[গত সংখ্যার পর]
কবি বাহারের ভাষায়Ñ ‘ঐশ্বর্য, রাজত্ব, মর্যাদা ও ধর্ম’
এ চারটি বিষয়ের সমন্বয়ে আমাদের সব কিছু গঠিত
ধনভাণ্ডার, শাসনক্ষমতা ও আমাদের
ধর্মীয় মতভেদকে সৃষ্টি করেছে
ইসলামে মতবাদের পার্থক্য
রাজনীতির ন্যায় আমাদের দিবসকে অন্ধকার করে দিয়েছে
আমাদের সম্মান দু’টি বিষয়ের সাথে মিশে আছে
প্রথমে ঐক্য, অতঃপর মতাদর্শ
কেননা এ দু’টি বীরত্বের প্রথম সোপান
ঐক্য ও সাম্যের বাণী এতেই নিহিত।’
আধুনিক কাব্যজগতে ইরানের শিল্প ইতিহাস বর্ণনায় মাহদি আখাভানে সালেস একটি অনন্য নাম। ইসলামী সভ্যতা বিকাশে তার কবিতায় প্রত্যাশা, আশা, প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, বিশৃঙ্খলা, উত্তেজনা, আত্মসমর্পণ, ভাঙাগড়ার আলোকে বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা-চেতনাকে ব্যাখ্যা করেছেন। পাশাপাশি মানুষের প্রত্যাবর্তনের বিষয়েও আলোচনা স্থান পেয়েছে তার কাব্যে। প্রতিদিন রাস্তায় হাজারো মানুষের আনাগোনা, সেই দীর্ঘ রাস্তার মাধ্যমে তিনি বোঝাচ্ছেন কিভাবে মানুষ তার মূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করেÑ
‘আমি এখানে যদিও আমার হৃদয় অপ্রশস্ত
কেউ যদি সুসজ্জিত করে দেয় দেখব মনের সুরকে এসব উপকরণ সরিয়ে নাও
কোন সে রাস্তায় যেখানে প্রত্যাবর্তন করা হয়েছে
দেখেছি আকাশকে কিন্তু সে রঙ কোথায়?’
প্রাচীনকাল থেকেই ফারসি সাহিত্য নীতিনৈতিকতা ও ন্যায়পরায়ণতা সম্পৃক্ত বক্তব্যমালায় পূর্ণ। সমাজ জীবনে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং প্রেম-ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এক সুন্দর ভূখণ্ড বিনির্মাণে আধুনিক কবিদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। অবিচার-অনাচার মানুষের জীবনকে করে তুলে অশান্তি ও বিভীষিকাময়। মানুষের মৌলিক অধিকার হয় ক্ষতিগ্রস্ত। একটি সংসারে নারীর অবদান বর্ণনার ঊর্ধ্বে। একটি নারী একাধারে অনেক বৈশিষ্ট্যে গুণান্বিত। তাই মাতৃত্বের প্রতি আমাদের ভালোবাসার কথা স্মরণ করিয়ে মায়ের প্রতি ন্যায়পরায়ণতার শিক্ষা দিতে গিয়ে কবি পারভিন এতেসামি বলেনÑ
‘তোমার মাঝে নিহিত আছে মাতৃত্বের ভালোবাসা
আমাদের বৈশিষ্ট্য ন্যায়পরায়ণতা ও সন্তানের প্রতি মমত্ববোধ।
নিজের অধিকারকে খেল-তামাশা মনে করো না
তোমার কাছ থেকে যা শিখেছি, তা পুনর্ব্যক্ত করছি।’
এ ধরাধামে মূল্যবান সব আমানত মানুষেরই জন্য, তার যথাযথ প্রয়োগ একান্ত দাবি। কিন্তু তা বিঘিœত হচ্ছে পদে পদে ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে মূল্যবোধ। এহেন প্রেক্ষাপটে আমানতের দায়িত্ব অনুভূতি জাগ্রত করেন কবি ফরিদুন মাশিরিÑ
‘একটু একটু কষ্ট দিয়ে সৌভাগ্য গড়ে উঠে
এ বিস্ময়কর ধরণীতে তোমার নামে সকল আমানত
দুর্ভাগ্য যেন সুশোভিত শস্যদানায় সাপের ন্যায়
কর্মতৎপরতা বৃদ্ধি পায় তোমার সৌভাগ্য লাভের প্রত্যাশায়।’
ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে কেন্দ্র করে অগণিত ইসলামী সাহিত্যভাণ্ডার গড়ে ওঠে। এ ভাণ্ডার থেকে রস সিঞ্চন করে কবি ইরাজ মির্জা পার্থিব ও পরকালীন বিভিন্ন বিষয়কে ঘিরে কাব্যচর্চা শুরু করেন। এর ফলে তার কবিতায় ধর্মীয়, নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবধারা ব্যাপকভাবে পরিলক্ষিত হয়। একে অপরের প্রতি কল্যাণ কামনা একজন ব্যক্তির পরিচয় বহন করে। তেমনি একজন মা সর্বদা তার সন্তানের কল্যাণ কামনা করে থাকে। জন্মের পর দুধ পান থেকে শুরু করে হাঁটি হাঁটি পা পা করে চলতে শেখান মা। সন্তানের মুখে কথা ফুটে উঠে মায়েরই চেষ্টায়, মায়ের মুখের হাসিতে সন্তান হাসতে শেখে। এভাবেই সন্তান একটু একটু করে বড় হয়ে উঠে মায়েরই কল্যাণে। তাই মায়েদের প্রতি আগ্রহ ও তাদের অবস্থানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। ইরাজ মায়ের অবদানের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বলেনÑ
‘বলা হয় জন্মলগ্নেই মা
দুধপান করা শিক্ষা দেন
রজনীতে আমার শিয়রে
জেগে থেকে ঘুমানো শিখিয়ে দেন
আমার হাতে হাত ধরে হাঁটি হাঁটি পা পা করে
পথচলা শিখিয়েছেন
এক অক্ষর দু’অক্ষর মুখের ভাষায়
মুখে শব্দ উচ্চারণ ও কথা বলা শিক্ষা দেন
আমার ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটিয়ে দেন
পুষ্পের ন্যায় ফোটে উঠা শিখিয়ে দেন
আমার অস্তিত্ব তার অস্তিত্ব থেকেই
যত দিন বেঁচে আছি তাকেই ভালোবেসে যাবো।’
আকাশ যেমন ভালো-মন্দের হিসাব ব্যতীতই অঝর ধারায় শীতল করে এ পৃথিবী। তপ্ত ধরা হয় শীতল, পৃথিবী হয়ে উঠে শস্য শ্যামল। মানুষ যতই সম্পদশালী হোক আর যতই দরিদ্র হোক সবাইকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। একমাত্র বিনয় ও নম্রতার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণই পরকালের মুক্তির পথ হতে পারে। তাই কবি পারভিন এতেসামি জীবনের বিত্ত-বৈভবে আবিষ্ট না থেকে অবিরাম বৃষ্টির ন্যায় বিনয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেনÑ
‘এ বিছানা অবলোকন করে, শিক্ষা গ্রহণ করে
সবাই যেন প্রকৃত সত্য প্রত্যক্ষ করে।
যে-ই হোক, আর যেখানেই পৌঁছে যাও
জীবন-জগতের শেষ মনজিল এ তো ঠিকানা।
মানুষ যতই সম্পদশালী হোক আর হোক ধনী
এখানে যখন আসে সে তো দরিদ্র মিসকিন।
নিয়তির বিধান হামলা করে যেখানে যখন
একমাত্র উপায় বিনয়, আনুগত্য ও আল্লাহতে সমর্পণ।
জন্মদান গুম করা আর প্রাণ হরণ
জগতের এ চিরাচয়িত নিয়ম, বিধির বাঁধন।
কষ্ট-ক্লেশের এ নিবাসে আনন্দিত শুধু সেই লোক
যার আছে প্রশান্ত চিত্ত, হৃদয় আলোক।’
অসহায় শিশুর আর্তনাদে ব্যথিত হৃদয়ে কবি সাইয়েদ আশরাফ উদ্দীন গিলানি তার অখণ্ড আজাব সারমাস্ত কবিতায় অসহায় শিশুদের প্রতি আল্লাহর কাছে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা রাখেন এভাবেইÑ
‘যদি আমরা ধনীদের বাড়িতে গমন করি
এক লোকমা খাবারের জন্য লজ্জা-শরম পরিহার করে।
দারোয়ান গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয় বেহায়া বলে
আমাদের তাড়িয়ে দেয় যেমন সিংহকে বন্যভূমিতে
আহ! কঠিন শীত আজ রাতে হে মা।
চিন্তা নেই কোনো গরিব শিশুসন্তানদের প্রতি
আমির, মন্ত্রী ও প্রতিনিধি কারোরই।
হে খোদা! দরিদ্রদের প্রতি ন্যায়বিচারের হাত বাড়াও
অসহায় ক্ষুধার্তদের খবর রাখে না কোনো বিত্তবান।
আহ! কঠিন শীত আজ রাতে হে মা।’
সৃষ্টিতে ও অগ্রগতিতে নতুন গতির সঞ্চার করে তারুণ্য। তারুণ্যই পারে নতুন দিনের স্বপ্ন আঁকতে। তরুণদের সঠিক পথে পরিচালিত করার যথাযথ পদক্ষেপ ও তাদের ন্যায়পরায়ণতার উপদেশ দিয়েছেন কবি আমিরি ফিরোজ কুহি। কারণ যুবসমাজই দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ। তাদের মাঝে লুকিয়ে আছে অমিত সম্ভাবনার ভার। তারুণ্যের সৌন্দর্য বিকশিত হবে দেশের জন্য। তারা হবে ন্যায়পরায়ণতার মূর্ত প্রতীক। সৃষ্টিরহস্যের অবারিত দ্বার এভাবেই উন্মোচিত হয়েছিল তার হৃদয়াকাশে। তাই তো কবি লিখেছেনÑ
‘সেই ক্ষতিকর প্রভাব প্রতিপত্তিতে আমার কোনো কল্যাণ নেই
কেউ আমার কোনো উপকারে আসবে না
আমার সাথে শত্রুতা নেই কোনো ন্যায়পরায়ণতা
আমার একাকী জীবনই আমার শত্রু
আমার হৃদয়ের সুপ্ত রহস্যই জীবন দর্পণ
আমার নিদর্শনেই কল্যাণ নিহিত
কবি ফরিদুন মাশিরি এমন একজন প্রতিভাবান আধুনিক কবি যিনি তার কবিতায় পথভ্রষ্ট মানুষকে আলোর পথে ডেকেছেন। তিনি আল্লাহ তায়ালার মহত্বের নিদর্শনাবলির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে মনকে ঊর্ধ্বগামী রেখে সীমাহীনতার বিস্ময়ে উচ্চারণ করেছেন,
‘বলল, ঊর্ধ্বে রয়েছে অন্য জগৎ
মাটির পৃথিবী থেকে তার পৃথক
অসীম আকাশেরও অনেক উর্ধ্বে তা
পুনরায় বললাম, ঊর্ধ্বে কোথায়?
বলল, উহার ঊর্ধ্বে কোন পথ নেই
সেখানে রয়েছে মহান আল্লাহর মহত্বের নিদর্শন
আমাদের সর্বশেষ মেরাজ, আল্লাহর আরশ।’
মগ্নতার প্রবল সাধনায় দৃশ্যমান বিশ্বজগতের রহস্য। এ রহস্যকে বুকে নিয়ে মানুষ স্বপ্ন বোনে ভবিষ্যতের যা ক্রমাগত পরিবর্তের ধারায় বেগমান। জীবন ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলো গত হয়ে যায় সহজেই। ক্ষুদ্র এ জীবনের হিসাব-নিকাশ যাওয়া-আসার এ খেলার স্রোতে এক দিন শেষ হয়ে আসে। ফলে কাজই মানুষকে মানুষের কাছে বাঁচিয়ে রাখে আজীবন। মানুষের জন্য কিছু করার আনন্দই পারে আত্মাকে প্রশান্তি দিতে। কবি ইরাজ মির্জা বলেছেন অনাগতকালের প্রজন্মের কাছে জীবনের এই গুঢ় রহস্যে কিভাবে জেগে থাকে জীবন আরেকটি জীবনের কাছে,
‘হে সৎকর্মশীলগণ, যারা পৃথিবীতে আছো
অথবা অনাগত কালে যাদের আগমন ঘটবে
এ মাটিতে শুয়ে আছি আমি
ইরাজ, মিষ্টিভাষী ইরাজ
জীবদ্দশায় আমি
তোমাদের বিহীন কাটাইনি সময়
যদিও আজ আমার কবর ক্ষমা প্রার্থনা কেন্দ্র
আমার চোখ তোমাদেরই দিকে তাকিয়ে আছে
আমার শিয়রের পাশে একমুহূর্ত বসো
কবরে আমার একবার পা ফেল
একমুহূর্ত স্মরণ করো আমার কথা
মাটির নিচে আমার হৃদয়কে প্রশান্ত করো।’
সাহিত্যের মধ্যে থাকে জীবনের খোঁজ। থাকে স্বপ্নের আকাশ। জীবনকে গভীরভাবে দেখার দৃষ্টি সাহিত্যকে পরিপূর্ণ করে। সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ পাঠ কবিতা। একজন কবির ভুবনজুড়েই থাকে নানা রঙের অনুভবের ছোঁয়া। হৃদয়ের সবটাজুড়েই থাকে কবিতা আর কবিতা। তাই ইসলামী সভ্যতা বিকাশে ইরানি কবিদের গুণগত ও সংখ্যা উভয় দিক থেকে ফারসি সাহিত্য শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত। প্রাচীনকাল থেকে মানুষের মুখে মুখে উপকথা, কাহিনী, লোকগীতি, ধাঁধা, ছড়া ও প্রবাদ-প্রবচনের আধিক্য আধুনিক কবি-সাহিত্যিকরা তাদের রচনায় পরিবর্তন করে সমকালীন ঘটনাবলির চিত্রকল্প বিভিন্ন কাব্যশৈলীর গাঁথুনিতে তুলে এনেছেন। এভাবেই আধুনিক কবি-সাহিত্যিকরা মানুষের নৈতিকবোধ জাগ্রত করে সামাজিক অবক্ষয় থেকে দূরে থেকে মৌলিক মানবীয় গুণে মানবকল্যাণে ভূমিকা রাখতে সচেষ্ট হন। ফলে পাঠকমহলের চেতনাজুড়েই থাকে কবিতার এক নতুন পৃথিবী।
[সমাপ্ত]
