সাংবাদিক ও কবি হাসান হাফিজ বাংলাদেশের সাহিত্য-পরিসরে একটি পরিচিত নাম। সাহিত্য-সম্পাদক হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন। চার দশকেরও অধিককাল তিনি সাহিত্যচর্চার সাথে সম্পৃক্ত। গদ্য ও কবিতাÑ দুই মাধ্যমেই তাঁর সহজ বিচরণ পাঠকের নজর কাড়ে। শিশুসাহিত্যে হাফিজের স্বচ্ছন্দ গতি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে বেশ কিছুকাল আগেই। কবিতা নিয়ে তাঁর যে কারবার, সেখানে বাণিজ্য-বাসনা নেই, লাভ এবং লোভের প্রত্যাশাও খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। পেশাগত কাজের আড়ালে, ফাঁকে, অবসরে, খেয়ালে, অনুভবের নিবিড়তায় তিনি গেঁথে চলেছেন শব্দের মালা। নিরন্তর কবিতাযাত্রী হাফিজ। খবরের কাগজে কাজ করার সুবাদে সমকালীন সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি, ক্রীড়া-বিনোদন, আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্বাচন, প্রশাসন ও শাসন, শোষণ এবং সুবিধাভোগের প্রতিযোগিতা প্রভৃতি সমাচার তাঁর কবিতার উপাদান ও প্রেরণা হয়েছে। আর তাই তিনি ক্রমাগত হয়ে ওঠেন সময়ের সতর্ক সন্তান এবং সাবধানী কবিতা-নির্মাতা।
প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের আলোড়ন, স্রোতস্বিনী নদীর অবিরল ধারা, পাহাড়ের আহ্বান হাসান হাফিজ শুনতে পেয়েছেন। তিনি জানেন, ‘একদা ভাঙন ছিল/স্রোতের দাপট ছিল/ সেইসব জলের উচ্ছ্বাস/ হাওয়া প্রেমিকের সঙ্গে লুকোচুরি’। কিন্তু এখন কেবল হাহাকার। সবখানে শুধু ‘দূর পাহাড়ের ঘুম’। কবি দায়মোচনের ভার গ্রহণ করে প্রজন্মকে মুক্তি দিতে চান। কেননা, ‘দায়মোচনের মধ্যে শান্তি আছে এক প্রকার’। (‘দায়’)
ভাষা আন্দোলনের মাত্র তিন বছর পরে তাঁর জন্ম। তিনি বেড়ে উঠেছেন পাকিস্তানের বিরূপ রাজনীতি, পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি শাসকের বঞ্চনা, জনতার অধিকার আদায় আর সম্ভ্রম রক্ষারসমূহ জাতীয় সংগ্রাম-বিদ্রোহের সুরের ধারার ভেতর দিয়ে। তাঁর সৃজন ও মননে তাই হয়তো, বাংলাদেশের জাতীয় চেতনার সুরটি প্রবলভাবে প্রবেশ করতে পেরেছে। কৈশোরের ক্রান্তিকালে বা যৌবনের প্রারম্ভে তিনি পাড়ি দিয়েছেন মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রহরগুলো। জাতীয় জীবনের যাবতীয় জটিলতা ও সম্ভাবনা তিনি ধারণ করেছেন কবিতার শব্দে ও সুরে। অভিজ্ঞতা দিয়ে কবি অনুভব করেছেনÑ ‘বেঁচে আছি এই ঢের!’, ‘বসন্ত বিগত বহুকাল’, ‘প্রত্যাখ্যান যে করেছে/ভেতরে ভেতরে কিন্তু পরাজিত সেও’Ñ এইসব প্রৌঢ়ক্তি। মানুষ যে ডিসিপ্লিন্ড প্রাণি নয়Ñ সমাজ থেকে, প্রকৃতি থেকে মানুষ যে খুব বেশি শিক্ষা নেয় না, তার সত্যতা জানেন হাসান হাফিজ। পিপিলিকার মতো শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন যে আমরা আয়ত্ত করতে পারি না, তার ছবি আছে তাঁর কবিতায়Ñ ‘পিঁপড়েও জোটবদ্ধ/মানুষ তা নয়/ছিদ্র অন্বেষণ করে/মানুষ ফুরিয়ে ফেলে/কষ্টে পাওয়া মহার্ঘ জীবন।’ (‘নিজেরই নিয়মে’) বাংলাদেশের মানুষ গাল-গল্প করতে ভালোবাসে। কী গণতন্ত্র কী জোছনা কী নিরাপত্তা কী কল্পনাÑ সব বিষয়েই আমরা পরিকল্পনাহীন। আর তাই, জাতীয়ভাবে আমরা ভিক্ষাবৃত্তি নির্বাহ করিÑ কী দেশে কী আন্তর্জাতিক পরিসরে। কখনো কখনো ভিক্ষাবৃত্তিতে কাজ না হলে আমরা আশ্রয় গ্রহণ করি লুটতরাজে। লোভ আর লাভের পিপাসায় ব্যাকুল যেন বাঙালি! হাসান বলেনÑ ‘ফেনাই বেশি/ পদার্থ কম।’ আমাদের জীবনে ‘দিনান্তে দুঃখের ঘড়া পরিপূর্ণ’। নীরবতা নামক ভদ্রতায় আচ্ছন্ন আমরা। তবে তিনি অনুভব করেছেন শব্দের উদ্বেলতার অশেষ প্রয়োজন। এই কবি চেয়েছেন নারী-সন্তানের সহজ-বিচরণÑ সাধ্যমতো জীবিকার সাথে তাদের সম্পৃক্ততা এবং সংসারে যথশব্দের প্রয়োগ প্রয়োজন। নৈঃশব্দ্যে আঘাত করে উন্নতির সিঁড়ি তৈরি করার স্বপ্ন দেখেছেনÑ ‘কথা ছিল/ওপরে ওঠার,/কিন্তু আমরা নেমে যাচ্ছি/আদিম আঁধার বৃত্ত নিচের বলয়ে,/ অতীতেরও চেয়ে ম্লান/ বর্ণহীন তামসিক/ দুর্গম পাতালে!’ (‘সিঁড়ির কী দোষ’)
মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় চেতনার আরেক নাম। কবির পক্ষে এই চেতনা থেকে দূরে থাকা অসম্ভব। হাসান হাফিজ লিখেছেনÑ ‘মুক্তিযুদ্ধ তুমি একটি গীতল কবিতা/দুরন্ত প্লাবন ঝড় উপমা তোমার/ যার তীব্র তুর্কী তোড়ে ভেসে গেছে/বন্দিত্বের গ্লানি দুঃখ যন্ত্রণা ও রক্তপাত’। লাখ লাখ মানুষের বিশ^াসী অভিযান কীভাবে মৃত্যুপুরী থেকে একটি জাতিকে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার এনে দেয়, তার সহজ বিবরণ পাওয়া যায় হাফিজের কবিতায়। অসীম আঁধার কান্তি পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত আমরা যে লাল ভোর আনতে সমর্থ হয়েছি, সে বীরত্বের কথা কে না জানে। যদিও কেউ কেউ মনে করেনÑ ১৯৭১ সালে নাটকীয়ভাবে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম। কিন্তু কবি হাসানের ধারণা ভাষা-আন্দোলন থেকে ধারাবাহিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পথ ও নিশানা নির্মিত হয়েছেÑ ‘রক্তস্নাত এই যে পতাকা/বায়ান্নর রক্তসিঁড়ি বেয়ে বেয়ে/উঠেছে আকাশে, উড়ন্ত দুরন্ত স্পর্ধায়’। (‘লাল-সবুজ’) ভাষা-আন্দোলন বিষয়ে লিখেছেনÑ ‘মায়ের ভাষার মান বাঁচাতে/শোধ করেছি ঋণ’। (‘ভাষা, ভালোবাসা’) ‘শহীদ মিনার তুমি বেঁচে আছো মানুষের বুকের গহনে’। ‘শহীদ মিনার এক স্রোতস্বিনী চিরঞ্জীব বিদ্রোহেরই নাম’। কবির কাছে ‘একুশ মানে রক্তজমিন’, ‘একুশ মানে সূর্য উদয়’, ‘একুশ মানে রক্তসোপান’। অবশ্য তাঁর ধারণা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের যে অভিযাত্রা, যে সংগ্রাম, গেরিলা যুদ্ধের যে অগ্নিস্মৃতি, তা আজও শেষ হয়নি। অথবা পূরণ হয়নি আমাদের প্রত্যাশা। তাই তিনি প্রয়োজন অনুভব করেছেনÑ ‘বারবার মুক্তিযুদ্ধ চাই/আরো রক্ত আরো ত্যাগ/আরো দাহ আরো প্রতিবাদ/আরো দীর্ঘ পথচলা।’ (‘পূর্ণতার প্রত্যাশা’)
ইতিহাসচর্চায় বাঙালি দুর্বল জাতি। সত্য-উদ্ঘাটনে আমরা বড় বেশি রাজনীতি-প্রবণ। সত্য কথা বলতে গেলে, শুনতে গেলে আমাদের ‘শ^াসকষ্ট, রক্তচাপ’ বাড়ে। জানি না হেয়ালি করে না-কি ক্ষোভে না-কি কঠিন কোনো উপলব্ধি থেকে জীবনের আড়াল-প্রবণতাকে প্রকাশ করার জন্য তিনি বলেছেনÑ ‘নীরবতাও এক ধরনের শিল্প। বুঝতে পারে ক’জন?/ উপেক্ষাও স্বীকৃতি এক রকম! ঠাহর হয়নি তাও!’ (‘আড়ালবর্তী’); ‘দেয়ালেরও চোখ কান আছে/দেখা যায় না, কিন্তু আছে ঠিকই।... বোবাদেরও শত্রু হয়।’ (‘চুপ, এই চুপ’) হাসান হাফিজ ‘শূন্যতা ও অভিমান’ বুকে নিয়ে, দীর্ঘশ^াস ও ঘুমকাতরতা পেরিয়ে ধারণ করেছেন ‘বসন্তের বুকভরা ঝরাপাতা’। জেনেছেন ‘আবেগের কানাকড়ি মূল্য নেই’। জরুরি স্পর্ধায় উন্নীত হয়ে তিনি দেখেছেন দেশের ভাষা-আন্দোলন ও স্বাধীনতার উজ্জ্বলতা।
বাঙালি জাতি সাংস্কৃতিকভাবে আনকালচারড। সভ্যতার নামে এখানে চলে সস্তা-সন্তোষের কেনা-বেচা। এখানে ‘দাসপ্রথা আজও আছে’ ভেবে ভেবে কান্ত কবি হাসান। তাই, বাঙালি জীবনের অস্পষ্টতাকে ধরতে গিয়ে রাতকে মৃত্যুর সাথে তুলনা করেছেন তিনি। দেখেছেন এই দুই-এর মধ্যে গোপন আঁতাত। আর ভেবেছেন আমাদের বাচালতা-বাতুলতার কথা। আমাদের অক্ষমতার কথা। তাঁর বর্ণনাÑ ‘টেবিলে টেবিলে কতো হৈ চৈ। মুণ্ডুপাত,/ বধ হচ্ছে রাজা-মন্ত্রী, ঠাণ্ডা হচ্ছে কফিÑ/ছোট কাগজের জন্ম, সমস্যা-বিকাশ আর/ সম্ভাবনা আলোচিত অন্তহীন তর্কে জিজ্ঞাসায়’। (‘কফি হাউসে, কলকাতায়’)
কবি হাসান হাফিজ কবিতার শব্দ আর শিল্পের সৌন্দর্যের সাধনা করতে করতে অনুভব করেছেনÑ ‘অভিমানই আজকাল নিত্যসহচর’। কবির ‘নিরীহ কলম থেকে কী আর বেরুবে?/... সামান্য স্বপ্নের কলি/জ¦লে পুড়ে ছাই/দুর্বৃত্তের লালসা ও কামনা আগুনে।’ দুই বেলা ভাত জোটানোই যেখানে দায়, সামাজিক নিরাপত্তা যেখানে স্বপ্নমাত্র, শিক্ষা ও মানবাধিকার যেখানে কেবল মিডিয়ার বিবৃতি-ভাষ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে স্বপ্নের কী দাম আছে? সেই দেশে কবির কথাইবা শোনে কারা? আর কবিরাও হয়তো আবছা আবছা কিছুর কথাই শুধু ঘুরে-ফিরে বলতে থাকেন। কখনো কোনো কবি হয়তো লিখেও ফেলেনÑ ‘কপর্দকশূন্য হয়ে মানুষ বিদায় নেয়’। অথবা প্রবল হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে ভাবেনÑ ‘প্রতিশোধ কখনো সুন্দর হয় না’। কিংবা সাজিয়ে তোলেন নিজেরই অলিখিত কথামালাÑ ‘যখন কিচ্ছুতেই মন বসতে চায় না, তখন প্রবল কোনও শূন্যতার/ কাঁধে চড়ে নিবিষ্ট উড়াল দিই অধ্যাত্ম-আকাশে। এই ডানা/ কোথায় পেয়েছি আমি’?Ñ এভাবে নিজস্ব বিবরে প্রবেশ করতে করতে হয়তো কথার কারিগর কোনো অবসরে সত্যি সত্যিই কবি হয়ে ওঠেন। আবার কবিতার ভিড়ের ভেতরে থেকেও তিনি শুনতে পান দিনশেষের বারতা। মৃত্যুর অসীম আহ্বানে নতশির কবি লেখেনÑ ‘অসময়ে জেগে উঠে লাভ-ক্ষতি নির্ণয়ের চেষ্টা ও প্রয়াস ঠিক কতোটা সফল হবে/বুঝি না দয়াল’। (‘বল ভরসা দাও রে দয়াল’) হাসান হাফিজ, এভাবে বিবর্ণতার ভেতর থেকে, অসম্ভব সব সম্ভবের ভেতর থেকে কল্পনা ও পরিকল্পনার, চিন্তা ও স্বপ্নের দরোজায় টোকা দিয়ে দিয়ে হয়ে-ওঠা কবিদের একজনÑ ‘গভীর নিখাদ শুদ্ধ’ কবি।
সাংবাদিক ও কবি হাসান হাফিজ বাংলাদেশের সাহিত্য-পরিসরে একটি পরিচিত নাম। সাহিত্য-সম্পাদক হিসেবে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছেন। চার দশকেরও অধিককাল তিনি সাহিত্যচর্চার সাথে সম্পৃক্ত। গদ্য ও...
