[গত সংখ্যার পর]

বাংলাদশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, মহান মুক্তিযুদ্ধ, শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, স্বাধীনতা ও নেতৃত্ব বিষয়ে নানান মতান্তর প্রভৃতির প্রত্যক্ষ ছায়া পড়েছে আল মাহমুদের কাবিলের বোন (১৯৯৩) ও উপমহাদেশ (১৯৯৩) উপন্যাসদ্বয়ে। ভিন্ন নাম হলেও আসলে বই যে একটি তা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী-বর্ণনাকারী তিনি। ইতিহাসের সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। ইতিহাসলগ্নতা বোধকরি এমনই। যেমন ২০১৪ সালে সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী ফরাসি ঔপন্যাসিক প্যাত্রিক মোদিয়ানো সারা-প্রচেষ্টা জুড়ে প্রকাশ করে চলেছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস- তার প্রতিটি বই যেন ধারাবাহিক রচনা কিংবা পরেরটি আগেরটির নতুন সংস্করণ (নোবেলপ্রাপ্তির পর এক সাক্ষাৎকারে লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী)। সমাজচিন্তক আল মাহমুদ অভিজ্ঞতা থেকে অনুভূতি ও ধারণাগুলোকে সাজিয়েছেন কথা-কাহিনীর স্তরে স্তরে। কখনো বানিয়ে বা আরোপ করে কিছু লিখতে চেষ্টা করেননি। বিশ্বাস এবং অনুভবে তিনি স্থির কথানির্মাতা। কাবিলের বোন-এ বাংলা-উর্দু-ফারসি ভাষার মিশ্রণ আছে। এটি বাঙালি কথানির্মাতা ও কবি মাহমুদের নিজের ভাষা- বানানো নয়। তিনি বড় হয়েছেন কনজারভেটিভ মুসলিম পরিবারে। সেখানে ছিলেন মাদ্রাসা-পড়–য়া ব্যক্তি, শিক্ষক-ব্যবসায়ী, মাওলানা। কাজেই একটি মিশ্র-সংস্কৃতি ও ভাষাবোধ তাঁর চেতনায় ছিল। উপমহাদেশ-এ মুসলমান পুরুষ কবি মীর হাদী এবং হিন্দু নারী নন্দিনীর সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে তিনি সমকালীন সামাজিক অবস্থা, অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভারত-পাকিস্তান ও স্বপ্নে-জাগা বাংলাদেশের মুসলমান-হিন্দুর মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন।


কবি ও কোলাহল (১৯৯৩) উপন্যাসে রবীন্দ্র-বিরোধিতার প্রসঙ্গ আছে- আছে রবীন্দ্রনাথের অনতিক্রম্য প্রাসঙ্গিকতার কথাও। এ ছাড়া এখানে প্রতিফলিত হয়েছে কমিউনিজম সম্বন্ধে মতবিরোধ ও চিন্তার বৈশাদৃশ্য এবং স্বপ্নময়তা ও বাস্তবতা-বিরোধিতার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার চিত্রাবলি। প্রকৃতপক্ষে লেখক বাস্তবকে, সমকালীনতা ও স্বপ্নময় সম্ভাবনাকে স্বীকার করে নিয়েছেন। পাঠককেও সে ধারণার সাথে পরিচিত করে তুলতে চেয়েছেন। বামপন্থী রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলন, মানবিকতা, যৌনতার স্বাভাবিকতার কাহিনী তাঁর নিশিন্দা নারী (১৯৯৫)। এখানে যাদুময়তা আছে, অনর্গল গল্প বলার ভঙ্গি আছে। যেমন সৈয়দ শামসুল হকের একবসায়- একরাতে লেখা উপন্যাস রক্তগোলাপ (১৯৬৪)। আল মাহমুদ তাঁর যেভাবে বেড়ে উঠি (১৯৮৬) আত্মজীবনীমূলক রচনাকে উপন্যাস বলতে চেয়েছেন- এটিকে তিনি নিজের জীবনের ঘটনার আবর্তে গড়ে ওঠা ‘ফিকশন’ বলতে চান। কহিনীটিতে নায়কের অস্থিরচিত্ততা এবং অল্পবয়সী বালকের জীবন-উপলব্ধি জীবনশিল্পী আল মাহমুদের দর্শনেরই প্রতিফলন মাত্র। জীবনসত্যের, শিল্পসত্যের এক অনন্যসাধারণ উদাহরণ হতে পারে বইটি। নারী ও নারীর দ্বন্দ্ব যে আমাদের ভারতীয় পরিবারের ঐতিহ্য ও স্বাভাবিক ছবি- তার গল্প পাওয়া যায় মাহমুদের পুত্র উপন্যাসে। ছেলে বিয়ে করলে পর হয়ে যায় কি না, সে শ্বশুরবাড়ির লোক হয়ে পড়ে কি না- এসব জিজ্ঞাসার সমাধান পাওয়া যেতে পারে গ্রন্থটিতে। আগুনের মেয়ে (১৯৯৫) অসাধারণ এবং এবং বিশেষ উপন্যাস। আমাদের লৌকিক বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ঐশ্বরিক ভাবনার দ্বন্দ্ব ও মীমাংসা, জিন ও ইনসানের মধ্যকার সম্বন্ধ, ধর্মীয় ও সামাজিক উপলব্ধি, দার্শনিকতা নানান বিষয়ের সমাবেশ আল মাহমুদের এই উপন্যাসখানি। আকারে ছোট এই গ্রন্থটিকে একটি সার্থক সৃষ্টি বলে দাবি করেন লেখক। আগুনের মেয়ে সম্বন্ধে আল মাহমুদের একটি বক্তব্য এখানে তুলে দেয়া হলো :
আমি বইটা লিখছিলাম এই কারণেই যে, আমাদের সব সমাজের অভ্যন্তরে, আমরা যেহেতু মুসলমান, আমরা যেহেতু কোরআন পাঠ করি আমরা জ্বিনের ওপর বিশ্বাস করি। আরেকটি কথা- পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ যে উপন্যাস তার নাম হলো এরাবিয়ান নাইটস। এরপর এর তুলনায় আর কোনো উপন্যাস লেখা হয়নি। এই উপন্যাসের একটা বড় উপাদান হলো জ্বিন চরিত্র। তাহলে আমরা জ্বিনকে কেন ব্যবহার করবো না? এই জন্যে একটা পরীক্ষামূলক গল্প আমি লিখলাম। আমি এই উপন্যাস দিয়ে আমাদের সবচেয়ে যারা আধুনিক লেখক তাদের একদম নাড়িয়ে দিয়েছি। আমরা কল্পস্টোরি করি।


আমরা জ্বিনে বিশ্বাস করি; জ্বিন আছে, কিন্তু তা আমাদের গল্পে নেই। আগের দিনের লেখকরা এরাবিয়ান নাইটস যারা লিখেছেন, তৈরি করেছেন, তারা এটাকে যাদু হিসেবে নিয়েছেন। হিন্দু শাস্ত্রেও কিন্তু জ্বিনের কথা আছে। গন্ধম চরিত্র আছে। এসবই কাল্পনিক চরিত্রে। কিন্তু আগুনের মেয়ে আমি লিখেছি আমার গভীর বিশ্বাস থেকে। (‘উপন্যাসের জন্য আমাকে এক সময় স্মরণ করা হবে’, সাক্ষাৎকার, চাড়–লিয়া, পূর্বোক্ত, ১৪৫)
আল মাহমুদের পুরুষ সুন্দর (১৯৯৪) উপন্যাসটি নিয়ে অনেক সমালোচনা আছে। আছে প্রবল নিন্দা। অনেকে মনে করেন এটি অশ্লীল- এমনটা না লিখলেও পারতেন তিনি। অবশ্য এর বিচার এখন সময়ের কাছে। যে পারো ভুলিয়ে দাও (১৯৯৬) গ্রন্থটি সম্ভবত তাঁর একটি বৃহৎ উপন্যাসের প্রথম খণ্ড। যদিও বইতে তা উল্লেখ নেই। তবে কাহিনীর হঠাৎ থেমে যাওয়া আর লেখকের আলাপচারিতা থেকে বিষয়টি ধারণা করা যায়। গ্রন্থটির গল্প-পরিসর লেখকের নানার বাড়ি। মামাদের কাণ্ডকাহিনী আর চরিত্রের ভালোমন্দ নিয়ে গড়ে উঠেছে গল্পের ক্যানভাস। ঘটনা বিবরণে তিনি সত্যনিষ্ঠ। কোনো কথা আরোপ করেননি, বানিয়ে লেখেননি। কেবল ঘটনাগুলো পরপর সাজিয়ে গেছেন। আর চেহারার চতুরঙ্গ (২০০১) উপন্যাসটির বিষয় হলো মিডিয়ায় নারীর পণ্য হিশেবে উপস্থাপন এবং ফটোগ্রাফির নানান কৌশল ও কলা। তিনি সাংবাদিক জীবনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন এই গ্রন্থের বয়নের সময়। দায়িত্বশীল সাংবাদিক আল মাহমুদ কাহিনীর মধ্য দিয়ে শুধু সত্য সংবাদই প্রকাশ করতে চেষ্টা করেছেন এখানে। চারপাশে দেখা সমাজের শ্লীলতা-অশ্লীলতার চেহারা পাওয়া যাবে হরিৎ খোলস উপন্যাসে। কবি আল মাহমুদ জাত কথাশিল্পী। এই প্রসঙ্গে তাঁর সাক্ষ্য: ‘যদি আমি কবিতা না লিখতাম তাহলে গদ্যশিল্পই তৈরি করতাম। আমার কিন্তু সমস্ত ঝোঁক ছিল কথাসাহিত্যের দিকে। বাইচান্স কবিতা লেখা শুরু করি, সেই চলা শুরু।’ (চাড়–লিয়া, ওই, ১৪৬)
তিন.


কবিতার পাশাপাশি কথাসাহিত্যে আল মাহমুদের আবির্ভাব এ দেশের গদ্যসাহিত্যের অভিযাত্রায় এক যুগান্তকারী ঘটনা। তিনি যখন গল্প-কাঠামো নির্মাণ করেন, তখন যেন খুব সাবধানে তৈরি করেন বাংলাদেশের বুক। আল মাহমুদ গল্প লিখেছেন ধীরে-সুস্থে; খ্যাতি ও প্রশংসার আকর্ষণ তাঁকে টলাতে পারেনি। তাঁর গল্প-পরিকল্পনায় এবং পরিবেশনশৈলীতে রয়েছে নিবিড় চিন্তার ছাপ। প্রখ্যাত কথাশিল্পী আবু রুশদ মন্তব্য করেছেন: ‘বাংলাদেশে আল মাহমুদের সমতুল্য অন্য কোন কবির হাত থেকে এত কয়টা ভাল গল্প বেরিয়েছে বলে আমার জানা নেই। এটা তাঁর সাহিত্যিক গুরুত্বে ঈর্ষণীয় মাত্রা যোগ করবে বলে আমার বিশ্বাস।’ (প্রেক্ষণ, খন্দকার আবদুল মোমেন সম্পাদিত, আল মাহমুদ সংখ্যা, জুলাই-ডিসেম্বর ২০০৭, ১৫০) মানুষ-জীবন-প্রত্যাশা-প্রাপ্তি আল মাহমুদের গল্পের মূল ক্যানভাস। নারী- তার রূপের বর্ণনা, প্রকৃতির সাথে নারীর তুলনা, পরিবার ও সমাজে নারীর অবস্থান এবং নিয়তির অমোঘতা তাঁর গল্পের কেন্দ্রবিন্দু। ‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পে চিত্রিত হয়েছে আল মাহমুদের গভীর গ্রামপ্রীতি। গল্পকথক গল্পটির প্রারম্ভেই প্রকৃতির বিচিত্র রঙ আর শোভার সাথে ভালো লাগার মানুষকে মিলিয়ে অনুভব করেন। পানকৌড়ির আভরণ-সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন তিনি; মনে পড়ে যায় সদ্য পরিণীতা স্ত্রীর মুখ-আদল। রোদে গায়ের পানি শুকাতে-থাকা পানকৌড়ির মাঝে তিনি যেন কেবলই দেখতে পান চুল-শুকাতে-থাকা স্ত্রী আদিনার কোমল মুখ। গল্পকার ভালোবাসেন দেশকে আর প্রিয় মানুষকে। তাই দেশের, প্রকৃতির নির্মলতায় বারবার খুঁজে ফেরেন প্রিয়তমার প্রতিচ্ছবি। ‘পানকৌড়ির রক্ত’ গল্পের প্রতীকী তাৎপর্য স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়ে এসেছে। বিলের বর্ণনা লেখকের তীক্ষè পর্যবেক্ষণ শক্তির পরিচয় বহন করে। লেখক কাদাকেও জীবন্ত করে তুলতে পারেন। তবে পানকৌড়িই আসল।


‘ভেজা কাফন’ গল্পে এক সাধারণ নারী নূরীর জীবনে ঘটে-যাওয়া টুকরো টুকরো ঘটনার সমাবেশ আমাদের চোখে পড়ে। নূরী অসুস্থ; হৃদরোগে ভুগছে। তার লেখা চিঠিতে আমরা পাই মৃত্যুভয় আর ক্ষমা-প্রার্থনার আকুলতা। সে লিখেছে: ‘আমি বাঁচব না। আমাকে মাফ করে দিও।’ ডাক্তারের মতে নূরী আর মাত্র ছয় মাস বাঁচবে। মা-বাবাহারা নূরী ভাইয়ের সহযোগিতায় চিকিৎসা চালাতে থাকে। স্বামী সাজ্জাদের প্রতিও তার বেশ আস্থা। মৃত্যুপথযাত্রী নূরী তার পুরনো বন্ধুদেরকে যে-সব লম্বা-লম্বা চিঠি লিখতো সেগুলো ডাকে পাঠাতো সাজ্জাদের হাতে। একদিন সত্যি সত্যি সব ছেড়ে পরপারের পথে পাড়ি দিলো জীবনের অতৃপ্ত বাসনা পূরণ-প্রত্যাশায় নিমগ্ন নূরী। সাদা কাফন-মোড়ানো দেহ তার চারপাশের আপনজনের কান্নার ভারে আর বৃষ্টি-উত্তর প্রবল বাতাসে স্নিগ্ধতা ছড়াচ্ছিলো যেন। নাকফুলছাড়া নূরীর মুখ বড় অচেনা হয়ে পড়ে সাজ্জাদের কাছে; লাল শাপলার গুচ্ছ তুলে-ফেলা পুকুরের টলটলে জলের মতো মনে হয় নূরীর ভেজা কাফনমোড়া মুখ। প্রকৃতির সন্তান নূরী যেন প্রকৃতিরই অকৃত্রিম স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দেয় স্বামীর স্মৃতিনিবিড় ভাবনাবলয়ে। নিয়তি যেন কিছুতেই আমাদেরকে সহজ-পথে হাঁটতে দিতে চায় না- গল্পকার বোধহয় এই অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটাতে চেয়েছেন এ গল্পে।
আদি ও ক্ষুদ্র নৃজাতির যাপিত জীবন আল মাহমুদের গল্পের ক্যানভাসে বিশেষ অভিজ্ঞতা আর আত্মগত অনুভবে রূপ লাভ করেছে। বাংলাদেশের পাহাড় ও প্রকৃতিনিবিড় বৃহৎ পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসীদের জুমচাষনির্ভর সমাজ-ব্যবস্থা আর প্রজন্ম-বিস্তারে ভূমিরূপ নারীর বিকাশ ও মর্যাদা ‘উত্তর পাহাড়ের ঝর্ণা’র প্রাণবস্তু। উপস্থাপন-কৌশলে গল্পটি দারুণ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে। এখানে ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের দারিদ্র্য-অশিক্ষা-অল্পশিক্ষা আর জ্ঞানপিপাসার ছবি আছে; আছে প্রকৃতির বিচিত্র লতাপাতা-ফলমূল-গাছগাছালির সাথে তাদের মিতালির কথামালা। আর আছে জাতীয়তাবোধে স্নাত মানুষগুলোর স্বাধিকার চেতনা। বেসরকারি এবং ভিনদেশী উন্নয়ন সংস্থাগুলো দিনবদলের আশ্বাস নিয়ে আদিবাসী-গ্রামে প্রবেশ করে শিক্ষা-অর্থ বিতরণের অন্তরালে প্রকারান্তরে খ্রিষ্টানধর্ম প্রচারের এমনকি অবুঝ লোকদের ধর্মান্তরিত করার প্রলোভন ছড়িয়ে দেয়ার যে কৌশল প্রয়োগ করে, তারও বাস্তব চিত্র গল্পকার তুলে ধরেছেন বর্তমান কাহিনীতে। কিছুটা স্বতন্ত্র চিন্তা আর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল পাহাড়িকন্যা মাইম্যা শিক্ষক হতে চায়; বিদেশী সংস্থার আমন্ত্রণে নার্স হবার ইচ্ছা তার নেই।
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]