ছোটখাটো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আয়ে আনিস সাহেবের মধ্যবিত্ত জীবন কেটে যাচ্ছে। মাসের শুরুতে আনিস সাহেবের বড় টেনশনÑ তার প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের মাইনে। বিগত মাস-বছর যেমন কাটার কেটেছে; কিন্তু করোনাভাইরাসের উপদ্রব শুরুর পরে কাস্টমার কমে যাওয়াতে সব কিছুতে হিমশিম খাওয়ার জোগাড়! কোরবানির ঈদ এলো বলে। ঈদের আগে কর্মচারীদের মাইনে দিতে হবে। যদিও দু-চার দিনের নিয়মের তারতম্যে কর্মচারীরা মন খারাপ করবে না, তবু আনিস সাহেবের মন সায় দেয় না। সারা মাসে তার যত চিন্তাÑ কর্মচারীদের মাইনে নিয়ে। কর্মচারীরা মাইনের জন্য কষ্ট করে, মাসকাবারি তা দিতে না পারলে কর্মচারীদের মন খারাপ হবে কখন, আনিস সাহেবেরই মন খারাপ হয়ে যায়! সে যাহোক, এ মাসে যা তা অবস্থা! তার ওপর কোরবানিও তো দিতে হবে। চিন্তাভাবনা শেষে আনিস সাহেবের সিদ্ধান্তÑ যত যা-ই হোক, বরাবরের মতো কর্মচারীদের মাইনে পরিশোধ আগে। তারপর কোম্পানির বিলবাট্টা যদ্দুর সম্ভব শোধ করে কোরবানি দেয়া গেলে দেবেন, না-দেয়া গেলে কী আর করা!
আনিস সাহেবের চিন্তা কিছুটা কমল। মাসের পনেরো তারিখের মধ্যে কর্মচারীদের মাইনে দেয়া সম্ভব হলো। আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করেছেন আনিস সাহেবÑ করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও বেচাবিক্রি কিছু তো হয়েছে! না-হলে কর্মচারীদের মাইনে দেয়া যেত না। এবার বসতে দিলে শুতে চাওয়ার অবস্থা তারÑ দিন দশেকের আয়ে কোম্পানির বিল আর কোরবানির আয়োজনটা যদি করা যেত! আল্লাহপাক কি তৌফিক দেবেন?
এক এক করে কমবেশি কোম্পানির বিল দিতে শুরু করলেন আনিস সাহেব। কোম্পানির বিল দিতে না পারলে অপমানিত হতে হয়। কোম্পানির অল্প বয়েসী সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভরা অপমানজনক ভারী ভারী কথা বলেন! সেসব কথার ওজন বহা কষ্টকর। ওদের দোষ দিয়েই বা লাভ কী! ওদের ওপর কোম্পানির চাপ! করোনাভাইরাস সঙ্কটে কোম্পানিগুলো যেন সুযোগ পেয়ে গেছে। যেমনÑ কৃত্রিম সঙ্কট সৃষ্টি করে জিনিসপত্রের দাম বাড়াতে মরিয়া, তেমন বিল আদায়ে। ছোটখাটো ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি চাপ। কার চাপ নিয়ে কে ভাবে! যেন টাকা-পয়সা কামাই বড় কথা। করোনা সংক্রমণ থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন। তবু স্বাস্থ্যবিধি মানার জোর চেষ্টা চালিয়েছেন আনিস সাহেব। তার কারণে কর্মচারীদের জীবন বিপন্ন না হয়!
পঁচিশ তারিখের মধ্যে কোম্পানির বিলও কমে এলো। টুকটাক বিল যা বাকি, কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভদের বলে কয়ে ঈদের পরে পরিশোধের সুযোগ নিতে পারলেন আনিস সাহেব।
এবার কোরবানির কথা ভাবা যায়। হাতে যা টাকা-পয়সা আছে, তার হিসাব করলেন। বাকি ক’দিনে আয়-রোজগার ভালো হলে আশা করাই যায়। গত দশ বছরে কোরবানি বাদ রাখেননি আনিস সাহেব। সওয়াবের সুযোগ ছাড়তে চায় কে! তা ছাড়া বাবা-মা, ভাইবোন, স্ত্রী-সন্তানদের খুশিমুখ দেখার লোভ সামলাতে পারেন না আনিস সাহেব।
ইবরাহিম বাদে বাকি কর্মচারীরা ছুটিতে। ইবরাহিমের বাড়ি কাছেই। সকালে রওনা করলে বিকেলে বাড়িতে পৌঁছা সম্ভব।
ইবরাহিম বলল, ‘চাচা, আমি চানরাইতে বাড়ি গেলেও চলব। সামনে কোরবানি। আপনের হাতে টাকা-পয়সা নেই। এই ক’দিনে কিছু বেচাকেনা হলে কিছুটা সুবিধা করতে পারবেন। কর্মচারী একজনও না থাকলে চলব ক্যামনে! তা ছাড়া আমি বাড়ি না গেলেও চলব। আমার তো বাপ-মা, বউ-পোলাপান নাই! এত তাড়া কিসের!’
আনিস সাহেব অবাক চোখে ইবরাহিমের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
‘আরেকখান কথা চাচা। আমার মাইনা এই মাসে না-নিলেও চলব। এই মাসের মাইনা আপনেরে ফেরত দিতে চাই। লাগলে ঈদের পরে নিমুনে। আপনের বাপ-মা, বউ-পোলাপান আছে। কোরবানি দেওন লাগব। আপনে অমত কইরেন না। পর্তি মাসেই তো সময় মতো মাইনা দিয়া দেন। এবারও দিছেন। সমস্যা নাই। আমার কাছে আগের মাসের মাইনার ট্যাকা আছে। বাড়িত গেলেও তা দিয়া বেশ চইলা যাইব। আর বাড়িত না-গেলে থাইকা যামুনে। কোরবানিতে আপনের লোক লাগব না? এই ভাইরাস-টাইরাসের মধ্যে আপনের গরুর হাটে যাওনের কাম নাই। আমিই যামুনে। লাগলে লগে কাউরে দিয়া দিয়েন। হুনছি, করোনাভাইরাসে বয়স্ক লোকের ঝুঁকি বেশি।’
ফ্যাল ফ্যাল করে ইবরাহিমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন আনিস সাহেব। অনুভব করলেনÑ তার চোখের কোণ ভিজে উঠেছে। গলা আটকে এসেছে। কিছু বলতে পারছেন না। কিন্তু বেশ উপলব্ধি করছেনÑ ইবরাহিমকে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে তার।
এক মুহূর্ত পরে আনিস সাহেব বললেন, ‘খুব তো আমাকে বয়স্ক লোক বলে গরুর হাটে যাওয়ার ঝুঁকি নিতে বারণ করছিস। গরুর হাটে গেলে তুইও তো ঝুঁকিতে পড়তে পারিস!’
ইবরাহিম কিছু বলল না। ওর ঠোঁটের ফাঁকে উঁকি দিলো বোকা হাসির রেখা।
গত কোরবানিতে গরিব-ভিখিরির ভাগের গোশত বিলি করেও তাদের নিজেদের ভাগের গোশতের ভাগ দিতে হয়েছে আনিস সাহেবদের। তারপর আরো অনেকে এসেছে। তাদের ফিরিয়ে দিতে হয়েছে। এই ঘটনা আনিস সাহেবের মনে আছে। গত কোরবানিতে তিনি ভেবে রেখেছেনÑ বেঁচে থাকলে এবারের কোরবানিতে বড় গরু কিনবেন। এবার যেন গরিবদের খালি হাতে ফিরে যেতে না হয়।
এবার গরিবদের খালি হাতে ফিরে যেতে হবে না মনে হচ্ছে। ইবরাহিম চোখে পড়ার মতো একটা গরু কিনে এনেছে।
দুই দিন বাদে ঈদ। ইবরাহিমের হাতে আশি হাজার টাকা তুলে দিয়ে আনিস সাহেব বললেন, ‘আল্লাহর রহমতে কোরবানির টাকা জোগাড় হইয়া গেছে। তোর মাইনের টাকা তোর কাছেই থাকুক। লাগলে চেয়ে নেবো। তুই বরং গরু কিনে আন। তোর পরামর্শমতো আমি আর গেলাম না। তবে তুইও মাস্ক পরে যাবি।’
‘লগে কাউরে দিবেন না চাচা?’
‘একা পারবি না? গরুর হাট তো দূরে না। কুড়ি-পঁচিশ মিনিটের দূরত্ব।’
‘না, মানে এতগুলা টাকা আমার হাতে ছাইড়া দিবেন...!’
মুচকি হেসে আনিস সাহেব বললেন, ‘তুই পারবি কি না বল।’
‘পারুম।’
ষাট হাজার টাকায় গরু কিনে আনল ইবরাহিম। সবার চোখে লেগেছে। কেউ কেউ এক লাখ টাকাও দাম বলেছে। আনিস সাহেবের ধারণাÑ এবার আর গরিব-ভিখিরিরা ফিরে যাবে না।
ইবরাহিম বলল, ‘আমি তাইলে বাড়ি যাইগা চাচা।’
‘না। গরুর গোশত খেয়ে, বাড়ির লোকের জন্য কিছু সঙ্গে নিয়ে ঈদের দিন বাড়ি যাবি।’
ইবরাহিম কথা বাড়াল না। ও জানে, চাচার সঙ্গে কথা বাড়িয়ে লাভ হবে না।
নামাজের পরপরই আনিস সাহেবের গরু কোরবানি হয়ে গেল। বারোটার মধ্যে গোশত বানানো, তিন ভাগ করাও হয়ে গেল। কিছু গোশত এতিমখানায় পাঠিয়ে দিলেন। গরিব লোকজন আসতে শুরু করল। রীতিমতো বিলিও শুরু হলো। কিন্তু ঘণ্টা দুয়েক পরে গরিব-ভিখিরির আনাগোনা কমে গেল। গেল তো গেলই। গরিব-ভিখিরির ভাগের মাংস এখনো অনেক রয়ে গেছে। আনিস সাহেব বিকেল পর্যন্ত অপেক্ষা করার মনস্থির করলেন। কিন্তু আর কোনো গরিব-ভিখিরি না-আসায় আনিস সাহেবের খুব মন খারাপ হলো। তিনি ভাবেনÑ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি। তিনি কি আমাদের ওপর নাখোশ? একটু গোশতের জন্য গরিব-ভিখিরির কী যে আকুলতা! অথচ এই করোনাকালে কোরবানি দিয়ে আমাদের আকুলতা গরিব-ভিখিরির জন্য!
ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময়ের জন্য সন্ধ্যায় ফোন করলেন আনিস সাহেবের খালা। কথায় কথায় তিনিও বললেনÑ ‘এবার গোশত বিলানোর জন্য গরিব-ভিখিরি পাওয়া কঠিন। তোদের অবস্থা কেমন রে আনিস?’
‘একই অবস্থা খালাম্মা। গরিব-ভিখিরিকে মনমতো গোশত বিলাতে না-পেরে আপনাদের বৌকে বলেছি ওদের ভাগেরটা ফ্রিজে রেখে দিতে। যখন যে ভিখিরি আসবে নামিয়ে বিলি করবে।’ এবার মনের ভেতরে ঘুরপাক খেতে থাকা কথাটা পারলেন আনিস সাহেবÑ ‘খালা, আল্লাহ পাক আমাদের ওপর খুব নাখোশ! আমরা তা উপলব্ধি করতে পারছি না এখনো! না হলে এই সাধারাণ ব্যাপারটি দেখেন, গরিব-ভিখিরিরাও গোশতের জন্য বাইরে নামেনি! অথচ আরেক কারবার দেখেন, ঢাকা শহরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এত বেশি; কিন্তু খবরে এসেছে ঘিঞ্জি বস্তিগুলোতে করোনা সংক্রমণ নেই বললেই চলে।’
খালাম্মা বললেন, ‘আসলেই আমাদের উপলব্ধি ক্ষমতা দিনকে দিন লোপ পাচ্ছে। আল্লাহর কাছে যে যার জায়গা থেকে ক্ষমা প্রার্থনা কর। ক্ষমা প্রার্থনা করো।’ হ
