আল মাহমুদ (জন্ম : ১১ জুলাই ১৯৩৬-মৃত্যু : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯) এক বিস্ময়কর প্রতিভা। তিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সম্পাদক ও সাংবাদিক। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি একজন কবি। তিনি আবহমান বাংলা ও বাঙালি ঐতিহ্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপকার, দেশের অন্যতম খ্যাতিমান কবি। ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত ‘সোনালি কাবিনের’ আশ্চর্য শিল্পসফলতা তাকে শ্রেষ্ঠ কবির সম্মান দিয়েছে। ১৯৭৫ সালে ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশের মধ্যে দিয়ে তিনি কথাসাহিত্যের জগতে নিজের আসন পাকাপোক্ত করেছেন।
বাংলা, বাঙালি, মানুষ, ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে আল মাহমুদ এক ও অভিন্ন সত্তা। তার শৈশব, কৈশোর কেটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি গ্রাম ছাড়েন, কিন্তু শূন্য হাতে তিনি গ্রাম থেকে শহরে আসেননি। নিয়ে এসেছেন নিবিড় গ্রাম্য প্রকৃতি, তিতাসের মতো ছোট-বড় অনেক নদ-নদী, খাল-বিল, খড়ের গম্বুজ, নর-নারী, নিসর্গ প্রকৃতি যা পরবর্তীকালে তার সাহিত্যে সৃষ্টিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে।
আল মাহমুদের সৃষ্টিশীল মেধার বিকাশ বিচিত্রমুখী। অর্থাৎ কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, জীবনীসাহিত্য, ভ্রমণসাহিত্য, থ্রিলার । তিনি অসংখ্য কালজয়ী কবিতার স্রষ্টা। কবিতায় আল মাহমুদ নিয়ে এসেছেন নিজস্ব ধারা। গ্রামীণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না তার কবিতায় স্থান পেয়েছে। তার সাহিত্যে আছে নারীর সুদৃঢ় পদচারণাএবং আছে রচনার প্রাচুর্য, প্রকরণশৈলী ও নান্দনিকতা। অর্থাৎ বাংলা ভাষাকে গৌরবোজ্জ্বল অবস্থানে নিয়ে এসেছেন তিনি। কবিতার পরম উষ্ণতায় ঋদ্ধ তাঁর জীবন।
‘সোনালি কাবিন’ খ্যাত কবি আল মাহমুদ গদ্যসাহিত্যেও বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। নিরন্তর এই লেখক আজও তারুণ্য, রহস্য, নারী পুরুষের সম্পর্ক, প্রকৃতির সাথে মানুষের কাজ ও কলার সাদৃশ্য ও সান্নিধ্য, প্রেম-বিচ্ছেদ, আনন্দ-যন্ত্রণার বর্ণনাকারী হিশেবে বর্তমান বয়সে ভার, দারিদ্র্য কিংবা সামাজিক-রাষ্ট্রীয় পেশাগত প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন সাফল্যের শিখরে। উপন্যাস কিংবা গল্পের কাঠামোকেও তিনি প্রদান করে চলেছেন কাব্যের সৌকর্য ও শোভা। জীবনানন্দের মতো কবিতা ও কথাসাহিত্য উভয় ধারাতেই শক্তিশালী এই প্রতিভা বাংলা সাহিত্যের বিরাট অহঙ্কার।
কবি আল মাহমুদ প্রধানত মৌলিক প্রতিভার কবি। রবীন্দ্র-উত্তর আধুনিক কালের কবিদের মধ্যে যিনি শব্দচয়নে, জীবনবোধে, ছন্দের জাদুময়তায়, ভাব-ভাষায়, বর্ণনায় অসামান্য- তিনি আল মাহমুদ। বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টি করেছেন এক ভিন্ন মাত্রা। আমাদের কবিতায় যে ঐতিহ্য ও আধুনিকতার উন্মেষ ঘটেছে তিনিই তার প্রাণপুরুষ। তিনি আমাদের গৌরব, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অহঙ্কার। তার কলমের প্রতিটি খোঁচা বাংলা সাহিত্যের ফসলি জমিকে করেছে উর্বর। আধুনিক বাংলা কবিতায় আল মাহমুদ এক বিশিষ্ট আসনে উপবিষ্ট। তার লেখনীতে যে জীবন দর্শন বা ভাবধারা প্রকাশিত হয়েছে, তাকে দু’টি পর্বে বিভক্ত করা যায়।
আল মাহমুদের সৃষ্টিশীল মেধার বিকাশ বিচিত্রমুখী। অর্থাৎ কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, জীবনীসাহিত্য, ভ্রমণসাহিত্য, থ্রিলার প্রভৃতি। তার রচিত সাহিত্যকর্মে যে জীবন দর্শন প্রতিফলিত হয়েছে, তাকে দু’টি পর্বে বিভক্ত করা যায়।
প্রথমত : লোক-লোকান্তর থেকে সোনালি কাবিন পর্যন্ত।
দ্বিতীয়ত:মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো থেকে ইতিহাস দেখ বাঁক ঘুরে গেছে ফের ইতিহাসে (মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত রচিত সাহিত্যকর্ম) পর্যন্ত।
প্রথম পর্বে লেখকের মানস ছিল প্রধানত সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় উজ্জীবিত, যেখানে তিনি বলেছেন-
শ্রমিক সাম্যের মন্ত্রে কিরাতেরা উঠিয়েছে হাত
হিয়েন সাঙের দেশে শান্তি নামে দেখ প্রিয়তমা
... ... ... ... ... ... ... ... ... ... ...
আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণীর উচ্ছেদ।
কবির জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় কবি প্রথম জীবনে তেমন মার্কসবাদী ছিলেন না। তিনি ছিলেন রোমান্টিক ধারার কবি। ‘জীবনের রোমান্স এবং সম্বন্ধসূত্র নিয়েই তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। পরবর্তীকালে তিনি যখন ঢাকায় আসেন তখন মার্কসবাদে পুরোপুরি বিশ্বাসী হন।’ তখন হয়তো কবির ধারণা ছিল মানুষে মানুষে বৈষম্যের সমাধান একমাত্র মার্কসবাদেই আছে। তখন তিনি ব্যাপকভাবে মার্কসীয় সাহিত্য পড়তে থাকেন। সত্যেন সেনের (১৯০৭-১৯৮১) মতো ব্যক্তির কাছে যাতায়াত শুরু করেন। তাদেরই কাছে তিনি মার্কসবাদের দীক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার মার্কসবাদ বিশ্বাসী হয়েও তিনি কবিতায় মার্কসবাদের প্রতিফলন ঘটাতে পারেননি। মার্কসবাদ এবং রোমান্টিকতা যদিও কবির জীবনে ছিল অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। শেষ পর্যন্ত রোমান্টিকতারই জয় হয়। তিনি কেন মার্কসবাদকে সমর্থন করলেন, কেন মার্কসবাদে দীক্ষিত হলেন সে সম্পর্কে তার সুস্পষ্ট অভিমত :
আমার যৌবন কালটা ছিল খুবই দারিদ্র্যের আঘাতে দিশেহারা। স্বভাবতই আমার সে সময়কার আদর্শও ছিল যে কোনো উপায়ে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। আমি তখন মার্কসবাদকেই সবকিছুর সমাধান ভেবে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিলাম। তখন ধর্মের ব্যাপারে আমার দারুণ জিজ্ঞাসা থাকলেও এবং মার্কসীয় দর্শনে এর তৃপ্তিকর কোনো জবাব খুঁজে না পেলেও আমি কমিউনিস্ট পার্টিকে সমর্থন করতে লেগে গেলাম। লেগে গেলাম মানে ঐ সময়কার আমার সাহিত্যকর্মে সোভিয়েত রাশিয়ার নেতাদের প্রতি বুকভরা সমর্থন ব্যক্ত হতে থাকল। পরে অবশ্য জেনেছিলাম রুশ বল শেভিকদের নেতা স্ট্যালিন একাই দুই কোটি মানুষকে হত্যা করে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। ঐ সমাজতন্ত্র মূলত একটি মানবপীড়নমূলক বিশাল কারাগার মাত্র। পরে সেই সাম্রাজ্য আপনা থেকেই ভেঙে পড়ে। আমার যৌবন কালটা আমি ঐ ভুল আদর্শের পেছনে ছুটে বেড়িয়েছি। এখন আমি বিশ্বাস করি যে আল্লাহর বিধানমালা ছাড়া মানবজাতি এই মহাবিশ্বে নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় সক্ষম হবে না। ঐ বিধানমালার নামই হলো কুরআন।
প্রথম জীবনে আল মাহমুদের রচনায় রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে সমাজতন্ত্র উপস্থাপিত হলেও গ্রামীণ জীবনযাত্রা ও লোকজ ঐতিহ্যের সফল রূপকার হিসেবেই তিনি বেশি খ্যাতিমান। তার কবিতায় আঞ্চলিক শব্দের মানানসই ব্যবহার তাকে কাব্যসাহিত্যে স্মরণীয় করে তুলেছে।
জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ দাশ বা বন্দে আলী মিঞার (১৯০৭-১৯৭৯) অনুকরণে নয় সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়েই তিনি উপস্থিত হয়েছেন বাংলা কাব্যাঙ্গনে। এ প্রসঙ্গে কবি বলেছেন :
আমি এমন এক গ্রাম বাংলাকে উপস্থাপন করতে চেয়েছি, যে গ্রাম বাংলা ভেঙ্গে পড়া ঠিক জসীমউদ্দীনের বাংলাদেশও না। আবার জীবনানন্দ দাশের বাংলাদেশও না। জসীমউদ্দীন ও জীবনানন্দ দাশের বাংলাদেশে এক ধরনের রূপকথা আছে, একটা স্বপ্ন আছে। কিন্তু আমার দেখা বাংলাদেশ একদমই রূঢ়। এ বাংলাদেশ নদীর পাড় ভাঙা বাংলাদেশ। গ্রামকে গ্রাম বিলীন হওয়া বাংলাদেশ। এইগুলো আমার কবিতায় প্রথম এসে যায়। চর নিয়ে দাঙ্গা হচ্ছে। চরের লাঠিয়াল উঠে আসছে কবিতায়। তারপর ঐ যে বাংলাদেশের কালো মানুষ তারা আমার কবিতায় আসতে শুরু করে। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল আমি তখন কবিতায় আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করলাম। যে শব্দ সাধারণত সাহিত্যের ভাষায় ব্যবহার হয় না।
আল মাহমুদ পঞ্চাশ দশকের খ্যাতিমান কবি। গ্রাম বা পল্লি তথা রূপসী বাংলা তাঁর কবিতার মূল উপজীব্য। গ্রামের জীবন ও দেশজ সাহিত্যের ঐতিহ্য, চলতি শব্দের ব্যবহার, রূপক, উপমা, উৎপ্রেক্ষা আল মাহমুদ তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন সার্থক ভাবে। এ প্রসঙ্গে কবির অভিমত : আমি এই আরবি, ফারসি শব্দের ব্যবহার করতে পেরেছি আমার পারিবারিক ঐতিহ্যের সূত্র ধরে। আমাদের রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিবারে আরবি, ফারসি সাহিত্যের ব্যাপক চর্চা ছিল। আমার দাদিকে দেখেছি পরিষ্কার ফারসি ভাষায় কথা বলতে। ফারসি বয়েত নিয়ে আলোচনা করতে।
মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো থেকে আল মাহমুদের চিন্তা চেতনা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে। সমাজতান্ত্রিক আদর্শের পরিবর্তে তিনি ইসলামি জীবন দর্শনে দীক্ষিত হন। যা তাঁর সোনালি কাবিন উত্তর রচনায় প্রকাশ পেয়েছে। মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো গ্রন্থে লেখক বলেছেন : আমি কুণ্ডলীকৃত কালো ধোঁয়ার আড়াল থেকে বেরিয়ে / ধ্বংসের ওপর রেখে আসা আল্লাহর আদেশ / বুকে তুলে নিলাম।
-মার্কসবাদী সাহিত্য ধারায় অনুপ্রাণিত হয়ে সাহিত্যচর্চা শুরু করলেও প্রাকৃতিক নিদর্শনাবলি কবির মানসপটে ঐশ্বরিক প্রভাব বিস্তার করে। তিনি নৈসর্গিক পত্র-পুষ্প নিয়ে অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেন। জেলখানার একান্ত সঙ্গী মশিউর রহমান যাদুমিয়ার কাছে তাঁর ভাবনা-কল্পনার কথা ব্যক্ত করেন। কবির ভাষায় :
আমার কবিতার প্রধান বিষয় হলো নারী। আমার কবিতার আরেক প্রধান বিষয় হলো প্রকৃতি। --আমার মনে আদিম মানুষের মত অতিশয় প্রাথমিক এক দার্শনিক জিজ্ঞাসা জাগে কে তুমি আয়োজক? তুমি ও কবি? না কবিরও নির্মাতা? তবে তুমি যে অনিঃশেষ সুন্দর আমি তা সাক্ষ্য দিচ্ছি। আমার সাক্ষ্য গ্রহণ করো প্রভু। এভাবেই আমি ধর্মে এবং ধর্মের সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ বীজমন্ত্র পবিত্র কুরআনে উপনীত হয়েছি। একবার জেলখানায় খুব ভোরে সেলের তালা খুলে দেয়া মাত্রই বাইরে এসে দেখি আমার বারান্দার সামনে সিঁড়ির দু পাশে দুটি বেশ বড় ডালিয়া ফুল ফুটে আছে। একটি গাঢ় লাল। অন্যটি হলুদ। উদ্ভিদ বিজ্ঞান সম্পর্কে যৎসামান্য ধারণা থাকায় আমি একেবারে অভিভূত হয়ে যাই। আমার কেন জানি মনে হলো নির্বোধ প্রকৃতির সাধ্যের সীমানা থেকে অনেক দূরের কোন অসামান্য ঈঙ্গিত ছাড়া এমন অন্তরভেদী প্রস্ফুটন এক অসম্ভব ব্যাপার। আমি আমার এই ছেলে মানুষী চিন্তার কথা আমার সহবন্দী খ্যাতনামা রাজনৈতিক নেতা জনাব মশিউর রহমানকে বলি। তিনি আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক তত্ত্বালোচনা ছেড়ে তুমি ধর্মগ্রন্থগুলো একবার পড়ে দেখতে পারো।’ আমি তার মুখের কথা শুনে একেবারে বোকা বনে যাই। এভাবেই আমার বুকের ভিতর ধর্মের কল বাতাসে নড়ে ওঠে। পরের দিনই আমি আমার স্ত্রী সৈয়দা নাদিরা বানুকে বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থগুলো জেলখানায় পাঠিয়ে দিতে বলি এবং সেগুলোর এক তুলনামূলক পড়াশুনায় আত্মনিয়োগ করি। ফররুখ আহমদকে একঘরে করে রাখা তাঁর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও সাহিত্যিক পরিণাম জানা সত্ত্বেও আমি ইসলামকে আমার ধর্ম, ইহলোক ও পারলৌকিক শান্তি বলে গ্রহণ করেছি।
সমাজের প্রতিটি মানুষ জগৎ, জীবন ও পারিপার্শি¦ক পরিবেশের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সেদিক থেকে আল মাহমুদ ব্যতিক্রম নয়। তাই জীবিকার তাগিদে তাঁকে একাধিকবার মত পরিবর্তন করতে হয়েছে। সাংবাদিকতা বা সরকারী চাকরি করেছেন জীবন বাঁচার তাগিদে। তাই একাধিক রাজনৈতিক দলের ছত্র-ছায়ায় কবিকে ঠাঁই নিতে হয়েছে। ‘কবি প্রতি মুহূর্তে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন কবিদের তৃতীয় বিশ্বের কোথাও কোন নিরাপত্তা নেই। বেঁচে থাকার জন্য আপোস এবং লেখালেখির বিচিত্র ধরনের কাজ করে দিন পার করতে হয়, যার সঙ্গে সাহিত্যের কোন সম্পর্ক নেই।’ অনেকেই মনে করেন কবি আশ্রয় নিয়েছেন একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলের ছত্র-ছায়ায়। এজন্য তাঁকে কেউ বলেছেন বিশ্বাসঘাতক, কেউ বলেছেন মৌলবাদী, আবার কেউ কেউ বলেছেন বামপন্থী। সে প্রসঙ্গে কবির অভিমত : আমি একজন সামান্য কবি ও কথাশিল্পী মাত্র। আমার পেশা কমবেশি সাংবাদিকতায় জড়িত রাখতে হয়েছে। এ ধরনের মানুষের সাথে রাজনীতির কি সম্পর্ক থাকতে পারে? আমি রাজনীতিক নই, কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। আমি একজন দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী মুসলমান বাঙালি কবি।
শত প্রতিকূলতা ও নেতিবাচকতার মধ্যে আল মাহমুদের জীবনে পরিবর্তন সাধিত হলেও তা কখনো সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেনি। এখানেই আল মাহমুদের সর্বৈব সার্থকতা। বাধা, বিঘœ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ফেরারি জীবনের মধ্যে দিয়েও বাংলা সাহিত্য-ভাণ্ডারে আল মাহমুদ নিয়ে এসেছেন এক নতুন অধ্যায়। এজন্য সমালোচকগণ তাঁকে জসীমউদ্দীন ও জীবনানন্দ দাশ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রধারার এক নতুন কবি প্রতিভা বলে উল্লেখ করে থাকেন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে তিনি তিরিশ দশকীয় প্রবণতার মধ্যেই নদী, নারী, প্রকৃতি, ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ দৃশ্যপট ও নর-নারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহের বিষয়কে অত্যন্ত সুন্দর ও সূচারূরূপে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন যা কাব্য রসিকদের মাঝে নতুন পুলক সৃষ্টি করে। ১৯৬৩ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ লোক-লোকান্তর এবং ১৯৬৬ সালে দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ কালের কলসের মধ্যে দিয়ে তিনি নিজেকে প্রকাশ করেন সম্পূর্ণ মৌলিক ধারার কবি হিসেবে। তবে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত সোনালি কাবিনই তাঁর কবি জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা।
কবিতার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন বেশ কিছু উপন্যাস এবং গল্প। কথাশিল্পী হিসেবেও আল মাহমুদ বাংলা সাহিত্যে অনন্য। ‘সৌরভের কাছে পরাজিত’ গল্পে মানুষের বিশ্বাসময় অধ্যাত্মবাদ ফুটে উঠেছে। ‘একটি চুম্বনের জন্য প্রার্থনা’ গল্পে স্রষ্টাপ্রেম হজরে আসওয়াদ চুম্বনের জন্য শিল্প আকৃতি স্বর্ণচুণি হয়ে ঝরে পরেছে।’ সামাজিক অবক্ষয়, অসঙ্গতি, শাসন-শোষণ, নিপীড়ন, যৌনতা যেমন তাঁর গল্পে রয়েছে তেমনি রয়েছে প্রেম ও অধ্যাত্মবাদ। তবে পানকৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবণিক, ময়ূরীর মুখ, নদীর সতীন প্রভৃতি গল্পগ্রন্থের অধিকাংশ চরিত্রই যৌন নির্ভর, অশান্ত ও লিবিডোতাড়িত। আল মাহমুদের ছোটগল্পের সমালোচনা করতে গিয়ে প্রখ্যাত সমালোচক আজহার ইসলাম তাঁর বাংলাদেশের ছোটগল্প: বিষয়-ভাবনা ও শিল্পমূল্য গ্রন্থে বলেছেন- ‘জীবনের এক বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে আল মাহমুদের ছোটগল্পের বিচার চলে। সেই বিশেষ দৃষ্টিকোণের বিষয়টি নর-নারীর দৈহিক প্রেমচেতনার সঙ্গে পুরোপুরি সংশ্লিষ্ট।’
নর-নারীর দেহজ কামনাই আল মাহমুদের ছোটগল্পের প্রধান দিক। মূলত তিনি ছোটগল্পে ফ্রয়েডীয় যৌনতাকে আশ্রয় করেছেন। তাঁর শিল্প-সাহিত্যে অবচেতনভাবে এই লিবিডোর প্রভাব থাকায় পানকৌড়ির রক্তগ্রন্থের অধিকাংশ গল্পগুলোতে যৌনতার খোলামেলা প্রকাশ ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে সমালোচক চঞ্চল কুমার বোস তাঁর বাংলাদেশের ছোটগল্পের শিল্পরূপ গ্রন্থে বলেছেন :
সিগমুন্ড ফ্রয়েড (১৮৫৬-১৯৩৪) ব্যক্তির যৌন মনস্তত্ত্বের যে অজানা রহস্যকে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে উন্মোচন করেছেন সেই যৌন বাস্তবতার বৈচিত্র্যময় স্বরূপ আল মাহমুদের সাহিত্যে মুখ্য হয়ে উঠেছে। অবচেতনা অন্তর্গত তীক্ষè ইন্দ্রিয়জ-প্রবৃত্তি, তার আলো-ছায়া, রূপ, রহস্যময়তা এবং তার বিনাসী-যা প্রাত্যহিক নর-নারীকে কখনো কখনো তাড়িত করে অস্বভাবী মনোবৃত্তিতে, তাকে নিক্ষেপ করে অন্ধকার কূপে। সেই দেহজ বাসনা নির্ভর নর-নারীই তাঁর গল্পের উপজীব্য।
আল মাহমুদ কবিতা ও গল্পের পাশাপাশি পাঠককে বেশ কিছু উপন্যাসও উপহার দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিকায় লেখা তাঁর উপন্যাস কাবিলের বোন ও উপমহাদেশ বাংলা সাহিত্য-ভাণ্ডারে সংযোজন করেছে নতুন মাত্রা। এভাবেই আল মাহমুদ সমকালীন সাহিত্যচিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত থেকেই তাঁর স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন। তাঁর উপন্যাস ও ছোটগল্পগুলোতে ফ্রয়েডের মনোবিকলনতত্ত্বের প্রয়োগ কোথাও প্রবল, আবার কোথাও প্রচ্ছন্ন। তবে সমাজ নিষিদ্ধ যৌন আকর্ষণকে তিনি সামাজিক স্বীকৃতির মাধ্যমে চূড়ান্ত সার্থকতা দিয়েছেন। আবার কোথাও সমাজগর্হিত দৈহিক মিলনকেও দেখিয়েছেন তবে তা সীমিত। নর-নারীর প্রেম ভাবনায় কার্যকরণ তত্ত্ব, যৌনঈর্ষা এবং সূক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তাঁর সাহিত্যে অনবদ্যভাবে ব্যঞ্জিত হয়েছেÑএখানেই তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব। হ