জন্ম : ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬, মৃত্যু : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪
ব্যক্তিসত্তা একসময় সৃজনের স্রোতে কবিসত্তায় রূপান্তরিত হয়। ব্যক্তির ভেতরদেশ থেকে উৎসারিত আবেগের ঝর্ণাধারা যখন মননের স্পর্শে একটা আদল পায় তখনই কবির আত্মপ্রকাশ ঘটে। মানবশিশুর মতোই কবিও অক্ষরের ও পঙ্ক্তির মাধ্যমে কলরব করে ওঠে ভাবের স্ফুরণে। কবি কল্পনা প্রতিভার মারফতে ভাবের অসীমতাকে প্রকরণের শরীরে প্রবেশ করিয়ে নির্মাণ করেন শিল্পকলা। ব্যক্তিসত্তা থেকে সহসা হয়ে ওঠে কবিসত্তা। কবি কখনো ব্যক্তিপ্রবণ বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রকাশকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন; কোনো কবি আবার সমষ্টিকেন্দ্রিক চিন্তাকে প্রাধান্য দেয়। কখনো মিশ্রণও হয়। তবে প্রকৃত কবি কবিত্বকে একটি মহত্ত্ব দান করেন।
বায়ান্নোত্তর বাংলা কবিতায় ফজল শাহাবুদ্দীন (১৯৩৬-২০১৪) একজন মৌলিক কবিকণ্ঠ। এই শক্তিমান কবি ‘কবিত্ব’কে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন। মহাবিশে^র মাঝে কবিসত্তাকে তুলনাহীন ও একক মহার্ঘ মনে করেছেন তিনি। মহাবিশ্বলোক, মহাপ্রকৃতি, আলো-অন্ধকারহীন অসীম মহাশূন্য ও কালহীন এক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দিয়েছেন কবি। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার মতোই এই কবিরও একক উচ্চারণ আমিত্ব ও কবিত্ব নিয়ে। নিঃসঙ্গতা ও শূন্যতার মাঝে কবির সদম্ভ কণ্ঠস্বর যেন পাঠকের কানে বেজে যায় ক্রমাগত। তীব্র শরীরী প্রেম-কাম, প্রকৃতির আশ্রয়, নির্জনতা-একাকিত্ব ও কবিত্বের সরব উচ্চারণ থেকে কবি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন অসীম ও অনন্ত লোকে। কবিতাকে যিনি ঘোরের নাম দিয়েছেন, তিনিই সচেতন কণ্ঠে ছন্দের আনন্দে আঙ্গিকের আধুনিকতায় বাঁধনহারা চরণ নির্মাণ করেন। নারীপ্রেম, শরীর-কাম, স্বদেশ-প্রকৃতি, মুক্তিসংগ্রাম, কবিত্ব-কবিসত্তার প্রতি কবি তীব্র-দীপ্র চেতনা অনুভব করেন। গভীর ও গোপন, বিস্তৃত ও বিশাল ক্যানভাস রচনা করেন পৃথিবীর মাটি থেকে মহাশূন্যলোক পর্যন্ত।
তুমি দুরন্ত অচেনা নদীর ঢেউ /তবু তুমি ছাড়া নেই আর কোনো গতি
এবং তোমার তনুর অন্ধকারে/অভিসারী কোনো রাত্রির প্রস্তুতি।
[এবং তুমি/ তৃষ্ণার অগ্নিতে একা]
কবি তৃষ্ণা দিয়েই সূচনা করেন কাব্যযাত্রা। জীবন, নিসর্গ, নারী-শরীর, নির্জনতা এবং একধরনের হাহাকার তাঁর কবিতায় ক্রমাগত প্রতিধ্বনিত। সেই প্রতিধ্বনির মাঝে পাঠক শুনতে পান স্বতন্ত্র কবিকণ্ঠ। কবি ফজল শাহাবুদ্দীন কাব্যযাত্রায় বারবার নিজের কবিসত্তার জয়গান গেয়েছেন উচ্চস্বরে। কবি দৃষ্টিতে দেখেছেন জীবনের বহুমাত্রিক বাস্তবতা ও অন্তর্গত চেতনাপ্রবাহ; মানুষীর দেহমনের সম্পর্কের অন্তঃস্রোত; নাগরিক সমাজ ব্যবস্থা থেকে উত্থিত মানবিক উত্তাপ-রঙ-রূপ; স্বদেশের দুঃসময়ে জীবনের সঙ্কটে প্রতিবাদ-প্রতিরোধে উচ্চকিত ও সরব। মুক্তিসংগ্রামে ও মুক্তিযুদ্ধে কবি দারুণভাবে উদ্ধুদ্ধ ও প্রতিবাদী। জীবন ও স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় তাঁর কবিতায় স্বাক্ষরিত।
হে আমার স্বদেশভূমি
তুমি আমার মায়ের মতো উপমাহীন
তোমার অপার সৌরভের সমুদ্রে তুমি আমাকে
ডুবিয়ে রেখেছো তোমার নক্ষত্রের নীচে
তোমার সূর্যালোকে তোমার অন্ধকারে
[আমার স্বদেশভূমি/ তৃষ্ণার অগ্নিতে একা]
জাতীয় সঙ্কট ও দুর্যোগে কবি রোমান্টিক ভাবালুতায় আক্রান্ত না হয়ে নতুন এক কাব্যভাব, ভাষা ও ভঙ্গিতে আন্তরিক জানান দিয়েছেন কবি। স্বদেশের প্রতি দায়বদ্ধ কবি স্বদেশের গণমানুষের মুক্তির জন্য আকুতি; হানাদার বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের বর্ণনা ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন কাব্যিক ব্যঞ্জনায়। স্বদেশ ও স্বজনের প্রতি ভালোবাসা ও দায় থেকে কবি রচনা করেছেন এইসব স্মরণীয় পঙ্ক্তি। কবি যেমন ব্যক্তিসত্তা ও সমাজসত্তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গি; তেমনি অধ্যাত্মচেতনার সাথেও একাত্ম। কবি শেষ জীবনে সেই অনন্ত ও অসীম শক্তির প্রতি সমর্পণ জানিয়েছেন নিজেকে। অনন্ত-অসীম লোকে কাব্যযাত্রা করেছেন আনন্দ চিত্তে।
জানি একদিন শব্দের গতির সঙ্গে মিশে যাবো আমি
মিশে যাবো নীহারিকাপুঞ্জ থেকে বিচ্ছুরিত
আলোর প্লাবনের সঙ্গে
বাতাসের যে বিশাল চক্র অনন্তকাল ধরে
গ্রাস করে রেখেছে পৃথিবীকে
তাকে ছিন্ন ভিন্ন করে আমি নিক্ষিপ্ত হবো
অনুভূতিহীন অন্তরীক্ষে পুষ্পপত্রহীন শূন্যতায়
[গতির শরীরে শব্দের আর্তনাদে/ ক্রন্দনধ্বনি]
কবি স্বদেশ থেকে পৃথিবী, পৃথিবী থেকে মহাবিশ্বলোকে কবিসত্তার সঞ্চার করতে চেয়েছেন; জীবন থেকে মৃত্যু, মৃত্যু থেকে শূন্যতায় যাত্রা করেছেন। মাটির সবুজ তৃণগুচ্ছ থেকে মহাবিশ্বলোক পর্যন্ত কবি অবাধ মানসভ্রমণ করেছেন কাব্যিক কল্পনায়। তাই নারী-নিসর্গ থেকে স্বদেশ হয়ে সীমাহীন মহাজাগতিক বিশ্বে কবি সঁাঁতার তেটেছেন অবাধে কল্পনার বাহনে চেতনাপ্রবাহে।
কবিসত্তা ও নয়া কাব্যভাষার দিক থেকে কবি ফজল শাহাবুদ্দীন একজন মৌলিক এবং আঙ্গিকচেতন কবি হিসেবে বাংলা কাব্যে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণ, ঋজু ও দ্বিধাহীন বক্তব্য প্রকাশ, মৌলিক চিন্তার সৃজন এবং নির্ভুল ছন্দ-প্রকরণে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কবি বাংলাদেশের কবিতায় তুমুল জননন্দিত ও পাঠকপ্রিয় হয়েছেন জীবনে। পঞ্চাশের শক্তি এই কবি আজীবন শুধু কবিই হতে চেয়েছেন এবং সফল হয়েছেন। সৃষ্টি করেছেন প্রাণবন্ত সব কাব্য : তৃষ্ণার অগ্নিতে একা, অকাক্সিক্ষত অসুন্দর, আততায়ী সূর্যাস্ত, অন্তরীক্ষে অরণ্য, সান্নিধ্যের আর্তনাদ, আলোহীন অন্ধকারহীন, সনেটগুচ্ছ, অবনিশ্বর দরোজায়, হে নীল সমুদ্র হে বৃক্ষ সবুজ, দিকচিহ্নহীন, ছিন্নভিন্ন কয়েকজন, ঝবষবপঃবফ চড়বসং, বাতাসের কাছে, ছায়া ক্রমাগত, নিসর্গের সংলাপ, পৃথিবী আমার পৃথিবী, ক্রন্দনধ্বনি, ক্রমাগত হাহাকার ইত্যাদি।
জীবন ও জগতে সর্বব্যাপী কবিমানস কবি ও কবিতাকে জীবন ও বিশ্বলোকে সবচেয়ে দাবি-উঁচু-বিশাল-অতলান্তিক আসনের মর্যাদা দিয়েছেন। সেই সাথে কবি ফজল শাহাবুদ্দীনও বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে স্থায়ী জায়গা গড়েছেন।