কবিতা শুধুই একটি শব্দ নয়। এটিকে ঘিরেই আবর্তিত হৃদয়বৃত্তি। কাল্পনিক আকাশের স্তরে স্তরে এর অবগাহন। নানা মত ও পথের বাঁকে যে চিত্রকল্প তারই সারবত্তা কবিতা। হৃদয় নিঃসৃত শব্দরা বিভিন্ন আঙ্গিকে আলোড়িত। কল্পনার এ এক গোপন পথ। যা কবিতা হয়ে প্রকাশিত। তাই বলে সবাই কি কবি? নিশ্চয়ই নয়। সবাই কবি হয়ে জন্মায় না। আবার চেষ্টা করেও কবি হওয়া যায় না। যুগের প্রবাহে কবিদের জন্ম জাতির জন্য এক অনন্য উপহার। সাহিত্যের প্রাণ বলা হয় কবিতাকে। কবিতাচর্চা মানুষকে সৃষ্টিশীলতার দিকে আহ্বান করে। মানুষের মনের সৌন্দর্যতা যেন বহুগুণে বেড়ে ওঠে। সৃষ্টিকর্তার সাথে সৃষ্টির যে সম্পর্ক তা প্রকাশের অন্যতম পথ কবিতা। সেই প্রাচীনকাল থেকে চলে এসেছে এ ধারা। জীবন অভিজ্ঞতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খণ্ড-বিখণ্ডিত এই ধরাদামে যা কিছুই চলমান ঘটনাবহুল অভিজ্ঞতা। যা অতীত, বর্তমান ও অনাগত ভবিষ্যৎ। সবই এক সময় থেমে যায়, যাবে; কিন্তু একটি কবিহৃদয়ে জ্বলন্ত শিখার মতো জ্বলজ্বল করে এই আবহ। এ সব বিষয়ই কবিতার প্রাণ হয়ে ওঠে। ছন্দে ছন্দে যা তসবির মতো ঝরে পড়ে। এখানেই পার্থক্য একজন কবির সাথে সাধারণের। যা আমি, আমরা পারি না তা অনায়াসে পারেন একজন কবি। জটিল পৃথিবীর অংশ আমরা। নিজেকে পরিমার্জিত করে সুস্থির রেখে এগিয়ে চলাটাই আসল। যেকোনো শিল্পচর্চাই মানুষকে সমৃদ্ধ করে। শুধু আবেগ অনুভূতির তারতম্য পরিলক্ষিত হতে দেখা মেলে। কেউ প্রকৃতিকে ভালোবাসেন। কেউবা মানব-জীবনকে। আবার কেউ হয়তো নর-নারীর মধ্যকার প্রেম-ভালোবাসাকে আপন করে নেন। যে যেভাবেই ব্যাখ্যা করেন না কেন কবিতার পঙ্ক্তিতে কবির মনোভাব সহজেই পাঠককুলকে আকৃষ্ট করে। কবিতায় আধুনিকতাও আজ স্পর্শ করেছে নির্দ্বিধায়। সবাই চায় আধুনিক হতে। আধুনিক জগতের নব্য-বিকিরণ কবিসত্তাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। সেই পথ ও মতেরই একজন কবি জীবনানন্দ দাশ। যাঁকে আমরা একজন আধুনিক কবি হিসেবে পাই। যিনি প্রকৃতিপ্রেমিক কবি হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়। প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ কবিকে আবেগী করেছে। ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হয়েও হৃদয়জুড়ে ধরে রেখেছিলেন বাংলার অবারিত রূপ। সব কিছুতেই যেন তার রচনায় রহস্য জেগে থাকে। একটি রচনার জন্য একজন কবিকে কতটা উপলব্ধির স্তরে পৌঁছাতে হয়। কতটা ধ্যানী হতে হয়। একজন কবি তার হৃদয়ভূমে কতটা তোলপাড় কতটা ক্ষরণের পর রচনা করেন একটি কবিতা। সেই জায়গায় একজন পাঠক পৌঁছাতে প্রায় অক্ষম। কবিতার যে আবেদন তা আনন্দের। প্রেরণার। আন্তঃশক্তির উৎস।
জাতীয় কবি নজরুলকে জানেন না। চিনেন না। আছে কি এমন কেউ। নেই বোধহয়। নজরুল রচনায় কী নেই। তার কবিতা তার গান তার ভাষণ-ভূষণ সবই ছিল আধুনিক। জীবনানন্দ দাশ ও তাঁর প্রথম জীবনে নজরুল ধারায় প্রাণিত হয়ে রচনা করেন কবিতা। নজরুল তাঁর চিন্তা ও মননে প্রভাব ফেলে প্রবলতর। পাশাপাশি আরো অনেকের সাথে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও মোহিতলাল মজুমদার ও আধুনিকতার সফরে ছিলেন বেগবান। যার ছোঁয়া পাওয়া যায় জীবনানন্দের জীবনচরিতে। কবি চলনে-বলনে ছিলেন আধুনিক। জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ব্যতিক্রম। নতুন নতুন বিষয় ছিল তাঁর জন্য আনন্দের। তাই কষ্ট করে ঘোষণার প্রয়োজন হয়নি কখনো। তিনি দেখেছেন দুই চোখ ভরে। ঘ্রাণ নিয়েছেন নিঃশ্বাসের প্রাঞ্জলতায়। রূপসী বাংলার রূপ মেখেছেন সারাগায়। তিনি নির্মাণ করেছেন বাংলা সাহিত্যের এক যুগান্তকারী বিপ্লব। স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছেন মনের কোণে। স্বপ্ন তো সবাই দেখে। স্বপ্নের কাছাকাছি হওয়ার সাহস থাকে ক’জনার। অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় যিনি পথ নির্মাণ করেছেন। থেমে থাকেননি কোথাও। অভিজ্ঞতায় হয়েছেন ঋদ্ধ। তাই কোনো কষ্টই কবিকে তাঁর স্বপ্ন পূরণের পথরোধ করতে পারেনি। নির্বিগ্নে হৃদয় উপুড় করে ঢেলে দিয়েছেন। বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন হাসিমুখে। তাই তো স্বপ্ন কবিতায় তিনি বলেন,
পাণ্ডুুলিপি কাছে রেখে ধূসর দীপের কাছে আমি/নিস্তব্ধ ছিলাম ব’সে,/ শিশির পড়িতেছিল ধীরে-ধীরে খ’সে,/নিমের শাখার থেকে একাকীতম কে পাখি নামি/উড়ে গেলো কুয়াশায়, কুয়াশার থেকে দূর-কুয়াশায় আরো।/তাহারি পাখার হাওয়া প্রদীপ নিভায়ে গেলো বুঝি?/অন্ধকার হাতড়ায়ে ধীরে-ধীরে দেশলাই খুঁজি,/যখন জ্বালিব আলো কার মুখ দেখা যাবে বলিতে কি পারো?
পৃথিবী সৃষ্টির শুরু থেকেই জানা সবই শেষ হবে একদিন। মানুষের আবহমান পৃথিবীর শীর্ষে একটি নতুন পৃথিবী গড়ার সুখস্বপ্ন সবার। সবাই চায় আকাশ ছুঁতে। চায় পাখির মতো ডানা। আকাশজুড়ে পাখিদের উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য মন কাড়ে না এমন মানুষ পাওয়া যাবে না বোধ হয়। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ। নতুন ভোরে সূর্যের চিক। আলোয় ভরা দিনের আনন্দ। গাছে গাছে ফোটে উঠা নতুন কুঁড়ি। নতুন কুঁড়ি থেকে ফুটন্ত ফুল। সেই ফুলের পাপড়িতে প্রজাপতিদের পেখম মেলে উড়ে উড়ে চলা। আরো আছে বৃষ্টি দেখার সুখ। সারাদিন বৃষ্টি। ঝিরিঝিরি। টুপটাপ। গাঢ় নীল আকাশ। আকাশজুড়ে রঙের খেলা। একাকী ভাবনা। সময় যেন নীরবে বয়ে যায় বৃষ্টির ভেতর দিয়ে। মনের মাঝে শব্দরা পেখম মেলে সহসা। ভেজা দিন। ভেজা রাত। চারি দিকে গাছের পাতা বৃষ্টিতে ধুয়ে যেন আরো গাঢ় সবুজ হয়ে ওঠে। প্রকৃতির এই রূপ কবির মনের অন্তঃস্থলকে স্পর্শ করে। জীবনবোধের সাথে পরিচিত করায়। দেশজ ও গ্রামীণ বিভিন্ন শব্দ বুননের মাধ্যমে কবি জীবনানন্দ দাশ কবিতাকে প্রাণের করে তুলেছেন। ভোরের শিশিরের সৌন্দর্যের ব্যাকুলতা কবির কবিতাকে ভিন্ন মাত্রা এনে দিয়েছে। কবি বলেন, সূর্যের সমস্ত গোল সোনার ভেতরে/মানুষের শরীরের স্থিরতর মর্যাদার মতো/তার সেই মূর্তি এসে পড়ে।
বাংলার রূপ ছড়িয়ে আছে চারিদিকে। খাল-বিল, নদী, মাঠ ফসল ভরা ক্ষেত। থেকে থেকে শালিকের ডাক। কৃষকের ঘাম ঝরানো সুখ। মেঘের কোলে রোদের হাসি। নদীর বুকে বর্ষার পাল তোলা নৌকা। ছোট-বড় নানান পদের মাছে ভরে যায় নদীর বুক। জেলেদের জীবনে নেমে আসে নতুন আয়োজনের মেলা। এসবই প্রকৃতির সম্পদ। জীবনানন্দ মানুষের কবি। প্রকৃতির কবি। তিনি নির্জনতার কবি। তিনি রূপসী বাংলার কবি। কোনো দ্বিধা নেই। নেই কোনো শঙ্কা। তিনি কৃষকের ঘাম ঝরানো কষ্ট অনুভব করেছেন। খেত ভরা সোনার ফসলের চিত্র এঁকেছেন। গাছে গাছে চড়ে সোনার ছেলেদের দস্যিপনা দেখেছেন। গোলাভর্তি ধান। পুকুরভরা মাছ। এই তো প্রিয় দেশ আমাদের। প্রিয় বাংলাদেশ। তিনি প্রিয় এই জন্মভূমিকে ভালোবেসেছেন। তাই তো তিনি বলেন। বলেন দ্বিধাহীন। নদীর বুকজুড়ে সাদা বকদের উড়ে বেড়ানোর সুখ পেতে চান। কী সহজ উচ্চারণ! চাওয়ার তীব্রতা! ব্যাকুলতা। বাংলার এই রূপ দেখতে তিনি আবারো জন্মাতে চান। এই রূপ এই সুধা পেতে তিনি ফিরে আসতে চান। মানুষ হয়ে আসবেন। নয়তো আসবেন শঙ্খচিল বা শালিকের বেশে। তবুও তিনি আসবেন। বারবার ফিরে ফিরে আসবেন। প্রিয় জন্মভূমিতে। সোনার এই বাংলাদেশে। তাই তো কবি বলেন- আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে- এই বাংলায়/হয়তো মানুষ নয়- হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে,/হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে/কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়।
কবিতা অনেকেই লিখেছেন। বলেছেন কত কথা; কিন্তু তার পথ এক অবাক করা পথ। যে পথ টেনে নিয়ে যায় শৈশবের কাকডাকা ভোরে। প্রকৃতির সবুজ রঙ কবির ছিল ভীষণ প্রিয়। কতশত কবিতায় কবি সবুজ রঙকে টেনে এনেছেন। কাশ, কামিনী, কেয়া, অশোক, পলাশ, বাবলা, জুঁই, চামেলি, চন্দ্রমল্লিকা, আপেল, ডালিম, নারকেল, সুপারিসহ কত শ’ রঙিন ফল-ফুলের ছবি এঁকেছেন। আরো বলেছেন পাহাড়, সমুদ্র, চাঁদ, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্রসহ দিন-রাত্রির কথা। তার ভাবনা ছিল গভীর। তার চিন্তা ছিল শৈল্পিক। মানবিক একটি মনও ছিল তাঁর। তাঁর কল্পনা ছিল বিস্তৃত। তাই তো তিনি পেরেছেন সোনার বাংলার রূপকে তুলে ধরতে। সভ্যতার সাথে রঙের যে সম্পর্ক তা সুপ্রাচীন। কবিতার সাথেও রঙের সম্পর্ক সুদূরপ্রসারী। তাই তো কালের সাক্ষী হয়ে আজো তাঁর কবিতার ঘ্রাণ পাওয়া যায়। কবিতার বুকজুড়ে পাই ফেলে আসা পথ। পাই পুরনো দিনের গন্ধ। পাই সুখুসুখ স্মৃতির মেলা। প্রকৃতির নিসর্গরূপ নিয়ে তিনি লিখেছেন। রচনা করেছেন গান। কবি বলেন-
আমাদের পৃথিবীর বনঝিরি নদী/হিজল বাতাবি নিম বাবলায় সেখানেও খেলা/করছে সমস্ত দিন; হৃদয়কে সেখানে করে না অবহেলা,/ফেনিল বুদ্ধির দৌড়; আজকের মানবের নিঃসঙ্গতা যদি/সেসব শ্যামল নীল বিস্তারিত পথে/হ’তে চায় অন্য কোনো আলো কোনো মর্মের সন্ধানী,/মানুষের মন থেকে কাটবে না তা’হলে যদিও সব গ্লানি/তবু আলো ঝল্কাবে অন্য এক সূর্যের শপথে।
কোনো একজন কবি বলেছিলেন- যদি কারো ভেতর পৃথিবীর খোঁজ করো তবে রঙ খোঁজো। জীবনানন্দের পুরো কাব্যে রঙের খোঁজ করলে দেখা যায় পাণ্ডুর ও ধূসর রঙের ব্যবহার। এ রঙ ছেয়ে আছে কবিতার বুকজুড়ে। মনে হয় যেন এর সাথে মিলেমিশে এক হয়ে আছেন কবি। পেঁচার ধূসর ডানা, ধূসর নদী, অনেক ধূসর ঘোড়া এমন অনেক রকম ব্যবহার। বিলুপ্ত জীবনের দুঃখবোধের মানচিত্র। অন্ধকারকে সবারই ভয়। অথচ একসময় এই অন্ধকারেই মিশে যেতে হয় সবাইকে। হবেও এমনই। তবে কিসের ভয়। কেন এত উৎকণ্ঠা। বরং অন্ধকারের নিজস্ব ভাষা জানা জরুরি। কবি ‘বনলতা সেন’ কাব্যের ‘অন্ধকার’ কবিতায় অন্ধকারকে রোমান্টিক ও প্রেমময় করে লিখেন, গভীর অন্ধকারের ঘুম থেকে নদীর ছল ছল শব্দে জেগে উঠলাম আবার/তাকিয়ে দেখলাম পাণ্ডুর চাঁদ বৈতরণীর থেকে তার অর্ধেক ছায়া/গুটিয়ে নিয়েছে যেন/কীর্তিনাশার দিকে। আহা কী উচ্চারণ! কী তার অনুভব! এমনই একজন কবি জীবনানন্দ দাশ। তিনি অন্ধকারকে ভালোবাসতেন। যেখানে চিরনিদ্রায় কাটবে জীবন। জীবন সর্বদা রহস্যঘেরা। সৃষ্টির রহস্য ও জীবনবোধ নিয়ে ভাবনা কবিকে অন্য এক মাত্রায় আলোকিত করেছে। তিনি রঙ-রূপ-গন্ধ ও স্পর্শে কবিতাকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছেন। মানুষের জন্য রেখে গেছেন জীবন শিক্ষা। যার কাছে ফিরে যেতে হবে আমাকে-তোমাকে। সবাইকে। এ পৃথিবীর মায়ায় আমরা ক্ষণিকের অতিথি মাত্র। কী এক মাদকতায় স্পষ্ট উচ্চারণে কবির কণ্ঠে বেজে উঠে-
স্বপ্নের ধ্বনিরা এসে বলে যায় : স্থবিরতা সবচেয়ে ভালো;/নিস্তব্ধ শীতের রাতে দীপ জ্বেলে/অথবা নিভায়ে দীপ বিছানায় শুয়ে/স্থবিরের চোখে যেন জমে ওঠে অন্য কোনো বিকেলের আলো।/সেই আলো চিরদিন হয়ে থাকে স্থির,/সব ছেড়ে একদিন আমিও স্থবির হয়ে যাব;/সেদিন শীতের রাতে সোনালী জরির কাজ ফেলে/প্রদীপ নিভায়ে রবো বিছানায় শুয়ে/অন্ধকারে ঠেস দিয়ে জেগে রবো/বাদুড়ের আঁকাবাঁকা আকাশের মতো।/স্থবিরতা, কবে তুমি আসিবে বলো তো।
