প্রচণ্ড বৃষ্টি নামছে। সেই যে সকাল থেকে নেমেই যাচ্ছে আর থামছে না। গত বারো বছরে এত বৃষ্টি আর দেখিনি। চৌত্রিশ তলার জানালা দিয়ে এ রকম বৃষ্টির দৃশ্য দেখতে ভালোই লাগছে। প্রচণ্ড এ বৃষ্টিতে মতিঝিল অফিসপাড়ার সব উঁচু ভবন যেন পানির উপরে ভাসছে। মতিঝিলের ভবনগুলোতে বিলিয়ন বিলিয়ন টাকা ওড়ে। এখানে টাকার খেলা। জানালা দিয়ে শুধু বৃষ্টিই দেখছি না। অনেক নিম্ন আয়ের মানুষের ছোট ছোট ঘর দেখছি। ফকিরাপুলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৌড়ঝাঁপ দেখি। রিকশাওয়ালাদের দেখছি। সীমাহীন কষ্টে তাদের জীবনযাপন। বড় বড় রাঘববোয়ালের টাকা আর ডলার চাই। তাদের চাহিদা অফুরন্ত। এই দরিদ্রদের নিয়ে ভাবার সময় ওদের নেই। জুলিয়া রুমা ওরাও আমার পাশে এসে বৃষ্টির দৃশ্য দেখছে। ওরা সবসময় উৎফুল্ল অবস্থায় থাকে। ইট ড্রিংক অ্যান্ড বি মেরি। এমন একটা অবস্থায় থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই ওরা হাই ব্র্যান্ডের রেস্টুরেন্ট থেকে মাটন বার্গার পিৎজা স্যান্ডউইচ ক্যাপাচিনো অনলাইনে অর্ডার করে এখানে নিয়ে এলো। ছোট টি-টেবিল বসিয়ে আমরা এসব খেয়ে যাচ্ছি এবং বৃষ্টি দেখেই যাচ্ছি। এ এক অন্যরকম এনজয়।
জুলিয়া ক্যাপাচিনো কফিটা বেশ পছন্দ করলেও আমি পছন্দ করি না। মাত্র সিক্সটি থ্রি ডিগ্রির হটের এসব কফি খেতে আমার কাছে ভালো লাগে না। এসব দেখতেই যত ভালো। এক্সপ্রেসও কফিটা আমার কাছে ভালো লাগে। যদিও এক্সপ্রেসও কফি সাংঘাতিক তিতা। যাই হোক। কিন্তু সেটি আবার কাকে দিয়ে পার্সেল করাব। তা ছাড়া এখানের এই এন্টারটেইনমেন্টটা রুমার পক্ষ থেকে। আমি জানি, রুমা কোল্ড কফি পছন্দ করে। কিন্তু সেও এখন ক্যাপাচিনো খেয়ে নিচ্ছে। এখনকার সোস্যাল আড্ডাটার ডিসিপ্লিন সে রক্ষা করছে। দরিদ্র মানুষের কথা যা ভাবলাম, তা ভেতরেই গেঁথে আছে। ওদেরকে বুঝতে দিইনি। এমন অভিজাত আড্ডায় বসে গরিবের কথা বলে লাভ নেই। পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে। দেশীয় সফ্ট ড্রিংকের অভাব নেই। রুমা ফ্রান্সের ইভিয়ান ড্রিংকিং ওয়াটার পার্সেল করেছে তিন লিটার।
রুমা টাকা খরচ করতে বেশ পছন্দ করে। স্যালারির বাইরে ওর অন্য ইনকাম আছে। প্রতি মাসে প্রায় দশ লাখ করে। কমিশন আর কমিশন। আমার এমন সুযোগ নেই। তা ছাড়া আমি ওসব পছন্দ করি না। আমার হাজবেন্ড শাহরিয়ার অমায়িক চরিত্রের এক পুরুষ। কম টাকা ইনকাম করলেও আমাকে ও মাঝে মাঝে বার্গার কিং-এ কেএফসিতে; বিভিন্ন পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়ে খাওয়ায়। হঠাৎ হঠাৎ কল করে বলে নীনা তুমি এখন বের হও। আমরা আজ গুলশান অমুক হোটেলে খেতে যাব। পরকীয়া-টরকিয়া ও করে না। গার্ল ফ্রেন্ড বলতে ওর আমিই। এ দিক দিয়ে আমি অনেক শান্তিতে। ওকে নিয়ে আমার বাড়তি টেনশন করতে হয় না। ওর অফিসের উমেন অফিসাররা ওকে মৌলবাদী বলে। ধর্মান্ধ বলে। গেঁয়ো বলে। বলে শাহরিয়ার একজন কট্টর মৌলবাদী। হ্যাঁ ও’তো মৌলবাদীই। পরনারীকে নিয়ে ফষ্টিনষ্টি না করে নিজের স্ত্রীকে নিয়ে অভিজাত রেস্টুরেন্টে এখানে সেখানে খেতে যায় এটা ওদের সহ্য হয় না। এ দিকে আমার অফিসেও আমাকে আফগান উমেন বলা হয়। কারণ আমি এখানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে ব্যাংকক সিঙ্গাপুর হংকং যাই না। মতিঝিল করপোরেট এলাকায় কয়েক শ’ সুন্দরী উমেন অফিসার আছে। যাদের কেউ কেউ অফিসের বড় কর্তাদের সাথে নিয়মিত কক্সবাজারে যায়। মাঝে মাঝে বিদেশে। ওদের প্রমোশন। আরো নানান সুযোগ-সুবিধার অভাব নেই। জুলিয়া রুমা ওদেরকে অফিসের বড় কর্মকর্তারা সিরিয়ান উমেন বলে। ওরা কিছু কমিশন-টমিশন খেলেও ওরা ওদের বডিকে সেফ রাখে। ওদেরকে সাথে নিয়ে অফিসের বড় কর্তারা ঘুরতে পারে না। এ জন্য জুলিয়া আর রুমার সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হয়েছে। গত বছরও এই চৌত্রিশ তলার জানালা দিয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। এটা ফলো করে সাকিব সাহেব আমাকে তার কক্ষে ডেকে নিয়ে দুবাইয়ের বুর্জ খলিফা টাওয়ারে মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস টাওয়ারে ইউএসএ’র ট্রাম্প টাওয়ারে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। সাকিব সাহেব বলেছিল, শুধু এতটুকু টাওয়ারে বসে বৃষ্টি দেখা নয়, বিদেশে ওই সব বড় বড় টাওয়ারে গিয়ে বৃষ্টিসহ অনেক কিছু দেখতে পারবে। আমি তার কু-প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছিলাম। সাকিব সাহেব বছরে বহুবার বিদেশে সুন্দরী পরনারী নিয়ে যায়। তাদের সাথে হোটেলে একসাথে থাকে। চেয়ারম্যান সামি সাহেব তো কলগার্লকে এপয়েন্টমেন্ট লেটার দেয়। সেসব এপয়েন্টমেন্ট লেটার অবশ্যই লেবার কোর্টে দেখাবার যোগ্য নয়। ইন্টারনালভাবে কলগার্লরা ওসব এপয়েন্টমেন্ট লেটার সংরক্ষণ করে। কলগার্লরা যে ফ্লাটে থাকে সেসব ফ্ল্যাটের ভাড়া পরিশোধ করা। আরো অন্যান্য খরচও সামি সাহেবকে পরিশোধ করতে হয়।
শাহরিয়ারকে আমি ছোটবেলা থেকে চিনি। ওর বাবা আর আমার বাবা দু’জন বন্ধু ছিলেন। আমাদের শৈশব কেটেছে খুলনা শহরে। আমার বাবা এবং শাহরিয়ারের বাবা দু’জনই তখন সরকারি চাকরি করতেন। শাহরিয়ার ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি করে। ক্লাসের পড়ায় শাহরিয়ার ছিল অমনোযোগী। লেখালেখি সাহিত্য চর্চায় বেশি সময় ব্যয় করত। এ জন্য শাহরিয়ার করপোরেট জগতে তেমন উন্নতি লাভ করতে পারেনি। বারবার শাহরিয়ার চাকরিচ্যুত হয়। করপোরেট জগতে অত্যন্ত ক্লেভার হতে হয়। চতুর হতে হয়। চাটুকার হতে হয়। সেটি শাহরিয়ার হতেই পারেনি। ওর অনেক বন্ধুরা বেশ ক্লেভার। ওরা করপোরেট কালচারেও বেশ মানিয়ে নিয়েছে। মিডিয়াতেও বিভিন্ন পদে বেশ ভালো পারফরম্যান্স নিয়ে আছে। শাহরিয়ার ওর মিডিয়ার বন্ধুদের বেশ কদর করে। তাদের বিভিন্ন গল্প বাসায় নিয়মিত বলতে থাকে। অতীতে শাহরিয়ারের মিডিয়ার এসব বন্ধু অনেক কষ্টে দিন পার করত। ভালো খেতে পারত না। ভালো প্যান্ট-শার্টও পরতে পারত না। এখন তাদের অনেক বিলাসিতা হয়েছে। যখন তখন ইউরোপ আমেরিকা অস্ট্রেলিয়া ঘুরতে যায়। অপেরা হাউজে বসে কফি খেয়ে সেই ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করে। শাহরিয়ার ওর এই সাংবাদিক বন্ধুদের অনেক প্রশংসা করে। বলে ওরা অতীতে অনেক কষ্ট করেছে। শাহরিয়ার তাদের অনেক সম্মান করে। বিশ্বাস করে। মনের আবেগ ঢেলে তাদের সাথে কথা বলে। মাঝে মাঝে গভীর রাত পর্যন্ত তাদের সাথে আড্ডা দেয়। প্রচণ্ড দাবি খাটিয়ে শাহরিয়ার ওর বন্ধুদের সাথে সমাজ রাষ্ট্রের অনেক অনিয়মের কথা বলে। এসব স্বভাবের কারণে শাহরিয়ার অনেক কোম্পানিতে চাকরি করেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। যেখানেই যায় সেখানেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে থাকে। টানা দশ বছর যে কোম্পানিতে চাকরি করে নিজেকে তিল তিল করে প্রায় শেষ করে দিয়েছে। সেখানে থেকে হঠাৎ ওকে বের করে দিলো। উপস্থিত বুদ্ধি কী করবে ভেবে ওর এক বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে তার কোম্পানিতেই চাকরি নিলো। ওর বন্ধু যে একজন ভয়ানক প্রতারক সেটি বুঝতে পারে যখন ওকে তিন মাস খাটিয়ে বেতন দেয় না। উল্টা ওর কাছে বিনিয়োগকারী চায়। পাসপোর্ট চায় যেটা দেখিয়ে ব্যাংক থেকে সুবিধা নিতে চায়। এটা চায় সেটি চায়। শাহরিয়ার বাসায় এসে নিশ্চুপ থাকে। সহজে মুখ থেকে কথা বের করে না। এতো পরিশ্রম করে ডিউটি করল। নিজের টাকা খরচ করে গাড়ি ভাড়া দিয়ে অফিস করল। প্রতিদিন লাঞ্চের জন্য, চা কফির জন্যও অনেক টাকা ওর খরচ হয়েছে। বড় বড় মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে মার্কেটিং করেছে মনোযোগী হয়ে। এর পরও তিনটি মাসের এত পরিশ্রমের জন্য শাহরিয়ার একটি টাকাও পেল না। উল্টো বেতন চাইতে গিয়ে অপমানসূচক নানা কথা শুনতে হয়েছে। এ রকম পরিস্থিতিতে শাহরিয়ার ওর কয়েকজন সাংবাদিক বন্ধুকে বলল- বন্ধু তোমরা একটু কষ্ট করে কথা বলে আমার পাওনা বেতনটা তুলে দেও। শাহরিয়ারের কোনো সাংবাদিক বন্ধুই এতে রাজি হয়নি। সবাই বলছে তোমার এই চাকরির এপয়েন্টমেন্ট লেটার আছে? শাহরিয়ারের বন্ধুদের কথাবার্তা যেন সেই পুলিশদের ন্যায় যারা মজলুম নাগরিকদের হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্ট দেখায়! অথচ ওদের মিডিয়ায় নিয়মিতভাবে জুলুমকারী সমাজ রাষ্ট্রের চিহ্নিত অপরাধীদের দালালি করে। সমাজ রাষ্ট্রের সম্মানিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটায়। তখন কিন্তু ওরা সাংবাদিকতার বিধি মানে না। কী আশ্চর্য আমাদের মিডিয়ার কর্মকাণ্ড। শাহরিয়ারের আর্থিক অবস্থা ভালো থাকলে ওর বন্ধুরা ওকে হাইকোর্ট সুপ্রিম কোর্ট দেখাত না। ওর বন্ধুরা আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। অনেক সম্পদশালী লোকদের তারা মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক উপকার করে। যা প্রেস ল’য়ের সম্পূর্ণ বিরোধী।
শাহরিয়ার এত করে বলল- এ দেশে খুব কম প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে চাকরিজীবীদের সাথে সাথেই এপয়েন্টমেন্ট লেটার দেয়া হয়। খুব অল্প প্রতিষ্ঠান জয়েনের সাথে সাথে এপয়েন্টমেন্ট লেটার দেয়। অনেকে তো দেয়-ই না।
শাহরিয়ার বন্ধুদের বলল দেখো আমি যে তিন মাস ওই কোম্পানিতে ডিউটি করেছি, সেটির অনেক ডকুমেন্ট আছে। বিভিন্ন অফিসিয়াল কাগজপত্র আছে। অফিস ভবনে অনেক সিসি ক্যামেরা আছে। এসব কথায় শাহরিয়ারের বন্ধুরা পাত্তাই দিলো না। বলল ওসব কোনো এভিডেন্স না।
শাহরিয়ার এসব শুনে নিশ্চুপ দিন কাটায় । আগের মতো আমার সাথে গল্প করে না। এখন শাহরিয়ার আর বলে না নীনা চলো বাইরে খেতে যাই। বন্ধুদের সাথে আড্ডাটাও কমিয়ে দিয়েছে।
রাত তিনটা বাজে হঠাৎ প্রচণ্ড বৃষ্টি নামছে। শাহরিয়ার বৃষ্টি খুব পছন্দ করে। শাহরিয়ার বলল নীনা বেলকনিতে গিয়ে বসি। গভীর রাতের বৃষ্টি দেখি। এটা পিওর। এটা অর্গানিক। এই বৃষ্টি পুঁজিবাদ কালচার মেনে চলে না।
পৃথিবীতে আজ পুঁজিবাদের লেলিহান আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। পুঁজিবাদের প্রভাবে ভাই ভাইকেও আভিজাত্য ছাড়া পরিচয় দেয় না। বৃষ্টির সাথে সাথে শাহরিয়ারের এসব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। অবশেষে ওর কাছ থেকে পারমিশন নিয়ে কিচেন রুমে গিয়ে ওর জন্য গরম গরম রুটি আর গরুর গোশত ভুনা করে আনলাম। মজা করে দু’জনে খেয়ে ফজরের নামাজ আদায় করে পার্কে হাঁটতে বের হলাম। পার্কের বৃষ্টিভেজা গাছগুলোতে পাখিদের হৈ-হুল্লোড় দেখে শাহরিয়ার অনেক কষ্ট ভুলে গেছে। শাহরিয়ার আবার হয়ে উঠেছে চনমনে।
