন-পালন করেছে নিজ দলের লোকেদের। অন্য দিকে, বঞ্চিত করেছে এবং করছে প্রকৃত যোগ্য, মেধাবীদের। তখন তারা আর পেছনে ফেরার কথা ভাবেনি। কারণ মেধাবীরা যদি কোটাধারীদের সাথে পেরে না ওঠে তাহলে কেবল দেশ, প্রশাসনই ধসে পড়বে না, গোটা জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। সেটি তো আদতে মৃত্যুরই নামান্তর। সেই চিন্তাই তাদের বুলেটের সামনে বুক পেতে দিতে নির্ভীক হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীরা এবং তারা বিজয় অর্জন করেছে।

৪.
আমরা জানি, এখন ইনটেরিম বা অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায়। এই সরকার তাদেরই বিজয়ের ফসল। তারা যত অন্যায়, যত বৈষম্য, সব বিরোধ নিরসনের চেষ্টা চালাচ্ছে। এটি তাদের সূচনামাত্র। এই রাষ্ট্রটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুণে খাওয়া অংশ সংস্কার না করলে জনগণ, সেবাপ্রার্থীরা ঠিকমতো সেবা পাবে না এবং গণতান্ত্রিক শাসনের ধারায় এসে শোষণমুক্ত দেশ গড়ে তুলতে পারবে না। এ জন্য প্রয়োজন মোটামুটি লম্বা একটি সময়। লম্বা সময় না হলে খুঁতগুলো নিখুঁত করা যাবে না। এ বিষয়টি দেখতে পাচ্ছি জনগণের মনে যেমন আছে, তেমনি বিজয়ী সংগ্রামী বিপ্লবীদের মনেও আছে। আসলে বহুকাল ধরেই অসাধারণ মানুষের মনে আমাদের সংবিধানের ভুলত্রুটিগুলো সংস্কার করার কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু যারা সেটি করবেন, সেই রাজনীতিকরা সাংবিধানিক ত্রুটিগুলোর স্বৈরতান্ত্রিক চেতনা থেকে দোর্দণ্ড প্রতাপ আহরণের পথ বন্ধ করতে চায়নি। মাত্র পাঁচ বছর আগে বিএনপি যে ৩১ ধারা ঘোষণা করেছে, সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্র মেরামতের বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। তবে বিএনপি তো আরো কয়েকবার ক্ষমতায় ছিল, সেই সময়গুলোতে কেন ওই সংস্কারের বিষয়টি মনে আসেনি? বিএনপির নতুন নেতৃত্বই কি এই পথের একজন চিন্তক?

গত ৫৩ বছর ধরে ওই অগণতান্ত্রিক ও অধিকার হরণের উপাদানগুলো কাঁধে নিয়ে যাচ্ছি আমরা। মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করতে করতে আজকে তাদের পিঠকে কঠিন দেয়ালের মধ্যে ঠেসে ধরেছে এই ব্যবস্থা। এই নগ্ন বোঝা বহনের দিন শেষ হয়ে আসছে বলে ধারণা করা যায়। যতটা সম্ভব এই অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কার করুক। যেখানে সংসদের প্রয়োজন পড়বে না, সেই রিফর্মগুলো করলে আমরা এটি আশা করতেই পারি যে, দেশ সামনেই এগিয়ে যাবে একটি সাম্যময় সমাজ ও শাসনকাঠামো গড়ে নেয়ার জন্য।
এটি আমাদের আশা। আর ভালোবাসাটি দেবে সরকার। জনগণ সবসময়ই ভালো কিছুর জন্য বিমুখ হয় না বা থাকে না। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, বর্তমানের যে ভয়াবহ বানভাসি চলছে এবং তার জন্য যে ৫০ লাখ লোক চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের সাহায্যে বেরিয়ে এসেছে সাধারণ মানুষ। আর ওই ত্রাণকাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে কিন্তু ওই সব কিশোর-যুবকরা যারা কোটার আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। তারাই সংগ্রহ করছে ত্রাণসামগ্রী, পাঠাচ্ছে বন্যার্ত এলাকার মানুষের কাছে।

একই বলে দেশপ্রেম, একেই বলে আর্ত মানুষের জন্য মানুষের ভালোবাসা।
কবিতায় এই দ্রোহ কিভাবে রচিত হলো, সেই বয়ানই আমি তাৎক্ষণিকভাবে তুলে আনতে চাই। কারণ তাহলে ইতিহাসের রক্তাক্ত লাল গোলাপের দ্রোহ ও সৌন্দর্য় আমরা তরতাজাই অনুভব করতে পারব। তবে একটি কথা মনে রাখতে হবে, এই বিপ্লব এক-দেড় মাসের ঘটনা নয়, এর শেকড় নিহিত আছে আমাদের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়কে ছিনিয়ে নিয়ে দলীয় সরকার গঠনের মধ্যে। আমি তখন এতটা ম্যাচিউরড হয়ে উঠিনি। তবে বামপন্থী ধারার রাজনীতি করেছি বলে শাসক ও শোষিতদের দু’টি শ্রেণীকে বেশ স্পষ্ট করে চিনতাম। সেই দিনগুলোতে মানুষের মনের কথা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারিনি। এই না পারার কারণ ছিল আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতা। তারাও বুকিশ জ্ঞানেই জারিত ছিলেন। তাদেরও ছিল না প্র্যাক্টিক্যাল জ্ঞান।

তারা দেশের চাষা-ভূষাদের উপকার, কল্যাণ, শোষণ থেকে মুক্তির কথা বলতেন, শোনাতেন, কিন্তু কিভাবে সেই ঘের থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, তার কোনো পথ নির্দেশ দিতে পারেননি। তারা কিভাবে কাজগুলো করবেন তার কোনো রোডম্যাপ দিতে পারতেন না। কারণ যে রোডম্যাপ তারা বই পড়ে শিখেছিলেন, সেই রোডম্যাপের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও প্রতিবেশের সাথে বাংলাদেশের টপোগ্রাফির মিল খুব কমই ছিল। ফলে সেই বুকিশ জ্ঞান কাজে লাগেনি। সেই বই কৃষকের পক্ষে পড়া, বোঝা ও অনুভবে জায়গা করে নিতে পারেনি। কৃষকসমাজ মূলত ও মুখ্যত ছিল নিরক্ষর। অক্ষর জ্ঞান দিয়ে যে তাদের বোঝ-মান করে তুলবেন বামপন্থীরা, সেটি তাদের মানবিক মনে জাগেনি। জাগলে তারা কৃষকদের সমাবেশে বক্তৃতা না দিয়ে তাদের সাক্ষর করে তুলতেন আগে। তাদের মনে সেই কল্যাণবোধ ও শোষণ থেকে মুক্তির বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি। আমার মনে হয়েছে, বুকিশ জ্ঞানীরা জনগণের, বিশেষ করে কৃষক-শ্রমিকদের মনের ভেতরে ঢুকতে পারেনি। বামদের ব্যর্থতার পথ ধরেই আমরা আজ দেখতে পাচ্ছি তারা দক্ষিণপন্থী আধা-পুঁজিবাদী আধা-বুর্জুয়া ও আধা-শিক্ষিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছেন। এই গণতান্ত্রিক নামের সামন্ত সিস্টেমের নিগড়ে বন্দী দড়কচড়া দলগুলোর মৌলিক পুঁজি হচ্ছে জাতীয়তাবাদী আবেগ। আর ওই জাতীয়তাবাদী কাঠামোতে এবং জাতীয়তাবাদের ডিপ স্ট্যাকচারে লুকিয়ে আছে বা থাকে সামন্ততান্ত্রিক ফ্যাসিবাদ। পুঁজির সাথে জাতীয়তাবাদ উগ্র হয়ে উঠলে তা ফ্যাসিবাদেরই অন্য রূপ হিসেবে বেড়ে ওঠে। কারণ ফ্যাসিবাদ, জাতীয়তাবাদ ও পুঁজির সম্পর্ক হলো গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক যেন তারা এক অন্যের মামাতো, ফুপাতো, খালাতো ভাইবোন। এটি পারিবারিক চেতনার এক শিখণ্ডিও বটে।


এই সম্পর্ক চিনতে হলে বাংলাদেশের বামপন্থীদের রূপ বদলের অনুঘটকগুলো লক্ষ করলেই বোঝা যাবে। কিংবা কখন কোনো দল ঠিক বিপরীত রাজনৈতিক মেরুর দলের সাথে রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠতে দেখলেই আমরা বুঝি, তারা একে অপরের তরে চিরকালীন বন্ধনে আবদ্ধ। তাদের মূল লক্ষ্য ক্ষমতার মসনদ। সেই মসনদের মালিকরা ইচ্ছেমতো ক্ষমতার অপব্যবহার করেন গণতন্ত্রের নামে। নামে গণতন্ত্রের ধ্বজা উঠালেই তা যে গণতন্ত্র নয় তার বহু প্রমাণ শেখ হাসিনা রেখে গেছেন। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে নিজের স্বৈরশাসনের চাকায় যোগ করেছিলেন একদল লুটেরা সন্ত্রাসী ও ব্যবসায়ীকে, যারা তারই ক্ষমতাবলয়ের অধিবাসী।

সমাজে সম্পদ গড়ে তোলার অদম্য আকাক্সক্ষার যেন ঢল নামে। ব্যবসায়ীরা, শিল্পকারখানা গড়ে তোলে বনে যান শিল্পপতি। এসব পতিরা মূলত ব্যাংক লোন থেকেই পতিত্ববরণ করেন। আর কে না জানে, ব্যাংকের টাকার মালিক আমানতকারী জনগণ। তারপরের ধাপটি হচ্ছে ব্যাংককে লুটের মধ্যমনি করে তোলা। কারণ ব্যাংক জনগণের অর্থ গচ্ছিত রাখে। সেই টাকা গণিমতের মাল হিসেবেই ব্যবসায়ী শিল্পপতিরা বিশ্বাস করেন। আজকে ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী সরকার কি পরিমাণ অর্থ লোপাট করেছে, তার হিসাব চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের রাষ্ট্রযন্ত্র সংস্কারের প্রাথমিক ধাপ থেকেই যে পরিমাণ অর্থবিত্ত লোপাটের চিত্র পাওয়া যাচ্ছে তাকে বঙ্গোপসাগর লোপাটের সাথেই কেবল তুলনা করা যেতে পারে।

এই রকম একটি রাজনৈতিক সমাজের মধ্যে পুঁজির বিকাশ না ঘটে, ঘটেছে লুটেরা পুঁজির ফোঁড়া। আর সেই লুটেরা পুঁজির ফোঁড়ার ভেতর থেকে ভীষণরকম টাটানোর চিৎকার আমরা শুনতে পাচ্ছি। তার বেদনা এতটাই তীব্র যে তার অভিঘাতে তৃণমূলের মানুষ থেকে শুরু করে নগরজীবনের মানুষের মধ্যে ঘৃণা ও তিতার সাগর জন্মেছে। আজ সেই তিতার প্রকাশ ঘটেছে প্রতিরোধের আন্দোলনে আর ঘৃণার রোষ আমরা দেখেছি শেখ হাসিনার পলায়ন আর শেখ মুজিবের মূর্তি গুঁড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা থেকে। জাতির এই নবপ্রজন্ম নতুন জেনারেশনের, যারা জি-জেন, এই প্রজন্ম তিতা আর ঘৃণার উদগীরণ নিয়ে জন্মেছে। তারা প্রচলিত কাঠামোর বিরুদ্ধে অটল আজ। সংস্কার করবে জাতির মৌলিক চেতনাকে... এটিই তাদের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শপথ।
এই শপথের বাণীই তো কবিরা সৃজন করেন কবিতার পঙক্তিতে পঙক্তিতে। চিত্রকল্পে এমন সব বৌদ্ধিক বিষয় আসছে যে আমরা চমকাতে চমকাতে তা পড়ছি।