ছন্দ ছাড়া কবিতা রচনা আদৌ সম্ভব কিনা সে প্রশ্নের উত্তর কবিরাই ভালো জানেন ও বুঝেন। কবিতা একসময় পদ্য নামেই পরিচিত ছিল। এখন অবশ্য পদ্য না বলে কবিতা বলার প্রচলন চালু হয়েছে। পদ্য বা কবিতার আলাদা নামকরণের ব্যাখাও দিয়েছেন পণ্ডিতজনেরা। মূলত পদ্য হলো গদ্যের বিপরীত। যে রচনায় নিয়মিত ছন্দ আছে, প্রতি লাইনে মাত্রার নিয়মিত বিভাগ এবং মাত্রার সেই ভাগের পুনরাবৃত্তি থাকে সে ধরনের রচনাকেই আমরা পদ্য হিসেবে জানি। ছন্দে বাঁধা যে কোনো লেখাই পদ্য। পদ্য হলো অগভীর, হালকা যা চিরন্তন নয়। অন্যদিকে কবিতা হলো গভীর, রহস্যময় এবং চিরন্তন। ভাষা, ছন্দ, অলংকার সব কিছু মিলেই কবিতা হয়ে ওঠে। প্রকৃত কবিতা একবার পাঠ করার পরও ফুরিয়ে যায় না। সাহিত্যের আদি নিদর্শন পদ্য কবিতা। পদ্য কিংবা কবিতা যে নাম ধরে ডাকা হোক না কেন উভয়ের মধ্যেই ছন্দের প্রয়োগ বিদ্যমান। অনেকে মনে করেন ইদানীং নাকি ছন্দের ব্যবহারটা প্রায় উঠেই গেছে। না, ছন্দের ব্যবহারটা ওঠে যায়নি; বরং ছন্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে কবিরা তাদের কবিতায় কী ধরনের ছন্দ প্রয়োগ করবেন তার রদবদল কিংবা বিবর্তনও ঘটেছে বলা যেতে পারে। ছন্দে চিন্তার নতুনত্ব ঘটেছে। কবিতার আধুনিক সময়ের আগ পর্যন্ত কবিতায় ছন্দ বলতে যে ধরনের ছন্দকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হতো কিংবা যে ধরনের ছন্দের বেশি প্রয়োগ হতো কবিতায় আর আজ সেভাবে প্রয়োগ হচ্ছে না। কবিতায় সেই ধরাবাঁধা নিয়মের যে ছন্দ সে ছন্দ থেকে কবিরা কবিতাকে মুক্তি দেয়ার পথ খুঁজেছেন। এখন কথা হচ্ছে যে, ছন্দ আসলে কী? ছন্দ হচ্ছে ঢং কিংবা রীতি। কবিতার শরীরে দোলা লাগাবার কায়দা-কৌশলই মূলত ছন্দ। যে ঢং বা রীতি অনুসারে কবিতার শরীরকে দোলায়িত করে যায় তাকেই ছন্দ হিসেবে গ্রহণ করা হয়ে আসছে। কবিতাকে নানান দোলায় দোলানো যায়। তেমনি কবিতায় ছন্দও নানা রকমের। এ নানা রকমের ছন্দ দিয়ে কবিতাকে নানান দোলায় দোলাতে হয়। নানা রকমের ছন্দগুলো সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। কবিতায় ছন্দকে মোটামুটিভাবে ছন্দ-বিশেষজ্ঞরা তিন ভাগে বিবেচনা করে থাকেন। যেমনÑ অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত। এ নামগুলো দিয়েছেন প্রখ্যাত ছান্দসিক প্রবোধচন্দ্র সেন। অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে প্রবোধচন্দ্র সেন পরবর্তী সময়ে যৌগিক ছন্দ, মিশ্রকলাবৃত্ত বা মিশ্রবৃত্ত ছন্দও বলেছেন। অমূল্যধন মুখোপাধ্যায় অক্ষরবৃত্ত ছন্দের নাম দিয়েছেন তানপ্রধান। রবীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছেন সাধু ছন্দ এবং সংস্কৃত বাংলার ছন্দ বা পয়ার ছন্দ। বুদ্ধদেব বসুও বলতেন পয়ার। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত নাম দিয়েছেন আদ্যা। মোহিতলাল মজুমদার বলতেন পদভুক। সুধীন্দ্রনাথ ডাকতেন আক্ষরিক বলে।
এ ছাড়া অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে অক্ষর মাত্রিক, বর্ণমাত্রিক, সংকোচ প্রধান, মিশ্র-প্রকৃতিক ছন্দ বলা হয়ে থাকে। বাংলা কবিতার আদিতম ও প্রধানতম ছন্দ হচ্ছে এ অক্ষরবৃত্ত। বাংলা ছন্দের ভিত্তিই হলো অক্ষরবৃত্ত। যা কথা বলার বা প্রাণের মৌলিক ছন্দ। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অধিকাংশ কবিতাই লেখা হয়েছে অক্ষরবৃত্ত ছন্দে। মাত্রাবৃত্ত ছন্দকে প্রবোধচন্দ্র সেন পরবর্তী সময়ে নাম দিয়েছিলেন কলাবৃত্ত ছন্দ। অমূল্যধন মুখোপাধ্যায় নাম দিয়েছেন ধ্বনিপ্রধান। রবীন্দ্রনাথ নামকরণ করেছিলেন সংস্কৃত ভাঙা ছন্দ বা বজ্রবুলি-ভাঙা। মূলত, রবীন্দ্রনাথই মাত্রাবৃত্ত ছন্দের প্রকৃত প্রবর্তক। রবীন্দ্রনাথ তার ‘মানসী’ কাব্যে এ ছন্দের ব্যবহার করেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ নাম দিয়েছিলেন হৃদ্যা। সুধীন্দ্রনাথ নাম দিয়েছিলেন মাত্রিক। কালিদাস রায় নাম দিয়েছিলেন স্বরমাত্রিক। এ ছাড়া একে বিস্তারপ্রধান ও ধ্বনিমাত্রিক ছন্দ বলা হয়ে থাকে। আর স্বরবৃত্ত ছন্দকে প্রবোধচন্দ্র সেন আরেকটি নাম দিয়েছিলেন দলবৃত্ত ছন্দ। অমূল্যধন মুখোপাধ্যায় নাম দিয়েছিলেন শ^াসাঘাতপ্রধান ছন্দ। রবীন্দ্রনাথের নামকরণ করেছিলন বাংলা প্রাকৃত বা লোকছন্দ। মূলত কবিতায় এ ছন্দ রীতিটিরও প্রবর্তক রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ তার ‘ক্ষণিকা’ কাব্যে এ ছন্দের প্রয়োগ ঘটান। তারাপদ ভট্টাচার্য বলতেন বলবৃত্ত। সত্যেন্দ্রনাথ বলতেন চিত্রা। সুধীন্দ্রনাথ বলতেন স¦রান্তিক। বুদ্ধদেব বসু বলতেন ছড়ার ছন্দ। এ ছাড়াও একে স্বরাঘাত প্রধান, বলপ্রধান ও স্বরমাত্রিক ছন্দ বলা হয়ে থাকে। স্বরবৃত্ত ছন্দ বাংলা ভাষার আদিতম ছন্দ। এ ছাড়া ময়মনসিংহ গীতিকা, বাউল পদাবলীতে, লোকসাহিত্যে ও ছড়ায় স্বরবৃত্ত ছন্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এভাবে দেখা যায় যে, এ তিনটি ছন্দকে নানা সময়ে নানা রকম নামে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু এত নামের ভিড়ে সেই অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত এ তিনটি নাম ধরে ডাকা ছন্দই সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছে। এ ছাড়াও পরবর্তী সময়ে আরো দুটি ছন্দের সৃষ্টি হয়েছিল যা হলোÑ গদ্য ছন্দ ও মিশ্রছন্দ। গদ্য ছন্দ ও মিশ্রছন্দ আসলে কবিতার মধ্যে মানুষের প্রাত্যহিক স্বাভাবিকতাকে আহরণ করবারই এক-একটি উদ্যম। আধুনিক কবিতার জনক মাইকেল মধুসূদন দত্ত বুঝিয়েছিলেন, কবিতায় যুক্ত করতে হবে গদ্যধর্ম বা গদ্যস্বভাব।
মধ্যযুগে শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের প্রয়োগ করা হয়েছে এবং মধ্যযুগে পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের বহুল প্রয়োগ ছিল লক্ষণীয়। তা ছাড়া, ভারতচন্দ্রের হাতে বাংলা পয়ার ও ত্রিপদী ছন্দের নানা বৈচিত্র্য ও নতুন ভঙ্গিমার সৃষ্টি হয়েছে। ভারতচন্দ্র সংস্কৃত ছন্দেরও সুষ্ঠু প্রয়োগ করেছেন। আধুনিক সময়ে এসে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইংরেজি আদর্শে বাংলা ছন্দে অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রয়োগ করে ইতিহাসে যুগান্তর আনলেন। মূলত অমিত্রাক্ষর ছন্দ বা মুক্তক ছন্দ তারই আবিষ্কার। আধুনিক কবিতা চেয়েছিল কবিতা তার নিজের পায়ে দাঁড়াক। আর এ দায়িত্বেরই প্রথম প্রকাশ পায় মাইকেল মধুসূদনের কবিতায়। তিনি খুলে দিয়েছিলেন আমাদের ছন্দোমুক্তির প্রথম দরজা। সুরের ছন্দ থেকে কবিতাকে তিনি কথার ছন্দের দিকে এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তার অমিত্রাক্ষর ছন্দের মধ্য দিয়ে ছন্দের যে নতুন দিক উন্মোচন হয়েছিল সেই প্রবণতাটিই হলো মধুসূদনের ছন্দের মধ্য দিয়ে ছন্দে আধুনিকতার ইঙ্গিত। বাংলা সাহিত্যে আধুনিক যুগের আগ পর্যন্ত বাংলা ছন্দের খুব বেশি বৈচিত্র্য ছিল না। মাইকেল মধুসূদনের পরই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত এবং কাজী নজরুল ইসলাম নানা কৌশলের মাধ্যমে বাংলা কবিতায় ছন্দের মূল তত্ত্বগুলোর বিচিত্র ব্যবহার করে ছন্দের ইন্দ্রজাল সৃষ্টি করেছেন। এদের ধারাবাহিকতায় অন্যেরাও ছন্দ নিয়ে কবিতায় কাজ করেছেন। কিন্তু ছন্দের প্রয়োগ করেই কী কবিতা হয়ে ওঠে সেজন্য অবশ্যই প্রয়োজন হয় কাব্যগুণের। অর্থাৎ কবিতায় কাব্যগুণ না থাকলে শুধু ছন্দের ঝনঝনানি দিয়ে কতটা আর কবিতাকে কবিতা করে তোলা সম্ভব। কবিতায় ছন্দের পাশাপাশি কাব্যগুণ থাকা চাই। অনেকে আবার এ কাব্যগুণকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে ধরাবাঁধা নিয়মের ছন্দের প্রতি কিছুটা অনীহা প্রকাশ করছেন। সেজন্যই বর্তমান কবিতায় পুরনো ছন্দের ব্যবহার অনেকাংশেই কম দেখা যায়। কবিতার যে ধরাবাঁধা নিয়মের ছন্দ সে অনুসারে ছন্দ না থাকাটাও এক ধরনের ছন্দ। এ ব্যাখ্যায় তারা তাদের কবিতাকে স্বাধীনতা দিচ্ছেন। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ছন্দ সম্পর্কে বলেছেন, ‘ছন্দ কেবল বাইরে বাঁধন, অন্তরে মুক্তি। অর্থাৎ কথাকে তার জড়ধর্ম থেকে মুক্তি দেবার নামই ছন্দ।’ ছন্দ কেমন? এর ব্যবহার কীরূপ? প্রশ্ন আসতে পারে। এ প্রশ্নের কিছুটা সমাধানের জন্য হলেও জানা প্রয়োজন ছন্দ বিশ্লেষণ। ছন্দ বিশ্লেষণ করতে হলে ছন্দের কতগুলো উপাদান বা বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হয়। সাধারণত বাংলা ছন্দে অক্ষর মানে অক্ষর জ্ঞান, মাত্রা মানে মাত্রা নির্ধারণ পদ্ধতি, যতি বা ছেদ এর ব্যবহার, পর্ব বা পর্বাঙ্গ বিন্যাস, পঙ্ক্তি, চরণ এবং স্তবকের আঙ্গিক গঠনÑ এ কয়েকটি উপাদান বা বিষয় সম্পর্কে বিশদভাবে জেনে ছন্দলিপি নির্ণয় করা হয়ে থাকে বলে তা জেনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর মধ্যে অক্ষর এবং মাত্রা হচ্ছে ছন্দের মূল উপাদান। ‘প্রখ্যাত ছান্দসিক প্রবোধচন্দ্র সেন বলেছেন, ‘শিল্পিত বাকরীতির নামই ছন্দ।’ এ শিল্পিত বাকরীতি তৈরি করতে কবিতায় পদবিন্যাস রীতির কৌশলের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। যেখানে দেখা যায় যে, শব্দসমূহ দ্বারা বাক্যকে রসাত্মক, ভাষাকে সুষমামণ্ডিত ও শ্রুতিমধুর করে যে পরিমিত পদবিন্যাস রীতি উপস্থাপন করা হয়ে থাকে তাকে ছন্দ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।
এভাবে কবিতায় ছন্দ ব্যবহারের মাধ্যমে কবিতায় গতিসৌন্দর্য বা ধ্বনিসৌন্দর্য সৃষ্টি করা হয়ে থাকে। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘কবিতার বিশেষত্ব হচ্ছে তার গতিশীলতা।’ এ গতিশীলতার জন্য কবিতায় ছন্দ ব্যবহার তার পরিস্ফূটনের বাহনরূপে কাজ করে। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য তার কবিজীবনের ঊষালগ্ন কালেই বলেছিলেন, ‘অনুভবের ভাষা ছন্দোবদ্ধ। কেননা কবিতা কিছু বলে না, বেজে ওঠে।’ এই বোধ তার মধ্যে জাগ্রত হয়ে ওঠেছিল বহু আগেই।
মূলত, কবিতার জন্মমুহূর্তেই নির্ণীত হয়ে যায় যে, কবিতাটি কোন ছন্দে লেখা হবে। রবীন্দ্রনাথ এটাও বলেছেন, কবিতার ছন্দ যে-নিয়মে উৎপন্ন হয়েছে, বিশ^জগতের সমস্ত সৌন্দর্যই সে নিয়মে সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া ছন্দ হচ্ছে স্মৃতিসহায়ক। ফরাসি কবি লুই আরাগাঁ বলেছিলেন, কবিতার ইতিহাস তার টেকনিকের ইতিহাস। ছন্দ ব্যবহারে আমাদের এ টেকনিকের ইতিহাস সম্পর্কে খুব বেশি করে জেনে রাখা প্রয়োজন। এখানে বলে রাখা দরকার, ছন্দের জন্য তার চাল বা চারিত্র জানা থাকা চাই। এ জন্য অক্ষর বা মাত্রা সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন। অক্ষর বা সিলেবল এবং মাত্রা হলো বাংলা ছন্দের মূলভিত্তি। অক্ষর বা সিলেবল হলোÑ দুই প্রকার মুক্তাক্ষর ও বদ্ধাক্ষর। অক্ষর বা সিলেবল বুঝতে হলে বর্ণ বা ধ্বনির তফাতটা বুঝতে হবে। কেননা, অক্ষর বা সিলেবল হবে আমরা যেভাবে শব্দ উচ্চারণ করি সেই অনুযায়ী, যেভাবে লিখি সেভাবে নয়। অক্ষর বা সিলেবলের উচ্চারণের কাল বা সময় জ্ঞানকে মাত্রা বলে। এক-একটা অক্ষর বা সিলেবলকে কতক্ষণ ধরে উচ্চারণ হচ্ছে তার পরিমাপকই হচ্ছে মাত্রা। কোনো অক্ষর বা সিলেবল কখনও এক মাত্রার বা কখনও দুই মাত্রার হতে পারে। একই শব্দের অংশ একটি কবিতায় এক মাত্রার, আবার অন্য কবিতায় দুই মাত্রার হতে পারে। অক্ষর বিবেচনায় মুক্তাক্ষর, তিন প্রকারের ছন্দেই মুক্তাক্ষর সব সময় এক মাত্রার। আর বদ্ধাক্ষর, তিন প্রকারের ছন্দেই বদ্ধাক্ষর তিনভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অক্ষরবৃত্ত ছন্দে বদ্ধাক্ষর শব্দের প্রথমে বা মধ্যে থাকলে এক মাত্রা এবং শব্দপ্রান্তিক হলে দুই মাত্রা হিসেবে চিহ্নিত হয়। মাত্রাবৃত্ত ছন্দে বদ্ধাক্ষর সব-সময়ই দুই মাত্রার। আর স্বরবৃত্ত ছন্দে বদ্ধাক্ষর সব সময়ই এক মাত্রার। চালের বেলায় ছন্দের অক্ষর বা সিলেবল হবে চার চালে। ছন্দ নির্ণয় করতে হয় জোড়া চালে। তা ছাড়া চাল বিজোড়ও হতে পারে। এ জন্যই সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন, ‘বিজোড়ে বিড়োজ গাঁথ, জোড়ে গাঁথ জোড়।’ এর সঙ্গে অবশ্য ধ্বনির সংযোগ প্রয়োজন। কেননা, কবিতায় ধ্বনিই আসল জিনিস। ধ্বনি কথাটার মানে হচ্ছে শব্দ বা আওয়াজ। যেকোনো আওয়াজই ধ্বনি। ভাষার ধ্বনি বলতে বাগধ্ব্নিকে বোঝায়। আমরা মুখে যে স্বরধ্বনি বা ব্যঞ্জনধ্বনি উচ্চারণ করি তাকেই কবিতার ধ্বনি বলা হয়ে থাকে। বাংলা কবিতায় এ সময়ে দাঁড়িয়েও ছন্দ ব্যবহৃত হচ্ছে। যে ছন্দগুলো বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে কবিতায় তা হলোÑ অক্ষরবৃত্ত ছন্দের প্রয়োগ। গদ্য ছন্দ ও মুক্তাক্ষর ছন্দও বর্তমান সময়ের কবিতায় ব্যবহার হতে দেখা যাচ্ছে। এভাবেই চিরাচরিতভাবে বাংলা কবিতায় ছন্দের ব্যবহার ছিল, ছন্দের ব্যবহার বর্তমানেও হচ্ছে, সুদূরেও ছন্দের ব্যবহার থাকবে বা ব্যবহার হবে। হোক না তা যেকোনো ছন্দে বা নতুন কোনো ছন্দ সৃষ্টি প্রয়োগের মাধ্যমে। তাই কবিতায় ছন্দের প্রাসঙ্গিকতা অমূলক কিছু নয়। নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, বাংলা কবিতায় ছন্দ বেঁচে আছে এবং বেঁচে থাকবে কবিতায়। ছন্দই কবিতায় নয় কিন্তু ছন্দবিহীন কবিতা নির্মাণ অসম্ভব। ছন্দ কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ।