যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ থেকে দারিদ্র্যতা ও শত প্রতিকূলতা ঠেলেও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সাফল্য অর্জন করা যায় তারই প্রতীক আলমির কাপিক। ৩৮ বছর বয়সী আলমির কাপিক বসনিয়ার নাগরিক। তিনি বসনিয়ার গর্ব, অহঙ্কার। বসনিয়া-হার্জেগোভেনিয়ার পতাকা তিনি ধরে রেখেছিলেন গর্বিতভাবে, যা গভীর সম্মান ও বিনম্র শ্রদ্ধায় আবুধাবিতে পতপত করে উড়িয়েছেন। গত মাসে আবুধাবিতে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড প্রফেশনাল জাইউ-জিতসু চ্যাম্পিয়নশিপে’ বাদামি বেল্ট ডিভিশনে আল্ট্রা হেভিওয়েট চ্যাম্পিয়ন শিরোপা জয়ের শীর্ষে উঠে এসেছেন তিনি। আলজাজিরাকে বিজয়ের অনুভূতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না... আমি অতি আনন্দে কাঁদতে শুরু করেছিলাম। বছরের পর বছর প্রশিণ এবং কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জাইউ-জিতসু চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। আমি অর্জন করেছি মাস্টার বেলটি বাঁধার যোগ্যতা।’
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে বসনিয়ার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের সময় প্রাণে বেঁচে থাকার জন্য ছোটো শহর বনোভিচিতে আলমির কাপিককে কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে। তখন তার বয়স ছিল ১৩ বছর। প্রায় চার বছরব্যাপী যুদ্ধের সময় তার বাবা সার্বিয়ান স্নাইপার দ্বারা গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। মায়ের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে রেড ক্রিসেন্ট থেকে খাবার নিয়ে তাদের বেঁচে থাকতে হয়েছে। সে সময় খাবার এতই দুর্লভ ছিল যে, অনেকেই বেঁচে থাকার জন্য ঘাস-পাতা খেয়েছে। কপিক বলেন,
‘আমরা জীবিত থাকার জন্য লড়াই করছিলাম, টিকে থাকতে চেয়েছিলাম।’
কাপিক পরিশ্রমী ও স্বপ্নদর্শী ছিলেন। যে কাজই করতেন মনোযোগ দিয়ে করতেন। বিশ^াস করতেন মন দিয়ে চেষ্টা করলে ফল একদিন আসবেই। জীবন যুদ্ধে শত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও তিনি সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য হাল ছাড়েননি। খেয়ে না-খেয়ে, অনেক বাধা অতিক্রম অতিক্রম করে সফল ক্যারিয়ার গড়েছেন।
বসনিয়ায় কাপিকের মতো ক্রীড়াবিদদের জন্য রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে খুব সামান্যই সহায়তা রয়েছে। দৈনিক প্রশিণ নিতে অনুশীলনকারীরা বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোয় ব্যক্তিগতভাবে ভাড়া দিয়ে থাকত। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা কিছুই ছিল না। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানীতে সাম্প্রতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য কাপিকের বন্ধুরা আর্থিকভাবে তাকে সাহায্য করেছিলেন।
কাপিক বলেন, ‘বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এমন একটি দেশ যেখানে অনেক বিষয়ে বিভ্রান্তি রয়েছেÑ আইনত, সামাজিকভাবে এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রেও। ক্রীড়াবিদদের চিন্তা করতে হয় কিভাবে খারাপ অবস্থার মধ্যেও নিজেদের প্রশিক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে। তার কোচ ফুয়াদ মুজভিচ বলেন, চ্যালেঞ্জিং অবস্থা দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। আমরা এমন লোক নই; যারা কিছু না পেলেই অভিযোগ করে, অজুহাত পেশ করব। আমরা আবুধাবিতে সোনার পদক পেয়েছি, এই সম্মান এমন কিছু যা আপনি টাকা দিয়ে কিনতে পারবেন না। সফলতার নিয়ম একটাই যে, যত কঠিন প্রশিক্ষণ নেবেন, সে তত সহজে জয় করতে পারবেন। কাপিক অত্যন্ত অধ্যবসায়ী, পরিশ্রমী ও সুশৃঙ্খল। তার বুদ্ধি এবং দৃঢ়তার সীমানা বিস্তৃত।
কাপিক মিসর ও সিরিয়ায় পড়াশোনা করেছেন, তিনি আরবিতে কথা বলেন, বই অনুবাদক হিসেবে কাজ করেন। তিনি একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান, তিনি বিশ্বব্যাপী শিার্থীদের জন্য অনলাইনে কুরআন কাস নেন। দশ বছর আগে কাপিক মিসরের রাজধানী কায়রোয় আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন এবং ‘হাফিজ’ হন।
তিনি বলেন, একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে আমার বিশ্বাস থেকেই আমি মানসিক শক্তি ও উৎসাহ পাই। আমি যখন নবী ও রাসূলদের সম্পর্কে জানি, তাদের জীবনী পড়ি; তখন আমি অনুপ্রাণিত হই। আপনার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টাও বিরাট সার্থকতা পেতে পারে, ক্ষুদ্র থেকেও বড় কিছু করতে পারেন যদি দৃঢ়তা থাকে, সৎ উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন থাকে।
জুলাই মাসে, কাপিক তার মাস্টার বেল্ট পাওয়ার জন্য ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোয় যাবে।
আবুধাবিতে জয়ী হওয়ার পর কাপিক একটি জাতীয় উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে কিভাবে একজন ব্যক্তি সফলতা লাভের জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে পারে। বসনিয়ার যুবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনাকেই কাজ করতে হবে। যারা প্রাণপণ চেষ্টা করে তাদের জন্য ফলাফল অবশেষে আসবেই। এর প্রমাণ হলো কয়েক বছরের সাধনার ফলে যা আবুধাবিতে ঘটেছে; যেখানে আমরা শক্তিশালী দেশ ও শক্তিশালী যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি; কিন্তু বসনিয়া এবং হার্জেগোভিনায়ই পদক এসেছে। আপনার জীবনে ব্যর্থতা আসা হতাশার নয়, হতাশা হচ্ছে ব্যর্থতা এলে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা না করা।