[গত সংখ্যার পর]
দুই.
বাংলা সাহিত্যের বিচিত্র আঙ্গিনা যার প্রতিভার আলোকচ্ছটায় হয়েছে আলোকিত, যার সাহিত্যসুধা আস্বাদনে পাঠক পেয়েছে পরিপূর্ণ তৃপ্তি। সাহিত্য পরিমণ্ডলের প্রতিটি স্তরে যিনি বিচরণ করেছেন সদর্পে। বিশ্ববাসীর সামনে বাংলা সাহিত্যকে তুলে ধরেছেন সগৌরবে। তার লেখনীর প্রতিটি শব্দ যেন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তুলির আঁচড়ে বেরিয়ে আসা এক একটি প্রাণ। রচনাজুড়ে তিনি গেছেন তারুণ্যের জয়গান। তিনিই আমাদের বিশ্বকবি, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-চিরসবুজ, চির যৌবনের কবি। রবীন্দ্রনাথ মনে-প্রাণে তরুণ ছিলেন। তরুণদের ওপর তার ছিল অন্তহীন ভরসা। জীবনের প্রত্যেকটি ভোর তার কাছে ছিল এক নতুন প্রাণ। জীবনের সব বেলায়, সব সময়ে নিজেকে ভেবেছেন তরুণ হিসেবে। ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতাটিতে কবি নিজেকে বলেছেন তরুণ বাউল। তিনি দুই শতাব্দীর মানুষ। পূর্ব ও পশ্চিমের সভ্যতাকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। দুই বিশ্বযুদ্ধ তার চোখের সামনেই ঘটেছে। শেষ জীবনে ‘সভ্যতার সঙ্কট’ও দেখে গেছেন। তবে, মনুষ্যত্বের গৌরবের ওপর আস্থা হারাননি। শেষ পর্যন্ত মানবতারই জয় হবে এই আশাবাদ বুকে ধারণ করেই তিনি এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। তার এই আশাবাদের উৎস ছিল স্বদেশী সমাজ, তার অন্তর্নিহিত শক্তি। আর এই শক্তিকে বিকশিত করার জন্য তার আস্থা ছিল তরুণ প্রজন্মের ওপর। কেননা, আজীবন তিনি তরুণদের চোখ দিয়েই বিশ্বকে দেখেছেন।
প্রতিনিয়ত তিনি জেগে উঠেছেন নব সৃষ্টির আশায়। তার ‘কবির বয়স’ কবিতাটিতে নিজেকে প্রকাশ করেছেন এভাবে : ‘কেশে আমার পাক ধরেছে বটে,/তাহার পানে নজর এত কেন?/পাড়ায় যত ছেলে এবং বুড়ো/সবার আমি একবয়সী জেনো।/ওষ্ঠে কারো সরল সাদা হাসি/কারো হাসি আঁখির কোণে কোণে,/কারো অশ্রু উছলে পড়ে যায়/কারো অশ্রু শুকায় মনে মনে,/ কেউ-বা থাকে ঘরের কোণে দোঁহে/জগৎ-মাঝে কেউ-বা হাঁকায় রথ,/কেউ-বা মরে একলা ঘরের শোকে/জনারণ্যে কেউ-বা হারায় পথ-/সবাই মোরে করেন ডাকাডাকি,/কখন শুনি পরকালের ডাক?/সবার আমি সমানবয়সী যে/চুলে আমার যত ধরুক পাক’’ : তারুণ্যের সাহসকে সদা জাগ্রত রাখতে, যুদ্ধে, সমরে অকুতোভয় তরুণকে এগিয়ে নিতে কবি তার ‘সুপ্রভাত’ কবিতায় বলেছেন : ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,/‘ভয় নাই, ওরে ভয় নাই-/নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই। তারুণ্যের, যৌবনের শক্তি মৃত্যুকে করে জয়, সত্যকে প্রতিষ্ঠায় সে নির্ভীক। তাই তো কবিগুরু সত্য, সুন্দরকে ভালোবেসে সারাটি জীবন ধারণ করেছেন তারুণ্য। নূতনেরে গ্রহণ করেছেন সানন্দে। নূতনকে জানা, আর তারই ছন্দে তাল মিলিয়ে চলার শক্তি সঞ্চয় করেছেন বারবার। পঁচাত্তর বছর বয়সে রচিত ‘পরিচয়’ কবিতায় তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন :’ ভাঁটার গভীর টানে/তরীখানা ভেসে যায় সমুদ্রের পানে।/নূতন কালের নবযাত্রী ছেলেমেয়ে/ শুধাইছে দূর হতে চেয়ে,/‘সন্ধ্যার তারার দিকে/বহিয়া চলেছে তরণী কে?’/সেতারেতে বাঁধিলাম তার,/গাহিলাম আরবার,/‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,/আমি তোমাদেরই লোক,/আর কিছু নয়-/এই হোক শেষ পরিচয়।’ এ কারণেই তিনি চিরনূতনের, চিরকালের চিরসুন্দর। প্রবীণদের ওপর তার আস্থা ছিলই না বলা চলে। অন্তত ‘সবুজের অভিযান’ কবিতাটি পড়লে তাই মনে হয়। ওই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ বেশ স্পষ্ট করেই নবীন প্রজন্মের ওপর তার গভীর আস্থার কথা প্রকাশ করেছেন। দেশকে ভালোবেসে কবি তরুণদের স্বদেশের জন্য কাজ করতে অনুপ্রাণিত করেছেন। সর্বদাই মন দিয়ে মানুষের প্রতি দৃষ্টিপাত করতে বলেছেন। যুবকদের আশার ক্ষেত্রকে আরো প্রসারিত করতে এবং তাদের স্বদেশ সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে পরামর্শ দিয়েছেন। একই সাথে প্রবীণদেরও খোলস ছেড়ে নবীনের পাশে এসে দাঁড়াতে বলেছেন। নবীনে-প্রবীণে মিলেই নৈরাশ্য বিসর্জনের উদ্যোগ নিতে বলেছেন।
তরুণদের আরো বলেছেন, ‘শুধু বড় জিনিস কল্পনা করিলেও হইবে না, বড় দান ভিক্ষা করিলেও হইবে না এবং ছোটমুখে বড় কথা বলিলেও হইবে না, দ্বারের পার্শ্বে নিতান্ত ছোট কাজ শুরু করিতে হইবে।’ সবশেষে তিনি তাদের ‘স্বদেশকে জানো ও তার জন্য কিছু করো’ এই আহ্বান জানিয়ে দশজনে মিলে দেশের ভাগ্য পরিবর্তনে উদ্যমী ও উদ্যোগী হতে বলেন। নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথের তারুণ্য বিষয়ক এসব কথা আজকের বাংলাদেশের জন্য খুবই প্রাসঙ্গিক। বর্তমানে মধ্যবিত্তেরও আয়-রোজগার কমে গেছে। নগরের বস্তিতে বস্তিতে দারিদ্র্য প্রকট হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের তরুণ সমাজের সংগঠিত হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। পুরো সমাজকে সচেষ্ট করে এই মহাদুর্যোগ মোকাবেলার জন্য তাদের স্বেচ্ছাশ্রমিকের ভূমিকা পালনের যে সুযোগ এসেছে তা যেন হেলায় না হারায় তারা। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গানের উদ্দীপনায় যারা অকাতরে প্রাণ দিয়েছে, তারা নিশ্চয় এই মহাসঙ্কটে বসে থাকতে পারে না। নবীনে-প্রবীণে মিলেই এই সঙ্কট মোকাবেলা করতে হবে।

সমকালীন বাংলা সাহিত্যে কবিতা তার নিজস্ব যোগ্যতা বলেই একটি বিশাল স্থান দখল করে আছে। কবিতা ছাড়া সাহিত্য অন্ধ, কবিতাহীন সাহিত্য অনুজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো। কবিতা একই সাথে কবির ভেতরে জন্ম নেয়া সবুজ বৃক্ষের সতেজতা জানান দেয় আর পাঠকের অনুভূতিকে ছুঁয়ে দেয় ফাগুনের প্রথম দখিনা পরশের মতোই। বর্তমান সময়ে কবিতার অবয়ব, উপস্থাপন ও পাঠপ্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এর সবচেয়ে বড় কারণ সময়ের সাথে পাঠকমনের পরিবর্তন আর সেই সাথে কবির দৃষ্টিভঙ্গিও। সময় সবচেয়ে বড় শিক্ষক। সময় বলে দেয় কোন পথে চলতে হবে। সমকালীন বাংলা কবিতা তার পথ চলার সীমানা বৃদ্ধি করতে পেরেছে। ইন্টারনেটের কল্যাণে পৃথিবীর যেখানেই বাংলা ভাষাভাষীর অবস্থান আছে সেখানেই সগৌরবে পৌঁছে গেছে বাংলা কবিতা, হয়তো অক্ষরের বুননে অথবা কোনো আবৃত্তিকারের মিষ্টি কণ্ঠে। কবিতায় এখন তারুণ্যের জয়গান। তরুণ কবিরা শব্দের বুননে প্রকাশ করছে নিজস্ব চিন্তাচেতনা। কবিদের সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে বটেই। তবুও সময়কেই ধারণ করছেন তারা কবিতায়। অনেক সমালোচক বিজ্ঞজন এই মিছিলকে না-বোধক সমালোচনা করেন। কেউ হয়তো কবিতার ব্যাকরণ মানছে না, ছন্দ-তালের পরোয়া করছে না, কেউ কেউ শব্দের শালীনতাকেও তোয়াক্কা করছে না একেবারেই। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সব ধরনের কবিতারই কিছু পাঠক পাওয়া যাচ্ছে। এটা আশার বিষয়। পাঠক না থাকলে কবিতা বাঁচবে কাকে নিয়ে? বাংলা কবিতার মিছিলে কোনো ধরনের কবিতাটিকে থাকবে বলা মুশকিল। আমার কাছে মনে হয় সাহিত্য আর পোশাকের ফ্যাশন যেন একই রকম। একসময় আমরা দেখেছি খুব পরিপাটি পোশাকই কেবল গ্রহণযোগ্যতা পেত। সময়ের সাথে রুচির বদল হয়েছে। পোশাকের ডিজাইনে ছেঁড়া ফাটা আর ফুটোও কদর পাচ্ছে। কেউ কেউ নাক সিঁটকালেও এই ফ্যাশন দিব্যি চলছে। অগ্রজ কবিগণকে হতাশা প্রকাশ করতে দেখেছি অনুজদের কাব্যচর্চার ধরন নিয়ে। কেউ কেউ বলে থাকেন, কবির সংখ্যা বাড়ছে বটে কিন্তু মানহীন এসব কবিতা সাহিত্যে বিরাট শূন্যতা তৈরি করতে পারে। গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে এসব কবিতা টিকবে না। কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে কবি লেখকদের পাশাপাশি পাঠকের ভূমিকাও মুখ্য। তবে, কবিমাত্রই মানবতা ও সমাজব্যবস্থার প্রতি দায়বদ্ধ। পাঠকের সামনে সেই লেখাই উপস্থাপন করতে হবে যার বার্তা দেশ জাতি ও বিশ্বব্যবস্থার জন্য হ্যাঁ বোধক বার্তা বহন করে। পাঠক সময়ের সাথে, সময়ের পথ ধরে চলবে। কিন্তু কোনটি সঠিক পথ, তার প্রকৃত বার্তা থাকা উচিত কবি সাহিত্যিকের শৈল্পিক রচনায়।

তিন.
কবিতা যে মানুষ-মানবতা, জীবন বোধ, মানুষের দুঃখ-দুর্দশার ছবি, সমাজের প্রতিছবি, অন্যায়-অবিচারের কথা, সমাজের চিত্র, শোষণ আর অপশাসনের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে তা দেখিয়েছেন সুকান্ত। তার কবিতায় ধারণ করেছেন সময়কে। শৈশব থেকেই সাহিত্য-সৃষ্টির প্রতি সুকান্তর আগ্রহ দেখা যায়। ৯-১০ বছর বয়সে অনেক ছড়া লিখেছেন। সে সময়েই সর্বমহলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সুকান্তর শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতার কমলা বিদ্যামন্দিরে। পরে তিনি বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলে ভর্তি হন। কমলা বিদ্যামন্দির স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্ররা হাতে লেখা একটি পত্রিকা বের করে। সুকান্ত এই পত্রিকার নাম দিলেন ‘সঞ্চয়’। এখানে সুকান্তের লেখা একটি হাসির গল্পও প্রকাশ পায়। এ সময় বিদ্যালয়ে ‘ধ্রুব’ নাটিকার নাম-ভূমিকায় অভিনয়ও করেন। তবে, সুকান্তর প্রথম মুদ্রিত লেখা প্রকাশিত হয় বিজন কুমার গঙ্গোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘শিখা’ পত্রিকায়, বিবেকানন্দের জীবনী। লেখা প্রকাশের পর লেখালেখির প্রতি তার আগ্রহ আরো বেড়ে যায়। ১১ বছর বয়সে সৃষ্টি করলেন রূপক গীতিনাট্য ‘রাখাল ছেলে’।
বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুলে সপ্তম শ্রেণীতে পড়াকালীন কবি অরুণাচল বসুর সহযোগিতায় ‘সপ্তমিকা’ নামক একটি হাতে লেখা পত্রিকা সম্পাদনা করেন। সুকান্তের সাহিত্য-সাধনার মূল ক্ষেত্র ছিল কবিতা। তার কবিতায় সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম, যন্ত্রণা ও বিক্ষোভ ছিল প্রধান বিষয়বস্তু। তার রচনাকর্মে শ্রেণিসংগ্রাম, গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষার বাণীসহ শোষণহীন এক নতুন সমাজ গড়ার অঙ্গীকার উচ্চারিত হয়েছে। রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কবিতার বৈপ্লবিক ভাবধারাটি যাঁদের রচনায় সমৃদ্ধি হয়েছে, সুকান্ত তাদের অন্যতম। তার কবিতার ছন্দ, ভাষা, রচনাশৈলীও নিখুঁত।
‘কবিতা তোমায় দিলাম আজকে ছুটি, ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময় : পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি...।’ এ রকম অভূতপূর্ব উপমার পাশাপাশি বিপ্লবী অভিব্যক্তি দিয়ে যিনি কবিতার বুনন গেঁথেছেন। কাব্যচর্চার সময় তার খুব দীর্ঘ না থাকলেও তার কবিতা পাঠকের কাছে আগ্রহ সঞ্চার করেছে। বলা যেতে পারে, সুকান্ত একটি আধুনিক কাব্যভাষার সৃষ্টি করেছেন। এখানেই অন্য কবিদের থেকে তার স্বতন্ত্রতা। তিনি গণমানুষের মুক্তির প্রেরণা সৃষ্টিতে মগ্ন ছিলেন। তার প্রতিবাদী কণ্ঠ বাঙালি পাঠককে আকৃষ্ট করে রেখেছে সেই কারণেই। খুব কাছে থেকে দেখা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা সুকান্তের কবিচিত্তকে আলোড়িত করে। দেশে দেশে বিক্ষোভ, নিরন্ন মানুষের হাহাকার ও প্রতিবাদ কবিতায় তুলে ধরে সুকান্ত নতুন ধারার কবিতা রচনা করেন।
সুকান্ত ছিলেন গণমানুষের কবি। তাই জীবদ্দশায় সরকারি রোষানলে তার মূল্যয়ন হয়নি। অসময়ে চলে যাওয়া এই কবির বাংলা সাহিত্যকে দেয়ার ছিল আরো অনেক কিছু। তবে মৃত্যুতে মলিন হয়নি সুকান্তের কবিতা, মানুষের হৃদয়ে তার অবস্থান এখনো সজীব। বিপ্লবী কবি ও রাজনীতিবিদ, এই প্রজন্মের তরুণের স্বপ্নপুরুষ, চে’ গুয়েভারা, তার লেখা শেষ কবিতা ‘হাওয়া আর ঢেউয়ের উল্টো দিকে’র কথা মনে পড়ছে। কবিতাটি তিনি লিখেছিলেন তার শেষ অভিযাত্রার কালে। তার যে সময় ফুরিয়ে আসছে, এ কবিতায় সে ইঙ্গিত স্পষ্ট। কবিতাটির কথামালা তিনি সাজিয়েছিলেন তার কিউবান বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় স্ত্রী আলেইদার উদ্দেশে। এ কবিতায় ধরা আছে তার জীবনের অন্তিম অভিপ্রায়। সেই কবিতা থেকে খানিকটা পাঠ নিতে পারি : ‘এই যে কবিতা, বইবে আমার স্বাক্ষর/তোমাকে দিয়েছি ধ্বনিমুখরিত ছয়টি মাত্রা-/একটি চাহনি যা বয়ে বেড়ায় (আহত পাখির মতন)/কোমল বেদনা,/কুসুমগরম অথৈ পানির একটু স্বস্তিহীনতা,/একটি আঁধার দফতর যার আলোর উৎস/ মাত্র আমারই কবিতা/তোমার অনেক একঘেঁয়ে রাতে জীর্ণ একটি/আঙুলের আবরণ/আমাদের যত ছেলেমেয়েদের একটি আলোকচিত্র/আমার সঙ্গী পিস্তলটির অতি অপরূপা গুলি,/সন্তানদের (সতত গোপন অথচ অতল) যুক্তিরহিত স্মৃতি/যা কি না একদা ধারণ করেছি আমরা,/এবং আমার কাছে গচ্ছিত জীবনের কিছু শান্তি,/সবই (সানন্দে আর অকাতরে) দিয়ে দিই বিপ্লবকে/এমন তো কোনো শক্তি নেই যা/ মিলতে দেবে না আমাদের।’- এটা স্বপ্নেরই কোনো রূপান্তরের অভিব্যক্তি, না স্বপ্ন শেষের গল্প? তিনি কি নতুন কোনো স্বপ্নভুবন নিয়ে হাজির হতে চান তার প্রেয়সীর কাছে? নাকি সময়ের হাতে হারাতে বসেছেন জীবনের সব স্বপ্নময়তা? এই অনুভূতি কি একই সাথে স্বপ্নডানা ও স্বপ্নভাঙার গল্প?

এক কিশোর সম্বন্ধে সম্ভবত তার স্বপ্নে পরিভ্রমণ ও বাস্তবতার সাথে কিছু অমিলের বিষয়াদি নিয়ে, তারুণ্যের কবি আবুল হাসান লিখেছেন একটি চিন্তা-জাগানিয়া কবিতা। ‘ক্লান্ত কিশোর তোমাকে ভীষণ ক্লান্ত দেখায়’ কবিতায় তিনি বলছেন : ‘দুপুর ঘুরে কিশোর তুমি বিকেলবেলায়/বাড়ি ফিরলে ক্লান্ত দেখায় ক্লান্ত দেখায়।/ক্লান্ত মুখটি ক্লান্ত দেখায়, ক্লান্ত চোখটি ক্লান্ত দেখায়।/..কোথায় ঘোরো সারা দুপুর, ক্লান্ত কিশোর কোথায় ঘোরে?/বুকের মধ্যে কিসের একটা কঠিন দুঃখ রুক্ষ দুপুর শাসন করে,...।’ তারুণ্যের দোরগোড়ায় দাঁড়ানো এই কিশোর কি স্বপ্নভাঙা বুক নিয়ে হতাশার গহিনে ডুবে গেছে? হয়তোবা। এ রকম বহু তরুণকে তার স্বপ্নের ডালি নিয়ে সম্ভবত আমাদের অজান্তেই পাড়ি দিতে হয় স্বপ্নভাঙার অপার সমুদ্র!
তারুণ্য যদি স্বপ্নের প্রতীক হয় অথবা স্বপ্নের উৎপাদক ও লালনকারী, তাহলে সমাজের গতি ও অগ্রগতি নির্ধারণে আমাদের অবশ্যই বিষয়টিকে প্রথমত অনুধাবন করতে হবে। অতঃপর, এর সম্ভাব্য সব প্রকাশে ও বিকাশে সহায়তার হাত ও মানসিকতা প্রসারিত রাখতে হবে। তবে চারপাশের অন্য সবাইকে এবং বিশেষত তরুণ সমাজকে খেয়াল রাখতে হবে, সময়ের অগ্রসর কোনো প্রসঙ্গ কিংবা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রবল প্রবাহে যেন তাদের স্বপ্ন দুঃখ বা হতাশাকে আমন্ত্রণ না জানায়। স্বপ্ন বুকে ধারণ করে সাফল্যের সিঁড়ি সাবধানে পার হতে হলে সদা সতর্ক থাকতে হয়। কেবল কল্পনা নয়, কল্পনা ও পরিকল্পনার সমন্বয়েই তরুণরা গড়ে তুলতে পারে সুন্দর ভবিষ্যৎ।