দুঃখ কিংবা সুখ অনুভবের জন্যও সময় লাগে। চোখের সামনে নিজের বাবাকে নির্মমভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে মরতে দেখেছে বেলাল। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জঘন্য বর্বরতার শিকার অগণিত মানুষের মধ্যে সেও একজন। কোনো দিন দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেনি বেলাল, বাবা অলি আহমদকে এভাবে মৃত্যুবরণ করতে হবে। মৃত্যু সব জীবনেরই স্বাভাবিক পরিণতি। বেলাল এটি জানে বেশ ভালো করে। মনে-প্রাণে বিশ^াস করে। একজন ধর্মভীরু মুসলমান সে। কারো সাথে কোনো ঝামেলা কিংবা হিংসা বিদ্বেষ, লোভ-লালসায় জড়ায়নি কোনো দিন। পরিবারের প্রধান হিসেবে বেলালের বাবা অলি আহমদ সবাইকে আদর্শবান হতে শিক্ষা দিয়েছেন। বাবার আদর্শ মেনে চলার চেষ্টা করে আসছে বেলাল। বাবার জন্য এক ধরনের গর্ব সবসময়ই অন্তরে জেগে ছিল। সেই আদর্শের মানুষটিকে চোখের সামনে বর্মি সৈন্যদের গুলিতে মরতে দেখেছে বেলাল।
নিজের প্রাণ বাঁচাতে বাবার লাশ ফেলে রেখেই ছুটে পালাতে হয়েছে বেলালকে। মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যের মংডু জেলার রাশিদং গ্রামে তাদের বাড়ি। মা-বাবাসহ তাদের ছয়জনের পরিবার। জমি ছিল প্রায় ১৫ বিঘা। আটটি গরু। অবস্থাপন্ন কৃষক পরিবার বলা যায় তাদের। অভাব, অভিযোগ ছিল না। কিন্তু সেই সুখের সংসার আজ ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে।
প্রিয় বাবার লাশ পেছনে ধান ক্ষেতে ফেলে রেখে অন্য অনেকের মতো তাকে ছুটতে হয়েছে প্রাণ বাঁচাতে। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে ভিনদেশে অজানা গন্তব্যে ছুটতে হয়েছে বেলালকে।
বাবাকে হারিয়ে একরকম অনুভূতিহীন নির্বাক পাথর হয়ে গিয়েছিল বেলাল। মা, ভাইবোন সবাই কোথায় আছে, কোথায় গেছে জানে না সে। আদৌ তারা বেঁচে আছে কি না তাও জানে না।
এ পৃথিবীতে রোহিঙ্গা হয়ে জন্ম নেয়াটা গুরুতর অপরাধ মনে হয় বেলালের কাছে। সাগরে কচুরিপনার মতো ভাসছে সে। স্রোতের টানে কোন দিকে যাবে জানে না। জন্মের পর থেকে বেলাল দেখে আসছে একধরনের বন্দী জীবনযাপন করতে হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। আরাকানে হরেক রকমের নিষেধাজ্ঞার মধ্যে একরকম বন্দী জীবনযাপন করতে হয়েছে তাদের সবাইকে।
মংডু জেলার রাশিদং থেকে একটানা অনেক পথ হেঁটে প্রাণ বাঁচাতে শত শত নারী-পুরুষের সাথে বাংলাদেশে ঢোকার জন্য অবশেষে নাইক্ষ্যংদিয়া চরে এসে পৌঁছেছে বেলাল।
দুর্গম এই এলাকায় লোকজনের কোনো বসতি নেই, সাধারণত জেলেরা মাছ ধরতে এ দিকে আসে। এ পথ দিয়ে মিয়ানমার থেকে অবৈধভাবে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী বাংলাদেশে পাচার হয় বলে শুনেছে বেলাল। এর মধ্যে ইয়াবার চালানটা খুব সাবধানে যায়। এর সঙ্গে অনেক রাখাইন মগ জড়িত।
রোহিঙ্গাদের মধ্যেও কেউ কেউ কম পরিশ্রমে প্রচুর লাভের আশায় আজকাল বাংলাদেশ ইয়াবা পাচারে নিজেদের জড়িয়েছে। বেলালকে তার বন্ধু-বান্ধবদের কয়েকজন প্রস্তাব দিয়েছিল ইয়াবা পাচারের ব্যবসায় নামতে। কিন্তু সৎ ও ধার্মিক বাবার সন্তান হিসেবে আদর্শ জীবনটাকে বেছে নিয়েছে যে মানুষ তাকে প্রচুর অর্থবিত্ত অর্জনের প্রলোভন কোনোভাবে আকৃষ্ট করতে পারেনি।
অনেক যুদ্ধ করে একসময় জয়ী হয় বেলাল। একটা মোটামুটি বড় আকারের মাছ ধরার নৌকায় উঠতে পারে সে। গাদাগাদি করে নারী-পুরুষ-শিশু তোলা হচ্ছে নৌকায়।
নৌকার চালক বারবার যাত্রীদের সাবধান করছে ‘আর নো উইট্টো, বেশি মানুষ উডিলে আই নৌকা লই নো যাইয়্যুম, দইজ্যার অবস্থা খুব খারাপ আজিয়া, পাহাড়ের মতো ঢেউ উডের, বাতাস বর, কোন সময় কি হই যায় কইন্যো ফাইজ্জুম, দইজ্জ্যার মধ্যে নৌকাডুবি গেলে কেউ নো বাঁচিবো, আই তোঁয়ারারে হুঁশিয়ার করি দেইরদে তোঁয়ারার ভালার লাই, আঁয়ার কথা নো হুনিলে বিপদ বাড়িবো’
কিন্তু তার কথায় ভ্রƒক্ষেপ করছে না কেউ। যে যার মতো পারছে নৌকায় চড়তে চাইছে। এ জন্য মরিয়া হয়ে উঠছে কেউ কেউ। ভয়ঙ্কর বিপদ হতে পারে জেনেও নাইক্ষ্যংদিয়া চরে ভিড়া মাছ ধরার মোটামুটি বড় আকারের নৌকায় ওঠে নারী, শিশুসহ ৮০ জন রোহিঙ্গা। নৌকার চালকের নিষেধাজ্ঞা কেউ মানে না। সবার উৎকণ্ঠা, কিভাবে এখান থেকে নাফ নদী পাড়ি দিয়ে ওপারে টেকনাফের শাহ পরীর দ্বীপে পৌঁছবে। এ পারে কেউ নিরাপদ নয়। কারণ এ জায়গাটা মিয়ানমার ভূখণ্ডে থাকায় আবার কখন বর্মি নৌবাহিনীর টহল বোট চলে আসে কে জানে। ওরা এলে কি ঘটবে সবাই জানে। তাই আর দেরি করতে চাইছে না কেউ। যে কোনোভাবে নৌকায় চড়ে নাফ নদী পাড়ি দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সবাই।
আজকের আবহাওয়া মোটেও সুবিধার মনে হচ্ছে না। হঠাৎ হঠাৎ দমকা হাওয়া বইছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। তেমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় কোনো মাঝি বা চালক তার নৌকা নিয়ে উত্তাল সাগরে যাত্রী বোঝাই করে যাওয়ার সাহস করবে না। অথচ এখন নাইক্ষ্যংদিয়া চর থেকে নৌকাটি ছেড়ে উত্তাল সাগরে নেমেছে। সাগর পথে কিছুটা গিয়ে নাফ নদীতে গিয়ে পড়বে নৌকাটি। ইঞ্জিনচালিত হলেও উত্তাল সাগরে দমকা হাওয়ায় বেসামাল হয়ে পড়ছে যাত্রা শুরুর পর থেকেই। আরো কয়েক ঘণ্টার পথ পড়ে আছে সামনে।
এখন অনেক রাত। খট খট শব্দ তুলে কাঠের তৈরি ইঞ্জিনচালিত নৌকাটা ঝড় তুফান উপেক্ষা করে এগিয়ে চলছে। সাগরে উত্তাল ভাবটা কমে আসছে ধীরে ধীরে। তবে মাঝে মাঝেই দমকা হাওয়ার সঙ্গে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।
নৌকার পাটাতনের নিচে শুয়ে বসে থাকা লোকগুলোর চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ। কেউ কোনো কথা বলছে না। সবাই নির্বাক মূর্তির মতো বসে আছে। যারা শুয়ে আছে তারাও মৃত মানুষের মতো চুপচাপ। এক কোণায় টিম টিম ধরে জ্বলছে ছোট্ট একটি হারিকেন। ওটার ম্লান আলোয় পরিবেশটা আরো ভুতুড়ে হয়ে উঠেছে। নৌকার ইঞ্জিনের একটানা শব্দ আর হ্যারিকেনের বাতির ধোঁয়ার গন্ধে বেলালের শরীরটা গুলিয়ে আসতে চায়। বেশ কয়েক দিন ধরে পেটে দানাপানি কিছুই পড়েনি। খালিপেট। তার পরও বমির উদ্রেক হতে থাকে। মনে হয় পেটের নাড়িভুড়ি সব বুঝি বেরিয়ে আসবে।

দুই
নৌকার ভেতরে কাঠের পাটাতনের নিচে বসে বাইরের অবস্থা বোঝার কোনো সুযোগ নেই। নৌকার ইঞ্জিন চলছে। খট খট শব্দ শোনা যাচ্ছে একটানা। বাইরে এখন রাত না দিন, এখান থেকে অনুমান করা যায় না। নৌকা ছাড়ার সময় আবহাওয়া অনেক খারাপ ছিল। দমকা হাওয়া আর সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এগোচ্ছিল নৌকাটা। বেশ দুলছিল কাঠের তৈরি নৌকাটা। ভেতরে গাদাগাদি করে ওঠা যাত্রীরা স্থির হয়ে বসতে কিংবা দাঁড়াতে পারছিল না। নৌকার প্রচণ্ড দুলুনিতে তারা একে অন্যের ওপর গিয়ে পড়ছিল। ভয়ে আতঙ্কে সবাই চিৎকার করে উঠছিল। দোয়া দরুদ পড়ে সৃষ্টিকর্তার সাহায্য প্রার্থনা করছিল।
গত কয়েক ঘণ্টায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে অনুমান করা যায়। নৌকাটা এখন আর আগের মতো দুলছে না। তার মানে আবহাওয়ার উন্নতি হয়েছে, দুর্যোগপূর্ণ ভাবটা কেটে গেছে।
বেলাল কিছুটা কৌতূহলী হয়ে সিঁড়ি বেয়ে খুব সাবধানে ওপরে ওঠে। কাঠের পাটাতনটা সরিয়ে উপরে উঠে আসে। তার দেখাদেখি আরো কয়েকজন উঠে আসে উপরে।
নাহ, রাতের অন্ধকার কেটে গেছে। এখন সকাল হয়েছে। সাগরের নোনা বাতাস এসে গায়ে লাগে। তাতেই শরীর মন জুড়িয়ে যায়। সাগরের পানি থেকে ভেসে আসা অদ্ভুত গন্ধে বাতাসের হালকা স্পর্শ থাকে। বেলালের খুব ভালো লাগতে থাকতে। মনের মধ্যে অনেক ধরনের চিন্তাভাবনা চেপে থাকলেও এক ধরনের প্রশান্তি অনুভব করে এ মুহূর্তে।
তাকিয়ে এদিক-ওদিক দেখে, সীমাহীন জলরাশি ছাড়া আর কিছ্ইু চোখে পড়ে না। টেকনাফ কোনদিকে জানে না সে। চার পাশে শুধু পানি আর পানি। তীরের কোনো নাম নিশানা নেই। তার মানে নৌকাটা এখনো দরিয়ায় রয়ে গেছে। নাফ নদীর কাছে যেতে পারেনি। বেলাল ভাবতে থাকে, আর কতটা সময় ধরে তাদের এই সাগরে কাটাতে হবে। এখন সাগর বেশ শান্ত। কাল রাতের দুর্যোগপূর্ণ রূপ এখন আর নেই। কিন্তু সাগরকে নাকি সহজে বিশ্বাস করা যায় না। শান্ত সাগরও হঠাৎ করেই অশান্ত, অস্থির হয়ে ওঠে। আবারো যদি তেমন রুদ্র মূর্তি ফিরে আসে এই সাগরে, প্রকৃতি যদি বিরূপ হয়ে ওঠে, তাহলে কী হবে? প্রশ্ন করে সে নিজেকে।
মেঘের ছিটেফোঁটা নেই এখন আকাশে। রোদ উঠেছে। চার পাশ ঝলমল করছে রোদের উজ্জ্বলতায়। বেলাল অবাক হয়ে সাগরে প্রথম সকাল হওয়া দেখে। এর আগে কিছু দিন মাছ ধরার বোটে কিছু দিন শ্রমিকের কাজ করেছে সে, গভীর সমুদ্রে যাওয়ার অভিজ্ঞতা খুব বেশি হয়নি তার। উপকূলবর্তী অঞ্চল থেকে মাছ ধরে দিনে দিনে ফিরে এসেছে। গভীর সমুদ্রে সকাল দেখার সুযোগ হয়নি।
দিনের বয়স বাড়ার সাথে সাথে রোদেরও তেজ বাড়তে থাকে ক্রমেই। নৌকার ওপরে খোলা আকাশের নিচে আর বসে থাকতে পারে না বেলাল ও অন্যরা। শরীর জ্বালাপোড়া করতে শুরু করে। তারা সবাই আবার নৌকার কাঠের পাটাতন সরিয়ে নিচের কুঠুরিতে গিয়ে ঢুকে পড়ে। একপাশে শুয়ে থাকারও সুযোগ নেই। আগে যেখানে বসেছিল সে জায়গাটাও দখল হয়ে গেছে।
নৌকাটা চলছে খুবই ধীরগতিতে। যে গতিতে ওটার চলার কথা তেমনভাবে চলতে পারছে না।
কিছুক্ষণ আগে নৌকার চালকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চেয়েছিল কয়েকজন। লোকটি চিন্তিত মুখে বলেছে, ‘ইঞ্জিনত গড়বড় দেখা দিয়েদে, ঠিক মতন ন চলের, আঁয়ারা চেষ্টা করির, আল্লাহ ভরসা, চিন্তা ন কইজ্জুন, ব্যাক ‘ঠিক হই যাইবো।’ ‘এক্কানা সবুর করো বদ্দা।’
তিন দিন তিন রাত ধরে আশিজন নারী-পুরুষ সবাই নৌকায়। সাথে আনা খাবার দাবার, পানি সবই শেষ হয়ে গেছে সেই কবে। ছোট ছোট শিশুগুলো ক্ষিধে সহ্য করতে না পেরে কিছুক্ষণ পরপর কেঁদে উঠছে। মায়েরা তাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুদের বুকের দুধ খেতে দিচ্ছে বটে, কিন্তু মায়ের বুকে দুধ থাকলে তো শিশু তা পাবে।
ভয়ঙ্কর একটা দুঃস্বপ্ন দেখে হঠাৎ বেলালের ঘুম ভেঙে যায়। আজকাল প্রায়ই এমন হচ্ছে তার। ঘুমোলেই দুঃস্বপ্নেরা এসে ভিড় করছে।
ধড়মড় করে উঠে বসে বেলাল। বসেই আশপাশে তাকায়। সেই আগের মতো খটখট শব্দ করে নৌকাটা চলছে। সে অনুমান করতে চেষ্টা করে, এখন রাত না দিন? কিন্তু নৌকার ভেতর এই কুঠুরিতে বসে তা বোঝার উপায় নেই।
বেলাল আবার কিছুটা উৎকণ্ঠা আর দুশ্চিন্তা নিয়ে নিচ থেকে উপরে উঠে আসে।
আকাশে চাঁদ উঠেছে। ভরা পূর্ণিমার রাত। সাগরের সব কিছুই দেখা যায়, দিনের মতো স্পষ্ট যেন। সাগরের মাঝারি আকারের ঢেউয়ের তালে দুলছে তাদের নৌকাটা। কিন্তু বেশ ধীরগতিতে নৌকাটা এগোচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপে কখন পৌঁছবে বেলাল জানতে চায়। নৌকার চালক ইঞ্জিন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে আছে। তার কথা শুনেও না শোনার ভান করে ব্যস্ততায় ডুবে থাকে।
বেলাল নাছোড়বান্দা হয়ে আবারো প্রশ্ন করে, ‘আঁয়ারা টেকনাফ যাই পোচ্ছুম কন সময়, এত সময় তো লাগিবার কথা নয়, হাঁছা করি কইয়ো তো ও বদ্দা, কি হইয়ে দে?’
অনেক চাপাচাপির পর নৌকার চালক তার ভুল স্বীকার করে। সে জানায়, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ঝড়ের রাতে সাগরের অনেকটা ভেতরে চলে এসেছে তারা, পথ হারিয়ে ফেলেছিল। তবে এখন আবার তারা টেকনাফ উপকূল ধরে এগোচ্ছে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নাফ নদীতে গিয়ে পড়বে নৌকাটা। নিরাপদে নাফ নদী অতিক্রম করতে পারলেই শাহ পরীর দ্বীপে পৌঁছে যাবে তারা। সেই গন্তব্যে তাদের জন্য কী অপেক্ষা করে আছে, জানে না কেউ। তবুও অনিশ্চিত গন্তব্যে পৌঁছার অপেক্ষায় প্রহর গুনতে থাকে নৌকার সব যাত্রী। সাগরের বিস্তীর্ণ জলরাশির দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বেলাল। নিজের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতে উদাস হয়ে পড়ে সে। হ