রহস্য নিয়েই সৃষ্টি এ পৃথিবী। রহস্যই ঘিরে আছে আমাদের। রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা হয়তো অনেকেই করেছেন। এখনো করছেন। কিন্তু আল মাহমুদ করেছেন একটু ভিন্ন মাত্রায়। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব ভুবন থাকে। সাজাতে রাঙাতে সে থাকে বদ্ধপরিকর। ছন্দশীলন ও আত্মবোধের যে জায়গা তাই প্রস্ফুটিত হতে দেখা মেলে আল মাহমুদের রচনায়। তিনি একজন শক্তিমান কবি। কোনোরূপ দ্বিধা নেই। এতটুকুও না। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে মানুষের অন্তরীণ চেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন তিনি। শিল্পের বহু অঙ্গে রংধনুর মতোই তিনি ছিলেন উজ্জ্বল। প্রাণবন্ত। স্বাপ্নিক। প্রকাশ লালন এবং শিল্প চর্চার মননশীলতা সর্বজনীন করে তুলেছে কবিকে। স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশই ছিল তার বিশেষত্ব। একজন কবির আদিগন্তে ছড়ানো থাকে ভাবনার আকাশ। থাকতে হয়। একটি বুকে আঁকতে হয় পুরো একটি দেশ। মনবাগানে সাজানো বাংলাদেশ কবিকে করে উদ্ভোধিত। উল্লসিত। উজ্জীবিত। জন্ম থেকেই কেউ জানে না সে কী হবে। কী করবে। কেমন করে একটি পুরো দেশের হয়ে উঠবে। সময়ের বেড়ে ওঠায় প্রকৃতিই তার পক্ষে দাঁড়িয়ে যায় বৃক্ষের মতো। প্রকৃতির একটি অংশ তিতাস নদীকে বুকে নিয়েই কবির আত্মপ্রকাশ। খুব কি সহজ বিষয়? মোটেও না। কিন্তু এমনই ছিলেন আল মাহমুদ। তাইতো কবি বলেন,
এ আমার শৈশবের নদী এই জলের প্রহার/সারা দিন তীর ভাঙে, পাক খায়, ঘোলা স্রোত টানে/যৌবনের প্রতীকের মতো অসংখ্যকার পালে/গতির প্রবাহ হানে। মাটির কলসে জল ভরে/ঘরে ফিরে সলিমের বউ তার ভিজে দুটি পায়।
লুকানো সেই দিনগুলো। মায়াকাড়া সব মুহূর্ত। যেখানে খেলা করেছে পাখি আর মাছ। ছলাৎ ছলাৎ ছোট ছোট ঢেউয়ের স্রোতে ভেসে থাকা পালতোলা নৌকা। আহা কি আনন্দ! কচুরিপানার মধ্য দিয়ে ঢেউয়ের পর ঢেউ যখন আচড়ে পড়ে। তখন কী এক ভাবনায় কবির মন উদাস হয়ে ওঠে। বিস্ময়কর মুগ্ধতায় তার আঁখি আকাশপানে ছুটে চলে। রহস্য উদ্ভাবনে মন হয়ে উঠে চঞ্চল। কলমি ফুলের দোলায় কচুরিপানার বুকে শাপলা ফুলেরা পাঁপড়ি মেলে ধরে। যেন হেসে ওঠে। অবাক সৌন্দর্যের কাছেই কষ্টগুলো ভেঙে পরে পাড় ভেঙে। ভাসিয়ে নিয়ে যায় টুকরো টুকরো করে বোনা স্বপ্নগুলো। নদীই কবিকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। এই নদীই দেখিয়েছে কেমন করে গ্রাস করে নেয় সর্বস্ব। এ দুয়ের অন্তঃকালীন সম্পর্ক কবিকে জাগিয়ে রাখে। বুকের পাঁজরের শব্দ কবিকে বিচলিত করে তোলে। উদাসী মনের আল মাহমুদ একাকী ঘুরে বেড়াতেন চরাচর। ভোর হতে রাত্রির মধ্যকালীন প্রতিটি সময়ের সাক্ষী হতে চাইতেন। নিঝুম সবুজ বন থেকে পাখপাখালির পিছু ছোটায় ছিল না কোনো অবসাদ। মনের উদাসী ভাবনার গভীরতা যেন আরো বেড়ে প্রবল হয়ে উঠত। নিজেকে দ্বিধাহীন উজিয়ে দিতেন আনন্দের দিকে। বৃষ্টিতে ভেজা মন হয় প্রেমময়। বৃষ্টির টুপটাপ-ঝিরিঝিরি শব্দের গন্ধ শুঁকতেন আনন্দে। যেন বৃষ্টির শব্দের ছন্দ কবিতার ছন্দ। ছন্দময় মন নিয়ে কবি ফুলকাননের গন্ধে খুঁজতেন ফুলেরই রহস্য। চেতনায় নিজেকে মনে করতেন এক উড়ন্ত সত্যিকারের পাখি। যেন সব ছাড়িয়ে সব জনপদ পেরিয়ে সবুজ অরণ্যে তার বাস। সবুজ সৌন্দর্যের সুগন্ধি মাখতেন। বৃক্ষের সাথে সখ্য ছিল দারুণ। মনে হতো বুঝি বন্ধু একজন। একেকটি বৃক্ষের শরীর ছিল কবির চোখে আনন্দ বিস্ময়াভূত অনুভব। পাতার খাঁজে ভাঁজে নেচে বেড়াত তার তীক্ষè দৃষ্টি। যেন তার রূপ কবিকে বিচলিত করে তুলত। তিনি প্রতিবারই প্রেমে জড়াতেন। নিবিড় অনুভবে আচ্ছাদিত মন হয়ে উঠত প্রাঞ্জল। এমনই ছিলেন কবি আল মাহমুদ। তিনি বলেন,
তাকাতে পারি না আমি রূপে তার যেন এত ভয়/যখনি উজ্জ্বল হয় আমার এ চেতনার মণি,/ মনে হয় কেটে যাবে, ছিঁড়ে যাবে সমস্ত বাঁধুনি/সংসার সমাজ ধর্ম তুচ্ছ হয়ে যাবে লোকালয়।/লোক থেকে লোকান্তরে আমি যেন স্তব্ধ হয়ে শুনি/ আহত কবির গান। কবিতার আসন্ন বিজয়।
সেই ছোটবেলাতেই মানুষের অসহায়ত্ব কবির হৃদয়ে আলোড়িত হয়েছে। ভীষণভাবে কাতর করেছে মানুষের শ্রেণী-বৈষম্য। গ্রামীণ জীবনধারণ পদ্ধতি নিয়েও কিশোর মনের ভাবনা ছিল দুরন্ত। স্পষ্ট উচ্চারণে তিনি গ্রামীণ মিথকে দুই হাতে তুলে ধরেছেন। বর্তমানের বিচিত্রতায় রচনা করেছেন আলোকিত ভবিষ্যৎ। গ্রাম থেকে শহরের প্রকৃতি পুরোটাই ভিন্ন। বিস্ময়ের বিষয় ছিল এখানেই। এতটুকুও কম্পিত হননি আল মাহমুদ। কিশোর বয়সের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যৌবনের উদ্দীপ্ত মন নিয়ে তিনি উড়াল তুলেছেন। তুলেছেন একজন কবি হতে। এমন কবি হওয়ার দৃঢ়সংকল্প আল মাহমুদেরই থাকতে পারে। পারে কারণ তার বুকের জমিন একজন কবির। কবিকে দৃঢ় হতে হয়। কবিসত্তাকে আপন করে নিতে হয়। সর্বাঙ্গে তার গ্রামের চিহ্ন। পোশাক-আশাক, চলনে-বলনে গন্ধে পুরোপুরিই গ্রামের। কিন্তু এ যেন কবির অলঙ্কার। মাটির গন্ধ নিয়ে রচনা করবেন ভবিতব্যের শহর। কবি থামেননি। সব কিছুকে ছাপিয়ে তার স্বপ্ন তিনি কবি হবেন। ইচ্ছের এমন প্রাবল্যতা কমই চোখ কাড়ে। ফেলে আসা দিনগুলোকে একটি ভাঙা সুটকেসে করে তিনি এলেন রাজধানীর রাজপথে। নিয়ে এলেন বাংলাদেশের সবগুলো নদী, পাখি, পতঙ্গ, নৌকা, নর-নারীসহ বহমান আস্ত এক বাংলাদেশ। গ্রামের ফেলে আসা চিত্রের বুনন ছিল এমনই,
আম্মা বলেন. পড়রে সোনা/ আব্বা বলেন, মন দে;/ পাঠে আমার মন বসেনা/ কাঁঠালচাঁপার গন্ধে/আমার কেবল ইচ্ছে জাগে/ নদীর কাছে থাকতে/ বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে/ পাখির মতো ডাকতে।/ সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে/ কর্ণফুলীর কূলটায়,/ দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি ফেরেশতারা উল্টায়।/ তখন কেবল ভাবতে থাকি/ কেমন করে উড়বো,/ কেমন করে শহর ছেড়ে/ সবুজ গাঁয়ে ঘুরবো!/ তোমরা যখন শিখছো পড়া/ মানুষ হবার জন্য,/ আমি না হয় পাখিই হবো,/ পাখির মতো বন্য।
জীবনে এগিয়ে যেতে হয় তা সবারই জানা। কিন্তু তাকে বাস্তব করতে সাহসের প্রয়োজন। একটি জীবনকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায় অনায়াসে। আল মাহমুদ জীবনের একটি পাঠ চুকিয়ে বুকিয়ে বুকের গহিনে সযতেœ রেখে দিয়েছেন। ঢাকার আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছেন হৃদয় দিয়ে। এখানেই তিনি আলাদা। বিশেষিত। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সাহস চাই। ইট-পাথরের এই রাজপথের রাস্তা মসৃণ নয় জেনেও তিনি পথে নেমেছেন। জানতে বুঝতে গ্রহণ করতে তিনি ছিলেন অতীব পারঙ্গম। হাতের তালু থেকে পায়ের দূরত্ব জানতেন। কেমন করে সকলের হয়ে উঠতে হয়। কিছু না বলেও কিভাবে সব বলা যায়। জানা ছিল তার। দৈন্যতার শিকলে আঁকা আল মাহমুদ ছিলেন দুরন্ত প্রকৃতির। ঢাকার রঙিন ঝিলমিলি আলোর স্পর্শ গ্রামে দেখা যায়নি। তবুও জীবনের যে বাঁক তাকে অস্বীকার করে এগুনো যায় না। তাকে গ্রহণ করতে হয়। এমনই জিদ তৈরি করেছেন কবি তার বুকের জমিনে। নিজেকে আমূল বদলে নেবার দৃঢ় প্রত্যয়ে উজ্জীবিত হয়েছেন। অসাধ্য পথের পথিক আল মাহমুদ কবিতাঙ্গনে একঝাঁক কবিদের মাঝে অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তুখোড় কবিদের খ্যাতির চর্চার মধ্যে এই যে আল মাহমুদের দাঁড়িয়ে পড়া। এটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ব্যঙ্গ, বিদ্রƒপ সহ্য করে স্বপ্ন এবং সাধনায় বিস্ময়করভাবে ছাড়িয়ে উঠলেন বহু মুখের মানচিত্র। কবিদের তালিকায় তার নাম উঠে এলো। চেহারা-বৈভব সব কিছুই ম্লান হলো তার কবিসত্তায়। এসবই আল মাহমুদকে একজন আধুনিক কবি করে তোলে। তিনি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারার একজন সফল শক্তিমান কবি হয়ে ওঠেন। আধুনিক এই কবির কণ্ঠে বেজে উঠে আধুনিকতার ছন্দে,
কী আছে এই হাতের মধ্যে/ কী আছে কও ঢাকা?/ বললে হেসে, কী আর হবে/ মিথ্যে ঢেকে রাখা/ মুক্ত করে বুকের কাছে/ তুলতে দু’টি কর,/ হাসলে, আরে, কোথায় পেলে/ বর্ণালী মাকড়!
কবিরা বলেন। কবিতা হচ্ছে নান্দনিক সৌন্দর্যের পাঠ। যারা পড়েন তারা পাঠক। এই পাঠকই গুরুত্বপূর্ণ। বারবার শোনার পরও ভোরের আলোর রঙ মাখাতে কে না চায়। চোখ মেললেই নানান রঙের ফুলঝুড়িতে ঝলসানো পৃথিবীর রূপ কবিকে আত্মার সাথে পরিচিত করে তোলে। জীবন ক্ষণস্থায়ী তা সবাই জানি। কিন্তু তা ধারণ করি কতজন! ইকবালের জীবন দর্শন ছিল তার বিশেষ পছন্দের। স্বল্পকালীন জীবনের আয়োজন কেমন হওয়া উচিত। কেমন করে পাড়ি দিতে হবে পথ। কর্মের দাগ কতটা প্রলম্বিত চাই। আদৌ কি চাই! এমনই সাহসী উচ্চারণ ছিল আল্লামা ইকবালের। মানুষের হয়ে মানুষের গান গেয়েছেন আল মাহমুদ। কবিকে সময়ের মূল্য বুঝতে হয়। একজন কবিই পারে সমাজ ও জাতিকে তাদের করণীয় সম্পর্কে সজাগ করতে। প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে জীবনকে এগিয়ে নিতে। জ্ঞান এবং কর্মের গাঁটছড়া সৃষ্টি থেকেই। শুধু উপলব্ধির প্রয়োজন। জাতির চিন্তায় আমৃত্যুই একজন কবিমন হয় ব্যথিত। মানুষের জন্য কিছু করার আকাক্সক্ষা উঁচু হয়ে ওঠে। বর্তমান যে সময় আমরা পার করছি, তাতে প্রয়োজন সঠিক সময়ের উপলব্ধি। তবেই একটি ভোর একটি আলোকিত বাংলাদেশ পাবে। সেই জায়গায় আল মাহমুদ নিবিষ্টচিত্তে বেঁচে থাকার প্রতিটি মুহূর্তেই মানুষের তরে নিজেকে উৎসর্গিত করেছেন। অনবদ্য রচনায় রেখে গেছেন তার শিল্পিত মনের আশ। কবির কণ্ঠে,
অনিচ্ছায় কতকাল মেলে রাখি দৃশ্যপায়ী তৃষ্ণার রোচন/ক্লান্ত হয়ে আসে সব, নিসর্গও ঝরে যায় বহুদূর অতল আঁধারে/ আর কী থাকলো তবে হে নীলিমা, হে অবগুণ্ঠন/ আমার কাফন আমি চাদরের মতো পরে কতদিন আন্দোলিত হবো/ কতকাল কতযুগ ধরে। হ
রহস্য নিয়েই সৃষ্টি এ পৃথিবী। রহস্যই ঘিরে আছে আমাদের। রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা হয়তো অনেকেই করেছেন। এখনো করছেন। কিন্তু আল মাহমুদ করেছেন একটু ভিন্ন মাত্রায়। প্রতিটি...
