বেগম রোকেয়ার সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য হয়েছে সমকালীন বাঙালি মুসলিম সমাজের বৈষম্য-কুসংস্কার-অজ্ঞতা। তার সাাহিত্যের অগ্নিশিখায় উদ্ভাসিত নারীসমাজ। সাহিত্যের পাশাপাশি নারীসঙ্ঘ গঠন, নারীশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনসহ সমাজ উন্নয়নমূলক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
বেগম রোকেয়ার সমকালে কুসংস্কার ও অজ্ঞতার কারণে বাঙালি মুসলিম নারীসমাজ শিক্ষা-দীক্ষায় বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেনি। এ সময় লেখাপড়ার পরিবর্তে মেয়েদেরকে ঘরকন্না শেখানোর দিকে পিতা-মাতার আগ্রহ ছিল বেশি। সমকালীন নারীসমাজের দুঃখ-দুর্দশার জন্য নারীশিক্ষার প্রতি উদাসিনতাকেই দায়ী করেছেন তিনি। এ করুণ অবস্থা উল্লেখ করে বেগম রোকেয়া আমাদের অবনতি প্রবন্ধে লিখেন, ‘...আমরা আলস্যের, প্রকারান্তরে পুরুষের দাসী হইয়াছি। ক্রমে আমাদের মন পর্যন্ত দাস (বহংষধাবফ) হইয়া গিয়াছে। এবং আমরা বহুকাল দাসীপনা করিতে করিতে দাসত্বে অভ্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি। এইরূপে আমাদের স্বাবলম্বন, সাহস প্রভৃতি মানসিক উচ্চবৃত্তিগুলো অনুশীলনের অভাবে বারবার অঙ্কুরে বিনাশ হওয়ায় এখন আর বোধ হয় অঙ্কুরিত হয় না।’ বাঙালি মুসলিম নারীসমাজের এহেন করুণ দশা দেখে ব্যথিত হয়ে তিনি নারীসমাজকে উদ্ধার করতে প্রথমেই নারীশিক্ষার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। নারীশিক্ষার প্রতি উদাসিনতাকেই তিনি নারীসমাজের দুঃখ-দুর্দশার মূল কারণ উল্লেখ করে বঙ্গীয় নারী শিক্ষা সমিতির সভার অভিভাষণে বলেন, ‘মুসলমানদের যাবতীয় দৈন্য-দুর্দশার একমাত্র কারণ স্ত্রীশিক্ষায় ঔদাস্য’। এ হেন অবস্থা থেকে মুসলিম সমাজ-জাতির উন্নতির লক্ষ্যে তিনি নারীশিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে ১৯০৪ সালে নবনূর পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধে লিখেন, ‘আমরা উচ্চশিক্ষা প্রাপ্ত না হইলে সমাজও উন্নত হইবে না।...তাই আমাদিগকে সব ধরনের জ্ঞান চর্চা করিতে হইবে।’
নারী-পুরুষের সমন্বয়েই মানবসমাজ। তাই মানবসমাজের উন্নয়নের জন্য নারী ও পুরুষ উভয় শ্রেণীর উন্নয়নের প্রয়োজন। এক শ্রেণীকে অবনত রেখে অপর শ্রেণী উন্নত হলে সমগ্রসমাজ উন্নয়ন হয় না। এ বিষয়টি যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বেগম রোকেয়া। কিন্তু সমকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীদের উন্নয়নের যথার্থ চিন্তাভাবনা ছিল না। অধিকন্তু নারীদের জন্য ছিল অবজ্ঞা-অবহেলা, সমাজের এ ভুল অপনোদনে বেগম রোকেয়া আমাদের অবনতি প্রবন্ধে লিখেন, ‘আমরা সমাজেরই অর্ধঅঙ্গ। আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কিরূপে? কোনো ব্যক্তির এক পা বাঁধিয়া রাখিলে, সে খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষদের স্বার্থ এবং আমাদের স্বার্থ ভিন্ন নহে- একই।’
নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য নারীদের রূপচর্চার পরিবর্তে জ্ঞানচর্চার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বেগম রোকেয়া। এ জন্য তিনি বোরকা প্রবন্ধে মেয়েদের অলঙ্কার ছেড়ে জ্ঞানচর্চার আহ্বান জানিয়ে লিখেছেন, ‘নারীর শোভন-অলঙ্কার ছাড়িয়া জ্ঞানভূষণ লাভের জন্য ললনাদের আগ্রহ বৃদ্ধি হওয়া বাঞ্ছনীয়।’ নারীশিক্ষাবিরোধী কথিত আলেমদের বিরুদ্ধাচারণ করে এবং নারীশিক্ষা ইসলামের ধর্র্মীয় নির্দেশ প্রমাণ করতে তিনি নারীশিক্ষা সমিতি প্রবন্ধে লিখেন, ‘পৃথিবীর যিনি সর্বপ্রথম পুরুষ-স্ত্রীলোককে সমভাবে সুশিক্ষা দান করা কর্তব্য বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন তিনি আমাদের রসূল মকবুল স.।’
বেগম রোকেয়া নারীসমাজে যেমন শিক্ষার চেতনা জাগ্রত করেছেন তেমনি নারীশিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ১৯০৯ সালে সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গালর্স স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন। অনেক বাধাবিঘœ অতিক্রম করে বাঙালি মুসলিম সমাজের শিক্ষা বিস্তারে এ প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়া তিনি ১৯১৬ সালে আঞ্জুমানে খাওয়াতীনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুসলিম নারীসমাজকে সঙ্ঘবদ্ধ করেছেন।
বেগম রোকেয়ার সমকালে অফিস-আদালতে নারীদের কাজ করার কথা বাঙালি মুসলিম সমাজ চিন্তা করতেই পারত না। তৎকালীন বাঙালি মুসলিম নারীসমাজের যথার্থ মর্যাদা ও স্বাধীনতা ছিল না।
স্ত্রীর নিজস্ব কোনো চিন্তা ও ইচ্ছা ছিল না। অথচ ইসলামই নারী জাতিকে দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে যথাযথ মর্যাদা দিয়েছে, নারীজাতির চেতনা জাগিয়েছে। এ প্রসঙ্গে নারীমুক্তি দাতারূপে হজরত মুহাম্মদ সা:-এর বিশেষ ভূমিকা উল্লেখ করে বেগম রোকেয়া অর্দ্ধাঙ্গী প্রবন্ধে লিখেন, ‘আরবে স্ত্রীজাতির প্রতি অধিক অত্যাচার হইতে ছিল, আরববাসী কন্যা হত্যা করিতেছিল তখন হজরত মুহাম্মদ সা: কন্যাকুলের রক্ষকস্বরূপ দণ্ডায়মান হইয়া ছিলেন। তিনি কেবল বিধিব্যবস্থা দিয়াই ক্ষান্ত থাকেন নাই, স্বয়ং কন্যা পালন করিয়া আদর্শ দেখাইয়াছেন।’
সমকালীন নারী-পুরুষের শিক্ষা ও জ্ঞানের ব্যাপক বৈষম্য উল্লেখ করে বেগম রোকেয়া ব্যথিত হৃদয়ে নারীসমাজকে জাগ্রত করার প্রয়াস চালিয়ে লিখেন, ‘স্বামী যখন পৃথিবী হইতে সূর্য ও নক্ষত্রের দূরত্ব মাপেন, স্ত্রী তখন একটা বালিশের ওয়ারের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ (সেলাই করিবার জন্য) মাপেন! স্বামী যখন কল্পনা-সাহাযে সুদূর আকাশে গ্রহ-নক্ষত্রমালা বেষ্টিত সৌরজগতে বিচরণ করেন, সূর্যমণ্ডলের ঘনফল তুলাদণ্ডে ওজন করেন এবং ধূমকেতুর গতি নির্ণয় করেন, স্ত্রী তখন রন্ধনশালায় বিচরণ করেন, চাল-ডাল ওজন করেন এবং রাঁধুনির গতি নির্ণয় করেন।’
পুরুষ সমাজের অনুগ্রহ নারীসমাজের জন্য অকল্যাণ মনে করে তিনি নারীসমাজকে পুরুষের অনুগ্রহ নির্ভর না হয়ে নিজস্ব স্বকীয়তায় বলীয়ান হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আমাদের অবনতি প্রবন্ধে লিখেন, ‘ফলত তাহারা যে অনুগ্রহ করিতেছে তাহাতেই আমাদের সর্বনাশ হইতেছে। আমাদিগকে তাহারা হৃদয় পিঞ্জরে আবদ্ধ করিয়া জ্ঞান-সূর্যালোক ও বিশুদ্ধ বায়ু হইতে বঞ্চিত রাখিয়াছেন, তাহাতেই আমরা মরিতেছি।’ তবে তিনি শুধু পুরুষদের সমালোচনা না করে প্রতিকারের জন্য নারীদের সক্ষমতা অর্জনের পরামর্শ দিয়ে রাণী ভিখারিনী প্রবন্ধে লিখেন, ‘অযোগ্য বলার জন্য রাগ না করিয়া যোগ্য হইবার চেষ্টা করাই শ্রেয়।’
বেগম রোকেয়া বাঙালি নারীসমাজের মুক্তির লক্ষ্যে সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন। নারীসমাজকে জাগ্রত করতে তিনি প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত মসিযুদ্ধ চালিয়েছেন। তিনি নির্যাতিত ও অসহায় নারীসমাজকে পুরুষের অত্যচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রেরণা ও শক্তি জুগিয়েছেন। তিনি পুরুষের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে নারীসমাজকে অধিকার আদায়ের আহ্বান জানিয়েছেন। পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনের জন্য নারীসমাজকে সামাজিক বাধা উপেক্ষা এবং কঠোর পরিশ্রমের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “পুরুষের সমকক্ষতা অর্জনের জন্য আমাদিগকে যাহা করিতে হয়, তাহাই করিব। আবশ্যক হইলে লেডি কেরানী হইতে আরম্ভ করিয়া লেডি-ম্যাজিস্ট্রেট, লেডি-জজ, লেডি-ব্যারিস্টার সবই হইব। পঞ্চাশ বছর পর লেডি ঠরপবৎড়ু হইয়া এ দেশের সব নারীকে ‘রাণী’ করিয়া ফেলিব।” প্রকৃতপক্ষেই বাঙালি নারীকে রাণী করার তার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়েছে। বাঙালি নারী আজ রাণীতেই পরিণত হয়েছেন। বাঙালি মুসলিম নারীসমাজের এ উন্নতি-অগ্রগতির নেপথ্যে বেগম রোকেয়ার সাহিত্য কর্মের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।