বিশ-শতকের অন্যতম প্রধান কবি শাহাদাৎ হোসেন। কবিতার পাশাপাশি তিনি অনেক গল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ও শিশুসাহিত্যও রচনা করেছেন। কবি হিসেবে অধিক পরিচিত হলেও সাহিত্যের সব শাখায় তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন। ভাষার উচ্চমার্গ, কাব্যের সৌন্দর্য আর বিষয়ের কল্পনা-স্বপ্নচারিতা তাঁর সাহিত্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। শাহাদাৎ হোসেন স্বপ্নচারী কবি হিসেবে সমধিক পরিচিত হলেও ধর্ম ও সমাজকে বিস্মৃত হননি কখনো। বরং সমাজ ও সংস্কৃতি তাঁর স্বপ্নের প্রধান অনুষঙ্গ। প্রেম-প্রকৃতি, ইসলাম-মুসলমান, বসন্ত-বিরহ ইত্যাদি তাঁর কবিতার উপজীব্য। এসব বিষয়ের সবকিছুর মূলে রয়েছে সৌন্দর্য। তিনি অগ্রজ কবি মাইকেল মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও অনুজ কবি কাজী নজরুল ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত হলেও ভাব, ভাষা, আঙ্গিক ও বিষয় নির্বাচন তাঁর নিজস্ব। মাইকেল মধুসূদনকে তিনি অনুসরণ করেছেন ধ্রুপদী ধাঁচে-নাটকীয়তায়, রবীন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল তাঁর প্রেম-প্রকৃতি বিষয়ক কবিতায় আর ইসলামের ইতিহাস-ঐহিত্যমণ্ডিত প্রবন্ধ রচনায় কাজী নজরুল ইসলামের অনুসরণ লক্ষ করা যায়। এতদসত্ত্বেও তাঁর সাহিত্যের স্বতন্ত্র ধারা অক্ষুণœœ থেকে যায়।
কবি শাহাদাৎ হোসেন ১৮৯৩ সালের আগস্ট, ১৩০০ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার পণ্ডিতপোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পড়ালেখার হাতেখড়ি বাড়ির পাঠশালা থেকে। পরে তিনি পড়ালেখা করেন হাড়োয়ার পীর গোঁরাচাদ মাইনর স্কুল ও হুগলি কলেজিয়েট স্কুলে। কিন্তু দুরন্তপনা ও কাব্যপ্রীতির জন্য পড়ালেখায় বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি। স্কুলের পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে হাড়োয়া এমই স্কুলে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয় তাঁর। পরবর্তীতে তিনি সাংবাদিকতা ও পত্রিকা সম্পাদনায় নিয়োজিত হন। ‘সওগাত’ ‘মোহাম্মাদী’ ‘দৈনিক সুলতান’ ‘সাপ্তাহিক মোসলেম জগৎ’সহ বেশ কয়েকটি দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন তিনি। সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে তাঁর বিশেষ খ্যাতি ছিল। আবৃত্তিকার, নাট্য অভিনেতা, বেতার নাটকে কণ্ঠশিল্পী হিসেবেও খ্যাতি ছিল তাঁর। কিশোরকাল থেকেই কবিতা রচনার পাশাপাশি তিনি কবিতা আবৃত্তিতে আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি কবিতা আবৃত্তি করতেন। শাহাদাৎ হোসেন তরুণ বয়সে ১৯১৫ সালে বশিরহাটের ‘বাণী সম্মিলনী’ নামের সাহিত্য সম্মেলনে কবিতা আবৃত্তি করে পদক লাভ করেন। পরিণত বয়সে তিনি বশিরহাটের ‘বাণীসংঘ’ সাহিত্য সংগঠন থেকে ‘কবিকুল শিরোমণি’ ও ‘পূর্ণেন্দু’ খেতাবে ভূষিত হন। উপস্থাপনায়ও তিনি বেশ পারদর্শী ছিলেন। ঢাকা ও কলকাতার রেডিওতে তিনি অনেক অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন।
কবি শাহাদৎ হোসেন শৈশবকাল থেকেই দুরন্ত ও সাহিত্যমোদী। স্কুলে পড়াকাল থেকেই কবিতা রচনা করেছেন তিনি। তারপর থেকে তিনি আর থামেননি। ‘মৃদঙ্গ’ ১৯৪২, ‘কল্পরেখা’ ১৯৪৩ ও ‘রূপচ্ছন্দা’ ১৯৫০ তাঁর কাব্যগ্রন্থ। সাতটি গল্পের সমন্বয়ে প্রকাশিত ‘রূপায়ণ’ ১৯৪৭ তাঁর একটি গল্পগ্রন্থ। তাঁর রচিত ‘সরফরাজ খাঁ’, ‘আনারকলি’ ও ‘মসনদের মোহ’ তিনটি নাটক। ‘রিক্তা’, ‘কাঁটাফুল’, ‘যুগের আলো’, ‘সোনার কাঁকন’, ‘লায়লী মজনু’, ‘শিরী ফরহাদ’, ‘মরুর কুসুম’ ইত্যাদি নামের ১৬টি তাঁর উপন্যাস গ্রন্থ। তাঁর রচিত ‘মোহনভোগ’, ‘বেগম নুরজাহান’, ‘গুলবদন’ ইত্যাদি শিরোনামের শিশুদের উপযোগী আটটি গল্প ও উপদেশমূলক জীবনীগ্রন্থ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে তাঁর অনেক প্রবন্ধ। ‘রূপচ্ছন্দা’ ও ‘মসনদের মোহ’ একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্য ছিল।
স্বপ্নচারী এ কবির জীবন ছিল ট্র্যাজেডিক। নিঃসন্তান ও দরিদ্র্যতার কারণে তাঁর জীবন ছিল এলোমেলো। এ জন্য তাঁর জীবন যাপন পদ্ধতি ছিল যাযাবরের মতো। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করার কারণে ১৯৩১ সালে চার মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয় তাঁকে। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালের মে মাসে তিনি রেডিওতে চাকরি নিয়ে ঢাকায় আসেন। কিন্তু ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে চাকরি চলে যাওয়ার পর তিনি দুঃখে-ক্ষোভে নিজ গ্রাম পণ্ডিতপোলে চলে যান। এমতাবস্থায় দারিদ্র্য আর রোগে-ভুগে ১৯৫৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর রাতে নিঃসঙ্গ অবস্থায় কলকাতার এক হাসপাতালে তিনি ইন্তেকাল করেন।