মানুষের জীবন সময়ের ধারায় আবর্তিত। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েই জীবনের সমগ্রতা প্রকাশিত। শুধু সমকালে বিরাজমান জীবন ও জগৎ তাই কবিতায় উপজীব্য হয়ে ওঠে না। একজন কবি জীবনের সমগ্রতাকে অন্বেষণ করেন কালের ত্রিস্তরে। তিনি ইতিহাসে ও ঐতিহ্যে নির্ভর করেন, সেখান থেকে আহরণ করেন নানা উপাদান; আবার আবিষ্কারও করেন নিজস্ব শৈলীতে। কবিতার বিষয়, প্রকরণ, ভাষা ও জীবনবোধ, সব দিক থেকেই একজন কবি ঐতিহ্যের মধ্যে গভীরভাবে নিহিত; কিন্তু আমরা যাকে বিশেষ কারণে ঐতিহ্যপ্রবণ বলি এবং সে কারণটি হলো তিনি সজ্ঞানে ঐতিহ্যের জগৎ থেকে রচনার উপাদান গ্রহণ করেন। অন্য দিকে প্রচলিত ভাব ও ভঙ্গি থেকে প্রকৃত কবি বের হয়ে এসে নতুন বিষয় ও ভাষার গঠন তৈরি করেন। কবির দ্রোহ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ঐতিহ্যবোধের সাথে ইতিহাসচেতনা নিবিড়ভাবে জড়িত। পরিণত কবির জন্য এই চেতনা অপরিহার্য এবং একজন কবি বা লেখককে তা ঐতিহ্যবাদী ও তার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। যেভাবে মধুসূদন পাশ্চাত্য কাব্যজগৎ সম্পর্কে, রবীন্দ্রনাথ মধুসূদন সম্পর্কে, নজরুল ও তিরিশের কবিরা রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে সচেতনতা অর্জন এবং অবস্থান নির্ণয় করেন ঐতিহ্যবোধের কারণে।
বাংলাদেশের কবিতা সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পর পাল্টে যেতে থাকে নতুন স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও আকাক্সার প্রতিফলনে এবং ঢাকাকেন্দ্রিক নতুন এক সমাজ ও সাহিত্য নির্মাণের প্রত্যয় ও প্রচেষ্টায়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাংলা কবিতার সেই স্রোতকে নতুন ধারার সন্ধান দেয় এবং সঞ্জীবনী শক্তিতে বেগবান করে তোলে। পরবর্তীকালে স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিসংগ্রামের ঝড়ো হাওয়ায় জনজীবনের রূপ-রঙের পালা বদলের সঙ্গে সঙ্গে কবিতায়ও সার্বিক রূপান্তর সম্পন্ন হয়। নজরুলের কাব্যজগতের যে ধারাটি আস্থা ও বিশ্বাসের এবং স্বজাতিক ঐতিহ্যের, তাকে একটি সুসম্পন্ন, পূর্ণাঙ্গ ও সমৃদ্ধ রূপ দেন ফররুখ আহমদ। এ প্রবাহকে আরো গভীর, বিস্তৃৃত ও প্রবল করে তোলেন আল মাহমুদ। বাংলাদেশের কবিতায় আশির দশকে এই ধারার একজন শক্তিমান ও মৌলিক কবির আগমন ঘটেÑ মোশাররফ হোসেন খান সেই কবির নাম। নতুন বক্তব্য ও কাব্যভাষা নির্মাণে মোশাররফ হোসেন খান বাংলা কবিতায় একটি মৌলিক কণ্ঠস্বর।
কবি মোশাররফ হোসেন খান স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের পটভূমিকা ও বৈশ্বিক চালচিত্রে আন্দোলিত হয়েছেন প্রবলভাবে। একটি বলিষ্ঠ আদর্শবোধ ও কাব্যশৈলী নিয়ে তিনি কবিতাঙ্গনে হাজির হন। জীবনাদর্শ, কাব্যাদর্শ ও সমাজজিজ্ঞাসা একাকার হয়ে নতুন এক কাব্যকলা নির্মাণ করেন কবি। কবি এ সমাজের একজন সদস্য হিসেবে সমাজের অংশ, সমাজের ঘটমান সব ধরনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্ম। সামাজিক আদর্শ, বাস্তবতা, মানসচেতনা, সামাজিক সংস্কৃতি, অতীত সমাজের জের, সমাজের উৎপাদন সম্পর্কের সূত্র, সংগ্রাম-সঙ্ঘাত, বিবর্তন, আঞ্চলিকতা ইত্যাদির মধ্যে ব্যক্তিকবি যে অভিজ্ঞতায় সাঁতরান; দিনযাপনে তিল তিল করে জমা হয় যে অভিজ্ঞতার শাঁস; শব্দের ভেতর দিয়ে কবিতায় কবি সেই অভিজ্ঞতার বীজ বোনেন। কবি নতুন বক্তব্য উপস্থাপন করেন নতুন আঙ্গিকে; সেখানে প্রেম, ঐতিহ্য ও দ্রোহের চিহ্ন স্বাক্ষরিত :
আমার কবিতা পড়ে যদি কোন কিশোর
কঠিন অঙ্গীকারে ছেড়ে যায় মায়ের কোল
যদি কোন বৃদ্ধ তুলে নেয় হ্যামিলনের বাঁশি
কিংবা কোন অগ্নিপুরুষ যদি জ্বালিয়ে দেয় জালিমের ঘর-দোর
তবে আমার কি দোষ?
[পূর্বলেখ/হৃদয় দিয়ে আগুন]
শুচি জীবনের সাথে যুদ্ধের সম্পর্কই গভীর
সুতরাং যুদ্ধ দিয়েই হোক হাঁটতে শেখা
যদিও রক্তিম কালিতে সূচিত হবে লেখা
তবু নীরব হতে পারে বুক অশান্ত পৃথিবীর।
[শুদ্ধি কথন/নেচে ওঠা সমুদ্র]
আর যা যা হতে পারে, হোক। শুধু একটি মুহূর্ত
আমাকে দাও স্বরূপা। আকাশের নীল তুলে দেবো
সমুদ্রের ঢেউ তুলে দেবো, জোছনার উৎসব
দেবো, আর যতো কিছু দেবো।
[মুহূর্ত ও অমরতা/আরাধ্য অরণ্যে]
এভাবে অজস্র পঙ্ক্তি হাজির করা যাবে যেখানে কবির স্বকণ্ঠ স্বকীয়তায় উচ্চারিত। কবির ব্যক্তিস্বভাব যেসব রূপ প্রকাশ করে, অন্তর্লীন থাকে, বহমান হয় কবির দেহ-মনে-সমাজে, ঠিক সেসব উপাদান কবিতার শিরা-উপশিরায় গুঞ্জরিত হয়। বাংলা কবিতায় মধুসূদন ও নজরুল স্বভাবগত দিক থেকে চঞ্চল, দ্রোহী ও বিপ্লবী ছিলেন; সে কারণে কবিতা ও কাব্যভাষা হয়েছে বাঁধনহারা, বিপ্লবী ও চঞ্চল চিত্তময়। আবার মজার ব্যাপার হলো এই দুই কবির স্বভাব একই ধরনের হলেও দু’জনের কাব্যভাষায় রয়েছে বিস্তর তফাৎ। অন্য দিকে মোশাররফ হোসেন খানও দ্রোহী ও বিপ্লবী স্বভাবের কবি, তবে শান্ত ও অন্তর্মুখী।
কবি মোশাররফ হোসেন খানের মন ও মননকে সমকালের প্রভাব ভেতর-বাইর থেকে আন্দোলিত করে। চলমান ঘটনার অভিজ্ঞতা কবিকে বিপুলভাবে নাড়া দেয়। কবির বেড়ে ওঠার পরিবেশ, দিনযাপন, বিদ্যমান সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতির ঢেউ-হাওয়া-মেঘমালা ও বজ্রপাত কবিকে নতুন ভাব ও ভাষার সন্ধান দেয়। জীবনাদর্শ ও কাব্যাদর্শের ছোঁয়ায় তার কাব্যরূপরীতি ও কাব্যভাষার ধরন গড়ে ওঠে। জীবনাদর্শে কবির জীবনভাবনার সৃষ্টি হয়; বিষয়-ভাবের নিশানা দেয়, ব্যক্তি-সমাজ-সংস্কৃতির প্রতি আপন মতামত ব্যক্ত করে; ভাবের গন্তব্য ঠিক করে ভাষার ধরন বাতলে দেয়। ফলে তার কবিতার ভাষায় যে বাছাই প্রক্রিয়া ও ছাঁচ তৈরি হয়েছে তা একান্ত নিজের জীবনাদর্শ থেকে আগত। সঙ্গে সঙ্গে কাব্যাদর্শ কবিকে যুৎসই ভাষা হাতড়ে একটা আদলে দাঁড় করিয়েছে। যেখানে কবিকণ্ঠ বোল পেয়েছে। বাংলার প্রতিটি প্রকৃত কবির ক্ষেত্রে এ কথা সত্য।
প্রথম কাব্য ‘হৃদয় দিয়ে আগুন’ (১৯৮৬) প্রকাশেই মোশাররফ হোসেন খান কবি হিসেবে মৌলিকতার স্বীকৃতি পান ও চমক সৃষ্টি করেন। এখানে নয়া ভাব ও ভাষার সৌন্দর্য দৃশ্যমান। দ্রোহী, প্রেমিক, যোদ্ধা, শান্তিবাদী কবির মর্যাদা পান। ‘নেচে ওঠা সমুদ্র’ (১৯৮৭) কাব্যে কবি একজন মানবতাবাদী ও ঐতিহ্যসন্ধানী কবি হিসেবে হাজির হন। ‘আরাধ্য অরণ্যে’ (১৯৯০) কবি প্রকৃত মানুষের অস্তিত্ব সন্ধান করেন। ‘বিরল বাতাসের টানে’ (১৯৯১) কাব্যে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় প্রতীক্ষাকাতর কবিপ্রাণ প্রকাশিত। ‘পাথরে পারদ জ্বলে’ (১৯৯৫) নতুন বাঁক সৃষ্টি করেÑ ইতিহাস-সমকাল-দর্শন মিলে কাল ও কালান্তরের মাঝে কবি হয়ে ওঠেন একজন দ্রষ্টা। ‘ক্রীতদাসের চোখ’ (১৯৯৭) কাব্যটি আঙ্গিকগত দিক থেকে ভিন্ন ও বক্তব্যে লক্ষ্যভেদী। পরবর্তীকালে প্রকাশ পেয়েছে ‘নতুনের কবিতা’ (২০০০), ‘বৃষ্টি ছুঁয়েছে মনের মৃত্তিকা’ (২০০২), ‘দাহন বেলায়’ (২০০২), ‘স্বপ্নের সানুদেশ’ (২০০৯), ‘পিতার পাঠশালা’, ‘সবুজ পৃথিবীর কম্পন’ ইত্যাদি কাব্য। সমগ্র কাব্যের মাঝে সব দিক থেকে বিবেচনা করে আমার কাছে ‘পাথরে পারদ জ্বলে’ নামক কবিতাটি সর্বশ্রেষ্ঠ মনে হয়েছে; সেখানে বিস্ময়-রহস্য-দ্রোহ-সর্বাত্মক দৃষ্টি-দর্শন-মানবতা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে জ্বলে উঠেছে কাব্যিক ব্যঞ্জনা ও শক্তিতে।
এসব কাব্যে মোশাররফ হোসেন খানের মৌলিকতা, শক্তিসামর্থ্য, নির্মাণশৈলী ও দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপকতা ও গভীরতা প্রকাশিত। তিনি ছন্দ ও প্রকরণ সচেতন একজন আদর্শবাদী আধুনিক কবি, সেই সঙ্গে সমকাল ও ঐতিহ্যপ্রীতি তাকে মাটি ও মানুষকেন্দ্রিক দৃষ্টি দিয়েছে। স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধতা দিয়েছে। সব্যসাচী সাহিত্যিক আবদুল মান্নান সৈয়দ তার কাব্যে ‘বিশিষ্টতা’ ও ‘বিস্ময়’ দেখে মন্তব্য করেছিলেন : ‘...মনে হচ্ছে বাংলা কবিতায় দেখা দিয়েছেন কোনো নবীন জুলে সুপেরভিয়েল।’ সত্যিই একজন মৌলিক কবির আবির্ভাব সম্পন্ন হয়েছে মোশাররফ হোসেন খানের মাধ্যমে। এ কবিই কালান্তরের আদি সত্য উচ্চারণ করেছেন :
পাথরে পারদ জ্বলে, জলে ভাঙ্গে ঢেউ
ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে জানি গড়ে যাবে কেউ।
মানুষের জীবন সময়ের ধারায় আবর্তিত। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েই জীবনের সমগ্রতা প্রকাশিত। শুধু সমকালে বিরাজমান জীবন ও জগৎ তাই কবিতায় উপজীব্য হয়ে ওঠে না।...
