বুঝতে পারছিলাম, বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে আর দেখা হবে না! কোভিড-১৯ আর লগডাউন সে সুযোগ দেবে না। শ্রদ্ধেয় বুলবুল চৌধুরী মরণব্যাধিতে আক্রান্ত। কোভিড-১৯ আর তাঁর ক্যান্সার। আমি কিংবা তিনি, যে কেউ আগে যেতে পারি।
লেখক হিসেবে বুলবুল ভাইয়ের কাছে যেমন প্রশ্রয় ছিল আমার, চিকিৎসক হিসেবেও। স্বাস্থ্যগত কিছু কিছু সমস্যায় ফোন করতেন কখনো কখনো। আবার কখনো-বা ধ্রুবদা (প্রিয় শিল্পী ধ্রুব এষ) ফোন করে বলতেন- ‘বুলবুল ভাইকে এখনই একটু ফোন দাও শাহনেওয়াজ। তাঁর শরীর ভালো না।’ উৎকণ্ঠায় জানতে চাইতাম- ‘কী হয়েছে দাদা?’ ধ্রুবদার বিরক্তি মেশানো জবাব- ‘এই লোকের কথা আর বইলো না! অসুখ পুষবেন, শত বললেও ডাক্তারের কাছে যাবেন না।’ বুলবুল ভাইকে ফোন করলে নিজের প্রতি সেই চেনাজানা অবহেলার সুর- ‘আর বইলেন না শাহনেওয়াজ, বয়স তো হইছে! কিছু সমস্যা তো থাকবেই। ক’দিন থেকে শরীরটা ভালো যাইতেছে না।’ তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে অসুস্থতা নিয়ে যতবার কথা বলেছি, ততবারই নিজের প্রতি উদাসীনতার রেশ লেগে থাকত তাঁর কণ্ঠে।
ক্যান্সার নির্ণয় হবার আগে ধ্রুবদা ফোনে জানালেন বুলবুল ভাইয়ের শারীরিক সমস্যাগুলো। শুনেই বুঝতে পেরেছি, এবার আর সাধারণ রোগের আওতায় নেই প্রিয় বুলবুল ভাই। এবার আর ফোনে চিকিৎসা নয়। ধ্রুবদাকে বললাম, ‘দাদা, এক-দু’দিনের মধ্যেই ডাক্তারের কাছে যেতে বলেন।’ ধ্রুবদার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা ঝরে পড়ল- ‘শাহনেওয়াজ, খারাপ কিছু মনে হইতেছে?’ ধ্রুবদা প্রাণের কাছের মানুষটার জন্য উৎকণ্ঠা হবে না! প্রাণের মানুষ না হলে বুলবুল ভাইকে নিয়ে ধ্রুবদার লেখা বইয়ের এমন নামকরণ হয়- ‘আমার একজন মানুষ’।
চার-পাঁচদিন পরে ধ্রুবদার সঙ্গে আবার কথা হলো। বুলবুল ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করলাম- ‘বুলবুল ভাই ডাক্তারের কাছে গেছিলেন?’ বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে ধ্রুবদা বললেন, ‘তাঁর কথা বাদ দাও। একটা মানুষ এতটা উদাসীন হইলে ক্যামনে চলে! ক’দিন ধরে আজ যাই কাল যাই-ই শুনতেছি।
বুলবুল ভাইকে ফোন করলাম আবার। রাজপুত্রের ম্লান কণ্ঠ- ‘নারে ভাই, সময় হইছে মনে হয়! আর কত?’
এবার মন খারাপের পালা আমারও। সাহসী বুলবুল ভাইয়ের কণ্ঠে অমোঘ শূন্যতা!
তারপর সেই আশাহত হবার খবর- বুলবুল ভাই ক্যান্সার আক্রান্ত! মুহূর্তে মনে বাজল- শক্তি হারাতে চলেছি আমরা। ছায়া হারাতে চলেছি। কারো স্নেহ হারাতে চলেছি।
যতবার বুলবুল ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে, ততবার বলেছেন- ‘শাহনেওয়াজ, বাসায় আইসেন ভাই।’ এই আহ্বানে খানিক পরিবর্তন ঘটেছে আমি ঢাকা ছাড়ার পরে- ‘ঢাকায় আসলে বাসায় আসবেন।’ কিন্তু কই যাওয়া হলো? দেখা হলো কই?
বুলবুল ভাইয়ের সম্পাদনায় রূপকথার সঙ্কলন বের হবে। ফোনে বললেন, ‘ফাইনাল রিডিং দিতে গিয়ে টের পাইলাম শাহনেওয়াজের লেখা নেওয়া হয় নাই। এইটা ক্যামনে সম্ভব হইলো? কালই আপনার পছন্দের লেখাটা পাঠিয়ে দেন ভাই।’
কাল আর আসে না। আমি এড়িয়ে যাবার কথা ভাবি। এত বড় মাপের লেখকের সামনে আমার দুর্বল লেখা পাঠানোর সাহস পাচ্ছিলাম না। তারপর আবার ফোন বুলবুল ভাইয়ের- ‘শাহনেওয়াজ, দেরি হইয়া যাচ্ছে ভাই। আজই লেখাটা ঝন্টুকে মেইল করেন।’
লিখতে লিখতে বুলবুল ভাইয়ের কণ্ঠ কানে বাজছে। মনে বৃষ্টি ঝরছে।
সেই আগের মতোই ভাবছি- বুলবুল ভাই আমাকে ‘তুমি’ সম্বোধন করেন না কেন? বোধ হয় কাছের মানুষ হতে পারিনি! সে না হতে পারলাম। তাঁর লেখার কাছ ঘেঁষা তো হয়েছি! ‘টুকা কাহিনী’ সবার মুখে মুখে। আমার মনে ‘চৈতার বউ গো’, ‘পাখিটি ছাড়িল কে’, ‘ঘাটের বাও’, ‘জলটুঙ্গি’, ‘এই ঘরে লক্ষ্মী থাকে’, ‘ভাওয়াল রাজার উপন্যাস’ কিংবা ‘ইতুবৌদির ঘর’। তাঁর লেখার মূল্যায়নের ক্ষমতা আমার নেই। তবে গ্রন্থালোচনার উদ্দেশ্যে ‘ভাওয়াল রাজার উপন্যাস’ পড়তে পড়তে বুলবুল চৌধুরীর লেখার ক্ষমতা টের পেয়েছি বইটির পরতে পরতে। পাঠক হিসেবে তাঁর নিজস্ব জগতের ধারণা পেয়েছি সামান্যই। কেননা, তাঁর যতগুলো লেখা পাঠের সুযোগ হয়েছে, গোগ্রাসে গিলেছি গল্পের স্বাদে। তাঁর গল্পের মোহময় টানে।
খুব মনে আছে, এক সময় ‘পূর্ণিমা’ ঈদসংখ্যা কিনতাম বুলবুল চৌধুরীর নতুন লেখার লোভে। তখন তাঁর সঙ্গে চেনাজানা ছিল না। প্রথম দেখে তো বটেই, যতবার দেখেছি অবাক মনে ভাবতাম- এত সৃজন ক্ষমতার মানুষ, এত সাদাসিধে হন কীভাবে!
আমার মতো অনেকের মনেই ছিলেন, আছেন, থাকবেন বুলবুল চৌধুরী- লেখা, বোহেমিয়ান জীবন, নিরহঙ্কার আর মিশুক মানুষ হিসেবে। অনেক অগ্রজের মতো তাঁকে দেখেও শিখেছি- নিরহঙ্কার থাকাটাও এক ধরনের অহঙ্কার। কিন্তু হিসাব শেষে ফলাফল একটাই- তিনি হারিয়েছেন অমোঘ শূন্যতায়...