সৃষ্টিলগ্ন হতে পর্যায়ক্রমে নানাবিধ সভ্যতার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। সময়ের স্রোতে মানবতার উৎকর্ষ সাধনে প্রতিটি সভ্যতারই কিছু না কিছু অবদান ছিল। মানবসৃষ্ট এ সভ্যতা বিশ্লেষণে যদিও দৃশ্যমান হয় প্রবৃত্তির চাহিদা তৈরির উপকরণ, যা কালক্রমে ভয়াবহতার
চিহ্নবহ। অথচ মানবতার উৎকর্ষ সাধনে প্রয়োজন একটি ত্রুটিমুক্ত, উন্নত ও সার্বজনীন সভ্যতার, যা মানবসৃষ্ট সভ্যতার উপকারী বিষয়গুলোর ধারক হওয়ার সাথে সাথে জনজীবনকে পরিশীলিত একটি জীবনের প্রতি প্রত্যক্ষ ইঙ্গিতবহ, যা কেবলমাত্র মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধের সমন্বয়ে ইসলামী সভ্যতার মাধ্যমেই প্রতিভাত হয়ে ওঠে। ইসলামী সভ্যতা ভৌগোলিক গণ্ডির সাথে কিংবা সুনির্দিষ্ট কোনো মানব সম্প্রদায়ের মাঝে অথবা ইতিহাসের কোনো নির্দিষ্ট বলয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব সার্বজনীন এবং বিশ্বময়। সভ্যতা বিকাশের ক্ষেত্রে সাহিত্য একটি উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে চলেছে আদিকাল হতেই। ফারসি সাহিত্য একটি সমৃদ্ধ সাহিত্য যার গুরুত্ব বহন করে কবিতা। কবিতা এমন একটি শিল্প যেখানে স্বল্প শব্দ অধিক অর্থ বহন করে বিষয়কে স্পর্শকাতর করে তোলে। কবিতা তখন জীবনের কথা বলে। ইতিহাস ধারাবাহিকতায় ফারসি কবিতায় প্রাচীন বিষয়ের জায়গায় নতুনত্বের জন্ম হয়। এ লক্ষণ স্পষ্ট হয় উনিশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে এবং পূর্ণ হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে। আধুনিক ফারসি কবিতায় চলমান ঘটনাবহুল জীবন প্রকাশের পাশাপাশি উন্নত জীবন গঠনে নৈতিক মূল্যবোধের চিত্রায়ণ হয়েছে সাবলীলভাবে। ইসলামী সভ্যতা বিকাশে কবি-সাহিত্যিকদের শৈল্পিক সৃষ্টি সাহিত্যকে একটি নতুন মাত্রা এনে দেয়। ফলে জীবন ও জগতের গভীর রহস্যের সন্ধানে কবিদের এ প্রচেষ্টার বাস্তবিক চিত্রায়ণ ঘটে সহজেই।
পারস্য সভ্যতা ছিল দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রিত সুবিস্তৃত এক সাম্রাজ্য। বিশ্বজুড়ে ইসলাম প্রসারের ফলে পারস্যেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের মধ্য দিয়ে ইরানিদের মধ্যে স্বকীয়তা ও স্বাজাত্যবোধ তৈরি হয়। যা ইরানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরে পরিবর্তন ঘটায়। মূলত খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সাসানি সম্রাটদের শাসনামলের মধ্য দিয়ে পারসিক সভ্যতা একটি উন্নত সভ্যতারূপে প্রকাশ পেয়েছিল। রাজনীতি ও দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায়, সমরবিদ্যা ও বিলাসিতার রকমারি প্রাচুর্যতায় ধর্মীয় রীতিনীতির আদলে এ সভ্যতা চরম উৎকর্ষতায় ছিল বিরাজিত। ফারসি সাহিত্য প্রাচ্যের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের এক বিশেষ অংশ। ইরানের কয়েক হাজার বছরের পুরাতন ফারসি সাহিত্য, কাব্য ও গদ্য সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। সাহিত্য যেমন মানবজীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ; তেমনি কবিতা এর প্রাণ। ইসলামী সভ্যতা বিকাশে কবিতা হয়ে ওঠে জীবন্ত, প্রাণান্ত এবং ঘটনাবহুল জীবনের অংশ।
আধুনিক কবিতা জীবনমুখী। জীবনঘনিষ্ঠ বলেই আধুনিক কবিতা সর্বমহলে এতটা সমাদৃত। সাংবিধানিক বিপ্লবী আন্দোলনের প্রভাবের ফলে ওই সময়ে ইরানে সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট ঘটনাবলিকে আধুনিক কবিরা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জনসম্মুখে তুলে ধরেন। সেই থেকেই এর পথচলার আরম্ভ। এভাবে আধুনিক ফারসি কবিতায় মানুষের কর্ম তথা জীবনকে তুলে ধরতে অসামান্য ভূমিকা রাখে যেসব পত্রিকা এর মধ্যে রোযনামেয়ে দৌলতে আলিয়ে ইরান, রোজনামেয়ে মেল্লাতি, রোজনামেয়ে এলমি, ইরান, মেরআতুস সাফা, মেশকাতুল হাজার, এলমি, শারফ, শারাফাত, আখতার, কানুন, হাবলুল মাতিন এর নাম স্মরণযোগ্য। এ ছাড়া আরো কিছু পত্রিকার নাম উল্লেখ্য, যার মধ্যে সুরে ইস্রাফিল, দানেশকাদে, আরমোগান, আযাদিস্তান। এসব পত্রিকাজুড়েই ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবহুল মানুষের ছায়া। আধুনিক কবিরা এ জাতীয় বক্তব্য উপস্থাপনের জন্য মোসাম্মত স্টাইলকেই উপযোগী করে মনে করতেন। স্বদেশপ্রেম, সামাজিক, ধর্মীয় ও অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক কবিতা স্থান করে নেয় মোসাভাত, নাসিমে শুমাল, নাসিমে সাবা ও অন্যান্য পত্রিকায়।
আধুনিক ফারসি কবিতার জনক বা পিতা বলা হয় কবি নিমা ইউশিজকে। কিন্তু কে প্রথম আধুনিক ফারসি কবি রচয়িতা এ নিয়ে মতানৈক্য দেখতে পাওয়া যায়। কারো মত আবুল কাসেম লাহুতি, কারো মতে তাকি রাফাআত। প্রকৃতপক্ষে আবুল কাসেম লাহুতিই প্রথম ফারসি কবি; কারণ তাকি রাফাআতের এক দশক আগে তিনি আধুনিক কবিতা রচনা করেন। যদিও পরে এই কবির রচনা তেমন খুঁজে পাওয়া যায় না। অপর দিকে তাকি রাফাআত তুর্কি, ফরাসি ও ফারসি এই তিন ভাষার দক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক এবং সামাজিক সমালোচনামূলক গণতন্ত্রকামীদের পক্ষে শক্ত হাতে কলম ধরেন। তিনি মানুষের অন্তরের ক্ষোভকে ভাষা দিয়েছেন। হয়ে উঠেছেন মানুষের প্রাণের কবি। যা পরে নিমায়ী ধারা নামে খ্যাত। বিশেষত কবিতার অন্ত্যমিলকে ভেঙে এমন কিছু টুকরো কবিতা রচনা করেন তিনি যা কি না আধুনিক কবিতার দিগন্তকে নতুন এক প্রজ্বলিত আলোয় উদ্ভাসিত করে। এখানে নমুনা হিসেবে তাকি রাফআতের নাসলে নও কবিতার একটি অংশ উদ্ধৃত করা হলো :
‘নব প্রজন্ম নব উদ্ভাসিত এক নতুন ধারা
প্রগলিত এক নব বসন্ত, ভরপুর ফসল কাঁটা
জাগো শুভ এ প্রতিজ্ঞায় বেঁধে নাও মন্ত্রখানা
জাগো পুনরায় পরিমার্জন করে নাও সেই মিথ্যের ঝুড়ি
জাগো সেই বৃদ্ধের শোষকের ধনুকের ধার হয়ে
প্রস্তুতি নিয়ে সর্বাঙ্গ আলোকিত হও আগামীর জন্য।’
নিমা ইউশিজ তার কবিতা রচনার শুরুতে পূর্ববর্তী কবিদের স্টাইল তথা সনাতন ধারার স্টাইলে কবিতা রচনা করেন। এ জাতীয় রচনা তার অতৃপ্ত আত্মাকে তৃপ্ত করতে ব্যর্থ হয়। ১৯২০ সালে ইরানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। কাজার বংশের পতনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন ঐতিহাসিক রেজা খান। ফলে ইরানের রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে আধুনিকতাপন্থী ও ঐতিহ্যপন্থীদের দ্বন্দ্ব প্রকটতর হয়। সে সময়েই নিমা মাত্র ২৩ বছর বয়সে ১৯২১ সালে পাঁচ শ’ পঙ্ক্তি সংবলিত তার প্রথম কাহিনী-কাব্য ক্বেসসেয়ে রাঙ পারিদে প্রকাশ করেন। এ কবিতায় প্রাচীন সাহিত্য ও ক্ল্যাসিক কাব্যরীতির বাস্তব পরিস্থিতির পাশাপাশি আধুনিকতার বিশেষ রূপ চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে। এটিই ছিল নিমার প্রথম বলিষ্ঠ কবিতা। এ গ্রন্থে বিশ্বকে কবি তার চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করেন। এর প্রথম কয়েকটি পঙ্ক্তির প্রতি লক্ষ্য করলেই এ বক্তব্য আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠবেÑ
‘আমি জানি না কার সাথে বলবো আমার মনের ব্যথা
বিবর্ণ কাহিনী, যে নিস্পৃহ!
যেই আমার সহযাত্রী এবং পরিমাপক হয়
শেষ পর্যন্ত হয় সে প্রেমাকুল-উন্মাদ
আমার কাহিনী প্রেমিকগণকে করে মর্মাহত
শেষ পর্যন্ত পাঠকদের করে উন্মাদ
প্রেমের আগুন যদি কারও মধ্যে হয় দহন
প্রেমের দহনে জ্বলে সে অধিক
আমার বন্ধুদের নিয়ে আমার আছে একটা কাহিনী
কাহিনীটা আমার ভাগ্য আর যুগের :
আমার মনে পড়ে সেই শৈশবের কথা
সর্বদাই আমার সাথে ছিল এক সহযাত্রী
আমার সেই সহযাত্রীকে নিয়ে আছে একটা কাহিনী ব্যাহত আমার
শুভ সহযাত্রী নিজে পরশ্রীকাতর।’
ইসলামী সভ্যতা বিকাশে মানুষের নৈতিক আচরণ অধিক গুরুত্ব বহন করে। তবে মানুষের আচরণগত পার্থক্যের কারণে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে এটি আলাদাভাবে মূল্যায়িত হয়। মানুষের সচেতনতা নির্দিষ্ট কিছু গুণকে ভালো এবং অপর কিছু অভ্যাসকে খারাপ বলে বিবেচিত করে। স্বার্থপরতা, নিষ্ঠুরতা, কৃপণতা এবং গোঁড়ামি সমাজে কখনো সমাদৃত হয়নি। মানুষ সর্বদা অধ্যবসায়, দূরদর্শিতা ও সাহসকে প্রশংসা করেছে এবং অধৈর্য, স্বল্পবুদ্ধিতা, কাপুরুষতা-এগুলোকে ঘৃণা করেছে। আত্মমর্যাদা, সৌজন্যবোধ, ভদ্রতা এবং সংযম সর্বদা উন্নত গুণাবলি হিসেবে মূল্যায়িত হয়েছে। অপর দিকে অবজ্ঞার মানসিকতা, অসৌজন্যমূলক আচরণ এবং বর্বরতা কখনো নৈতিক গুণ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেনি। দায়িত্বের প্রতি মনোযোগী ব্যক্তিরা মানুষের কাছ থেকে শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়ে থাকে; অযোগ্য, ধীর ও দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তি কখনো সমাজে সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত হয় না। তাই মানুষের সামগ্রিক আচরণের ভালো এবং মন্দ দিক ইসলামী সভ্যতা বিকাশে প্রভাব বিস্তার করছে।
মানুষের অভ্যন্তরীণ উন্নত গুণাবলির সমষ্টিই হলো নৈতিকতা। এসব গুণের সমন্বয়ে গঠিত একটি সমাজ ইসলামী জীবনগঠনে সম্মান ও মর্যাদাপূর্ণ মূল্যবোধের ক্ষেত্রে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। ভালো এবং মন্দের এ নৈতিক জ্ঞানের সাথে মানুষ জন্মগতভাবেই সম্পৃক্ত। নৈতিক মূল্যবোধ সম্পর্কে দার্শনিক ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি কখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। স্ব-স্ব যুক্তি উপস্থাপন যেন কালের এক অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে স্বীকৃত। দার্শনিকেরা ভালো-মন্দের এ দিকটিকে মানুষের যুক্তি, প্রয়োজন, ইচ্ছা-আকাক্সক্ষা এবং ঐতিহ্য-অগ্রগতির কষ্টি পাথরে যাচাই করতে প্রয়াস পান। তারা নৈতিকতাকে যথার্থ বিশ্লেষণের পরিবর্তে সময়, কাল, প্রেক্ষাপট ও আশা-আকাক্সক্ষার মানদণ্ডে বিচার করে থাকেন। প্রকৃত প্রস্তাবে যা ব্যক্তি স্বার্থ, অন্ধ-অনুকরণ ও জাতিগত স্বার্থের দ্বারা পরিচালিত ও মূল্যায়িত হয়ে থাকে। বৃহৎ অর্থে তা কোনো সঠিক সমাধান দিতে সক্ষম নয়। নৈতিক মূল্যবোধের এ আপেক্ষিক বিশ্লেষণ একটি দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়। কেউ একটি বিষয়কে অঠিক বলে দাবি করলে অপরজন সেটিকে ভিন্ন মানদণ্ডে সঠিক বলে প্রমাণ করার সুযোগ পান। সত্যিকারার্থে বিষয়টি ভুল বা শুদ্ধ যেকোনো একটি হওয়ার দাবি রাখে। কিন্তু নৈতিকতা সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকায় একটি বিষয় ভুল অথবা দু’টিই ঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। পৃথিবীর সব ধর্মেই নৈতিকতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। বড় বড় ধর্মগুলো এ বিষয়ে কাছাকাছি পৌঁছতে পারলেও চূড়ান্ত পর্বে এসে ঐকমত্য পোষণ করা সম্ভবপর হয়ে উঠছে না। কেননা এ বিষয়ে মীমাংসার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তি নির্ধারণ। ভিত্তি নিয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নির্ধারিত না হওয়ার ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব নয় কারও পক্ষেই। কবি-শিল্পী ও দার্শনিকগণ নিজ নিজ ব্যাখ্যা দিয়েই যেন দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিচ্ছেন। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বজাহানের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালা প্রদত্ত ও রাসূল সা: প্রদর্শিত বিধানের ভিত্তিতে যে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত, তাই নির্ভুল ও সঠিক। অন্যান্য মানুষের গবেষণা ও চিন্তাপ্রসূত বিষয় কখনো চিরন্তন নৈতিক মানদণ্ড হতে পারে না।
ইরানে সাংবিধানিক সংগ্রাম সমাপ্তের মধ্য দিয়ে কাজার রাজত্ব পাহলভি রাজত্বে পরিবর্তিত হওয়ার পর ফারসি কাব্যশৈলীর ক্ষেত্রে দু’টি চিন্তাধারার বিকাশ ঘটেছিল; প্রথমত, প্রচলিত কাঠামোগুলোর সাথে নব্য চিন্তাধারার বিন্যাস যাকে সাংবিধানিক যুগের অব্যাহত ধারা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেখানে মালেকুশ শোআরা বাহার, পারভিন এতেসামি, আদিব নিশাপুরি, আদিবুল মামালিক ফারাহানি এবং হামিদি শিরাজির মতো কবিগণও এ ধারায় কাব্যচর্চা করেছেন। দ্বিতীয়ত নিমা ইউশিজের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে ফারসি কাব্যশৈলীতে আধুনিক ধারার সূত্রপাত ঘটে। এ কাব্যশৈলীতে ভাষা, সাহিত্য ও চিন্তাদর্শন এ তিনটি পর্যায়ে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়। ফলে অতীত যুগগুলো থেকে ভিন্ন একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি হয়। এ সময়ে কবিসাহিত্যিকদের রচনায় সামাজিক বিভিন্ন বিষয়াবলির পাশাপাশি নৈতিকতাসম্পৃক্ত বক্তব্যমালা প্রাধান্য লাভ করে। বিভিন্ন উপমা দ্বারা মানুষের উদ্দেশ্যে নৈতিক শিক্ষামূলক বিষয়াবলির অবতারণা আধুনিক কাব্যমানকে করে তোলে উন্নত ও সমৃদ্ধ। যুগের চাহিদানুযায়ী ইসলামী সভ্যতা বিকাশে আধুনিক কবিতা অভিনব আঙ্গিকে নতুনত্বের সূচনা করে।
সহিত্যে সমসাসয়িক যুগ-মানস প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। সাহিত্যিক যেহেতু দেশ, কাল ও যুগের সন্তান। সেহেতু তার চিন্তাভাবনা থেকে তা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। কবি-সাহিত্যিকেরা শৈল্পিক বিন্যাসে তাদের মনোভাব কাব্যে রূপায়িত করেন। কোনো শিল্পকর্মই সমাজ ও জীবনবহির্ভূত নয়। আধুনিক কবিরা তাদের কাব্যে সমকালীন বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের চিত্রই নৈতিক মানদণ্ডে চিত্রিত করেছেন। মূলত ক্ল্যাসিক কবি-সাহিত্যিকদের দ্বারাই ফারসি সাহিত্যে নৈতিক বিষয়াবলির আগমন। এ সময়ের কবিদের মধ্যে কবি হাকিম সানায়ি, আবুল কাসেম ফেরদৌসি, জালাল উদ্দিন রুমি, ফরিদ উদ্দিন আত্তার, নিজামি গাঞ্জুবি, শেখ সাদি, ওমর খৈয়াম, হাফিজ শিরাজি ও খাজু কেরমানির নাম স্মরণযোগ্য। এসব কবি আধ্যাত্মিক, নৈতিক, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনাবলি, ইহকালীন ও পরকালীন চিন্তা, বিশ্বসৃষ্টি রহস্য, ন্যায়পরায়ণতা, পার্থিব জীবন ইত্যাকার বিষয়ের সৃষ্টি সাহিত্যকে মানুষের জীবনের গভীর রহস্যময় অনুভূতিতে কার্যকর করে তোলেন। যা পরবর্তী তথা আধুনিককালের কবি-সাহিত্যিকদের রচনায় সমাজের প্রচলিত ঘটনাবলি বর্ণনার পাশাপাশি নৈতিক বিষয়াদিÑ ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষমা প্রদর্শন, উদারতা, কল্যাণ কামনা, অল্পে তুষ্টি, খোদাভীতি ও পরকালীন জবাবদিহিতা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, ধৈর্যধারণ, বিনয় ও নম্রতা, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, বদান্যতা বিষয়ক আলোচনা জীবনের গভীরতায় প্রবেশ করে।
ফোরুগে ফাররোখযাদ এমন একজন আধুনিক মহিলা কবি যিনি ভালোবেসে সংসার জীবনে পা রেখেও কষ্টময় একাকিত্বের জীবনকে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। জীবনের চড়াই উৎরাই খুব কাছ থেকে দেখে কবি নিবিষ্ট মনে উপলব্ধি করতে পেরেছেন জগতের সবকিছুই এক মায়ায় জড়ানো চার দিক শুধু রহস্যেঘেরা। যা কিছু বর্তমান তার সবই ফেলে যেতে হবে পরিবর্তন হবে শুধু নাম। যা কিছু সত্য ও সুন্দর তা শুধুই আধ্যাত্মিক প্রেম। তাই অনুতপ্ত হৃদয়ে তার দিওয়ার নামক কাব্যে নিজ গুনাহের কথা স্বীকার করে সমর্পিত হয়েছেন সৃষ্টিকর্তার অপার ভালোবাসার কাছে। পাশাপাশি তিনি আল্লাহর প্রতি তার একনিষ্ঠ ভালোবাসার অনুভূতি নিয়ে সবাইকে জাগতিক প্রেম ভালোবাসা থেকে দূরে সরে গিয়ে ঐশ্বরিক প্রেমে উদ্বুদ্ধ করেন। পরকালের ভয়াবহতা সম্পর্কে সজাগ করে তোলার প্রয়াস চালিয়েছেন এভাবেইÑ
‘জীবনের শীতল মুহূর্তগুলো অতিক্রান্ত হয়েছে দ্রুতবেগে
তোমার হিংস্র চোখগুলো স্বনীরবে নিরাপদেই আছে।
আমার চার দিকে প্রাচীর তৈরি করছে
তোমার ভ্রান্ত পথের অনুকরণ থেকে আমি পালিয়েছি।’
কবি মালিকুশ শোআরা বাহার তার চারপাশের জীবন ও জগৎকে উপলব্ধি করেছেন নিবিঢ়ভাবে। সমাজ ও রাজনীতির কুটিল আবর্তে মানুষ প্রতিনিয়ত আবর্তিত হচ্ছে, জড়িয়ে যাচ্ছে শোষণের বেড়াজালে। বিশেষত বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের দুর্দশা, নিপীড়িত হওয়ার দৃশ্য তাকে বেদনার্ত করেছে। এসব অভিজ্ঞতাজাত উপলব্ধি করে তিনি মুসলমানদের মধ্যকার ঐক্যের কথা বলেছেন। তিনি ইসলামের মাজহাব নিয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি করে অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবী থেকে ঐক্যের মাধ্যমে আলোর দিকে ধাবিত হতে বলেছেন।
[বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়]