[গত সংখ্যার পর]
পর্বতচারি টং থা গোত্রের জেদি পুরুষ মংসুকে ভালোবাসে মাইম্যা। তাকে পাওয়ার জন্য অপেক্ষাও করে সে। মাইম্যার পরিবারও এ অপেক্ষায় সায় দেয়। কিন্তু কালান্তরে দেখা যায় মংসু সংসারচিন্তা পরিহার করে ধর্মদীক্ষা নিয়ে ভিক্ষু হয়ে যায়। অবশ্য প্রতিবেশীদের কেউ কেউ ভেবেছিল মংসু বুঝি গোপনে শান্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে। মংসু যেখানেই যে বেশেই থাক না কেন মাইম্যা কিন্তু তাকে কিছুতেই হারাতে চায় না; প্রিয় মানুষটির, আকাক্সিক্ষত পুরুষটির সন্ধানে বেরিয়ে পড়ে সে। পেয়েও যায় একদিন। ভিক্ষুরূপি মংসুর সামনে হাজির হয়ে সে বলে: ‘আমি চিম্বুক পাহাড়ের বনদেবী নই। চিনতে পারছো তো?’ মাইম্যা তাকে দেয়া প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মংসুকে জানায়- বীজবপনের সময় হয়েছে; এখন ভিক্ষু হয়ে প্রহর যাপনের কাল নয়। তাকে সে বাধ্য করে নারী-পুরুষের লৌকিক জীবনাচারে প্রবেশ করতে। ‘উত্তর পাহাড়ের ঝরণা’ গল্পে উপজাতি মারমাদের সমকালীন জীবন প্রতিফলিত হয়েছে ‘মাইম্যা’ ও ‘মংসু’ নামের দু‘টি চরিত্রের মাধ্যমে। উভয়ে লেখাপড়া জানা মারমা যুবক-যুবতী। পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক। শেষাবধি মিলন। এই মিলন আল মাহমুদ যেভাবে চিত্রিত করেছেন তা অনেকটা নাটকীয়। লেখকের অপূর্ব বর্ণনার পরেও এই নাটকীয়তা চাপা পড়ে না। গল্পটি তখন আহত হয়।
সাংসারিক-পারিবারিক জীবনের নৈমিত্তিক ঘটনা আর দাম্পত্য-জটিলতার ভাষাচিত্র আল মাহমুদের ‘পাতার শিহরণ’ গল্পটি। স্বামীকে হারাতে না-চাওয়া এক ঘরমুখো স্ত্রীর মানসিক দোলাচল, অনাস্থা, সিদ্ধান্তহীনতা আর শেষত নিশ্চলতা এই গল্পের মূল আভাসকেন্দ্র। নতুন চাকুরিতে যোগ দিতে যাবার জন্য অন্য শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েও যুবতী কাজের মেয়ে ঘরে রেখে যেতে সাহস পায় না মধ্যবিত্তস্বভাবের বাঙালি নারী পাতা। বাঙালি নারীর স্বামী-নির্ভরতা কিংবা স্বামীর প্রতি অবিচল আকর্ষণ চিত্রণে বর্তমান গল্পে লেখক বেশ আন্তরিক; পাতার সন্দেহ-বাতিকতা প্রকাশে প্রকারান্তরে তার ভালোবাসার অকৃত্রিমতাই ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন গল্পকার। দাম্পত্য-দলিল পরিবেশনের পাশাপাশি গল্পটিতে কথাশিল্পী চাকুরির নির্বাচনী বোর্ড, শহর ও গ্রামের পরিবেশগত ভিন্নতা- বেশির ভাগ শিক্ষিত মানুষের শহরপ্রীতি প্রভৃতি প্রসঙ্গের বিশ্বাসযোগ্য কিছু বিবরণও উপস্থাপন করেছেন সামাজিকের দায় থেকে। জীবন চলার পথে গল্পকার দেখা-শোনা-জানা বিষয়গুলোকে গল্পের পাতায় পাতায় সাজিয়েছেন অভিজ্ঞ শিল্পীর দিকজয়ী তুলির জাদুময়ী স্পর্শে। ‘তৃষিত জলধি’ গল্পটি ভ্রমণ-বিষয়ক বাস্তব ঘটনার বিবরণ। গল্পকথক তার জবানিতে জানাচ্ছেন বিচিত্র পেশার মানুষের চরিত্র-প্রবণতা আর রাজনৈতিক সংস্কৃতির আভাসচিত্র। গল্পটির শুরুতে কথক পাঠককে বলছেন তার ভ্রমণ-অনুষঙ্গ: ‘বঙ্গোপসাগরে প্রমোদ-ভ্রমণে এসে সারাদিনের ক্লান্তিকর ছোটাছুটি আর হৈ-হুলোর ছাড়া আমার জন্য জাহাজটির মধ্যে তেমন পরিতৃপ্তিকর কোন অবকাশ ছিল না।’ একটি প্রমোদ-তরীতে রাষ্ট্রপতির সাথে ভ্রমণসঙ্গী হয়েছেন সঙ্গীতশিল্পী-ব্যবসায়ী-রাজনীতিবিদ-নিরাপত্তাকর্মী-শিক্ষার্থী। এই প্রতীকী গল্পে কথাশিল্পী আল মাহমুদ বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আবহ নির্মাণ করেছেন অত্যন্ত দক্ষতায়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা আর ঠক-প্রবণতা গল্পটির ক্যানভাস। গল্পে বর্ণিত রাষ্ট্রপতিকে একদিন রাতে জাহাজের ছাদে বসে থাকতে দেখা যায়- একাকি; তখন তাঁর নিরাপত্তাকর্মীরা ঘুমরত। আমাদের ভূমি-অধিকর্তা-চারপাশ যে গভীর অনিশ্চয়তা আর গন্তব্যহীনতার অন্ধকারে নিমজ্জিত- তারই চিত্রাভাস বর্তমান গল্পটিতে উপস্থাপিত। ‘নিশি বিড়ালীর আর্তস্বর’ পারিবারিক-পরিসরের নারীজীবনের কাহিনী। হোমা নামক এক সাধারণ নারীর সংসারের উত্থান-পতন আর আশা-নিরাশার গল্প এটি। এতে স্থান পেয়েছে দেশবিভাগ এবং তৎজনিত জমি হস্তান্তর, বাড়ি ক্রয়-বিক্রয় ও দান-প্রতিদানের ঘটনাবলি। হোমার স্বামী সোহেলকে তার বড়কর্তা সাব্বির পাকিস্তান চলে যাবার সময় নিজের বাড়িটি লিখে দেয়। অত্যন্ত ছোটখাটো ঘটনাও যে মানবজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে, তার বাণীভাষ্য নির্মিত হয়েছে এ গল্পে। আর একটি বিড়ালকে কাহিনীতে উপস্থাপন করা হয়েছে সম্ভবত প্রাণ-অস্তিত্ব আর মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তার প্রাসঙ্গিকতা পরিবেশনের জন্য। মফস্বলের কলেজ শিক্ষকদের প্রাত্যহিক সঙ্কট আর প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের বর্ণনা পাওয়া যায় ‘গন্ধের উৎস’ গল্পে। জিহান নামক এক কলেজ শিক্ষকের সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হন নবাগত ইংরেজি শিক্ষক রব; আলাপ-প্রেম-বিয়ে-সংসারে গড়ায় তাদের সম্পর্ক। কিছুকাল পরে দূরারোগ্য ব্যাধিতে মারা যায় জিহান। তার স্মৃতি মুছে ফেলতে পারে না স্বামী রব। চারপাশে সে যেন কেবলই অনুভব করে জিহানের গায়ের গন্ধ। এ গল্পে পারিবারিক টানাপড়েন, স্মৃতিলগ্নতা, ইন্দ্রিয়চেতনার প্রখরতা বিবৃত হয়েছে একজন সমাজবিজ্ঞানির দৃষ্টিতে। ‘জলবেশ্যা’র প্রস্তুতিপর্ব দীর্ঘ হলেও খুব মুন্সিয়ানার সঙ্গে সমস্ত পরিমণ্ডলটা গড়ে তোলা হয়েছে এবং তা শেষের অভিযানটাকে প্রাসঙ্গিক ও অনিবার্য করে তুলেছে। তবে মিলনের অবস্থানে সাপের ঝুঁড়িতে পা- দেওয়া জলবেশ্যার পক্ষে এত অভ্যস্ত জিনিস না আকস্মিক এর দুর্ঘটনা? যে নির্লিপ্ততার সঙ্গে মিলনকাক্সক্ষী পুরুষটার সাপের ছোবল খাওয়া অচৈতন্য দেহকে জলবেশ্যা নিজের হাতে ও কাঁধে তুলে পুরুষটার নৌকাতে ফেলে দিল তাতে বস্তুতই মেয়েটার চারিত্রায়নে নতুন এক মাত্রা যুক্ত হলো। সমস্ত বিবরণটাই যথাযথভাবে কল্পনাসমৃদ্ধ। ‘মীর বাড়ির কুরসীনামা’য় লেখকের খুঁটিনাটির প্রতি সতর্ক দৃষ্টি ও গ্রামীণ মুসলিম জীবনের পরিমণ্ডল রচনায় অভ্রান্ত কৌশল রাতটার যৌন-নৈপূণ্য ও তা অবলোকন করে এক অতৃপ্ত স্ত্রীর আফশোস ও কামনাকে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কযুক্ত করে তুলেছে। লেখকের মাষ্টারী হাত এই দুই ধরনের যৌনতার উন্মোচনকে সম্পূর্ণ প্রাসঙ্গিক ও বিশ্বসযোগ্য করে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
‘পশুর নদীর গাংচিল’ গল্পে সুন্দরবন, ও পাশে নদী আর গাছ-গাছালির কোলে বেড়ে ওঠা চৌদ্দ বছরের কিশোরী ‘কর্পূর’ ও পনেরো-ষোল বছরের ‘রতনের’ জীবন-জীবিকার এমন একটি খণ্ডচিত্র চিত্রিত হয়েছে যা ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন সংগ্রাম সম্পর্কে ধারনা দানে যথেষ্ট। গল্পে জানা যায়, ‘গাঙ পাহারাওলা আর বাদাবনের জানোয়ার দুটোইতো এক জাতের।’ আরো এক শ্রেণীর মানুষ জানোয়ার হয়ে উঠে। যারা জাহাজ ভিড়িয়ে কর্পূরের ছাগল তুলে নিয়ে মূল্য পরিশোধ করতে চায় না। গল্পটি এখানে এসে মোড় নেয়। পরে কর্পূর ছাগলের দাম বাবদ প্লাস্টিকের ব্যাগে রাখা ছয়টি নতুন কম্বল নিয়ে নেমে আসে। কর্পূরের এই জাহাজে ওঠা এবং নামা নিয়ে আল মাহমুদ যে বর্ণনা দিয়েছেন তা বস্তবগ্রাহ্য। ‘পাতার শিহরণ’ এবং ‘নিশি বিড়ালের আর্তস্বর’ গল্পে নারীর নারীত্ব ও মাতৃত্ব যুগপৎ প্রকাশিত। গল্পের সাধারণ কাহিনী অসাধারণ হয়ে ওঠেছে আল মাহমুদের হাতে। বিশেষত নারীর চরিত্র ও মনস্তত্ব খননে কোনো ইঙ্গিত নয়, ডিটেলসের আশ্রয় নিয়ে প্রকৃত বাস্তবতাকে মূর্ত করেছেন আল মাহমুদ। ‘নিশি বিড়ালীর আর্তস্বর’ গল্পে মা হোমায়রা অকস্মাৎ ঘুম ভেঙ্গে বেড়ালের বাচ্চার যে মিহি ডাক টের পান তার ক্রমশ বিস্তার ধরে গল্প এগিয়ে যায়। এবং পাঠকও এগিয়ে যান। শেষে মধ্যরাতে ড্রেনের ময়লা স্রোত থেকে মা মেয়ে দু’জনে বেড়ালের বাচ্চাটাকে উদ্ধার করে। সকালের দিকে মেয়ে সেতু যখন বেড়ালের বাচ্চাটাকে দুধ খাওয়াচ্ছে তখন তার ডাকে মা হোমায়রার ঘুম ভাঙ্গে না। এ-যেন সন্তান ফিরে পেয়ে এক মায়ের নিবিড় প্রশান্ত ঘুম।
উত্তম পুরুষে লেখা গল্প ‘গন্ধবণিক’ লেখকের আত্মজৈবনিক লেখা। কিন্তু আল মাহমুদ নিজে প্রকৃত শিল্পীর মতো শেষবধি নিজের লেখা থেকে ছিঁড়ে আলাদা হয়ে যান এবং একটি দার্শনিক ধারণা মূল বিষয় হয়ে প্রতিষ্ঠা পায়। গন্ধবণিক লেখকের বাড়ি লাগোয়া নানা সম্পর্কের একজন প্রবীণ আতর বিক্রেতা। তিনি এক সময় সুখী, সম্ভ্রান্ত ও বিলাসী মানুষ ছিলেন। তাঁর সদালাপে মুগ্ধ ছিল মানুষজন। সুগন্ধ বিক্রয়ের সুবাদে তাঁর বন্ধুত্ব দাবি করতেন অনেকে। লেখকের মতে, ‘তার সুন্দর পকেট ঘড়িটা, আইভরির কলমদানী, স্ফটিকের ফুলদানী, হরিণের চামড়ার চশমার খাপ, কষ্টি পাথরের পেপারওয়েট, মৃগনাভি রাখার চন্দন কাঠের বকসো, রুপোর তৈরি জর্দার কৌটা আর সুগন্ধি চুরুটের মুখ কাটার চাকুটা হাত দিয়ে নেড়ে চেড়ে মহা আনন্দ পেতাম (পৃষ্ঠা ৩৫)।’ গন্ধবণিকের বিষয় ও রুচির যে বর্ণনা আছে তাতে তিনি একজন বড় ধরনের মানুষ হয়ে ওঠেন পাঠকের কাছে। লেখক সে আয়োজন করেন গল্পে। এই গন্ধবণিক মারা যান যেদিন মাসিক বেতন পেয়ে লেখক নিজের বাড়িতে আসেন। স্মৃতিকাতর, ব্যথিত-দুঃখিত লেখক ওই গভীর রাতে স্ত্রীকে নিয়ে গন্ধবণিকের লাশ দেখতে যান। কি হলো সেখানে? কিছু হওয়ার চেয়ে হুইপ চালিয়ে পাঠকের মনে নতুন এক উপলব্ধি কেটে বসিয়ে দেন আল মাহমুদ। ‘মন্তু নানার মুখের দিকে ফিরে আঙ্গুল দিয়ে তার চোখের পাতি দু’টি বন্ধ করতে একটু ঝুঁকতেই একটা উৎকট দুর্গন্ধের ঝাপটা এসে আছড়ে পড়লো আমার নাকে। নাসারন্ধ্র দিয়ে বুকের ভেতর কুৎসিত গন্ধটা ছড়িয়ে পড়লো দ্রুত। আমার নাভি মণ্ডলে অকস্মাৎ মোচড় দিয়ে একটা বমির ভাব ছড়িয়ে পড়লো জিভে। মনে হল মুহূর্তের মধ্যে আমার সর্বসত্তা অস্তিত্ব অসুস্থ, মুহ্যমান ও বিবমিষায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছে (পৃষ্ঠা ৪২)।’ নিখুঁত এই অনুভূতি। মৃত মানুষ যে জীবিত মানুষের মতো আর মূল্য রাখে না- এই প্রভেদ গল্পে নৈপুণ্যের সাথে আল মাহমুদ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। তাঁর এ পর্যন্ত লেখা গল্পগুলোর মধ্যে ‘গন্ধবণিক’ একটি উল্লেখযোগ্য গল্প হিসেবে বিবেচিত হবে। ‘স্বজাতি’ গল্পও উত্তম পুরুষে লিখিত হলেও এর প্রধান সুর আন্তর্জাতিকতা। কোনো আরোপ করা বা চাপিয়ে দেয়া বক্তব্য নেই। বরং কাহিনী ধারাবাহিকতার সঙ্গতি রক্ষা করে। কিন্তু উত্তম পুরুষে লেখা ‘তৃষিত জলধি’ গল্প হয়ে ওঠেনি। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাথে সমুদ্র ভ্রমণের সঙ্গী হিসেবে তাঁর উপলব্ধি ও দেখা ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন যা সরেজমিনে একটা প্রতিবেদন হয়েছে মাত্র।
চার
আল মাহমুদের কথাসাহিত্যে কাব্যিক আবহ আছে; রয়েছে সৌন্দর্য আর প্রকৃতিনিবিড়তার ঘনিষ্ঠ ছবি। সমাজ- তার সমূহ উত্থান-পতন, মানুষের স্বপ্ন-আশাভঙ্গ আর প্রত্যাশার জাল তিনি তৈরি করেন দারুণ মমতায়। বর্ণনাকৌশলে তাঁর কাহিনী-কাঠামো পরিবার-কাঠামোরই এক একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায় যেন।
[ শেষ ]
