রেহনুমা নিজে জানে, কতটা সুখে আছে সে। বাইরে থেকে দেখে কারো ভেতরটা জানা সম্ভব হয় না। যদি সে মুখ ফুটে কাউকে কিছু না বলে তাহলে মনের খবর জানবে কিভাবে? আজকাল ডিপ্রেশনটা ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে খাচ্ছে তাকে। যে কারণে হঠাৎ হঠাৎ প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে। তখন বুকের ভেতরটাতে বেশ ধরফড় করে, ঘাড়ের কাছে হালকা চাপ এবং ব্যথা অনুভব হয়। ডাক্তার বলেছে , এসবই শরীর ও স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও ভালো নয়। নিজে এতসব উপলব্ধি করলেও এ থেকে মুক্তির কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছে না রেহনুমা। এক ধরনের কষ্ট, দুঃখ-বেদনা আর অতৃপ্তি-অসন্তুষ্টির যন্ত্রণা একা একা বয়ে বেড়াচ্ছে সে। তার মতো চার পাশে এরকম কষ্ট যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো অনেক মেয়ে হয়তো ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদেরকে বাইরে থেকে দেখে বোঝার কিংবা উপলব্ধি করার কোনো অবকাশ নেই। তার মনের খবর সে নিজেই শুধু জানে, আশপাশের কেউ জানে না, বোঝে না। এমনকি তার খুব কাছে থাকা অতি আপনজন স্বামী কিংবা সন্তানও বুঝতে পারে না, জানতে পারে না।
চুলায় কড়াইয়ে গরম ডুবো তেলে সবজি- গোশতের পাকোড়া ভাজতে ভাজতে হঠাৎ নিজের কথা ভাবছিল রেহনুমা। আজকাল প্রায়ই এমন হচ্ছে তার। অনেক কাজের ব্যস্ততার মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে হঠাৎ আনমনা হয়ে পড়ছে। নিজের জীবনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব খুঁজতে গিয়ে এক ধরনের হতাশার গ্লানি পেয়ে বসছে তাকে।
বিয়ের আগে একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করত আরমান।
অফিসে ভালো পজিশন, মাস শেষে অনেক বেতন। তেমন চাকরিজীবী পাত্রের কাছে মেয়ের বিয়ে দিতে পেরে বেশ খুশি হয়েছিলেন রেহনুমার বাবা-মা। আরমান দেখতে শুনতেও বেশ সুন্দর। সুঠামদেহী, স্মার্ট। ভার্সিটি থেকে পাস করেই চাকরি পেয়ে গেছে। রেহনুমাও বাবা-মায়ের পছন্দে আপত্তি করতে পারেনি। তখনো তার লেখাপড়া শেষ হয়নি। অনার্স শেষ করে মাস্টার্স করছিল। তার নিজের ইচ্ছে ছিল, পড়াশোনা শেষ করে নিজের মেধা ও যোগ্যতায় একটা চাকরি-বাকরি জুটিয়ে নিয়ে তারপর বিয়ে-শাদি করার চিন্তা-ভাবনা করবে। নিজের যোগ্যতায় আগে প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারপর মেয়েদের সংসার জীবনে ঢোকা উচিতÑ ভার্সিটিতে পড়ার সময় ভাবতো রেহনুমা। স্বামীর সংসারে স্রেফ হাউজওয়াইফের পরিচয়ে থাকলে নিজের অবস্থানটা তেমন শক্ত, জোরালো হয় না। স্বামীর ইচ্ছাতেই জীবনের সবকিছু নির্ধারিত হয় তার। তার নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার, চাওয়ার তেমন দাম থাকে না। এসব নিয়ে কিছু বলতে গেলে স্বামীর বিরাগভাজন হতে হয়। ঝগড়া-বিবাদ, পারিবারিক কলহ-সঙ্ঘাত লেগে থাকে।
বাবা-মায়ের পছন্দের পাত্র আরমান আহমেদকে রেহনুমারও বেশ ভালো লেগে গিয়েছিল।
পড়াশোনা শেষ করে নিজের যোগ্যতায় একটা চাকরি-বাকরি জুটিয়ে বিয়ে করার চিন্তাভাবনা মাথা থেকে সরিয়ে নতুন জীবনে পা রেখেছিল সে। বিয়ের পর বউকে নিয়ে ঢাকা শহরের ভালো জায়গায় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে উঠেছিল আরমান। ছাত্রী থাকা অবস্থায় বিয়ে করলেও স্বামী হিসেবে রেহনুমার ভার্সিটির পড়া শেষ করার ব্যাপারে আপত্তি করেনি তখন সে ।
মাস্টার্স পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার আগেই রেহনুমার কোলজুড়ে এসেছিল ছেলে শাফিন।
যে আরমানকে দেখে তার ভদ্র স্মার্ট চলন-বলন দেখে কথাবার্তায় মুগ্ধ হয়ে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল রেহনুমা। বিয়ের পর এক ছাদের নিচে বসবাস করতে গিয়ে দিনে দিনে মানুষটিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিল সে। বাইরে থেকে দেখা মানুষটির আসল রূপ ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতেই কষ্টে, অপমানে, গ্লানিতে রেহনুমার বুকের ভেতরটা ক্রমেই ভারী হয়ে উঠেছিল। অল্প কিছুতে সন্তুষ্ট থাকা মেয়েটি সুন্দর ছিমছাম সাধারণ আটপৌরে জীবনযাপনে নিজের সুখ খুঁজে পেতে চাইলেও আরমানের উচ্চাকাক্সক্ষা, দ্রুত অনেক অর্থ-বিত্ত সম্পদ অর্জনের নেশা তাকে হাঁপিয়ে তুলেছিল।
চাকরি-বাকরি করে বড়লোক হওয়া যাবে না, চার পাশে বিজনেস করে, সরকারি চাকরি করে ঘুষ-দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে রাতারাতি গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ইত্যাদির মালিক হয়ে যাচ্ছে সবাইÑ যা সে করতে পারছে না প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করে। এ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বাসায় ফিরে হইচই করত, রেহনুমার সাথে দুর্ব্যবহার করত।
শেষমেশ একদিন হঠাৎ করেই চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিল আরমান ব্যবসা করে বড়লোক হওয়ার ধান্দায়।
এ ব্যাপারে রেহনুমার কোনো মতামত কিংবা পরামর্শ নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।
ব্যবসা করতে নামলেও শুরুতে আরমানের হাতে যথেষ্ট পুঁজি ছিল না। টাকা-পয়সার অভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকার অবস্থা হয়েছিল। তখন নিজেই উদ্যোগী হয়ে বিয়ের সব গয়না দোকানে বিক্রি করে বেশ বড় অঙ্কের টাকা স্বামীর হাতে তুলে দিয়েছিল রেহনুমা। মজার ব্যাপার হলো, তার দেয়া টাকাগুলো আরমানের ব্যবসায়িক উত্থানে সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছিল। সেই টাকায় ব্যবসা করে অল্প দিনেই দশগুণ লাভ করেছিল। এভাবেই আরমানের ব্যবসায়িক পুঁজির শক্ত একটা ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। সেই থেকে দিনে দিনে তার ব্যবসা-বাণিজ্যের অনেক প্রসার হয়েছে। খ্যাতি, সুনাম প্রভাব বেড়েছে। ধানমণ্ডিতে নিজের কেনা ফ্ল্যাটে উঠেছে, গাড়ি কিনেছে, ছেলেকে শহরের নামীদামি স্কুলে পড়িয়েছে, নিজের আলাদা অফিস খুলেছে।
এতসব কিছুর মূলে রেহনুমার তুলে দেয়া বিয়ের সব গয়না বিক্রির টাকাÑ এ কথা প্রথম প্রথম কিছুদিন বললেও আজকাল আর মুখে উচ্চারণ করে না মানুষটা। সব সময় একটা দাম্ভিক ভাব দেখিয়ে উচ্চারণ করে, ‘আই অ্যাম এ সেলফ মেড ম্যান। আমি বড়লোক হয়েছি নিজের চেষ্টায়, পরিশ্রমে, অধ্যবসায়ে। আমার আজকের এ পর্যায়ে আসার জন্য আমার একক কৃতিত্বটাই হলো বড়।’
মায়ের দেয়া, শাশুড়ির দেয়া গয়নাগুলো তখন দোকানে বিক্রি করতে গিয়ে অনেক কষ্ট অনুভব করেছিল রেহনুমা। তাদের ভালোবাসা, স্নেহ আদরের চিহ্ন সাথে আর কিছুই রইল না। গয়নাগুলোকে জড়িয়ে ছিল অনেক মধুর স্মৃতি। আরমানের ব্যবসার পুঁজির জন্য সবই ত্যাগ করেছিল, বিসর্জন দিয়েছিল সে। এ বিষয়ে কোনো সময়ে কিছু বলেনি। তার মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধ কিংবা স্বীকৃতির কোনো প্রকাশ ঘটেনি।
ব্যবসা-বাণিজ্য করে দিনে দিনে বিত্তবৈভব সম্পদ বাড়িয়েছে আরমান। কিন্তু অর্থবিত্তের প্রতি ঝোঁক কমেনি তার। রেহনুমা গোটা সংসার একাই সামলে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে। আরমান শুধু টাকা দিয়েই তার দায়িত্ব শেষ করেছে। কোথা থেকে কী হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছেÑ সে ব্যাপারে তেমন খোঁজখবর রাখেনি।
ছেলেটা শহরের সেরা ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ে ও লেভেল, এ লেভেল কমপ্লিট করে ভার্সিটি পর্যন্ত পৌঁছেছে। শাফিন এখন অস্ট্রেলিয়ায় স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করছে। ছেলেকে ঠিকভাবে গাইড করে এতদূর পর্যন্ত নিয়ে আসার পেছনেও মা হিসেবে রেহনুমা একাই কৃতিত্বের দাবিদার। আরমান কোনো সময়ে শাফিনকে সেভাবে সময় দিতে পারেনি ব্যবসায়িক ব্যস্ততার অজুহাতে। চাইলে সে বাবা হিসেবে সন্তানের পাশে থেকে অনেকটাই গাইড করতে পারত। কিন্তু রেহনুমার মতো দায়িত্বশীল বউ আছে যার, তার তো কোনো চিন্তাভাবনা থাকতে পারে নাÑ এমন ভাব নিয়ে কাটিয়ে দিয়েছে গত কুড়ি-একুশ বছর।
একমাত্র সন্তান শাফিনকে বড় করে তুলতে মা হিসেবে একাই ছোটোছুটি করতে হয়েছে রেহনুমাকে। সংসার সামলে ছেলেকে নিয়ে স্কুলে, কোচিংয়ে প্রাইভেট টিউটরের কাছে নিয়ে যাওয়ার কাজগুলো করেছে সে সুচারুভাবে। মাঝে মাঝে ক্লান্তিতে হাঁপিয়ে উঠলেও থেমে যায়নি। অবহেলায়, অনাদরে অযতেœ সন্তান যাতে নষ্ট হয়ে না যায়, যেন বিপথগামী না হয় সেদিকে নজর ছিল তার। শাফিনও তার মায়ের পরিশ্রম, নিষ্ঠা, একাগ্রতার মূল্য দিয়েছে। সব সময় ভালো রেজাল্ট করে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছে ।
ছেলের পড়াশোনার ব্যাপারে বাবা হিসেবে কোনো সময়ে তেমন সিরিয়াস মনোযোগ কিংবা খোঁজখবর না রাখলেও পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করার পর শাফিনের পিঠ চাপড়ে বাহবা দিয়ে বলেছে, ‘এই তো আমার বাপকা বেটা। বাপের মতো হয়েছিস। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হয়েছিস আমার মতো। স্কুল কলেজ ভার্সিটি সব খানেই আমি ছিলাম তুখোড় স্টুডেন্ট।’
ছেলের ভালো রেজাল্টের পেছনে মা হিসেবে রেহনুমা যে প্রাণপাত করেছে, সংসার সামলে তাকে নিয়ে স্কুলে গেছে, কোচিং ও প্রাইভেট টিউটরের কাছে অবিরাম ছোটোছুটি করেছে। বাসায় ফেরার পরও ছেলের লেখাপড়ার দিকে গভীর দৃষ্টি, মনোযোগ ছিল রেহনুমার।
শাফিন এখন ভালো রেজাল্ট করে বিদেশে স্কলারশিপ নিয়ে পড়তে গেছে। ছেলেকে নিয়ে মা হিসেবে রেহনুমার অনেক গর্ব হলেও তার প্রত্যাশা ছিল, দেশেই থাকবে ছেলে, এখানে থেকেই পড়াশোনা করবে। মায়ের কাছেই থাকবে শাফিন। ছেলেটি কাছে থাকলে তাকে দেখে মনের দুঃখ-বেদনা, অপ্রাপ্তি অতৃপ্তির কষ্টগুলো ভুলে যেতে পারবেÑ তেমন চিন্তা-ভাবনা মাথায় এলেও বাস্তবে তা হয়নি।
শাফিন এখন হাজার হাজার মাইল দূরে ভিনদেশে রয়েছে। মাঝে মধ্যে ফোনে, মেসেঞ্জারে ভিডিও কলে কথা হয় ছেলের সাথে। গতকালও কথা হয়েছে শাফিনের সাথে। ছেলে বড় হয়েছে। মায়ের মনের গভীরে চেপে থাকা দুঃখ-বেদনা, কষ্টগুলো কিছুটা সে বুঝতে পারে হয়তো। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সে কী করতে পারে? ছেলের সাথে ভিডিও কলে কথা বলতে গিয়ে প্রায়ই বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলেও তা আড়াল করে রেহনুমা।
তার কষ্টগুলো একান্তই নিজের। এই কষ্টগুলোর কথা কাকে বলে একটু হালকা বোধ করবে সে? মনের গভীরে চেপে থাকা একান্ত অনুভবের কথা বলার মতো কেউ নেই রেহনুমার পাশে। এভাবেই তার ছোট ছোট দীর্ঘশ্বাসগুলো ক্রমেই চার পাশটাকে ভারী করে তোলে। যা কেউ দেখে না, কেউ জানে না। হ
রেহনুমা নিজে জানে, কতটা সুখে আছে সে। বাইরে থেকে দেখে কারো ভেতরটা জানা সম্ভব হয় না। যদি সে মুখ ফুটে কাউকে কিছু না বলে তাহলে...
