‘লোকে বলে বলে রে, ঘর বাড়ি ভালা না আমার
কি ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ই মাঝার
ভালা করি ঘর বানাইয়া, কয় দিন থাকমু আর
আয়না দিয়া চাইয়া দেখি, পাকনা চুল আমার।’
এই গানের রচয়িতার নাম না জানলেও গানটি একবারো শোনেননি এমন বাংলা ভাষাভাষি বেশি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। দেশ, জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ নির্বিশেষে সব মানুষের যে মানবিকতা রয়েছে সেই মানবতার ফেরিওয়ালা ছিলেন তিনি। হ্যাঁ, বলছি মরমী কবি এবং বাউল হাসন রাজার কথা। অহিদুর রেজা বা দেওয়ান হাসন রাজা চৌধুরী জন্ম ২১ ডিসেম্বর ১৮৫৪ সালে। কাকতালীয়ভাবেই এই মরমী সাধক ডিসেম্বর মাসেই মৃত্যুবরণ করেন। ৬ ডিসেম্বর ১৯২২ সালে আধ্যাত্মিক স্বপ্ন-দর্শনে উদ্ভাসিত হাসন রাজার জীবনাবসান ঘটে। তৎকালীন সময়কার প্রতাপশালী অত্যাচারী দাপুটে জমিদার হাসনই হয়ে ওঠেন একজন দরদী জমিদার এবং মরমিয়া কবি ও বাউল সাধক। হাসন রাজা দেখতে সুদর্শন ছিলেন। মাজহারুদ্দীন ভূঁইয়া বলেন, ‘বহু লোকের মধ্যে চোখে পড়ে তেমনি সৌম্যদর্শন ছিলেন। চারি হাত উঁচু দেহ, দীর্ঘভূজ ধারাল নাসিকা, জ্যোতির্ময় পিঙ্গলা চোখ এবং একমাথা কবিচুল পারসিক সুফিকবিদের একখানা চেহারা চোখের সম্মুখে ভাসত।’ বেশির ভাগ বিশেষজ্ঞের মতে, তিনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ করেননি বটে, ছিলেন সশিক্ষিত এবং সহজ-সরল সুরে আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় সহস্রাধিক গান রচনা করেন। প্রথম যৌবনে তিনি ছিলেন ভোগবিলাসী এবং সৌখিন।
হাসন রাজার প্রিয় পাখির নাম ছিল কুড়া। জং বাহাদুর ও চান্দমুশকি নামে প্রিয় দু’টি ঘোড়া ছাড়াও প্রায় ৭০টির মতো ঘোড়া ছিল তার। বেশ সৌখিন জীবন যাপনে অভ্যস্ত অত্যাচারী, বিলাসী, ভোগবিলাসী হাসন রাজাকে এক আধ্যাত্মিক স্বপ্ন-দর্শন তার জীবন দর্শনে আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। বিলাস প্রিয় জীবন ছেড়ে দিয়ে আল্লøাহর প্রেমে মগ্ন হয়ে যান। হাসন রাজার মনের দুয়ার খুলে চরিত্রে আসে এক সৌম্যভাব। ভুল-ত্রুটিগুলো শুধরে জমকালো পোশাক পরা ছেড়ে দেন। শুধু বহির্জগত নয়, তার অন্তর্জগতেও আসে এক বিরাট পরিবর্তন যা তাকে বিষয়-আশয়ের প্রতি নিরাসক্ত করে তোলে। উদাসীনতা ও বৈরাগ্যে সাধারণ মানুষের খোঁজখবর নেয়া ও গান রচনা হয়ে ওঠে তার প্রতিদিনের কাজ। তার সব ধ্যান-ধারণা গান হয়ে প্রকাশ পেতে থাকে। তখনকার রচিত একটি গানের অংশবিশেষ-
‘গুড্ডি উড়াইল মোরে, মৌলার হাতের ডুরি।
হাসন রাজারে যেমনে ফিরায়, তেমনে দিয়া ফিরি।।
মৌলার হাতে আছে ডুরি, আমি তাতে বান্ধা।
জযেমনে ফিরায়, তেমনি ফিরি, এমনি ডুরির ফান্ধা।’
আরেকটি কবিতায় দেখা যায়, হাসন বলেন-
‘স্ত্রী হইল পায়ের বেড়ি পুত্র হইল খিল।
কেমনে করিবে হাসন বন্ধের সনে মিল’
জাগতিক দুই চোখ দিয়ে বাস্তব জগৎ দেখা যায়। তৃতীয় নয়ন বা মানশ্চক্ষ দিয়ে মানুষ জীবন জগৎ এবং স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করতে পারে। যেমনটা দেখা যায় হাসনের আরেকটি কবিতায়-
‘আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে, আঁখি মুঞ্জিয়া দেখ রূপ রে।
আরে দিলের চক্ষে চাহিয়া দেখ বন্ধুয়ার স্বরূপ রে।’
হাসন রাজা কোন পন্থার সাধক ছিলেন তা স্পষ্ট জানা যায় না। তার পদাবলিতে কোনো গুরুর নামোল্লেøখও নেই। নিজেকে তিনি ‘বাউলা’ বা ‘বাউল’ বলে কখনো কখনো উল্লেøখ করেছেন। তবে তিনি বাউলদের সমগোত্রীয় হলেও নিজে আনুষ্ঠানিক বাউল ছিলেন না। হাসন রাজা আধ্যাত্মিক ও মানব ধর্মের যে মরমী সাধনা করে গেছেন যুগযুগ ধরে তা বেঁচে আছে। আর তিনি বেঁচে আছেন তার আধ্যাত্মিক গানগুলোর মধ্য দিয়ে।
‘লোকে বলে বলে রে, ঘর বাড়ি ভালা না আমারকি ঘর বানাইমু আমি, শূন্যের-ই মাঝারভালা করি ঘর বানাইয়া, কয় দিন থাকমু আরআয়না দিয়া চাইয়া দেখি, পাকনা...
