রাঙামাটি যে আমি এবারই প্রথম এসেছি এমন নয়, এর আগেও আমি এখানে বেশ কয়েকবার এসেছি। তবে এবার ঝুলন্ত সেতুটাকে যত সুন্দর লাগছে, এর আগে কখনো এমন মনে হয়নি। কাপ্তাই হ্রদের নীলাভ জলরাশি আর দূরের উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি সৌন্দর্যে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এসব জায়গায় এলে আমার মন-মনন প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে চায়।
এবার এসেছি লিলির জন্য। চট্টগ্রামে বড় হয়েছে অথচ ও নাকি এখনো রাঙামাটি আসেনি। ওর বায়না মেটাতেই আজ আসা। লিলি আমার ফুফাতো বোন। ওরা দুই ভাই, দুই বোন। ভাই দুজনই বড়, দুজনই ঢাকায় চাকরি করে। বাড়িতে লিলি, মিলি আর ফুফা-ফুফু। আগ্রাবাদে ওদের বাসা। মিলি এবার এসএসসি দেবে। আমার ফুফা রসায়নের অধ্যাপক। অসম্ভব ভালো মানুষ তিনি।
ছেলেবেলাতেই নাকি আমাদের নিয়ে ফুফু আর মায়ের একটা প্ল্যান ছিল। আমাদের বলতে আমাকে আর লিলিকে নিয়ে। ফুফু মাকে বলত, ভাবী এ দু’টি বড় হলে আমরা এদের জুটি বেঁধে দেবো। দারুণ মানাবে, কী বলেন! মায়ের গলা কানে না এলেও আমি হাসির শব্দ শুনে বিষয়টি আঁচ করতে পারতাম। আড়ালে-আবডালে কথাগুলো শুনে আমি লজ্জায় কুঁকড়ে যেতাম। পুলকিত যে হতাম না তাও নয়।
এখন সে কথাগুলো আদৌ ফুফুর মনে আছে কি-না জানি না, তবে লিলির মনে আছে বলেই আমার বিশ্বাস। যদিও সে সজ্ঞানে কখনো আমাকে ‘ভালোবাসি’ টাইপের রোমাঞ্চকর কোনো কথাবার্তা বলেনি। এমনকি হৃদয়ঘটিত কোনো ব্যাপারস্যাপারও আমাদের মধ্যে নেই। সালেম-আসেম ভাই ঢাকা চলে যাওয়ার পর ওদের দু’বোনের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আমাকেই পূরণ করতে হয়। শহরের কেনাকাটা থেকে শুরু করে স্কুল-ভার্সিটির ফাংশন পর্যন্ত ওদের সাথে আমাকে ছায়ার মতো লেগে থাকতে হয়। ফুফুর এই ফরমায়েশ খাটতে আমার কোনো ক্লান্তি-বিরক্তি নেই।
ক্যাম্পাসে লিলি আর আমি বেশির ভাগ সময় এক সাথেই কাটাতাম। বলা বাহুল্য, এটা ছিল ফুফুরই নির্দেশ। বন্ধুদের আড্ডায় আমি কবিতা লিখে নিয়ে যেতাম আর লিলি নানান ভঙ্গিমায় তা আবৃত্তি করে শোনাত। ভার্সিটির বার্ষিকী কিংবা ডিপার্টমেন্টের ম্যাগাজিনে বরাবরই আমার একটা কবিতা থাকত। কিন্তু বড় কোনো কাগজে আমার লেখা কবিতা ছাপা হবে তা ছিল আমার চিন্তার বাইরে। লিলির মুখেই আমি তা প্রথম জানতে পারি। একদিন ও দৈনিক পূর্বকোণ নিয়ে এসে আমাকে চমকে দিলো। আমার সদ্য লেখা একটা কবিতা। কিন্তু কই! আমি তো লেখা পাঠাইনি। লিলিকে জিজ্ঞেস করলে সে ভালো মতো জবাব না দিয়েই সারা বাড়িময় ছোটখাটো একটা হুলস্থূল কাণ্ড বাঁধিয়ে দিলো। এর একটু পরই সে তৈরি হয়ে এসে আমার হাত ধরে বলে, চলো, ক্যাম্পাসে আজ তোমার প্রথম প্রকাশিত কবিতা নিয়ে জম্পেশ আড্ডা দেবো। লিলির এই ব্যাপারটা আমাকে খুবই অবাক করে ও নিমিষেই বাইরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে। আমি হলফ করে বলতে পারি, লিলিই আমার কবিতাটা পত্রিকার অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছিল। কেননা, আমাদের বাড়িতে এলে ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও আমার গোপন কাগজপত্র, ডায়েরি ঘাঁটাঘাঁটি করে নির্দ্বিধায়।
আড্ডায় আমি সপ্রতিভ হতে পারি না। আনন্দের ঘোর তখনো কাটেনি। বারবার কাগজের দিকে তাকাই। দেশের খ্যাতনামা কবি সাহিত্যিকদের ভিড়ে আমার নামটা মুখস্ত করে ফেলি। যখন বন্ধুদের সামনে ঘোষণা করলাম, লিলিকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমার হয়ে এমন একটা কাজ করে দেয়ার জন্য। নইলে এই সাহস অর্জন করতেই হয়তো আমার কয়েক বছর লেগে যেত। তখন হঠাৎ আজমেরি নামের আমার এক ক্লাসমেট কী একটা অজুহাত দিয়ে আসর ত্যাগ করে চলে গেল। ও একটু এমনই! সবসময় দলছুট থাকতে পছন্দ করে। সেদিন বিকেলে লিলিদের বাড়িতে গেলে লিলি আমাকে সেধে দু’কাপ চা খাওয়াল। ও জানে এই জিনিসটাতে আমার কোনো অরুচি নেই। আর আমিও জানি চা দেয়ার পরই লিলি নতুন কোনো বায়না উপস্থাপন করবে। যথারীতি লিলি বলতে থাকে, ‘শাওকি ভাইয়া, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।’ ও এমনভাবে কথাগুলো বলে যেন পরের বাক্যটাতেই বলবে আমি তোমাকে প্রচণ্ড ভালোবাসি...। আমি ওর লজ্জা লজ্জা অনুভূতি উপভোগ করতে থাকি। তা কী এমন গোপন কথা? হাসিমুখে বলি, ‘খুব গোপনীয় কিছু বুঝি!’
‘না, মানে... একটু গোপন তো বটেই। কিন্তু কিভাবে যে কথাটা বলি! সাহসই পাচ্ছি না।’ আমতা আমতা করতে থাকে লিলি।
আমি ভাবি যেহেতু ব্যাপারটা আমি আন্দাজ করতে পারছি, তাই ওটা গোপনই থাকুক না! শুনে ফেললে তো আর মজাই থাকল না। ওকে নিবৃত্ত করার জন্য বলি, ‘বেশি গোপন হলে থাকুক না, গোপন কথা এত দ্রুত প্রকাশ না হওয়াই ভালো। আগে সাহস সঞ্চয় করে নাও, তারপর না হয় বলিও। আমি তো আর হাওয়ায় ভেসে যাচ্ছি না।’ বলে আমি দুষ্টুমির হাসি হেসে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ওর দিকে তাকাই।
লিলি কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলে, ‘দাঁড়াও তোমার জন্য আরেক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে আসি।’
ভালোবাসার মাত্রা কোন লেবেলে আছে ঠাহর করতে হিমশিম খাই আমি। হেসে বলি, ‘হ্যাঁ, এটা করতে পারো। তবে চিনি কম।’ পরিবেশটা হালকা করার জন্যই শেষের বাক্যটা বলা। যখন কেউ থাকে না তখন আমি সাধারণত চিনি ডুবিয়ে চা খেতেই পছন্দ করি।
রাঙামাটির ঝুলন্ত ব্রিজের পাদদেশে ছেলেটির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় লিলি। ওর নাম নাদিম। একটা বিদেশী কোম্পানির ডেপুটি ম্যানেজার। বেশ মোটা অঙ্কের বেতন পায়। কোম্পানি থেকে বাড়ি-গাড়িও নাকি দিয়েছে। লিলিকে ওর সাথে যেচে কথা বলতে দেখে বুঝে যাই এর আগেও ওদের দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। এখানে আসার প্ল্যানও নিশ্চয় আগেই করেছিল। লিলিকে ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করি, ‘ওর কথা আগে আমাকে জানাসনি কেন?’
‘বাহ, রে, আমি তো বলতেই চেয়েছিলাম। কিন্তু তুমিই তো শুনতে চাওনি। তা ছাড়া আমি ভেবেছিলাম তুমি হয়তো কোনোভাবে আমাদের ব্যাপারটা জেনে গেছ। কবিদের ইনটুইশন ক্ষমতা নাকি প্রবল হয়ে থাকে,’ বলে রহস্যজনকভাবে কপালের চুলগুলো সরায় লিলি।
সন্দেহ নেই লিলিটা অনেক চালাক হয়েছে। গুছিয়ে বলতেও শিখেছে। ঘূণাক্ষরেও আমি ধরতে পারিনি এমন একটা ঘটনা ঘটিয়ে সে বসে আছে। আমি আর কিছুই ভাবতে পারি না। আমার পরিচিত পৃথিবীটা এলোমেলো হয়ে যায় মুহূর্তেই। হ্রদের স্বচ্ছ নীল পানির দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকি বোকার মতো।
আমি প্রশ্রয় এবং সমর্থনের ভাব ফুটিয়ে বলি, কোনো চিন্তা করো না, আমি সব ঠিক করে দেবো। একটু থেমে হাসি হাসি মুখে বলি, ‘লিলি, সাহস নিয়ে কথাটা আমাকে আগে বললেই পারতি! এত লুকোচুরির কী কোনো প্রয়োজন ছিল।’ লিলি লজ্জা পায়। আমি পাই ততধিক, কিন্তু ওকে বুঝতে দেই না। আমি অনাহত আগন্তুক না সেজে কেটে পড়ার তাগাদা অনুভব করি। লিলির লজ্জার রেশ কাটতে না কাটতেই বললাম, ‘তোরা তাহলে কথা বলো, আমি একটু ওদিক থেকে ঘুরে আসি।’
‘ওদিকে আবার কোথায় যাবে?’ কপট গার্জিয়ানি ফলাতে চায় লিলি। জানি সে অখুশি হয়নি।
‘চায়ের তেষ্টা পেয়েছে। দেখি কোথাও মেলে কি-না।’ বলে নাদিম সাহেবের সাথে হাত মিলিয়ে হাঁটতে থাকি তবলছড়ির দিকে। মনের অজান্তেই গুনগুন করতে থাকি, ‘চান্দের বাত্তির কসম দিয়া ভালোবাসিলি, সূর্যের আলোয় ঝলমলাইয়া আমায় পোড়াইলি...!’
বাড়ি ফিরে আকাশ-পাতাল অনেক কিছু ভাবতে থাকি। লিলি তাহলে এই বলতে চেয়েছিল। অযথাই কেন যেন আজমেরির কথা মনে পড়ে যায়। হঠাৎ ওর সেই চিরকুটটার কথাও মনে পড়ে। তন্ন তন্ন করে খুঁজে বের করে চারভাঁজের চিঠিটা পড়তে গিয়ে আমার চক্ষু চড়কগাছ। ‘লিলির কাছ থেকে তোমার একটা কবিতা নিয়ে আমার মামাকে পাঠিয়েছি। আমার মামা দৈনিক পূর্বকোণের সাহিত্য সম্পাদক। সাহিত্য পাতায় চোখ রেখো।’ আমার মাথায় তখন অনেক চিন্তা কিলবিলিয়ে ওঠে। ওটা তাহলে ছিল আজমেরির কাজ। সেদিন ও তাহলে এ জন্যই আসর ত্যাগ করে উঠে গিয়েছিল। নিজেকে ভীষণ অপরাধী মনে হয়। ইশ আমি আজমেরিকে কেন যে ভুল বুঝেছিলাম! প্রকৃত ভালোবাসা এড়িয়ে এক মিথ্যা আশায় বুঁদ হয়েছিলাম। মাথার চুল টেনে ছিড়তে ইচ্ছা করে আমার।
তখন থেকেই আমি আজমেরির সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করি। কিন্তু যা শুনি তাতে আমার আক্কেলগুড়–ম অবস্থা। আজমেরি চট্টগ্রাম থেকে অনার্স করেই ঢাকা চলে গেছে। আমাদের সাথে আর এমএসসিতে ভর্তি হয়নি। এর বেশি কেউই বলতে পারল না।
দুই বছর পরের কথা। আমি পাকাপাকিভাবে ঢাকায় চলে এসেছি। এর মাঝে ঘটা করে লিলির বিয়েটা হয়ে গেছে। শুনেছি বছরের শুরুতে নাদিম সাহেব মিলিকে নিয়ে দুবাই উড়াল দিয়েছেন। এবার বইমেলায় আমার একটি কাব্যগ্রন্থ বেরিয়েছে। ফাল্গুনের প্রথমার্ধের এক বিকেলে প্রকাশনীর স্টলে বসে আছি। হাতে আল মাহমুদের ‘দ্বিতীয় ভাঙন’। হঠাৎ অপরিচিত এক নারী কণ্ঠে আমার নাম শুনে সচকিত হলাম।
‘এক্সকিউজ মি ভাইয়া, কবি আহমদ শাওকি কি আজ স্টলে আসবেন?’
‘জি, ওই তো উনি’। স্টলের ছেলেটি আমার দিকে ইঙ্গিত করে বলে। বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই অনুমান করি মেয়েটি আমার দিকে এগিয়ে আসছে। আমি আচানক বই থেকে মুখ তুলেই চমকে উঠি, আরে এ যে আজমেরি! কতদিন না খুঁজেছি ওকে।
‘কেমন আছ কবি?’ বলে স্মিত হেসে আমার দিকে তাকায় আজমেরি।
‘ভালো’। আমার বিস্ময়ের ঘোর তখনো কাটেনি।
‘একটা অটোগ্রাফ দাও’। আজমেরি হাতের বইটি আমার দিকে বাড়িয়ে দেয়। আমার এই মেলায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘বিদায়ের সুর বেদনার’। আমি ওর দিকে একবার তাকিয়ে লিখে দেই, ‘শুভেচ্ছা, শুভ কামনায় হৃদয় থেকে হৃদয়ে’। আজমেরি চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। আমি বলি, ‘দাঁড়াও আজমেরি।’
তারপর আমি আর ও হাঁটতে থাকি।
‘অনেকদিন পর দেখা তাই না?’
‘হ্যাঁ’। ছোট্ট জবাব ওর।
‘তুমি ঢাকাতে কি করছ এখন?’
‘একটা ব্যাংকে ঢুকেছি’।
অনেক কথাবার্তা হয় আমাদের। একসময় আবার আমরা বাংলা একাডেমির দিকে হাঁটা দেই।
‘গত বছর লিলির বিয়ে হয়ে গেছে আজমেরি, জানো।’
‘হুম, আমাকে বলেছিল। ব্যস্ততার কারণে যাওয়া হয়নি।’
‘বলো কি! তুমি জানতে? তোমাদের যোগাযোগ হয়!’ আকাশ থেকে পড়ি আমি।
‘হ্যাঁ, আমি আরো অনেক কিছুই জানি’।
‘তার মানে আমি যে তোমাকে হন্যে হয়ে খুঁজেছি সেটাও জানো!’
‘হুম।’
‘তাহলে সাড়া দাওনি কেন?’
আমি চমকে আজমেরির দিকে তাকাই। ওর চোখে পেয়ে যাই আমার দীর্ঘদিনের জমানো অনেক প্রশ্নের উত্তর।