‘আমিতো সকল ঘৃণা, নির্মমতা ও জিঘাংসার উন্মুলের গন্ধ শুঁকেছি
প্রণয় ও প্রণতির বীভৎস রূপ আমি দেখেছি
অজস্্র নীরবতার মধ্য থেকে আমি
বিদ্বেষ ও বিষাদের ধোঁয়াও দেখেছি।
আমাকে আর কোন বৈরী বাতাসের ভয় দেখাও?
প্রতিটি শব্দের ব্যাখ্যাতীত ব্যাখ্যা ও রহস্য আমার জানা আছে
কে আমাকে আর পরাস্ত করতে চায়।’
[মুখোমুখি : কবিতা সমগ্র ২, পৃ. ২৪৭]
রহস্য উদঘাটনের কবি মোশাররফ হোসেন খান, আধুনিক বাংলা কবিতার একজন নিরন্তর রূপকার। তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ২৪ আগস্ট ১৯৫৭ সাল; যশোর জেলাতে। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছে সেখানেই সাপ্তাহিক মুজাহিদের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে। কবি মোশাররফ হোসেন খান ১৯৮৫ সালে ঢাকা আসেন এবং বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করে নিজের অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করেন। তাঁর লেখা কাব্যগ্রন্থের (প্রকাশিত) মধ্যে রয়েছেÑ হৃদয় দিয়ে আগুন; নেচে ওঠা সমুদ্র; আরাধ্য অরণ্যে; বিরল বাতাসের টানে; পাথরে পারদ জ্বলে; ক্রীতদাসের চোখ প্রভৃতি। গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছেÑ শ্রেষ্ঠ গল্প; ডুবসাঁতার; সময়ও সাম্পান। প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য’। শিশুসাহিত্যের মধ্যে রয়েছেÑ সাহসী মানুষের গল্প; রহস্যের চাদর; অবাক সেনাপতি; কিশোর কমান্ডার; কিশোর গল্প। হাজী শরীয়তুল্লাহ; সাইয়েদ নিসার আলী তিতুমীর; মুনশী মোহাম্মদ মেহেরউল্লাহর জীবনী নিয়েও তিনি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এ ছাড়া বিপ্লবের ঘোড়া; সাগর ভাঙ্গার দিন; কিশোর উপন্যাসসমগ্র নামে রয়েছে কিশোরদের জন্য লেখা একাধিক উপন্যাস। লেখক হিসেবে কবি মোশাররফ হোসেন খান অর্জন করেছেন বহু মূল্যবান পুরস্কার, পরিচিতি ও সম্মান।
কবি মোশাররফ হোসেন খানের জন্ম, শৈশব, বেড়ে ওঠা, যৌবন ও এগিয়ে যাওয়া সবই বাংলাদেশকে ঘিরে। স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ, বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতি, ভাষা আন্দোলন, মুক্তি সংগ্রাম, স্বাধীনতা উত্তর শোষণ বঞ্চনা ও বৈষম্য কবির কাব্যসাধনার প্রেক্ষাপটকে অনাকাক্সিক্ষত করে তুলেছে। তবুও তিনি বাধ্য হয়েছেন এসব প্রেক্ষাপটকে কাব্যসাধনার বিষয়বস্তু করতে।
কবি মোশাররফ হোসেন খান যে সমাজের হাটেবাটে কবিতা চর্চা করছেন সেই সমাজটাকে বলা হচ্ছে আধুনিক সমাজ। কিন্তু কবির কাব্যসাধনার বিষয়বস্তুতে সমাজের সর্বাঙ্গীণ আধুনিকতা পরিলক্ষিত হয় না। কবির কাব্যসাধনার সমাজটা শুধু বহিরাঙ্গনে আধুনিক; এ সমাজের অন্তর অঙ্গনটা এখনো আদিম, পৌরাণিক। খেয়াল করলে দেখা যাবে, বিজ্ঞানের পাতে মোড়ানো তথাকথিত আধুনিক আখ্যা পাওয়া সমাজের খোলস বদলেছে ঠিকই কিন্তু খোলসের ভেতরটার কোনো পরিবর্তন আজো ঘটেনি, ঘটাবার চেষ্টাও কেউ সেভাবে করেনি। ফলে আদিম সমাজের দীর্ঘশ^াসটা বেলুনের মতো ফেঁপে আরো প্রলম্বিত হয়েছে। দীর্ঘশ^াসের ফাঁপা এই বেলুনটি মোশাররফ হোসেন খানের কবিতায় ধরা পড়েছে নিষ্ঠুরভাবে। তিনি ‘ফিনিক্স পাখির মতো’ কবিতায় লিখেছেন-
শোনো কালের ক্রন্দন-
আর দেখো জীবন-পল্লবের পতন
মানুষ ও মানবতা ভেসে গেছে বঙ্গোপসাগরে
দুঃসহ দুঃস্বপ্নই এখন মানুষের সম্বল।
দীর্ঘতম দীর্ঘশ^াস- আরো প্রলম্বিত হয়
মৃত্যুর প্রহর গোনে জীবনের খুঁটি ধরে
আর হাঁপরের মতো ফুঁপিয়ে ওঠে মধ্যএশিয়া
মৃত্যুর মতোই দুর্ভাবনা মানুষের নিত্য সহচারী।
আধুনিক যুগ মানে অতিশয় অস্থিরতার যুগ। প্রতিনিয়ত বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারের সাথে তালমিলিয়ে নিজেকে মানিয়ে চলার যুগ। সেই সাথে বুদ্ধিবৃত্তির খেলায় মানুষকে নতুন সঙ্কটে ফেলে দিয়ে স্বার্থসিদ্ধ করার প্রতিযোগিতার যুগ। এ যুগের প্রত্যেকটি মানুষই অন্যের থেকে নিজেকে কৌশলী ভাবতে পছন্দ করে। ফলে কৌশলের চরিত্র অল্পসময় পরপর রূপ বদলিয়ে ওঠে আত্মবিধ্বংসী হয়ে। সমাজের এই যে কদর্য, সেই কদর্যকে কবিতায় তুলে এনে সমাজের স্বরূপ উন্মোচন করতে চেয়েছেন বাংলা ভাষার অনেক কবি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম, ফররুখ আহমদ, সুকান্ত ভট্টাচার্যসহ অনেকেই। মোশাররফ হোসেন খানের কবিতায়ও সে চেষ্টা লক্ষ করা গেছে। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ‘খবর’ কবিতায় লিখেছেন-
খবর আসে!
দিগদিগন্ত থেকে বিদ্যুৎবাহী খবর;
যুদ্ধ, বিদ্রোহ, বন্যা, দুর্ভিক্ষ, ঝড়-
-এখানে সাংবাদিকতার নৈশ্য নৈঃশব্দ।
রাত গভীর হয় যন্ত্রের ঝঙ্কৃত ছন্দে- প্রকাশের ব্যগ্রতায়;
তোমার জীবনে যখন নিদ্রাভিভূত মধ্যরাত্রি
চোখে স্বপ্ন আর ঘরে অন্ধকার।
ঠিক তাই। মোশাররফ হোসেন খানের চোখেও স্বপ্ন বিরাজমান কিন্তু সমাজে রয়েছে ঘোর অন্ধকার। সেজন্য, এত নিকশ অন্ধকারে লেখা কবিতার বিষয়বস্তুও ঠিক ততটাই সঙ্কটাপন্ন হতে পেরেছে। ভালোবাসা, সহমর্মিতা, প্রতিযোগিতা নয়, সহযোগিতা, উদারতা, সহানুভূতি অর্থে যে আধুনিক সমাজ সে সমাজের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় না মোশাররফ হোসেন খানের কবিতায়। না করারও নানাবিধ কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হলো, একবিংশ শতাব্দীর অসারবাদী অপ্রকৃতিস্থ চিন্তকরা যখন বারুদের উৎকট গন্ধকে সাদরে গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে কবি মোশাররফ হোসেন খান আকাশ ছেয়ে ফেলা বারুদবাষ্পকে উপেক্ষা করতে কাব্যাঙ্গনকে বেছে নিয়েছেন প্রতিবাদের স্লোগান হিসেবে। কিন্তু সেটিতো অত সহজ নয়। তবুও তিনি নিজেকে নিমজ্জিত রাখতে চেয়েছেন সমাজ বিনির্মাণে।
কবি ‘কালপদ্য’ কবিতায় লিখলেন- ‘ক্ষুব্ধ কেন পাথর কাল ক্ষুব্ধ কেন/রক্ত দেয়া আজও শেষ হয়নি যেন। ক্ষুব্ধ কেন জনমানব জবাব খুঁজি/রক্ত আজও শেষ হয়নি বুঝি। কবি মোশাররফ হোসেন খানের কবিতার বিষয়বস্তুতে যেমন উচ্চমার্গীয় চেতনা ঠায় করে নিয়েছে তেমনি কবিতার গঠনশৈলীতেও স্থান পেয়েছে শব্দালঙ্কার ও অর্থালঙ্কারের সৌন্দর্য। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত কবিতাগুলোর প্রতিটি পঙ্ক্তিতে লক্ষ্য করা গেছে অলঙ্কারের ঝঙ্কার। প্রতিটি কবিতায় রয়েছে অনুপ্রাস, যমক, শ্লেষ, উপমা, রূপক, উৎপ্রেক্ষার সরস উপস্থিতি। ফলে কাব্যসৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে আশানুরূপভাবে। এতে কবিতার গঠনশৈলী পাঠকের দৃষ্টি এড়ায় না। শব্দ চয়ন, অর্থের পরিপূর্ণ বিকাশে শব্দ নির্বাচনে কবি যে কৌশলী হয়ে উঠেছেন তা অনুমান করতে কষ্ট করতে হয় না। যেমন ‘কালসমাচার’ কবিতায় যমকের ব্যবহার লক্ষ করা গেছে এভাবে-
‘শোকের আগুনে পোড়ে সোনার স্বদেশ
মানুষ মানুষ নেই ইতর বিশেষ’
এ কবিতার পঙক্তিতে মানুষ শব্দটি দুবার ব্যবহার হয়েছে কিন্তু দুই মানুষের অর্থ দু’রকম হয়েছে। এটিই শব্দ প্রয়োগের কৌশল; অনুপ্রাস; কাব্যসৌন্দর্য। কবির ‘দানবীয় দাঁত’ কবিতায় উপমার ব্যবহার অতি চমৎকার।
‘তুর্কি ঘোড়ার মতো ছুটছে বাজার দর, বাড়ি ভাড়া
অগ্নিমূল্য সকল কিছু
খুনও সস্তা এখানে নুনের চেয়ে।’
এ কবিতায় কাব্যালঙ্কার অত্যন্ত স্পষ্ট। এখানে উপমার ব্যবহার হয়েছে সচেতনভাবেÑ যেমন তুর্কি ঘোড়ার মতো বাজার দর। আবার শ্লেষ ব্যবহার হয়েছে এভাবেÑ ‘খুনও সস্তা নুনের চেয়ে’। এ দুটি অলঙ্কার কবিতাটিকে চিত্রকল্পে রূপান্তরিত করেছে। আবার ‘গরম’ কবিতায় কবি ‘গরম’ শব্দটি একাধিকবার ব্যবহার করে অনুপ্রাস সৃষ্টি করলেন এভাবে-
গরম গরম কী যে গরম
গরম গোটা দেশ
এই গরমে তরু-ছায়ায়
তবু আছি বেশ।
এভাবেই কবি মোশাররফ হোসেন খান নির্মাণ করেছেন তার কবিতার জগৎ।
