মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে আমি ‘কোয়াড্রুপল বাইপাস’ সার্জারি সেরে উঠেছি। এত বড় ধকল কাটিয়ে আস্তে আস্তে সুস্থ হতে একটু সময় লাগছে, এর মাঝে অল্পস্বল্প জরুরি কাজে অফিসেও যাচ্ছি। সাথে এটাও বুঝতে পারছি, আগের জায়গায় ফিরে আসতে শরীর মহাশয়ের আরো অনেক দিন সময় লাগবে।
সার্জারির দিন বিকেল ৪টার দিকে গভীর ঘুম থেকে যখন চেতনার জগতে ফিরছি, তখনো আমি মরা-বাঁচার সন্ধিক্ষণে। ক্ষণিকের জন্য জাগি, আবার ঘুমিয়ে পড়ি। এমনি অবস্থায় একসময় চোখ খুলে দেখি, মাথায় নীল টুপি ও গায়ে অ্যাপ্রোন পরা সাত-আটজন মানুষ আমার চার দিকে হাঁটাহাঁটিতে ব্যস্ত, তাঁরা ফিসফিস করছেন, কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার হাত-পা বাঁধা, কথা বলতে অপারগ, মনে হলো, কে যেন আমার মুখ দিয়ে বুক পর্যন্ত একটি বাঁশ ঢুকিয়ে দিয়েছে। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেও শ^াস টানতে পারছি না। একটি শ্বাস নেই আর ভাবি, এই বুঝি আমার শেষ নিঃশ^াস! মরেই যখন যাবো, তখন কলেমাটা তো পড়তে হয়। এখন আমার দুটো সংগ্রামÑ এক দিকে শ্বাস টেনে প্রাণবায়ু ধরে রাখা, অন্য দিকে তৌহিদের বাণী পড়ে মৃত্যুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়া। জীবন বাঁচাতে পারলেও আমার বিশ^াসের মূল মন্ত্রটি পড়তে গিয়ে দেখি, সব তালগোল পাকিয়ে ফেলছি। বারবার ব্যর্থ হয়ে অবশেষে সফল হলাম, পড়তে পারলাম, ‘আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু... মুহাম্মাদান আবদুহূও রাসূলুহূ’। মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেল, বললাম, হে আল্লাহ, আমি প্রস্তুত, তুমি আমার ছেলেমেয়েদের দেখে রেখোÑ তোমার কাছে এই আমার শেষ প্রার্থনা। মুখের কথাটি ফুরাবার আগেই আবার ঘুমিয়ে পড়া।
তার পর আবার জ্ঞান পুরোপুরি ফিরেছে কি না জানি না, চোখ খোলা না বন্ধ তাও বলতে পারব না, তবে স্পষ্ট মনে আছে, আমার সামনে যেন শুরু হলো অভিনব এক খেলাÑ আলোর খেলা। যে দিকে তাকাই, শুধু আলো আর আলো, রঙ-বেরঙের আলো, তখন শ্বাস-প্রশ্বাসে কোনো কষ্ট টের পাইনি। অবাক বিস্ময়ে আর আনন্দে ভাসছি, একা একা আলোর সাগরে ভাসছি! নীরবতায় ভরা গভীর প্রশান্তির এক সুমসাম পরিবেশ! মানুষ নেই, জন নেই, যেন মহাশূন্যে উড়ে বেড়াচ্ছি আলোর মেলায়! এ কোথায় এলাম, কোন দিকে যাচ্ছি, এমনি ভাবতে ভাবতে, ভাসতে ভাসতে স্বপ্নের জগৎ পেরিয়ে বাস্তবে ফিরে এলাম। অনুভব করলাম, আমার মুখ থেকে ব্রিদিং টিউব বের করা হলো। এখন আমি কথা বলতে পারছি। আমার হুস পুরোপুরি ফিরে এসেছে। এর বেশ কিছুক্ষণ পরে আমাকে কিঞ্চিৎ পানি খেতে দেয়া হলো। পানি গেলার সাথে সাথে ঢেকুর উঠল। এতে ডাক্তার, নার্স সবাই খুশি, কেন? কারণ, আমার অরগ্যানগুলো ঘুম থেকে আস্তে আস্তে জেগে উঠছে, আমার ‘সিস্টেম’ কাজ করতে শুরু করেছে। সামনে সার্জন, দু’পাশে দু’জন নার্স, জানানো হলো, আমি আইসিইউ’তে শুয়ে আছি। সার্জন বললেন, ‘ণড়ঁ যধাব ফড়হব াবৎু বিষষ, ুড়ঁ ধৎব ফড়রহম ভরহব হড়'ি বাঁ হাতের ‘আইভি’ খুলে দিয়ে আমাকে স্বাভাবিক খাবার দেয়ার জন্য নার্সদের প্রতি নির্দেশ রেখে তিনি চলে গেলেন।
তার পর শুরু হলো শুশ্রƒষাকারীদের পরিচর্যার পালা, মনিটারে তাঁরা অনবরত আমার ভাইটাল সাইনগুলো দেখছেন, কতক্ষণ পরপর রক্তের নমুনা নিচ্ছেন, পরীক্ষার ফলাফল দেখে আমার মেডিক্যাল চার্টে টুকে রাখছেন। তিন বারো ঘণ্টার মাথায় নার্সরা আমাকে ধরে উঠালেন, বসালেন এবং ধরে ধরে হাঁটাতে নিয়ে গেলেন। আমি কোনো অসুবিধা ছাড়াই হাঁটাহাঁটি করে রুমে ফিরে এলাম। বেশ স্বস্তি পেলাম এবং অত্যন্ত আশাবাদী হয়ে উঠলাম, ভাবলাম, বাহ! আধা দিনের মধ্যে হাঁটতেও পারলাম, স্বাভাবিক খাবারও পেয়ে গেলাম, তা হলে সপ্তাহ দিনের মধ্যেইতো আমি সুস্থ-সবল হয়ে বাড়ি ফিরে যাবো! আমার এই ভুল ধারণা ভাঙতে সময় দু’দিনও লাগেনি। বুঝলাম, বাইপাস সার্জারির উপশম প্রক্রিয়ায় দুটো ধারা আছে। একটি ব্যথাবেদনা নিয়ে শারীরিকÑ যার অগ্রগতি মোটামুটি সরলরৈখিক অর্থাৎ সময়ের সাথে ক্রমে ক্রমে সেরে ওঠে, ওঠানামা করে না। অন্য ধারাটি হলো, মনের ভালো লাগা না লাগাকে ঘিরে। একটু বিশদ করে বলতে গেলে এ রকম দাঁড়ায়Ñ বসতে ভালো লাগে না, শুতে ভালো লাগে না, কিছু খেতে ইচ্ছা করে না, কথা বলতে মন চায় না, কারো কথা শুনতে বিরক্ত লাগে। মনের এ-জাতীয় উপসর্গের নিরাময় প্রক্রিয়া বড় কঠিন, বড় জটিল, বড় বিচিত্র! এক দিন ভালো, তো দু’দিন খারাপ! দু’দিন ভালো, তো তিনদিন খারাপ! যে দিন ভালো যায়, সে দিন রোগী আশাতীতরূপে আশান্বিত হয়ে ওঠে। যে দিন খারাপ যায়, সে দিন ভালো দিনের প্রত্যাশায় আশা-নিরাশার মাঝে সে দোল খায়।
শুরুতে এই ভালো-মন্দের বিষয়টি আমার মেনে নিতে খুব অসুবিধা হচ্ছিল, আমি অতি সহজেই ধৈর্যহারা হয়ে যেতাম, কারণে-অকারণে মেজাজ করতাম, কেবলই অভিযোগ অনুযোগ করতাম, তবে পর্যায়ক্রমে এ বাস্তবতার সাথে আমি খাপ খাওয়াতে পেরেছিলাম এবং এতে দেশ-বিদেশে থাকা আমার কয়েকজন বিচক্ষণ বন্ধুর পরামর্শ ও উপদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আজ আমি তাঁদের কাছে ভীষণভাবে ঋণী ও কৃতজ্ঞ। এখন বুঝি, রোগী কখনো হা-হুতাশ করতে পারে না, তার এমনটি করা উচিত নয়, এর কারণ ইংরেজি ‘প্যাশেন্ট’ শব্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে। ‘প্যাশেন্স’ মানে ধৈর্য, আর যে ধৈর্যশীল, সে আহাজারি করে না, করতে পারে না। আমি কঠিন ও বাস্তব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এবার নতুন করে এই সামান্য জ্ঞান অর্জন করেছি বলে দাবি করতেই পারি।
এরই ধারাবাহিকতায়, হাসপাতালে থাকাকালে কোনো দিন ভালো, কোনো দিন মন্দ, কোনো দিন ভালো-মন্দের মিশেলে কেটেছে আর ‘কোনো দিন’ সে যেন পারই হতে চায় না! ঘড়ির কাঁটা ঘুরে, নৈঃশব্দের মাঝে প্রতিটি ‘টিকটিক’ শব্দ গোনার চেষ্টা করি, ষাট হলে এক মিনিট গেল, আমার জন্য এ যেন এক দিনের সমান! যতদিন সেখানে ছিলাম, এভাবে প্রতিটি মুহূর্ত গুনে গুনে কাটিয়েছি, পার হয়ে এসেছি ব্যথাবেদনা ও নিবিড় অনুভূতির এক গভীর মহাসাগর! রাতের কথাই যদি বলি, ঘরের বাতি নেভানো, পরিবেশ শান্ত, যান্ত্রিক বিছানায় নিদ্রাহীন আমি, তবে একা নইÑ আমার সঙ্গী আমি আর আমার ছটফটানি। চোখে ঘুম নেই, শরীরে স্বস্তি নেই, এ অবস্থায় বেচারা মনের আর দোষটা কী। এলোমেলো কত কিছু ভাবি, সবার আগে মায়ের কথা মনে পড়ে, ছোটবেলার কথা ভাবি যখন চাহিদা ছিল অতি অল্প, কিন্তু সব চাহিদাই পেশ করতে হতো মা জননীর কাছে, আরো ভাবি, জগতে যাঁর যত চাহিদা আছে তার প্রথম ও আদি চাহিদা হলো, ’মা, ভাত দাও’। তাঁর কথা এখানেই শেষ হওয়ার নয়, দেখতাম, জ্বরজারি হলে তিনি কী রকম অস্থিরতা করতেন, সারারাত আমার বালিশের পাশে বসে থাকতেন; আমার এমন তন্ময়তায় মাঝে মধ্যে নার্স এসে বিরক্ত করেন, আবার চলেও যান। যেই আমার সেই আমি অব্যক্ত এক যন্ত্রণা নিয়ে পড়ে থাকি বিছানায়, জানালার ফাঁকে ফ্যাল ফ্যাল করে বাইরে চেয়ে থাকি, দেখিÑ বিদ্যুতের খাম্বায় খাম্বায় বড় বড় তেজি বাল্ব জ¦লছে, তাদের চার পাশে পোকার দল বিরামহীন ঘুরপাক খাচ্ছে, আলোর প্রতি কীটপতঙ্গের এ কী অদ্ভুত আকর্ষণ! কী তফাত মানুষের সাথে পোকাদের! সব পতঙ্গ সবসময় আলোর দিকেই ছোটে, অথচ বুদ্ধিমান বলে কথিত অনেক মানুষ অনেক সময় আলো থেকে অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়! কেন? এ এক সর্বজনীন প্রশ্ন। এর উত্তর একেক জনের কাছে একেক রকম হতে পারে। আমার কাছেও একটা উত্তর আছে, দিতে পারি এক শব্দে!
যে ক’দিন হাসপাতালে ছিলাম, নার্সদের সাথে আমার খুনসুটি লেগেই থাকত। একদিন রাত দুটো কি আড়াইটা বাজে, টয়লেটে যাব বলে ডেকেছি তাঁকে। তখন আমি বিছানা থেকে নিজে নিজে উঠতে পারি না, শুতেও পারি না। তিনি আমাকে তুলে দিলেন, আমি টয়লেট সেরে এলাম। এবার বললেন, ‘আপনি এখন বিছানায় শোবেন না, চেয়ারে গিয়ে বসবেন। কোথায় স্বস্তি পাবÑ জানি না, এমনি এমনি বলে দিলাম, আমি চেয়ারে বসব। তিনি আমাকে চেয়ারে নিয়ে বসালেন এবং চেয়ারটি রিক্লাইন করে দিলেন। পাঁচ মিনিট যেতে না যেতে আবার ডাকলাম, বললামÑ না, আমার এখানে ভালো লাগছে না, আপনি আমাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে যান। স্বাভাবিকভাবেই তিনি আমার ওপর ভীষণ বিরক্ত হলেন। আমি বললাম, রোগীদের প্রশ্ন করতে নেই, কারণ তারা নিজেরাই জানে না কখন কী চায় এবং কিসে তাদের আরাম। এভাবে নার্সদের অনেক জ্বালাতন করেছি। তাঁরা আমার ওপর বিরক্ত হয়েছেন, আমিও হয়েছি, সময় সময় তাঁদের ওপর রাগও করেছি। তবে বারো ঘণ্টার ডিউটি শেষে বাড়ি ফেরার আগে, আমি আমার সেবাদানকারীদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতাম এবং আবেগাপ্লুত হয়ে তাঁরাও আমাকে মাফ করে দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলতেন, ণড়ঁ ধৎব ধ হরপব সধহ, মড়ড়ফ ঢ়ধঃরবহঃ.’ এভাবে জীবনের প্রতিটি দিন, দিনের শেষে যদি ক্ষমা চেয়ে আর ক্ষমা করে বিছানায় ঘুমোতে যেতে পারতাম, তাহলে আজ নিঃসন্দেহে একটি উন্নত জীবনের অধিকারী হতে পারতাম!