অনেক দিন পর নিজের দুই সন্তান অপু-দীপুকে দেখার পর ওদেরকে কাছে পেতে নাজিয়ার মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে। এত কাছে রয়েছে ওরা। কিন্তু মা হয়েও তাদের কাছে যেতে পারছে না, ওরাও মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে তৃষ্ণার্ত চোখে। মাকে কাছে পেতে উন্মুখ হয়ে থাকলেও অপু ও দীপু আদালতের এজলাসের সামনের বেঞ্চে আরেক পাশে বসে আছে। নাজিয়ার বুক ফেটে কান্না আসছে। নিজের আদরের ধন সন্তান দু’টিকে এত কাছে দেখতে পেলেও ওদেরকে বুকে টেনে নিয়ে আদর করতে পারছে না। কোলে নিয়ে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিতে পারছে না। আদালতের এক সিদ্ধান্তে অপু ও দীপুকে এখন ওদের বাবার সঙ্গে থাকতে হচ্ছে। এক বছর আগে রাকিবের সঙ্গে নাজিয়ার ডিভোর্স হয়েছে।
প্রিয় সন্তান দু’টিকে হারিয়ে একদম ভেঙে পড়েছিল নাজিয়া। এই সমাজে স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাওয়ার পর সাধারণত তালাক পাওয়া মেয়েদের অনেকটা বেকায়দায় থাকতে হয়। নিজের পরিবারের লোকজনদের নানা লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সহ্য করতে হয়, অনেক ধরনের খোটা শুনতে হয়। আপন সন্তান দু’টিকে নিজের কাছে রাখার অধিকার তারও থাকতে পারেÑ এটা জোর গলায় বলার মতো অনুকূল পরিবেশ থাকে না। বিয়েবিচ্ছেদের জন্য যেন সে ই দায়ী এককভাবেÑ এমন ভাব দেখায় সবাই।
কতভাবে যে নাজিয়া চেষ্টা করেছে সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু পারেনি। নানাজনের শরণাপন্ন হয়েছে। পরিবারের মুরুব্বিদের কাছে গিয়ে কান্নাকাটি করে আকুতি জানিয়েছে। সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। নাজিয়া একদিন গভীরভাবে ভালোবেসে যে মানুষটি একান্ত আপন করে নিয়েছিল, পরম বিশ্বাসে যাকে নিজের জীবনের সঙ্গে জড়িয়েছিল, আজীবন একসাথে থাকার শপথ করেছিলÑ সেই মানুষটি এভাবে তার প্রতিপক্ষ হয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়াবে, ভাবেনি নাজিয়া।
দাম্পত্য জীবনের শুরুটা বেশ ভালোভাবে কাটলেও পাঁচ-ছয় বছর সময় পেরোতেই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্কে নানা টানাপড়েন শুরু হয়। নাজিয়া রাকিবের বেশ কিছু ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। বিশেষ করে তার নিজের পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতা নাজিয়া সহজভাবে মেনে নিতে পারছিল না। রাকিব তার গ্রামের বাড়িতে মা-বাবার জন্য টাকা-পয়সা পাঠাতে গেলে নাজিয়া আকার ইঙ্গিতে বাধা দিতে শুরু করে। নাজিয়ার স্কুলের পুরুষ সহকর্মীদের সঙ্গে তার সহজ সরল নিষ্পাপ অন্তরঙ্গ সম্পর্কটা ভিন্ন চোখে দেখতে থাকে রাকিব। এ নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতেও ছাড়ে না সে। দিনে দিনে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দ্বন্ধ শুধুই বাড়তে থাকে। দু’জনের মধ্যে এক অদৃশ্য দেয়াল সৃষ্টি হয়। একই ছাদের নিচে বসবাস করলেও দুই ভুবনের দুই বাসিন্দায় পরিণত হয় । বিভেদ, দ্বন্দ্ব, সন্দেহ সংশয়, বিরোধ জিইয়ে রেখে এক ছাদের নিচে একসাথে থাকাটা তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে।
নাজিয়ার আবেদনের পর প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রাকিবকে তাই দুই সন্তান নিয়ে হাইকোর্টে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালতের নির্দেশ মেনে রাকিব তার দুই ছেলে অপু-দীপুকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছে আজ। শুধু তারাই নয়, উভয়পক্ষের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের কয়েকজনও এসেছেন আদালতে। সবার উপস্থিতি পরিবেশটাকে আরো নাটকীয় এবং আবেগময় করে তুলেছে। সবার চেহারায় উদ্বেগ ও বিষণœতার ছায়া পড়েছে।
দু’পক্ষের আইনজীবীর যুক্তি-পাল্টা যুক্তি চলার একপর্যায়ে নাজিয়ার উকিল সাইফুর বলেন, ‘আমার মক্কেল নাজিয়া সুলতানা দুই সন্তানের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন আছেন আজ প্রায় এক বছর ধরে। একজন মা হিসেবে তিনিও তার আদরের দুই সন্তানকে কাছে পেতে চান। আজ অনেক দিন পর দুই সন্তানকে সামনাসামনি দেখে মায়ের মনটা অস্থির হয়ে উঠেছে। আমার মক্কেল নাজিয়া সুলতানা তার দুই সন্তানের সঙ্গে অন্তত দশ মিনিটের জন্য কথা বলার সুযোগ চান। মাই লর্ড, যদি আপনি এ ব্যাপারে একটু অনুমতি দেন। বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনার জন্য আবেদন করছি।’
বিচারক অনুমতি দিতেই নাজিয়ার কাছে ছুটে আসে তার দুই সন্তান অপু ও দীপু। নিজের দুই ছেলেকে অনেক দিন পর একান্তে নিজের কাছে ফিরে পেতেই আবেগের বাঁধ ভেঙে যায়। প্রিয় দুই সন্তানকে জড়িয়ে ধরে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দেয়। অপু মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘মা তুমি আমাদের কিভাবে ভুলে গেছো, আমাদের কাছে একবারও ফোন করোনি কেন? ঈদের সময় আমরা দুই ভাই তোমার ফোনের জন্য কত অপেক্ষা করেছি। তোমার ফোন না পেয়ে আমরা ঈদের দিন কেঁদেছি অনেকক্ষণ ধরে।’
সন্তানের অভিযোগ শুনে নাজিয়া কাঁদতে কাঁদতে জবাব দেয়, ‘লক্ষ্মী সোনা, বাবা আমার, আমি তোমাদের ফোন করেছিলাম। তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তোমাদের ফুপি কথা বলতে দেয়নি। আমাকে ধমক দিয়ে ফোন রেখে দিয়েছে। তোমাদের সঙ্গে কথা বলতে না পেরে আমিও অনেক কেঁদেছি সে দিনÑ ’ বলতে বলতে তার গলাটা ধরে আসে।
অপু-দীপু দুই ভাই দুই দিক থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে তাদের বাবা রাকিবকে কাছে আসার জন্য ডাকতে থাকে। এমন ঘটনা উপস্থিত দু’পক্ষের আত্মীয়স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের বিচলিত করে তোলে। এ অবস্থায় রাকিব কী করবে, ভেবে কূল পায় না। সিদ্ধান্তহীনতার দোলচালে দুলতে থাকা রাকিব পাথরের মূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এটি দেখে এজলাসে নিজের আসনে বসা বিচারক তাকে সন্তানদের কাছে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়ে বলেন, মিস্টার রাকিব ‘আপনাকে বলছি, আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না, ওদের কাছে যান। নিজের নিষ্পাপ সন্তানদের আর কষ্ট দেবেন না।’
রাকিব তাদের কাছে যাওয়ার পর অপু-দীপু বলতে থাকে, ‘আব্বু, তুমি আম্মুকে সরি বলো, প্লিজ, স্যরি বলো।’ ওরা নাজিয়াকেও বলে, ‘আম্মু, তুমিও আব্বুকে স্যরি বলো। আমরা এখন থেকে আর আলাদা থাকতে চাই না। আমরা সবাই একসাথে থাকতে চাই। আব্বু-আম্মু তোমরা আর রাগ করে দূরে সরে থেকো না। আমরা অনেক কষ্ট পাচ্ছি। প্লিজ, আমাদের আর কষ্ট দিও না।’
বিচারক অপু-দীপু দুই ভাইকে এজলাসের কাছে ডেকে আনেন। তার পর তিনি বলেন, ‘তোমরা কী চাও, এখন আমাকে বলো তো বাবা’। অপু কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমরা আব্বু ও আম্মুকে একসাথে চাই। একজনকে বাদ দিয়ে নয়, আমরা একসাথে দুইজনকেই চাই। একই বাসায় থাকতে চাই সবাই মিলে।’
মা-বাবাকে একসাথে আবার কাছে পেয়ে অপু-দীপু বলতে থাকে, ‘আব্বু-আম্মু তোমরা একজন আরেকজনের হাত ধরো, প্লিজ ধরো।’ বলতে বলতে তারা তাদের মা-বাবার হাত টেনে এনে ধরিয়ে দেয়।‘তোমরা কেন আলাদা হয়ে গেলে? সব ছেলেমেয়ে তাদের আব্বু-আম্মুকে সঙ্গে নিয়ে একসাথে থাকে। ওরা কত আনন্দ করে, আমরা কেন ওদের মতো থাকতে পারি না? বলো না আব্বু, বলোনা আম্মু’Ñ ছোট্ট দীপু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে।
আদালতজুড়ে তখন অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছে। কেউ কিছু বলতে পারছে না। মা-বাবাকে একসঙ্গে থাকার আকুতি জানিয়ে দুই কিশোর সন্তানের আর্তনাদ, কান্না উপস্থিত সবার হৃদয়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।
আদালতের নীরবতা ভেঙে বিচারক সামনে দাঁড়ানো রাকিব ও নাজিয়াকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনাদের দুই সন্তানের আকুতিভরা আর্তনাদ শুনেও কি আপনাদের নিজেদের মন গলে না? সন্তানের জন্য কী নিজেদের জেদ, একগুঁয়েমি, স্বার্থপরতা এসব ত্যাগ করতে পারেন না? আপন সন্তানের চেয়ে আপনাদের কাছে ইগোটাই বড় হয়ে গেল?
এভাবে আরো বেশ কিছুটা সময় নিঃশব্দে কেটে যায়। একসময় নীরবতা ভেঙে রাকিব বলে, ‘মহামান্য আদালত, আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি, অনেক অন্যায় করে ফেলেছি আমরা। আমাদের সন্তান দুটো একটি বছর ধরে অনেক কষ্ট ভোগ করছে ওদের মাকে ছাড়া। আমি আর কষ্ট দেবো না ওদেরকে। আমরা আসলে নিজের জেদ বজায় রাখতে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। এখন আমরা সেই ভুল সংশোধন করতে চাই। আমি আমার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে আবার নতুন করে আগের মতো জীবন শুরু করতে চাই।’
রাকিব নাজিয়ার দুই হাত ধরে আবেগময় গলায় বলতে থাকে, ‘প্লিজ নাজিয়া, এবার আমরা অতীতের সব কিছু ভুলে জীবনটাকে সুন্দরভাবে সাজাবো। বলো, তুমি থাকবে আমার সাথে? তুমি কিন্তু না বলতে পারবে না। আমাদের দু’জনেরই কিছু ভুল, দোষত্রুটি ছিল। আমরা সেগুলো দূর না করে একজন আরেকজনকে দূরে ঠেলে দিয়েছি। যার খেসারত দিচ্ছে আমাদের দুই সন্তান। আমরা আসলে অনেক ভুল করে ফেলেছি। চলো, আমরা আবার আগের জীবনে ফিরে যাই।’ এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ সব নেবো। রাকিবের আকুতিতে নাজিয়া নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না সে। ঝর ঝর কান্নায় ভেঙে পড়ে। মুখে কিছু বলতে পারে না। রাকিবের হাত দু’টি না ছেড়ে নিজের হাতের মধ্যে শক্তভাবে ধরে রাখে। অভূতপূর্ব এক দৃশ্যের অবতারণা হয় আদালতের মধ্যে। উপস্থিত সবাই মুগ্ধ আবিষ্ট হয়ে সেই দৃশ্য দেখতে থাকে। হ
