পরাবাস্তবতা হচ্ছে এমন এক ধরনের বাস্তবতা যে বাস্তবতার সাথে চাক্ষুষ বাস্তবতার কোনো মিল নেই। কিছু মিল থাকতেও পারে অবশ্য। ইংরেজিতে সুররিয়েলিজম (ংঁৎৎবধষরংস) বলা হয়। বস্তুত চেতনার মূল ভিত্তি হলো অযুক্তি ও অবচেতন। ফ্রয়েডীয় মনস্তাত্ত্বিক ধারণা মিলানো যায় এখানে। মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের ভাবনা- মানুষ অবচেতন মনে অনেক কিছুই করে বা ভাবে। তিনি বলেনÑ এ ভাবনা চেতন মনের চেয়ে অবচেতন মনেরই বেশি। পরাবাস্তবতা হচ্ছে মানুষের চেতনটা যখন শিথিল হয় তখন মানব মনে অবচেতন প্রভাব ফেলে। এটি হচ্ছে কবির প্রতীক ও চিত্রকল্পগুলোর মধ্যে যোগসূত্র। মূলত সুইজারল্যান্ড থেকে উঠে আসা ‘ডাডাইজম’-এর পরবর্তী আন্দোলন হচ্ছে ‘সুররিয়েলিজম’ বা‘পরাবাস্ততা’। এখন আবার যা জাদুবাস্তবতা বলছেন অনেকে।
মার্ক আর্নেস্টের সংজ্ঞা আমরা তুলে ধরতে পারি। সুররিয়েলিজমকে তিনি বলেছেনÑ সুর রিয়ালিস্টের লক্ষ্য হচ্ছে অবচেতনার বাস্তব চিত্র আঁকা নয় কিংবা অবচেতনার বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে কল্পনার আলাদা এলাকা সৃষ্টি করাও নয়। এর লক্ষ্য হলো চেতন ও অবচেতন মনের সাথে বাইরের জগতের সব দৈহিক ও মনের বেড়া তুলে দেয়া।
ইতালিতে জন্মগ্রহণ করা ফ্রেঞ্চ আপোলিনিয়ার (১৮৮০-১৯১৮) ‘সুররিয়ালিজম’ শব্দটি উল্লেখ করেন। তার লেখা কবিতায় আদি-সুররিয়ালিজম কাব্যের নিদর্শন রয়েছে। ‘টাইরেসিয়াম-এর স্তন’ নাটকে প্রথম সুররিয়ালিজম প্রয়োগ করেন তিনি। পরে তা ইংরেজি ও জার্মান সাহিত্যেও এ ধারা সম্প্রসারণ হয়। ‘চাঁদের আলো’ কবিতায় তিনি পরাবাস্তবতাকে শিল্পরূপ দিয়েছেন এভাবে-
‘ক্রোধীর ঠোঁটে শ্রবণসুখকর চাঁদ
আর রাতের লোভার্ত নগর ও উদ্যান
মৌমাছির মতো নক্ষত্রদের ভ্রম হয়
এই আলোকময় মধুতে আঙুরবাগান আহত
আকাশ থেকে ঝরছে মধুর মধু
চাঁদের রশ্মি যেন মধুর ঝিকিমিকি
...হাওয়ায় গোলাপে মিশছে মধুর চন্দ্রিমা।’
এল দুয়ার, সালভার দালি, চিত্রশিল্পী পল ক্লে, নেরুদাসহ অনেকে সুররিয়েলিজম কবিতা লিখেছেন বা সাহিত্য রচনা করেছেন। বাঙলা সাহিত্যে অনেকে পরাবাস্তবতার প্রয়োগ বেশ কিছু কবি প্রয়োগ করেছেন। বর্তমানকালের প্রায় সব কবিই পরাবাস্তবতার প্রয়োগ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বা কাজী নজরুল কবিতা/গানে সামান্য পরাবাস্তবতার উপাদান ব্যবহার করেছেন। যেমনÑ ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই, সেই পাহাড়ের ঝর্ণা আমি...।’ বিষ্ণু দে, বুদ্ধদেব বসু, অমিয় চক্রবর্তী, শক্তি চট্টপাধ্যায়, সুনীল, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, মান্নান সৈয়দ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ কবিতায় পরাবাস্তবতা এনেছেন মাঝে মধ্যে।
আধুনিক বাংলা কবিতায় কবি বিষ্ণু দে তার ‘ঊর্বশী ও আর্টেমিস’ কাব্যগ্রন্থে প্রথম সার্থক সুররিয়েলিজম বা পরাবাস্তবতার প্রয়োগ করেন। তবে পরাবাস্তবতার উপাদান সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করেছেন কবি জীবনানন্দ দাশ। তার ‘ঝরাপালক’, ‘বনলতা সেন’, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কাব্যগ্রন্থে পরাবাস্তবতার ব্যবহার অনেক বেশি। তাঁকে ‘পরাবাস্তবতার কবি’ বলা হয়ে থাকে। পরাবাস্তবতার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন এ বিষয়ে। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যাকÑ
‘জানতাম তোমার চোখে একদা জারুলের বন
ফেলেছে স¤পন্ন ছায়া, রাত্রির নদীর মতো শাড়ি
শরীরের চরে অন্ধকারে জাগিয়েছে অপরূপ’- (কোনো এক পরিচিতাকে, শামসুর রাহমান)
‘অনেক আকাশ’কবিতায় সৈয়দ আলী আহসান ধরা দিয়েছেন এভাবেÑ
‘... সোনার ঘাসের পাতা ঘুমের মতো
অজস্র পাতার ফাঁকে হৃদয়ের নদী হয় চাঁদ নেমে ঘাসে’Ñ (সংক্ষেপিত)
আল মাহমুদ বেশ কয়েক জায়গায় পরাবাস্তবতার উপাদান ব্যবহার করেছেন। ‘নদীর ভিতরে নদী’ কবিতায় পরাবাস্তবতারÑ
‘নদীর ভিতরে যেন উচ্চ এক নদী স্নান করে।
তিতাসের স্বচ্ছ জলে প্রক্ষালণে নেমেছে তিতাসই।
নিজের শাপলা লয়ে নেমে নদী নদীর ভিতরে
ঠাট্টা বা বিদ্রƒপ নেই, শ্যেনচক্ষু, নেই চারণের বালি।’
মান্নান সৈয়দ বলতেনÑ সুর রিয়ালিজমই হলো প্রকৃত বাস্তবতা। তিনিও কবিতায় সার্থক পরাবাস্তবতার প্রয়োগ করেছেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ (১৯৬৭)। এখানে সুররিয়ালিজমের সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। তিনি জীবনান্দ দাশ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা লিখেছেন এবং গবেষণা করেছেন মান্নান সৈয়দ। আর এ কারণে জীবনান্দ প্রভাব বিস্তার করেছে কবির মনে। কয়েকটি কবিতায়
‘দেখেছি ঘাসের মেঝে ছিন্ন
লাল মুণ্ডু নিয়ে খেলে বিনা অপব্যয়ে
সূর্য টেনে নিয়ে যাচ্ছে কালো রেলগাড়ি।’ (কবিতা, রাত্রপাত)
পরাবাস্তবতার কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতার কিছু চরণ তুলে ধরি
‘দেখি তাঁর চুলে রাত্রি থেমে আছে
চোখে সবুজ প্রিজমের ভিতর থেকে লাফিয়ে পড়ে ফড়িং
... বেরিয়ে আসছে সান্ধ্যবেলার সবগুলো তারা
দেখি তার পাঞ্জাবির ঢোল পকেটে উঁকি দিচ্ছে চাঁদ।’
তাঁর অনেক কবিতায় পরাবাস্তবতার গন্ধ পাওয়া যায়। বর্তমানের অনেক কবিই পরাবাস্তবতা বা জাদুবাস্তবতার প্রয়োগ করছেন সুনিপুণভাবে। আসলে আধুনিক কবিতাকে গতিশীলতা আনতে পরাবাস্তবতার কাছে যেতেই হবে। আর উত্তরাধুনিক কবিতায় এর চাহিদা আরো বেশি। হ
পরাবাস্তবতা হচ্ছে এমন এক ধরনের বাস্তবতা যে বাস্তবতার সাথে চাক্ষুষ বাস্তবতার কোনো মিল নেই। কিছু মিল থাকতেও পারে অবশ্য। ইংরেজিতে সুররিয়েলিজম (ংঁৎৎবধষরংস) বলা হয়। বস্তুত...
