কোলরিজ থেকে ইয়েটস, রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ দাশ কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ভিন্নভাবে। আল মাহমুদের কবিতা সোঁদামাটির গন্ধ ও প্রকৃতির মিশেলে এক চমৎকার উপস্থাপন। ‘কবিতা এমন’ কবিতায় বর্ণনা করেছেন-
কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি।
সে তো ভেসে ওঠা ম্লান
আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটা
পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ছোট ভাইবোন
আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি- রাবেয়া রাবেয়া
আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট...
কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর
স্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান
চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে
নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা...
কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস
ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর
গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর
কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার...।
আয়েশা নামটিকেও উন্নত স্থানে নিয়ে গেলেন। সমস্ত কিশোরীর প্রতিনিধিত্ব করলেন। তার কবিতায় এমন উপাদানের ছড়াছড়ি। বলা যায়, এ কবিতাটিই তার সব কবিতার প্রতিনিধিত্ব করছে। সব কবিতার সমন্বয়েই এ কবিতা।
মানুষ গল্প শুনতে আগ্রহী, ঐতিহ্য অনুসন্ধানেও আগ্রহী। মানুষের ঐতিহ্যসন্ধান মূলত তার অস্তিত্ব অনুসন্ধান করা। মানুষ স্বভাবতই সামাজিক জীব। সমাজের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নিয়েই গড়ে ওঠে তার সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির সাথে মিশে আছে তার লৌকিক, সামাজিক, রাজনৈতিক
জীবনাচরণ। কবি আল মাহমুদও তার ব্যতিক্রম নন। কবি আহসান হাবীব আধুনিক বাংলা সাহিত্যে লোকজ উপাদান ব্যবহারের সূচনা করেন। তবে এতে ব্যাপকতা দান করে পূর্ণতা দিয়েছেন শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ। শহর নির্ভর কবিতা হতে বের হয়ে এসে তিনি সৃষ্টি করেছেন আধুনিক পল্লী নির্ভর কবিতা।
কবি লোকজ উপাদানকে শৈল্পিক করে তুলেছেন অধিকাংশ কবিতায়। কৈশোরের স্মৃতি, মায়ের মুখ, হলুদ পাখি, পাতার আগুন, রাতজাগা ছোট ভাইবোন, সাইকেলের ঘণ্টাধ্বনি, হাঁটুজল নদী, কুয়াশা-ঢাকা পথ, ভোরের আজান, নাড়ার দহন, তিলের সৌরভ, মাছের আঁশটে গন্ধ, বাঁশঝাড়ে দাদার কবর, বইয়ের মলাট, অসুখী কিশোর, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান, দাঙ্গার আগুন, নিঃস্ব অগ্রজের কাতর বর্ণনা, চরের পাখি, হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস, দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর, গোপন চিঠির প্যাড, নীল খাম, মক্তবের চুলখোলা মেয়ে, ঢেউয়ের পাল ইত্যাদির মতো স্মৃতিকথার উপাদান ব্যবহৃত হয়েছে তার কবিতায়। তার নস্টালজিক এমন কবিতা পড়লে পাঠক ফিরে যাবেন অতীতে।
বাসা, প্রেম, লতাপাতা, বইয়ের মলাট।
দুমড়ে মুচড়ে খসে পড়ে। মেঘনার জলের কামড়ে
কাঁপতে থাকে ফসলের আদিগন্ত সবুজ চিতার।
ভাসে ঘর, ঘড়া-কলসী গরুর গোয়াল
বুবুর স্নেহের মতো ডুবে যায় ফুল তোলা পুরনো বালিশ।
বাসস্থান অতঃপর অবশিষ্ট কিছুই থাকে না
জলপ্রিয় পাখিগুলো উড়ে উড়ে ঠোঁট থেকে মুছে ফেলে বাতাসের ফেনা। (বাতাসের ফেনা)
‘আমার চেতনা যেন শাদা এক সত্যিকারের পাখি
বসে আছি সবুজ অরণ্যে’ (লোক-লোকান্তর)
ও পাড়ার সুন্দরী রোজেনা
সারা অঙ্গে ঢেউ তার, তবু মেয়ে কবিতা বোঝে না!
[অবুঝের সমীকরণ]
‘দ্যাখো, জয়নুলের ছবির মত ঘরবাড়ি, নারী
উঠোনে ঝাড়ছে ধান, ধানের ধুলোয় ম্লান শাড়ি’
[প্রত্যাবর্তন]
আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন’
[সোনালী কাবিন]
‘আমাদের কলাকেন্দ্র, আমাদের সর্ব কারুকাজে
অস্তিবাদী জিরাফেরা বাড়িয়েছে ব্যক্তিগত গলা’
[সোনালী কাবিন]
‘হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোনো কবি করে না কসুর’
[ সোনালী কাবিন ]
‘চাষীর বিষয় নারী উঠোনে ধানের কাছে নুয়ে থাকা
পূর্ণাস্তনী ঘর্মাক্ত যুবতী’ (কবির বিষয়/অদৃষ্টবাদীর রান্নাবান্না),
‘স্তন দুটি দুধের ভারে ফলের আবেগে ঝুলে আছে’ (অন্তরভেদী
অবলোকন/সোনালী কাবিন),
পাখির ছতরে/চুম্বনী রাশী (সোনালী কাবিন),
বাতাসের ফেনা (বাতাসের ফেনা) ইত্যাদির মতো শব্দাবলি ব্যবহার করেছেন।
কবিতায় ইংরেজি, আরবি-ফারসি, প্রাচীন সংস্কৃত ও সাধুভাষার শব্দ নির্দ্বিধায় সেই সাথে লোকজ শব্দের যুৎসই ব্যবহার করেছেন। পাইলা (পাতিল), টুম (কলার), হগল (সকল), আজকা (আজ), লহ (রক্ত), সুখটান (বিড়ি বা সিগারেটের শেষ টান), ঠিল্লা (কলসি), জেয়র (অলঙ্কার), নারি (পারি না), ছলবে (ছলনা করবে), লক্ষি (লক্ষ করিয়া), রাখি (রাখিয়া) ইত্যাদির মতো লোকজ শব্দাবলি সহজ ও সরলভাবে ব্যবহার করে কবিতায় নতুনত্ব আনার পাশাপাশি কবিতার ভাষাকে শক্তিশালী ও গতিশীল করেছেন।
প্রেম, প্রকৃতি ও স্বদেশ ভূমিই ছিল আল মাহমুদের রচনার মূল বিষয়বস্তু। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনা, অনুভব-অনুভূতি সহজ কথায় বুনেছেন তিনি। মানুষের মুখের বুলির লোকজ শব্দ, ঐতিহ্য সচেতনতা মিলিয়েই তার কবিতা। পল্লীর উপাদান থেকে তিনি নির্মাণ করেন তার উপমা ও চিত্রকল্প। প্রকৃতপক্ষে তিনি কাব্যের ভাষাক্ষেত্রে এক অপূর্ব সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছেন।
জসীমউদ্দীনের লোকসাহিত্যের উপাদান আর জীবনানন্দের শ্যামল বাংলার উপাদানের সমন্বয়ে কবিতায় উজ্জ্বল কণ্ঠস্বর সৃষ্টি করতে পারঙ্গম হয়েছেন। ছন্দ নির্মাণে তিনি কৌশলী। দেশ, নারী, প্রকৃতি, তাঁর কবিতার প্রধান অনুষঙ্গ।
‘রাতের নদীতে ভাসা পানিউড়ী পাখির ছতরে,
সৃষ্ট ঢেউয়ের পাল যে কিসিমে ভাংগে ছল ছল
আমার চুম্বন রাশী ক্রমাগত তোমার গতরে
ঢেলে দেবো চিরদিন মুক্ত করে লজ্জায় আগল..।
[সোনালী কাবিন]
‘বিষয়ী দর্পণে আমি’ কবিতায়-
সে অলীক মুহূর্তের ক্রোধ
জয় করে দেখি আমি, কেবলই আমার মধ্যে যেন এক
শিশু আর পশুর বিরোধ।
সারল্য-বিস্ময়ের পাশাপাশি হতাশা-বর্বরতার সমন্বয়ই আধুনিক কালের মানুষের বৈশিষ্ট্য। গ্রামীণ-জীবনযাত্রা, নাগরিক বোধ, প্রকৃতি, মানবতা, যৌনচেতনা, মৃত্যুচেতনা ইত্যাদি চিন্তার প্রয়োগে কবিতাকে আধুনিক মানে নিয়ে গেছেন। ফলত এভাবে কবিতায় আন্তর্জাতিকতা এনেছেন। আবহমানতার সঙ্গে আধুনিকতার সমন্বয় করেছেন। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়াংশে সক্রিয় থেকে তিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনায় ও বাকভঙ্গিতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন।
বলতে পারি, কবি আল মাহমুদ ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ দৃশ্যপট, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের কর্মমুখর জীবন চাঞ্চল্য ও নর-নারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে অবলম্বন করে প্রচুর কবিতা রচনা করেছেন। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাসি-কান্না, দুঃখ-বেদনা, অনুভব-অনুভূতি সহজ কথায় শতবন্ধনজালে বুনেছেন তিনি। গ্রামবাংলার জীবন এবং মানুষের মুখের বুলির লোকজ শব্দ এবং সেই সঙ্গে ঐতিহ্য সচেতনতা তার সৃজনী জগতের মৌল বৈশিষ্ট্য। যা বাংলা সাহিত্যকে অনন্য উজ্জ্বলতা দান করেছে। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোয় আল মাহমুদ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের চমৎকার প্রয়োগের মধ্য দিয়ে কাব্যরসিকদের মাঝে নতুন পুলক সৃষ্টি করেন।
কোলরিজ থেকে ইয়েটস, রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ দাশ কবিতাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন ভিন্নভাবে। আল মাহমুদের কবিতা সোঁদামাটির গন্ধ ও প্রকৃতির মিশেলে এক চমৎকার উপস্থাপন। ‘কবিতা এমন’ কবিতায়...
