‘শুয়েছে ভোরের রোদ ধানের উপরে মাথা পেতে/অলস গেঁয়োর মতো এইখানে কার্তিকের ক্ষেতে/মাঠের ঘাসের গন্ধ বুকে তার- চোখে তার শিশিরের ঘ্রাণ/ তাহার আস্বাদ পেয়ে অবসাদে পেকে ওঠে ধান।’
বাংলাদেশে বহুকাল ধরে লক্ষ্য করা যায় ঋতুবৈচিত্র্যের পালাবদল। যদিও বাংলায় ছয়টি ঋতুর দেখা মিলত, ছয় ঋতু ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন রূপের পসরা নিয়ে হাজির হতো। কিন্তু আমাদের এ গর্বের আবহাওয়া ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে কালের গর্ভে। আমরা অথবা আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো সেসব সৌন্দর্য আর অনুভব করতে পারবে না, যতটা আমরা পেয়েছি শৈশবে। মক্তবে যেতে যেতে কুয়াশার ভেতর হারিয়ে যাওয়া। কুয়াশা থেকে আরও অধিক কুয়াশার ভেতর! রূপকথার গল্পের মতো হয়ে যাচ্ছে আমাদের ফেলে আসা শৈশব। বড় মনে পড়ে আজকাল!
হেমন্তের আগমন ঘটে গেছে আমাদের এই সবুজের দেশে। এই ঋতুতেই কবি জীবানন্দ দাশ ভোরের কুয়াশাভেজা কাক হয়ে কিংবা শঙ্খচিল, শালিকের বেশে কার্তিকের নবান্নের দেশে ফেরার আকাক্সক্ষা প্রকাশ করেছিলেন তার ধূসর পাণ্ডুলিপি বইয়ের কবিতায়। এখন কার্তিকের শুরু। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ নিয়ে চিরায়ত হেমন্তের রুপালি যাত্রা। মাঠে মাঠে দূর্বা ঘাসে, কাঠবৃক্ষের পাতার ডগায় এবং প্রকৃতিতে কুয়াশার স্পর্শ নিয়ে হেমন্তের অবগাহন। সজনে গাছের নাঙা পাতা চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে শিশিরের ফোটা। শীতের কোমল পরশ। গ্রামে গ্রামে প্রজাপতির ডানায় ভর করে সন্ধ্যা নামতেই শীত শীত মিষ্টি অনুভূতি কি যে ভালো লাগে! আধুনিকতার হাত ধরে পরিবর্তনের প্রতিযোগিতায় ব্যাপৃত ইট–পাথরের ব্যস্তনগরীতে সেসবের ছিটেফোঁটাও নেই। ফলত জীবনানন্দের মতোই নবান্নের দেশে ফিরার সুর ওঠে মনে।
‘আমলকী বন কাঁপে যেন তার/বুক করে দুরু দুরু/পেয়েছে খবর পাতা খসানোর/সময় হয়েছে শুরু/শিউলির ডালে কুঁড়ি ভরে এলো/টগর ফুটিল মেলা/মালতীলতায় খোঁজ নিয়ে যায়/মৌমাছি দুই বেলা।’
ঋতুর পালাবদলে ভিন্ন ভিন্ন ফুলের সৌন্দর্যে সেজে ওঠে বাংলা। বাংলাদেশের মতো ঋতুবৈচিত্র্যের এমন আশ্চর্য সুন্দর হয়তো পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে নেই। ঋতুতে ঋতুতে ফুলবনে ফোটে বিভিন্ন ফুল। জুঁই, চামেলী, জবা, শিমুল, শিউলি কিবা শেফালী- নানান জাতের ফুল সাজিয়ে তোলে ঋতু। শিউলি যদিও শরতের ফুল, তবে হেমন্তেও এই ফুল ফোটে, ঝরে। হেমন্তও বঞ্চিত হয় না শিউলির শোভা সৌরভ থেকে। কার্তিকের শুরুতে কম ফুটলেও মাসের শেষের দিকে গাছের ডালে ডালে ফুলের সংখ্যা বাড়ে। সন্ধ্যায় ফোটা এই ফুল সকালে সূর্যির ছোঁয়া পাবার আগেই ঝরে পড়ে ভোরকে অভিবাদন জানায়। শিউলি মূলত আলো নিয়ে আসে ভোরের কোমল পৃথিবীতে। আশ্চর্য রকম এক সৌন্দর্যের সৃষ্টি হয়! ফুলে ফুলে বেড়ে যায় মৌমাছির সফর। এভাবেই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বর্ণনায় উঠে আসে শিউলির অনুষঙ্গ। রবীন্দ্রনাথের এসব লেখনি শিউলির মতোই সুরভিত হয়ে আছে পাঠক কিংবা শ্রোতাদের মনে।
