বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি এ কোন অপরূপ সৃষ্টি, এত মিষ্টি মিষ্টি মিষ্টি আমার হারিয়ে গেছে দৃষ্টি। গানের সুরের মতো বৃষ্টি পড়ে বনে, বৃষ্টি পড়ে নদীতে, বৃষ্টি পড়ে মনে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের আরেক রূপ বারিধারা। নিজেকেই যদি প্রশ্ন করি প্রকৃতির কোনরূপ আমাকে আন্দোলিত করে, কোনরূপ হেসে খেলে হৃদয়ে মাতম তোলে, কেমন সে চিত্র যা মনাকাশে উড়ে বেড়ায়। চোখের দৃষ্টির সীমানার খোঁজ মিলে না। মনকে বেঁধে রাখা হয় না নির্দিষ্ট মননে। আকাশ ফুঁড়ে বৃষ্টি নামে এমনই অবয়ব নিয়ে। মনকাড়া এত্ত সুন্দর পৃথিবী।
সব ঋতু তাদের আয়োজনের ডালা সাজিয়ে মুগ্ধতা নিয়ে আসর বসায়। বাংলাদেশে আষাঢ়ের ঘনমেঘ কিংবা শ্রাবণের ঘনবর্ষণ এমনই চিত্র আমাদের চিরকালের সঙ্গী। বৃষ্টি আমাদের স্বপ্নকেও আলোকময় করে আমূল। আমাদের জীবনের যত আয়োজন যত গল্প তার সবই কোথাও না কোথাও কোনো না কোনোভাবে নিবিড়ভাবে মিশে আছে প্রকৃতির পাজরঘেঁষে। অঝর বর্ষণে বৃষ্টিরা খেলা করে বিস্ময়ে। দিন-রাতের হিসাব থাকে না, থাকে না সকাল সন্ধ্যা কিংবা দুপুরের। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি কখনো বা মুষলধারায় সিক্ত করে মাটির বুক, ঘাসের পিঠ। আকাশের নিচে মেলে ধরা নদীর বুকেও বৃষ্টিরা নেচে ওঠে কল্লোলে। জীবনের এই আনন্দের সৌন্দর্য মনকে সচ্ছলতায় ঘিরে রাখে।
আমার চোখে সৃষ্টি আসে বৃষ্টি নিয়ে, মনকাড়া হাসির ফোয়ারা নিয়ে। ঝর্ণার একটানা বর্ষণে পৃথিবীর বুকে মনে হয় বুঝি শূন্যতার বলয়ে মেঘেদের বাড়ি থেকে অশ্রু ঝরে পড়ছে। শীতল স্পর্শ আঁকে পৃথিবীর কোলেপিঠে। বৃষ্টিও কথা বলে। সুরের মূর্ছনায় পুরো পৃথিবীকে উদ্যমী করে তোলে। মেঘেরা রং মেখে জায়গায় জায়গায় গুচ্ছ ফুলের মতো জেগে থাকে। কোথাও আবার মেঘের আড়ালে সূর্য হাসে। চারিদিক যখন কালো বাদামি মেঘেরা উড়ে বেড়ায় সেই মেঘের আড়ালে সূর্যের আভায় আকাশ যেন মুচকি হাসে। খুব নিচে মেঘেরা লুকোচুরি খেলায় মেতে ওঠে। হাত বাড়ালেই মনে হয় মেঘ এসে ছুঁয়ে যাবে। বৃষ্টিতে হাসে সবুজ ভুখণ্ড। তপ্ত পৃথিবী নিয়ন্ত্রিত হয়ে প্রকৃতিকে আরো শান্তিময়, স্নিগ্ধতায় ভরিয়ে তোলে।
ভালোবাসি বৃষ্টিকে-টিপটিপ বৃষ্টি, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি, টাপুর টুপুর বৃষ্টি, রিমিঝিমি বৃষ্টি, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, উচ্ছল বৃষ্টি, মুষলধারায় বৃষ্টি, পেজো তুলোর ন্যায় বৃষ্টি, অপ্রত্যাশিত বৃষ্টি। কতভাবে কত নামেই না তাকে ডাকা যায়। প্রত্যেক রূপেই তার সৌন্দর্য প্রকাশিত। সেই ছোট্টবেলায়ই ভালোবাসার সম্পর্ক বৃষ্টির সাথে। ঝমঝম শব্দ নিয়ে টিনের চালে যখন বৃষ্টিরা নেচে উঠত সেই শব্দ ও দেখার দৃশ্য আজও আনন্দের আজও চাওয়ার। পানির প্রতি ছিল অসম্ভব টান। মনে পড়ে যায় গ্রামের সেই চিত্র যেখানে বাংলাঘরের উঠোনে ধান উড়াত ঘোমটা মাথায় গাঁয়ের বধূরা। সাথে যোগ হতো কচিকাঁচা বাচ্চারাও। প্রায় ছয় ফিট লম্বা সারিধরে এক মাথা থেকে আরেক মাথা পযর্ন্ত ধান উড়িয়ে যেত। এর মধ্যেই যখন মুষলধারায় বৃষ্টিরা মাটির বুকে গন্ধ ছড়াত সেই সৌন্দর্যের উৎস থেকে আজও ঘ্রাণ পাই বুকের তলে। হাতের ওপর বৃষ্টির ফোঁটা পায়ে পায়ে বৃষ্টির সাথে খেলা এক অন্য আবহ তুলে দেয় স্মৃতিতে। কতশত ছবি, সময়ের আনন্দের মুহূর্ত জীবনকে নতুনের তরে জাগিয়ে দেয়। বৃষ্টির সজীবতায় মুগ্ধ প্রকৃতির হাসিমুখ দেখি অনিমেষ।
সে সময়ের বর্ষা ছিল দীর্ঘতায় মোড়ানো। চারিদিকে বৃষ্টিরা তখন নানা অবয়বে হাজিরা দিত। মাঠঘাট, নদী পুকুর-দীঘি বৃষ্টির পানিতে হয়ে উঠত টইটম্বুর। এ সময়ে পানি ভরা মাঠে ফুটবল খেলা জমে উঠত ভীষণ। ফুটবল খেলায় বল নিয়ে পায়ের মারপ্যাঁচে পানিতে গড়াগড়ির দৃশ্য ছিল মনকাড়া। কী ভীষণ সুখময় ছিল দিনগুলো। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বৃষ্টিরা আসত বন্ধুদের সঙ্গ নিয়ে। একসাথে স্কুলড্রেসে বইয়ের ব্যাগ বুকে ধরে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে চলত দৌড়ের প্রতিযোগিতা। পড়ে যাওয়ার ভয় নেই, ছিল না জ¦র হওয়ার আশঙ্কা। বৃষ্টিকে আপন করে পেতে সে কি দুর্বার আকাক্সক্ষা। বৃষ্টিকে মাথায় নিয়ে আকাশকে খুব আপন মনে হতো। আহ! বৃষ্টি।
সকাল হতে রাতের সময়ে বৃষ্টি আসত আনৌখি আবহ নিয়ে। ফজরের আজানের শব্দ আর বৃষ্টির রিমঝিম শব্দে যখন ঘুম ভাঙত তখন বুকের পাটে কেমন এক উদাসী মন রাঙ্গা হয়ে গভীর ভাবনায় ডুব দিতো। ঘুমো ঘুমো চোখে স্বপ্নরা খেলা করত। থেকে থেকে বজ্রপাতের শব্দে আঁতকে উঠত মন। জানালা খুললে বৃষ্টির ছোঁয়া ভিজিয়ে দিত সারা শরীর। আজ বুঝি বৃষ্টিরা নিজেদের খেলায় মেতেছে। আধো আধো আলোয় মনে হতো অন্ধাকারকে ধুয়ে আকাশ থেকে নেমে আসছে ফুলের ধারা। ঝিরিঝিরি বা মুষল যে রূপেই আসুক না বৃষ্টি একই সুর একই শব্দের উল্লাসে মনের নকশায় ঝড় তুলত। সময়ের কোনো হিসাব মানত না এ ধারা। বৃষ্টি পড়ে আজ বৃষ্টি পড়ে কালও এভাবেই বৃষ্টি ঝড়ে কখনো সপ্তাহব্যাপী আবার কখনোবা থেমে থেমে মাস গড়িয়ে। কখনো এসেই দেখা দিয়েই মিলিয়ে যেত কখনো আবার কয়েক ঘণ্টা অবিরাম ঝরে পড়ত। স্বপ্নময়তার মধ্যেই চোখ আটকে যেত বড় আকারের কদমগাছে। চোখ পড়ত কদম ফুলে। বলের মতো অবয়বে তিন রকমের লেয়ারে এ ফুল বর্ষাকে বিশেষ করে তুলত। সকালের বৃষ্টিতে ঝরে পড়ত কদমের ওপরের হালকা ঝিলিক দেয়া পাপড়িগুলো। সুরভী ছড়িয়ে জানান দিত নিজের অস্তিত্বের। কত মানুষের লেখনীতে স্থান করে নিত এই ফুল। কবিতার শব্দবুনটে কদমের সুগন্ধ আরো প্রাণময় হয়ে প্রকাশ পেত। শুধুই কি শব্দবুনট! এর বাইরেও কাঠবিড়ালি, বাদুড় খাবারের সন্ধানে কদম ফুলের সন্ধানে ঘুরে ফিরত। কদম ফুলের বাইরেও নাম না জানা কত বুনোফুল নিজেদের জানান দিতো প্রকৃতির সৌন্দর্যে।
ধীরলয়ে দুপুর যখন কাছাকাছি এ সময়ের বৃষ্টি চঞ্চল হয়ে উঠত ভীষণ। ছোট ছোট পা তখন কৈশোরের উত্তাপে দৌড়াতে ভালোবাসত। এমনই একটি দুপুর ছিল সেদিন, আকাশে ছিল রঙের ঘনঘটা। থোকায় থোকায় মেঘের রাশি কোথাও আবার সূর্যের হাসি। সূর্যের হাসি সাথে নিয়েই আকাশ নেমে এলো ধীরলয়ে। কিছু সৌন্দর্যের কোনো ব্যাখ্যা হয় না, কোনো ভালোলাগার কারণ খুঁজে মিলে না। সোনালি রোদমাখা সেই দুপুরে আকাশ অঝোরে নেমে মাটিকে ভিজিয়ে যে সৌরভ ছড়িয়ে দিলো তাতে আমি প্রাণভরে নিজেকে ভিজিয়েছি বৃষ্টির পানিতে। বৃষ্টিকে বুকে তুলে চিনেছি আকাশের কান্নাকে। গাছের গা বেয়ে বৃষ্টির স্পর্শে পাতাগুলোতে কাঁপন সৃষ্টি হয়। পাতার ওপর ঝিরিঝিরি ফোঁটা যেন রূপকথার গল্প করে। বাতাসের সাথে বৃষ্টির গলাগলি সম্পর্ক। বৃষ্টি জড়িয়ে আছে সৃজনশীলতার চিহ্ন নিয়ে। স্মৃতিকে জীবন্ত করে তোলে আলো আঁধারির বৃষ্টির শব্দ। স্বাপ্নিক মন ভাবনার সাগরে ডুব দেয়। বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি। গান বেজে উঠেছিল মনে গুণগুণ শব্দে মাতোয়ারায় গেয়েছি ‘আমার সারাটা দিন মেঘলা আকাশ বৃষ্টি তোমাকে দিলাম শুধু শ্রাবণ সন্ধ্যাটুকু তোমার কাছে চেয়ে নিলাম।’ নির্মল আকাশের সবটুকু নীলে ঝাঁক বাঁধা বলাকারা উড়ে বেড়াচ্ছিল সুখমনে। ঘুমভাঙ্গা অবয়বে হাসির ঝিলিকে আকাশ তার সৌরভ মেলে ধরেছিল ধরনীতে।
বৃষ্টিকে দেখেছি নীরবতায় নিস্তব্ধতায়। অবিরাম বর্ষণে এক ধরনের ঘোরে নির্নিমেষে চেয়ে থাকার আনন্দ ছিল বেশুমার। ভাবনার আকাশ নেমে আসত বুকের কাছে। সময় কখনো থেমে গিয়ে ফিরে আসত বিপুল প্রবাহে। বাড়ির আঙ্গিনা থেকে মাঠঘাট চরাচর বৃষ্টির পানিতে মাখামাখা। গাছপালা থেকে ধান পাট সবই যেন স্বাগত জানাচ্ছিল ভেজা শরীরে বৃষ্টিকে। পানিভরা মাঠে সুর তুলত নানা নামের ব্যঙসহ নাম না জানা প্রাণীরা। তাদের জিকিরে মুখরিত হতো প্রকৃতির রূপ। কর্মের তাগিদে বৃষ্টিকে মাথায় নিয়ে মানুষ নেমে আসত রাস্তায়। রিকশা হোক বা গাড়ি পানির জলাবদ্ধতায় আটকে পড়ত অসহায়ত্বে। এমনই চিত্র থাকে বৃষ্টি দিনের। বন্যার মতো দুর্যোগ মানুষকে নাজেহাল করে ছাড়ে। কারো হাতে ছাতা কেউবা রেইনকোট জড়িয়ে নেয় গায়। এসবের কোনোটাই যখন থাকে না তখন আকাশকেই ছাদ ভেবে এগোতে হয় প্রয়োজনে। অতিবৃষ্টির এত কষ্টের পরও নীরব দীর্ঘশ^াসে বৃষ্টির সৌন্দর্যে মন ভরে ওঠে।
আসি আসি বৃষ্টির মুহূর্তটা দেখতে মনে হতো হঠাৎ মুচকি হাসে বুঝি কোনো বুনো তারকা। আকাশভরা আলোরা নিজেদের আড়াল করে মেঘেদের জায়গা করে দেয়। হালকা ছাইরঙ্গা হয়ে চারি পাশ যখন তুষারের মতো ঝরে পড়ে শুকনো পাতার ওপর, ঘাসের ওপর বাড়ির ছাদে দেখে মনে হয় টুকরো টুকরো ভালোবাসাময় অশ্রু গাল বেয়ে নেমে আসছে শব্দহীনভাবে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ছোঁয়ায় জীবনটা বড্ড বেশি সুন্দর কাক্সিক্ষত বোধহয়। মন যেন বলে ওঠে, ‘জীবন যেখানে যায়, প্রকৃতির রূপ মেখে থাকে সারা গায়। খুশি আর হাসি শুধুই জড়াজড়ি-ভালোবাসার অনুভব তো তাই।’
বর্ষার এ সময় নদী যেন তার যৌবনের দেখা পায়। নদীর কুল ভরে উঠে পানিতে। থই থই পানিতে ঝাঁকেঝাঁকে হাঁসেরা দলবেঁধে ভেসে বেড়ায়। নানা জাতের পাখিদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ পাওয়া যায়। নদী ভরে ওঠে মাছের জোয়ারে। ছোট-বড় নানা জাতের মাছ ধরা দেয় বর্ষার হাতে। এ সময় নদীর বুকভরে হেসে ওঠে শাপলা ও পদ্ম ফুলে। কচুরিপানার মধ্যে ফুটে থাকা ফুলের সৌন্দর্য প্রকৃতির প্রেমে মানুষকে একীভূত হতে শেখায়। এসবের মধ্যেই বৃষ্টি আসে ইলিশের গন্ধ নিয়ে। পদ্মা, মেঘনা ও রূপালি ইলিশ বর্ষাকে রাঙিয়ে দেয়। গরিব থেকে ধনী সবার ঘরে ঘরে ইলিশের গন্ধ। ইলিশ ভাজা, আলু ভর্তা, বেগুন ভর্তা শুকনো পোড়া মরিচের সাথে খিচুরি লোভনীয় স্বাদ নিয়ে বর্ষা আসে আয়োজনে উৎসবে। ঝমঝম বৃষ্টির শব্দের সাথে চলে আড্ডার আসর। লুডু, দাবা-ক্যারম খেলার আসর সাজে ছোট থেকে বড় সবার মাঝে। কেউ বা বৃষ্টির গানের শব্দে কাঁথা গায়ে ঘুমানোর আয়োজন করে। কারো হাতে উঠে আসে বই। বইয়ের পাতায় ডুবে থেকেও সোঁদা মাটির গন্ধ নিতে, কান পেতে মেঘের ডাক শুনতে ভীষণ ভালো লাগত। এমন বৃষ্টি কখনো কখনো অবিরাম ঝরে যায় দিনের হিসাব না রেখে।
বৃষ্টিরও জীবন আছে। জীবনের পরতে পরতে অনুভবের যে ছোঁয়া তাতে নকশা আঁকে বৃষ্টি। অনুসন্ধানী চোখ ও মনের আঙিনায় জীবনের গোপন বাণী পাঠ হয় এই বৃষ্টির রঙ এ। অন্ধকারের আলোর শিখায় মুক্তার মতো ঝরে পড়া বৃষ্টিরা জীবনের পাঠশালায় একটি নতুন ভোর নিয়ে হাজির হয়। নতুন স্বপ্নের সিঁড়ি তৈরির কাজ করে আগত দিনের মানচিত্র।
বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি এ কোন অপরূপ সৃষ্টি, এত মিষ্টি মিষ্টি মিষ্টি আমার হারিয়ে গেছে দৃষ্টি। গানের সুরের মতো বৃষ্টি পড়ে বনে, বৃষ্টি পড়ে নদীতে, বৃষ্টি...
