আমাদের সম্পর্কগুলো দিনদিন কেমন জানি ঠুনকো হয়ে যাচ্ছে; উনিশ থেকে বিশ হলেই ভেঙে যায়। স্বার্থে আপনজন হই ফের স্বার্থে খেলাঘরের মতো সব ভেঙে চুরমার করে দিই। রক্তের সম্পর্কগুলোও কখনো উঁচু গলায় অস্বীকার করে ফেলি। আমরা মানুষেরা যেনো আজ এক ‘হৃদয়হীন’ প্রাণী হয়ে উঠেছি। কত-শত মধুর স্মৃতি থাকা সত্ত্বেও মধুর সম্পর্ক ছেদ করে দিই পান থেকে চুন একটু খসে পড়লেই।
ছোট সময় মায়ের মুখে শুনতাম তাদের বানানো সম্পর্কের কথা। শুনতাম বানানো সম্পর্কগুলো কত মজবুত ছিল। শত ঝড় তুফানেও কিভাবে সম্পর্কগুলো টিকে থাকতো। কিভাবে রক্তের কেউ হয়ে উঠতো। আজ তা কেবল শুধুই স্মৃতি আর সিনেমা নাটকের সাজানো গল্প।
আগে কালের সম্পর্কগুলো কতটা আপন ছিল এবং সম্পর্কের মানুষটাকে সুখী করার জন্য কত ত্যাগ তিতিক্ষা করত আসুন একটা গল্পের সাহায্যে জেনে নিই: বিয়ের পাঁচ বছর পর ‘রাবেয়া’ তার বাবার বাড়ি আসছে। দূরের রাস্তা এবং স্বামী জয়নাল চাকরির সুবাদে ছুটি সে রকম না পাওয়ায় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আসা হয়ে উঠে নাই রাবেয়ার। এতে সে অসন্তুষ্ট নয়। স্বামী সংসার নিয়ে বেশ সুখেই আছে। প্রথম প্রথম অবশ্য খুব খারাপ লাগতো নতুন জায়গা, নতুন স্থান এবং নতুন মানুষগুলো সাথে থাকতে। ধীরে ধীরে সে মানুষগুলো এখন প্রচণ্ড আপন হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে করে না এখন আর তাদের থেকে দূরে থাকতে। মেয়েদের স্বামী-পরিবারই সবচে আপন হয়। আপন করে নিতে হয়। রাবেয়াও তাই করল।
‘কিরে চামেলি, তোর কী খবর? কোলে এই বাচ্চা কার?’ জানতে চাইলো রাবেয়া। চামেলি তার ছোটকালের বান্ধবী এবং অ- গোষ্ঠীর চাচাতো বোন। খবর ‘ভালো’ বলার পর লজ্জামাখা মুখ নিয়ে চামেলি বললো এই বাচ্চা আমারই। বাহ! তোর বিয়ে হয়ে গেছে? তা কোথায় হয়েছে বিয়েটা শুনি? চামেলি, ওইতো পাশের গ্রাম ‘পল্টিপাড়া’র শুক্কুর আলীর বড় ছেলের সাথে। বেশ বেশ। আচ্ছা কুলসুমের কী খবররে চামেলি? ও, কুলসুম আপার? শোনার পরও চামেলি পুনরায় আবার জিজ্ঞেস করলো চোখমুখে খুশি নিয়ে। রাবেয়া বললো, হুম, কুলসুমের।
চামেলি, কুলসুম আপার তো বিয়া হয়ে গেছে বছর দুই বছর হইসে। বিয়ার পর আর আসে নাই। হয়তো ভালোই আছে। আরো কিছু বলতে যাবে এর আগেই রাবেয়া বললো, আচ্ছা ভালো থাকুক, এটাই চাই। আমি চলে যাবো রে। হাতে সময় নাই বেশি। বাড়িতে অসুস্থ শাশুড়ি রাইখা আইছি। উঠলাম এখন। ভালো থাকিস তোরা।
‘কুলসুম’ রাবেয়ার বানানো একমাত্র বান্ধবী। সেই একটু একটু বুঝতে যখন শুরু করেছে তখন থেকেই ফ্যামেলি মারফতে ‘সই’ হয়েছিল ওরা। এখনো আছে সে সম্পর্ক অটুট। এক সাথে খেয়েছে। এক সাথে ঘুমিয়েছে। এক সাথে খেলেছে। এবং এক সাথে সবই করেছে। একজন ছাড়া অপরজন যেনো অপূর্ণাঙ্গ। রাবেয়া ও কুলসুমের ‘সই’ পাতা এলাকার সবাই জানে। এরপর এলাকায় আরো অনেক ‘সই’ হয়েছে। কিন্তু কারও ‘সই’ই টিকেনি। মাস, ছয় মাস সর্বোচ্চ টিকেছে। কোনো না কোনো কারণে এরপর ভেঙে গেছে। কিন্তু রাবেয়া ও কুলসুমের ‘সই’ পাতা ভাঙেনি। এলাকায় তারা বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছে। মানুষের মুখে মুখে তাদের এই বন্ধনের কথা গুঞ্জরণ হয়েছে। অমরত্বের পুঁতি দ্বারা যেনো তারা বান্ধবী বন্ধন আবদ্ধ করেছে। যাহোক, এরই ভেতর তারা বড় হয়ে গেল। রাবেয়ার বিয়ে হয়ে গেল। কুলসুম সেদিন খুব কান্না করেছিল বান্ধবী ছাড়ার বেদনায়। মাইক্রোবাসে চড়ে চললো, রাবেয়া তার শ্বশুরবাড়ি।
চিঠি মারফতে রাবেয়া খবর পেল তার দাদা ‘করিম মোল্লা’ ভীষণ অসুস্থ। মরতে মরতে বেঁচে আছে। কখন জানি মরে যায় নিশ্চিত নাই। শরীরের অবস্থা খুবই খারাপ। দু’দিন হলো খানাপিনা ছেড়ে দিয়েছে। চামচ দিয়ে পানি খাইয়ে প্রাণটা বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে কোনো রকম। যদি সম্ভব হয় যেনো চিঠি পাওয়ার পরই রওনা দিয়ে দেয়। রাবেয়া চিঠি পড়া শেষ করে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললো। স্মৃতিতে দাদার সাথে করা খুনসুটি এবং করিম মোল্লার শাসন বারণ ভেসে উঠছে। সেদিন বাড়ি হতে এসেছে রাবেয়া। বছর পার হয়নি এখনো। যাবে কি যাবে না চিন্তা করছে কপালে ভাঁজ ফেলে।
সিদ্ধান্ত ফাইনাল। মানুষের হায়াত মওতের কথা বলা যায় না। সেদিন আসছে বলে কি হয়েছে! যেতে পারবে না? অবশ্যই যেতে পারবে। তাকে যেতে হবে। দেখতে হবে দাদা ‘করিম মোল্লা’কে। স্বামী ‘জয়নাল’ যেতে পারবে না। ছুটি নাই তার। অফিসে কাজের প্রেসার খুব বেশি। সোজা বলে দিয়েছে, আমি যেতে পারবো না, অফিসে আমার বহু কাজ পড়ে আছে। তুমি বরং একা চলে যাও। রাবেয়ার মন খারাপ হলো স্বামীর কথা শুনে। ভেবেছিল কোনো ভাবে হয়তো অফিস ম্যানেজ করে ছুটি নেবে। যেহেতু স্বামী যাচ্ছে না তবে সে একাই যাবে বলে সিদ্ধান্ত ফাইনাল করেছে।
ঘরে প্রবেশ করল। সব আগের মতোই লাগছে। ব্যাগটা খাটের একটা সাইটে রাখল। ভালো-মন্দ খোঁজখবর নিলো সবার। সকলের মুখ মলিন হয়ে গেছে রাবেয়া যখন জানতে চাইলো ‘দাদা’ করিম মোল্লার খবর।
আর বোঝার বাকি রইলো না তার করিম মোল্লা গত হয়ে গেছে। পাড়ি জমিয়েছে না ফেরার দেশে। কাঁদা কাঁদা চোখে জানতে চাইলো শেষ বাসস্থান কোথায় দেয়া হয়েছে তাকে। একজন বললো, বাড়ির পেছনে কলাবাগানের পাশে দাফন করা হয়েছে। নিষ্প্রাণ রোবটের মতো কদম রাখছে সামনে এবং এগিয়ে যাচ্ছে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে করিম মোল্লা যেই ঘরটাতে ওই ঘরের দিকে। রেখে যাওয়া দাদার জিনিসপত্রগুলো দেখছে এবং হাত বুলাচ্ছে। চোখ থেকে টুপটুপ করে অশ্রু- ফোঁটা পড়ছে গাল-গণ্ড বেয়ে জমিনের বুকে।
‘রাবেয়া, রাবেয়া! এই রাবেয়া। আরে কী হলো তোর এত ডাকছি তাও উঠিস না ক্যান?’
গোধূলি শেষে তার ঘুম ভাঙলো পর্যায়ক্রমে আরো অনেকের ডাকার পর। চা নাশতার পর একজন বললো, কুলসুম আইছিলো। তোমারে অ নে ক ডাইকা গেল তুমি সজাগ হওনাই ঘুম ছাইড়া। ‘কখন আসছিলো’ রাবেয়ার প্রশ্ন। ওইতো দুপুরের দিকে। আচ্ছা, ‘আমি এখনই যাচ্ছি কুলসুমের বাড়ি’- এই বলে রাবেয়া খাট থেকে উঠে দাঁড়ালো। ওড়না দিয়ে মুখ ছাড়া মাথা-বুক ঢেকে নিলো। হারিকেন হাতে নিয়ে সলতেটা একটু উপরে তুলে নিলো চাবি ঘুরিয়ে। অনেকদিন পর যাচ্ছে সে কুলসুমের বাড়ির রাস্তা ধরে। হয়তো অনেক বদলে গেছে। চিনতে অসুবিধা হতে পারে তাই হারিকেনের আলো বাড়িয়ে নিলো।
কুলসুমের বাড়ির উঠোনে গিয়ে দেখে রাবেয়া তার ঘরের দরজা খোলা। আবছা আলোয় দেখতে পেলো, এলোমেলো চুলে পাগলের মতো একটা মহিলাকে। মনে মনে রাবেয়া ভাবছে- কে এই পাগলি মহিলা কুলসুমের ঘরে! ক্রমশ কদম সামনে রাখছে আর পাগলি মহিলার চেহারা স্পষ্ট হচ্ছে তার কাছে। ঘরের চৌকাঠ পেরিয়েই দেখে- এ পাগলি মহিলাই ‘কুলসুম’! ডাক দিলো, কুলসুম? ফিরে তাকালো কুলসুম রাবেয়ার ডাক শুনে। রাবেয়া দেখলো চোখ দুটো সাগরের অতল গহ্বরে পড়ে কাতরাচ্ছে। চেহারা পুরো শুঁকনো কঙ্কালসার হয়ে গেছে! এ কি কুলসুম, তোর এই অবস্থা ক্যানো? ‘সই’ বলে এক ঝাঁপ দিয়ে রাবেয়ার বুকে এসে আছড়ে পড়লো এবং বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। রাবেয়া কাঁদছে তার এই করুণ হাল দেখে আর কুলসুম কাঁদছে তার জীবনের ট্র্যাজেডি নিয়ে।
দীর্ঘক্ষণ কাঁদার পর রাবেয়া একটু শক্ত হলো। কুলসুমকে স্বাভাবিক হালতে আনার চেষ্টা করলো এবং ‘আল্লাহর পক্ষ হতে সব হয়’ বলে সান্ত্বনা দিলো। দু’জন গিয়ে এখন বসলো চৌকির উপরে। রাবেয়া জানতে চাইলো তার এই হালত কিভাবে হলো। কুলসুম বলা শুরু করলো, হুটহাট একটা সম্বন্ধ আসলো বিয়ের। আমাকে দেখে ছেলেসহ ছেলের বাবা মায়ের পছন্দ হয়ে গেলো। এক সপ্তাহ পর আমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাদের বাড়ি থেকে বিদায় নিলো উনারা। কথামতো এক সপ্তাহ পর আসলো। বিয়ে হলো। উঠিয়ে নিয়ে গেলো। আমার জামাইয়ের সংসার বড়। মা বাবা ভাই বোন মিলে নয়জন সদস্যের পরিবার। আমিই বাড়ির প্রথম বউ হয়ে উনাদের ঘরে উঠলাম। ওই বাড়িতে যাওয়ার পরদিন থেকে পুরো পরিবারের কাজ কাম আমাকে করতে হলো। আনন্দচিত্তে করে যাচ্ছি। সপ্তাহখানেক যাওয়ার পর একে একে সবাই তাদের কাপড়চোপড় আমাকে দিয়ে ধোয়ানোর কাজ করানো শুরু করেছে। আমি সাধ্যমতো ধুয়েও দিচ্ছি। আমার জামাই সব দেখে তারপরও কিছু বলে না। আমার কাজে একটু এদিক ওদিক হলে শাশুড়ি বকাঝকা করে তারপর আমার জামাইকে বলতো। সে আমাকে প্রথম কয়দিন অশ্রাব্য গালিগালাজ করলো। তারপর থেকে একটু উনিশ-বিশ হলেই বৃষ্টির ফোঁটার মতো কিল-ঘুষি, লাথি পড়তো আমার এই শরীরটার ওপর। এইভাবে দিনের পর দিন যখন মারতে শুরু করলো আমায়। আমি সহ্য করার চেষ্টা করলাম। দিনদিন দেখি মারধরের তীব্রতা বেড়েই চলছে। একপর্যায়ে অসহনীয় হয়ে ওঠে। ‘স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত’ এইটা ভেবে তাও সয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু...
রাবেয়ার চোখ থেকে শ্রাবণধারা বয়ে যাচ্ছে। সে কি বলে তার আত্মার বান্ধবী কুলসুমকে সান্ত্বনা দেবে ভেবে পায় না। ‘ভাগ্যে কষ্ট ছিল তোর তাই কষ্ট ভোগ করছস তুই’ বললো রাবেয়া। রাতে আর ফিরে আসেনি রাবেয়া কুলসুমের বাড়ি থেকে। পুরোটা রাত সুখ-দুঃখ এবং ছোটকালের স্মৃতি মনে করে কাটিয়ে দেয় তারা দু’জন। সকালে রাবেয়া বান্ধবী কুলসুমকে একটা অনুরোধ করে এবং করজোড়ে বলে তা যেনো ফিরিয়ে না দেয়। কুলসুম জানতে চাইলে রাবেয়া বলে, আমার সাথে তোর যেতে হবে আমার শ্বশুরবাড়ি। আমি কোনো কিন্তু শুনতে চাই না এবং তোর এই কষ্টও সহ্য করতে পারছি না। আমি নিয়ত করেছি তোকে আমার কাছে নিয়ে যাবো। কেনো নিয়ে যাবো তা জানতে চাইবে না। শুধু যাবি এটাই জানি। কুলসুম কিছু বলতে যাবে তার আগেই কুলসুমকে বাধা দিয়ে বলে ‘না কোনো কিন্তু শুনতে চাই না। বলার ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও কিছু আর বলা হলো না কুলসুমের। আগামী পরশু চলে যাবো। ‘এখন তুই তোর কাপড়চোপড় গুছিয়ে আমাদের বাড়িতে চলে আয়। আমি গেলাম বাড়ি’ বলে রাবেয়া কুলসুমের বাড়ি থেকে চলে আসলো। রাবেয়া বাড়ির পথে হাঁটছে আর ভাবছে কুলসুমকে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে গেলে ওখানকার মানুষজনে কী বলবে! কত দিনই বা রাখা যাবে সেখানে? নিজের মনকে সে প্রশ্ন করছে। এক পর্যায়ে মনে মনে বলে উঠলো, কপালে যাই আছে তবুও কুলসুমকে আর কষ্ট করতে দেবো না। জয়নালকে বলবো, সে যেনো কুলসুমকে বিয়ে করে নেয়। আমি প্রথম স্ত্রী হিসেবে অনুমতি দিয়ে দিচ্ছি তোমাকে। দিন গিয়ে চলে আসলো যাওয়ার দিন। রাবেয়া কুলসুমকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলো।...
