‘আমি গল্প-উপন্যাস লিখি। সেটা আগে থেকেই। আমার একটা ধারণা হয়েছে যে, উপন্যাস লিখলেই যে সেটা তিন শত পৃষ্ঠা হতে হবে, এর কোনো তাৎপর্য নেই। অনেকে পড়তেও চায় না। আমি ছোট উপন্যাস লেখা শুরু করেছি। আঙ্গিকের দিক থেকে সেগুলোকে বড় গল্প মনে হলেও তাতে উপন্যাসের বিভঙ্গ আছে; প্রেম-প্রীতি, আনন্দ-বেদনা আছে। অনেকে এ ধরনের উপন্যাসকে মাইক্রো উপন্যাস বলে। তবে সব মিলিয়ে আমার যে কাজ সেটি একজন কবিরই কাজ।’ (সূত্র : আহমদ বাসির, ‘আল মাহমুদের মুখোমুখি’, প্রেক্ষণ, খন্দকার আবদুল মোমেন সম্পাদিত, আল মাহমুদ সংখ্যা, জুলাই-ডিসেম্বর ২০০৭, ১২৮)- এক সাক্ষাৎকারে এভাবেই নিজের কথাসাহিত্য-ভাবনা সম্পর্কে বলছিলেন আল মাহমুদ। ‘সোনালী কাবিন’খ্যাত কবি আল মাহমুদ (জন্ম : ১১ জুলাই ১৯৩৬, মৌড়াইল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) গদ্যসাহিত্যেও বিশেষ মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। নিরন্তর এই লেখক তারুণ্য, রহস্য, নারী-পুরুষের সম্পর্ক, প্রকৃতির সাথে মানুষের কাজ ও কলার সাদৃশ্য ও সান্নিধ্য, প্রেম-বিচ্ছেদ, আনন্দ-যন্ত্রণার বর্ণনাকারী হিশেবে সামাজিক-রাষ্ট্রীয়-পেশাগত প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি পৌঁছে গেছেন সাফল্যের শিখরে। উপন্যাস কিংবা গল্পের কাঠামোকেও তিনি প্রদান করে চলেছেন কাব্যের সৌকর্য ও শোভা। জীবনানন্দের মতো কবিতা এবং কথাসাহিত্য- উভয় ধারাতেই শক্তিশালী এই প্রতিভা বাংলা সাহিত্যের বিরাট অহংকার। প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল আগে- ১৯৬৭ সালের জুলাই কিংবা আগস্টের কোনো একসময়ে চট্টগ্রাম থেকে কবি জসীমউদ্দীনকে তিনি এক পত্রে লিখেছিলেন :
আমার গদ্য আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হয়েছি। এ দিকটা প্রসারিত করার জন্য আপনার উপদেশ আমাকে দারুণভাবে প্রাণিত করেছে, আমারও বিশ্বাস, আমরা যারা শুধু কবিতা নিয়ে আছি তারা অল্পাধিক গদ্য রচনা করলে এ দেশে গদ্য সাহিত্যের এমন দুর্গতি হতো না। অন্তত প্রত্যেক কবি একটি বা দুটি উপন্যাস অথবা প্রবন্ধ বই রচনা করলে আমাদের সাহিত্যের চেহারা পাল্টে যেতো। অধ্যাপকদের হাত থেকে মুক্তি পেতে হলে কবিদেরই এগিয়ে আসা উচিত। একথা একদিন আমি শামসুর রাহমানকেও বলেছিলাম। (চাঁড়–লিয়া, ওমর বিশ্বাস সম্পাদিত, ১ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা, আল মাহমুদ সংখ্যা, জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০০১, ২৪৬)
চলিত গদ্যরীতির প্রবর্তক ও ‘সবুজপত্র’ সম্পাদক প্রমথ চৌধুরীও তার ‘সাহিত্যে খেলা’ প্রবন্ধে সাহিত্যের অধ্যাপকদের সম্পর্কে কিছুটা বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। অধ্যাপকদের বিষয়ে আল মাহমুদের অভিযোগ কী, তার দিকে আপাতত বেশি মনোযোগ স্থাপন না করেই বলছি, আমরা পরবর্তীকালে দেখেছি তিনি কথাসাহিত্য নিয়ে বেশ নিরীক্ষা-প্রবণতার পরিচয় রেখেছেন।

দুই
পঞ্চাশের দশকের আলোড়ন সৃষ্টিকারী কবি আল মাহমুদ। সোনালী কাবিন (প্রকাশকাল : ১৯৭৩) তাঁর সর্বাধিক উচ্চারিত রচনা। প্রায় ৬ দশক ধরে বিরতিহীন লিখে চলেছেন তিনি। গ্রন্থ-সাময়িকপত্র-সভা-সেমিনার-অনুষ্ঠান-বেতার-টেলিভিশন-সর্বত্র তাঁর অবাধ-সাবলীল বিচরণ আজো আমাদেরকে প্রেরণা যোগায়। কবি-কথাশিল্পী- বাঙালির সরব ভাষ্যকার আল মাহমুদ! প্রথিতযশা এই সাহিত্যিক ১৯৫৪ সাল থেকে তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করছেন। সাংবাদিকতার সাথে জড়িত হন ১৯৭১-এর অব্যবহিত পরে। তখন দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন তিনি। কবিতা রচনা ছাড়াও আল মাহমুদ প্রায় নিয়মিত লিখছেন উপন্যাস-গল্প-প্রবন্ধ-কলাম-শিশুতোষ রচনা। বাংলাদেশের রাজনীতি-সংস্কৃতি আর সামাজিক বিকাশধারার অন্যতম নিবিড় ভাষ্যকার তিনি। ঐতিহ্য আর মানবিক-প্রবণতা বিবৃতিতে তাঁর খ্যাতি অসামান্য। গ্রামীণ জীবনের মাহাত্ম্য আর নগরজীবনের বহুবিধ জটিলতা তাঁর রচনাবলিতে অনায়াসে পাশাপাশি হাত ধরে হেঁটে চলেছে। কলকাতা থেকে প্রকাশিত সত্যযুগ পত্রিকায় তাঁর একটি গল্প প্রকাশিত হয় ১৯৫৪ কি ৫৫ সালে। প্রখ্যাত সম্পাদক তাঁকে তখন গদ্য লিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সত্যযুগ-এ তখন মাহমুদের একটি কবিতাও ছাপা হয়েছিল। পরে, ১৯৫৫ সালে বুদ্ধদেব বসু তাঁর কবিতা পত্রিকায় আল মাহমুদের তিনটি কবিতা- ‘প্রবোধ’, ‘একদিন অন্ধকারে’ ও ‘সিম্ফনি’ প্রকাশ করেন। সেই থেকে অবিরাম প্রায় ৬০ বছর ধরে লিখে চলেছেন কথাকারিগর আল মাহমুদ।
মানব জাতির ইতিহাস, প্রেম ও স্বজাত্যবোধ, মাটি ও মানুষের নিবিড়তা, সত্য ও মিথ্যার মোড়ক, চাতুরি ও স্পষ্টতা বিশেষ প্রহরে আল মাহমুদের কথাশিল্পের বিষয় হয়ে ওঠে। আর কাঠামোতে থাকে পর্যবেক্ষণ-পরিবর্তন প্রবণতা এবং প্রাতিস্বিকতা প্রতিষ্ঠার বলয়। হাল আমলে তাঁর রচিত একটি উপন্যাসের বিষয়চিন্তা ও কাঠামোশৈলীর দিকে আমরা খানিটা নজর দিতে পারি। পোড়ামাটির জোড়া হাঁস (প্রকাশকাল জানুয়ারি ২০১৩, বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সোসাইটি লিমিটেড) গ্রন্থটিতে ঔপন্যাসিক হাজার বছরের ঐতিহ্য-ইতিহাস আর মানুষের অগ্রগমণকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। অবলম্বন হিশেবে বেছে নিয়েছেন প্রেমকে। জীবনানন্দের বহুল পঠিত কবিতা ‘বনলতা সেন’-এর মতো করে মানব-সভ্যতার দেয়ালে খানিকটা গাঁ ঘেঁষে আল মাহমুদ কাহিনী-বয়নের শুরুতে বলছেন : ‘হাজার হাজার বছর ধরে...’। বিস্ময়ের ব্যাপার এখানেও রয়েছে বনলতা সেন। আর আছে আরেক নারী পল্লবী। আছে পুরুষ চরিত্র আনন্দ। উপন্যাসটির গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়- নারীর প্রাকৃতিক প্রেম ও পুরুষের হৃদয়লীলা। অন্তহীন নারী পল্লবী এবং সম্ভাবনাময় পুরুষ আনন্দের মানসিক দ্বন্দ্ব আছে এখানে। উর্বরাজমির মতো ভরাট গতর আর কামকাতর কৃষককন্যা বনলতার রহস্য হয়তো আটকে থাকে মানুষের অনাদিকালের স্বপ্নভরা ফসলের মায়াবী মাঠের প্রান্তে। বনলতার মাতৃত্ব, পল্লবীর সখিত্ব আর আনন্দের নারীমগ্নতা- সব মিলিয়ে সরল কাহিনীতে মানব-মানবীর সনাতন প্রেমের গল্পই পরিবেশিত হয়েছে। আর কাহিনীর কারিগর কৌশলে তাঁর পাঠককে হাজির করেছেন ধর্মতত্ত্বের সৃজনরহস্যে। উপন্যাসটি রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’র কাব্যময়তা কিংবা প্রেমের দ্বান্দ্বিকতা ও রহস্যের উত্তরণ-পর্ব কি-না, তা হয়তো পরবর্তীকালে গবেষকরা বিবেচনা করে দেখবেন। তবে এখানে পোড়ামাটিতে তৈরি আদি মানুষ- আদম ও হাওয়ার প্রেম- অতঃপর জগতের সব রহস্য ও জটিলতার ব্যাপ্তিকে তিনি ধরতে চেষ্টা করেছেন বিশেষ, নির্বিশেষ ও রূপকের অন্তরালে। উপন্যাসটির শেষাংশের পাঠ নেয়া যাক :
সব প্রেমেরই ঘটনা থাকে। কিন্তু সেই ঘটনাকে কেউ ইতিহাসের মর্যাদা দেয় না। লোকে বলে প্রেমে অন্ধ হয়ে যাওয়া একটা অবস্থার কথা। যে অবস্থা এখন আনন্দের। সে কেবল দু’চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে এবং মুখে বিড়বিড় করে কাব্যের পঙ্ক্তিটি উচ্চারণ করে। তার মধ্যে প্রকৃত কবিত্বশক্তি লুকায়িত আছে বলে সবারই মনে হতে থাকে। আনন্দ নিজের ওপর আস্থা হারায় না। সে কবিতাকে মনে হয় খানিকটা নিজের আয়ত্তে এনে তারই চর্চা করে এগিয়ে যাচ্ছে।
বনলতা মাঝে মধ্যে বিনয় প্রকাশ করে সমঝোতার চেষ্টা করতে চায়। কারণ তার আছে গর্ভে সন্তান। এ জন্য তার মধ্যে নারীসুলভ হিংস্রতা খানিকটা চাপা পড়ে থাকে। তার বদলে তার ভেতরে মাতৃত্ব প্রবল হয়ে উঠেছে। যেখানে তার সন্তান আসছে। সেই সন্তানের জন্য যে ব্যাকুল-বিহ্বল হয়ে অপেক্ষা করছে। অন্য দিকে পল্লবী তার দেহবল্লরী সবার সামনে মেলে ধরার সুযোগ পেয়ে পুলকে, শিহরণে কাঁপছে। সব কিছুই মোটামুটি আনন্দঘন এক পরিবেশের জন্ম দিয়েছে।
অন্য দিকে এই কাহিনীর রচনাকারী এখন সমাপ্তিতে পৌঁছাতে চায়। যদিও গায়ের জোরে সমাপ্তিতে পৌঁছা যায় না। তবে অবস্থা যে রকম আছে, সেভাবেই সমাপ্ত করার নামই হলো শেষ। তামাম শোধ।
শেষের আলোয় এই কাহিনীর সব চরিত্রই উদগ্রীব এবং ঘটনার পারম্পর্য পরিসমাপ্তিতে না পৌঁছালেও এই কাহিনীর বর্ণনাকারী যেহেতু ক্লান্ত-শ্রান্ত হয়ে বলতে চান- আর কিছু নেই। এ কথাই এখন প্রাধান্য লাভ করেছে। শেষ মানে আর বলার-চলার কোনো পথ অবশিষ্ট নেই। এখানেই তবে শেষ হোক। সমস্ত চরিত্রের অন্তর্জ্বালা ও স্বপ্নকল্পনা।
‘অবশেষে সকল জল্পনা-কল্পনার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে নায়ক ও নায়িকা মিলে গেল’ কিংবা ‘নটে গাছটি মুড়োলো আমার গল্প ফুরোলো’ ধরনের বাংলা সিনেমার মতো অথবা বাঙালির রূপকথার মতো ঐতিহ্যিক সূর হয়তো আমরা এখানে পেয়ে যাই। কিন্তু আড়ালে লুকিয়ে থাকে অন্য কথা- পৃথিবীর কাহিনী যে চলমান, প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে ইতিহাসের উপাদান- সভ্যতা যে স্থির নয়, এর যে কোনো সীমা-পরিসীমা নেই, অতএব মানুষের গল্পের ও বিকাশেরও যেকোনো পরিসমাপ্তি থাকতে পারে না; আর এসবের ভেতরেই থাকে মানুষের স্বপ্ন ও তৃপ্তি- সেই আখ্যানই বোধ করি কথাকার সাজিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছেন। এই কাঠামো ও কৌশল অবশ্যই তাৎপর্যপূর্ণ ও বিশেষভাবে চিন্তাজাগানিয়া।
আল মাহমুদ কোনো উপন্যাস লেখা শেষ করে তারপর ছাপতে দিয়েছেন এমন নজির নেই। সবগুলোই কোনো-না-কোনো সাহিত্যপাতা বা সাময়িকীর জন্য ধারাবাহিতভাবে বা আংশিকভাবে রচিত; পরে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত। তিনি একটানা উপন্যাস লেখাটাকে কঠিন কাজ ভেবেছেন। ধীরে ধীরে লেখা শেষ করার কারণে তাঁর কাহিনীতে কিংবা কোনো পরিচ্ছেদের পরিসমাপ্তিতে প্রায়শই নাটকীয়তার আভাস মেলে। প্রথম উপন্যাস ডাহুকী ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয়। যদিও গল্প লিখছেন বেশ আগে থেকেই। গল্প লিখে হাত পাকিয়ে, সাংবাদিক আল মাহমুদ, কবিতার পাশাপাশি গদ্যের খাতায় নাম লিখিয়েছেন বোধকরি। তো ডাহুকীতে কী আছে?- আছে প্রধান নারী চরিত্র আতেকার গ্রামে ছুটে যাওয়ার ঘটনা। বাঙালি মুসলমান ও নগরে বসবাসকারী এক নারীর ভেতরে টানাপড়েন, শহর ছেড়ে শেকড়ের সন্ধানে ছুটেচলার যে প্রাণান্ত আবেগ- সেসব তিনি জানাতে চেষ্টা করেছেন। আর আস্তিকতা যে মানুষের প্রকৃত পরিচয়, নাস্তিকতার ভেতরেও যে প্রচ্ছন্ন থাকে এক প্রকারের আস্তিকতা, তাও প্রকাশ করেছেন তিনি ডাহুকীতে। ৩৮ বছরে পদার্পণ-করা আতেকার কৈশোরকাল বর্তমান কাহিনীর ক্যানভাস। স্কুলে যাওয়ার সাথী কেরামতকে ভুলতে পারেনি আতেকা। গল্পের পরিসরে চত্রির হিশেবে প্রবেশ করেছে আতেকার স্বামী অধ্যাপক শাহেদ, কেরামতের স্ত্রী সুফিয়া বানু, দর্শনের অধ্যাপক ফিরোজা বেগম প্রমুখ। অতৃপ্ত দাম্পত্য মূল সুর হলেও উপকাহিনীরূপে স্থান পেয়েছে শাহেদের কৈশোরকালে বেশ্যাপাড়ায় কোনো এক নারীর পরম মমতার স্পর্শ-কথা। আতেকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক। শাহেদ-আতেকা দম্পতি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ালেও সংসারে তাদের সুখ আসেনি। একপর্যায়ে আতেকার বান্ধবী ফিরোজার সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে শাহেদ। নানান ঘাত-প্রতিঘাত, মনোবাস্তবিক সামাজিক স্তর পেরিয়ে গল্পটির ক্যানভাসে আতেকার মানসিক পরিবর্তনের ছায়া প্রতিফলিত হয়। আতেকার প্রথম শিক্ষক ইমাম সাহেবের সান্নিধ্য ও পরামর্শ লক্ষণীয় : ‘আল্লাহ তোমার মতি সুস্থির করবেন। মনে রাইখো, হুদাই ভোগের মইধ্যে সুখ নাই আল্লারে যত বেশি ইয়াদ করবা, আল্লাহ তত বেশি তোমার ইয়াদ করব।’ (আল মাহমুদ রচনাবলী-২, ঐতিহ্য, ২০০২, ৩০৬) উপন্যাসটির সংলাপে একটা বিশেষ গ্রাম্য-ঢঙ আছে।
(চলবে)