নজরুল তারুণ্যের কবি। তারুণ্যের সাধনা তার সাহিত্যের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। শ্রীচৈতন্যকে নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের মন্তব্যটিকে একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, ‘বাংলা সাহিত্যে যৌবন একবারই মাত্র রূপ ধরে এসেছিল; আর সেই রূপের শরীর ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম।’ নজরুলের সক্রিয় সাহিত্যকালে শ্রেষ্ঠ রচনাগুলো রচিত হয়েছিল কবির ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। জীবন পরিক্রমায় নিঃসন্দেহে এ সময়টিকে যৌবনকাল বা তারুণ্য বলা যায়। তবে, বয়সের মধ্যে তারুণ্যকে আটকে রেখে প্রাসঙ্গিক এ আলোচনার বিভ্রান্তি দূর সম্ভব না। সাহিত্যে তারুণ্য কিংবা যৌবনকে সব সময় ইতিবাচকভাবে দেখা হয় না। যদিও তরুণ এবং তারুণ্যের মধ্যে গুণ এবং অর্থগত পার্থক্য রয়েছে তবু তরুণকে অবলম্বন করে তারুণ্য গুণ বিকশিত হয়। আর তরুণকালটি জীবনের প্রথম পর্যায়-যেখানে মানবজীবনের অভিজ্ঞতার অপূর্ণতা কল্পনার দ্বারা পল্লবিত হয়। কল্পনা সাহিত্যের সূতিকাগার হলেও ভাষাশৈলী ও বিষয়ের মিলনের জন্য দরকার পাঠ ও অভিজ্ঞতা। নজরুলের তারুণ্য কেবল একক কোনো ভাববিলাসী কবির আকাশ-কুসুম রচনা নয়। তার তারুণ্যকে আবিষ্কার করতে হবে কালের চরিত্র ও মানস-পটের ভেতর। ২০ শতকের একেবারে সূচনা পর্বে নজরুল জন্মগ্রহণ করেছিলেন। নজরুল-জন্ম সে সমাজের আর ১০টি সাধারণ শিশুর জন্ম থেকে ভিন্ন না হলেও ভারতবর্ষের সময়কাল এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে এগুচ্ছিল- যার একটি সমবায়ী কণ্ঠস্বর কোথাও ঘনীভূত হয়ে উঠছিল। ২০ শতকে ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক শাসনের দুষ্টচক্রের ফলে ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয় ছাড়াও নষ্ট জাতপাত ও সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ঘটে। সেই নাগপাশ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনুশীলন, যুগান্তর কিংবা স্বদেশী আন্দোলনে তরুণ সমাজ তত দিনে আত্মাহুতির প্রস্তুতি শুরু করে। এসব চরমপন্থী আন্দোলনের মাধ্যমে এ-ও প্রমাণিত হয়েছিল যে, জাতীয় কংগ্রেসের প্রবীণ নেতাদের কেবল অহিংস নীতি স্বাধীনতা আনতে পারবে না। সহিংস আন্দোলন এবং মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এ সত্য প্রমাণিত হয়, কেবল তরুণরাই এ ধরনের আন্দোলনের নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। নিকট অতীতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধও তার ব্যতিক্রম নয়। সুতরাং নজরুল-কাব্যে আমরা যে তারুণ্যের সাক্ষাৎ পাই, তা কেবল তরুণ কবির ভাব-কল্পনার কাব্যবিলাস নয়। বুদ্ধদেব বসু নজরুলকে বলেছিলেন, ‘অসহযোগের অগ্নিদীক্ষার পরে সমস্ত মনপ্রাণ যা কামনা করছিল, এ যেন তা-ই; দেশব্যাপী উদ্দীপনার এ-ই যেন বাণী।’
নজরুল তারুণ্যের এই পটভূমিকাটুকু সত্য যে, নজরুল প্রকৃতই একটি যুদ্ধাবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার জন্মের প্রায় দেড়শ বছর আগে ভারতের শাসনভার নিয়েছিল ইংরেজ জাতি। অন্য দেশের ধনসম্পদে নিজের জাতকে পরিপুষ্ট করে তোলা ছিল যাদের প্রধান নীতি। তারা এই নীতির বাস্তবায়ন করেছিল তাদের এ দেশীয় সহযোগী আর সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি দ্বারা। এ অবস্থা কেবল ভারতেই ছিল এমন নয়। নজরুলের জন্মের সময় পৃথিবীর প্রায় আশি শতাংশ ভূভাগ ছিল তাদের দখলে। সাগরপাড়ের এসব ‘সভ্যের বর্বর লোভে’র কারণে বিশ্বব্যাপী প্রথম যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় তখন নজরুলের বয়স সবে পনেরো। নজরুলের সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া, হাবিলদার হওয়া এই পরিস্থিতির ফল। সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার পেছনে এই কারণ অস্বাভাবিক নয় যে, যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ভারত স্বাধীনতার কাজে লাগানো। তার পক্ষপাতিত্ব ছিল দেশের জন্য আত্মত্যাগী ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বসন্ত বিশ্বাসের মতো নেতাদের প্রতি।
১৯২২ সালে যখন নজরুলের অগ্নিঝরা কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নি-বীণা’ প্রকাশিত হচ্ছে তখন তার বয়স ২৩ বছরের কাছাকাছি। নজরুল এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করছেন বারীন্দ্রকুমার ঘোষকে। উৎসর্গপত্রে বলেছেন- ‘ভাঙা-বাংলার রাঙাযুগের আদি পুরোহিত, সাগ্নিক বীর বারীন্দ্রকুমার ঘোষ শ্রী চরণারবিন্দেষু।’ উৎসর্গপত্রের কবিতাতেও তিনি বলতে চেয়েছেন তার এই কবিতাও সেই ‘সর্বনাশা বাঁশি’- যা এই বিপ্লবীকেই মানায়। বারীন্দ্রের আহ্বানে উদ্বুদ্ধ হয়ে ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকী যখন কিংসফোর্ড হত্যার উদ্যোগ গ্রহণ করেন তখন তাদের বয়স ১৮/১৯-এর বেশি নয়। কিংসফোর্ড হত্যা সফল না হলেও তাদের কর্মের প্রভাব কিশোর তরুণদের মধ্যে থেকে যায়। এ সময়ে নজরুলের বয়স ছিল ৯ বছর। হয়তো তখন থেকেই এই ৯ বছরের শিশু নিজেকে দেশের জন্য শহীদ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন, যে কারণে আর কখনো তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এ ছাড়া ঘটনার প্রায় ১৪ বছর পরে বারীন্দ্র ঘোষকে বই উৎসর্গ করার আর কোনো কারণ ছিল বলে মনে হয় না। ততদিনে বারীন্দ্র সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন ত্যাগ করে ভাই অরবিন্দর পণ্ডিচেরী আশ্রমে থাকতে শুরু করেছেন। এই আন্দোলনের প্রতি নজরুলের এমনই সমর্থন ছিল যে, অরবিন্দ ঘোষ সন্ত্রাসবাদ ত্যাগ করে আশ্রমবাসী হলে নজরুল ‘আনন্দময়ীর আগমন’-এ লেখেন, ‘মহেশ্বর আজ সিন্ধুতীরে যোগাসনে মগ্ন ধ্যানে,/ অরবিন্দ চিত্ত তাহার ফুটবে কখন কে সে জানে।’ আর এই কবিতাটি যে কিংসফোর্ড হত্যা পরিকল্পনার চেয়ে কম ছিল না তা ইংরেজ সরকার বুঝিয়ে দিয়েছিলেন- ধূমকেতু বাতিল করে, নজরুলকে গ্রেফতার এবং এক বছরের জেল দিয়ে। এমনকি নজরুল এই কবিতাটি পরবর্তীকালেও কোনো গ্রন্থে রাখতে পারেননি।
নজরুল ছিলেন রোম্যান্টিক মানস-চেতনার অধিকারী। এমনকি তার বিখ্যাত ‘বিদ্রোহী’ কবিতা আঙ্গিক ও বিষয়-সৌন্দর্য বাংলা কবিতায় ভাস্বর উদাহরণ হলেও নজরুলের ব্যক্তিগত বিদ্রোহ পরিকল্পিত ও সুদূরপ্রসারী ছিল না। যে কারণে, মার্কসবাদ কিংবা তৎকালীন রাজনীতিবিষয়ক অল্প-বিস্তর জ্ঞান ও যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে একনিষ্ঠ পার্টি-সদস্য রূপে হাজির করেননি। বন্ধু মুজফফর আহমদের সান্নিধ্যে তার কবি-জীবন পার্টিজীবনে পরিণত হয়নি। তিনি ভারতবর্ষের এমন একটা স্থিতি অবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেমনটি ব্রিটিশ আসার আগে বজায় ছিল। এ দিক দিয়ে তার চেতনাকে সর্বৈব দেশজ ও উপনিবেশমুক্ত বলা যায়। তবে, পরিণামে তার চেতনা রোম্যান্টিকতায় মিলিয়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। আবার নজরুলের এই রোম্যান্টিকতাকে অনেকে ইংরেজি সাহিত্যের রোম্যান্টিকতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছেন। বিশেষ করে আঠারো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে যে বায়রনিক রোম্যান্টিকতার সূচনা হয় শেলি, কিটস ও কোলরিজের মধ্যে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে। এই রোম্যান্টিক ইংরেজ কবিদের সাথে নজরুলের আশ্চর্য এক মিল লক্ষ্য করা যায়। নারীপ্রেম ও দেশাত্মপ্রেমের কবিতাকে তাঁরা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায়। এমনকি জীবনের শুরুতেই তারা সব উজাড় করে পৌঢ়ত্বপ্রাপ্তির আগেই জীবনের পাঠ চুকিয়ে দেন। এদের মধ্যে কিটস ছাব্বিশ, শেলি তিরিশ, বায়রন ছত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন। কোলরিজ কিছুদিন বেশি বেঁচে থাকলেও যৌবনেই কাব্যশক্তি হারিয়ে ফেলেন। নজরুলও ছিলেন ইংরেজ রোম্যান্টিক যুগের কবিদের মতো ট্র্যাজেডির নায়ক। যে কারণে অনেকেই মনে করে থাকেন, সম্ভবত নজরুল ইংরেজ এই রোম্যান্টিক কবিদের ভালো করে পড়েছিলেন; এমনকি তাদের দ্বারা কিছুটা উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯২৯ সালের এক অভিভাষণে কবি বলেন, ‘এ কথা স্বীকার করতে আজ আমার লজ্জা নেই যে, আমি শক্তি-সুন্দর রূপ-সুন্দরকে ছাড়িয়ে আজও উঠতে পারিনি। সুন্দরের ধেয়ানী দুলাল শেলির মতো আমারও মন্ত্র- ‘নবধঁঃু রং ঃৎঁঃয, ঃৎঁঃয রং নবধঁঃু’। ইংরেজ রোম্যান্টিক যুগের কবি পিবি শেলির হবপবংংররঃু ধঃযবরংস, ঢ়ৎড়সবঃযঁং ঁহনড়ঁহন নজরুলের ভালো করে পড়া ছিল। ‘বর্তমান বিশ্ব-সাহিত্য’ প্রবন্ধে তিনি এই সব রোম্যান্টিক কবিদের কথা উল্লেখ করেছেন। ইংরেজ রোম্যান্টিক যুগের কবিরা নজরুলকে প্রভাবিত করেছিলেন এ প্রস্তাবনা নজরুল জীবনের সাথে খাপ খায় না। কারণ ইংরেজ মডেলের আধুনিকতার সাথে নজরুলের গভীর কোনো যোগাযোগের কারণ ছিল না। পিতৃহীন এক দরিদ্র বালক টিকে থাকার লড়াইয়ে লেটোগান থেকে রুটির দোকান, মক্তবের শিক্ষক থেকে পুরুতগিরি, জায়গিরবাড়ি থেকে সেনা-শিবির, বর্ধমান থেকে ত্রিশাল, শিয়ারসোল থেকে করাচি পর্যন্ত ছুটে বেড়াচ্ছেন। বিদ্যা বলতে আরবি-ফারসি মিশ্রিত লেটোবাংলা, দশম শ্রেণী পর্যন্ত সর্বোচ্চ অ্যাকাডেমিক ডিগ্রি, চাকরিজীবনে সর্বোচ্চপ্রাপ্তি সেপাই থেকে হাবিলদার পদে উন্নীত হওয়া এবং মাত্র ২০ বছরের মধ্যে কবি হিসেবে সর্বোচ্চ খ্যাতি অর্জন। আজ নতুন করে ভাবার সময় এসেছে এ ধারার কবিতায় শেলি, কিটস, হুইটম্যান কিংবা বিপরীতার্থে রুডিয়ার্ড কিপলিং- কত দিক থেকে কে বেশি প্রাসঙ্গিক। ইংরেজ রোম্যান্টিক কবিদের প্রসঙ্গ আসার কারণ কেবল এ কথা বলা, নজরুলের সক্রিয় সাহিত্য রচনার কালও ছিল তাদের মতো স্বল্প। তারও চেতনায় ছিল কিটসের মতো সুন্দরের সাধনা। তাদের কবিতাতেও তারুণ্য বিদ্রোহ ছিল মূল প্রবণতা। কিন্তু নজরুলের ভাগ্য তাদের বরণ করতে হয়নি। তারা ছিলেন স্বাধীন দেশের নাগরিক, আমাদের পরাধীনতার জন্য তাদের দেশই দায়ী। নজরুলের বিদ্রোহের সাথে তাদের বিদ্রোহের এখানে মূল পার্থক্য। পরাধীন দেশে সুন্দরের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তার যৌবন বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
নজরুলের এই যৌবন কোনো দেশ-কালের গণ্ডি দ্বারা আবদ্ধ নয়। তার যৌবনের প্রতিমূর্তি আমরা দেখেছি একাত্তরে, মুক্তির সমরে। তরুণ মুক্তিসেনাদের বুকের বল হয়ে সেদিন নজরুলের গান-কবিতা লড়াইয়ের ময়দানে শত্রুর বুক প্রকম্পিত করেছিল। তরুণের সংগ্রাম কখনো শেষ হয় না। যেভাবে প্রতি বছর কালবোশেখি ঝড় এসে পুরনোকে লণ্ডভণ্ড করে নতুন সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি করে। সেভাবে তরুণরাও তার কালের জঞ্জাল দূর করে পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলে। নজরুলের তারুণ্য যত দিন আমাদের আন্দোলিত করবে, পরার্থপরতায় উদ্বুদ্ধ করবে, তত দিন আমরা সহসা পেরিয়ে যাব- ‘দুর্গম গিরি, কান্তারমরু, দুস্তর পারাবার।’
[বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়]
নজরুল তারুণ্যের কবি। তারুণ্যের সাধনা তার সাহিত্যের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। শ্রীচৈতন্যকে নিয়ে দীনেশচন্দ্র সেনের মন্তব্যটিকে একটু ঘুরিয়ে বলা যায়, ‘বাংলা সাহিত্যে যৌবন একবারই মাত্র রূপ...
