আমরা এমন এক সময়ে দিনযাপন করছি যে সময়টা অস্থির এবং অনিশ্চিত। এ সময়ের বৃত্তে আবদ্ধ সবাই। আমাদের সন্তানেরা জানে না কী তাদের ভবিষ্যৎ, পরিকল্পিত ভবিষ্যৎই বা কতটা নিশ্চিত। যার ফলে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে তাদের জীবন এবং জীবনের প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গগুলো। এমনই এক অস্বস্তিময়তার গল্প ‘বৃত্ত’। কাক ও কারফিউ গল্পগ্রন্থে কথাশিল্পী নাজিব ওয়াদুদের ব্যতিক্রমী গল্প এই ‘বৃত্ত’। এ জন্য যে, এ গ্রন্থের অন্য গল্পগুলো নিন্মবিত্ত আর বিত্তহীনদের নিয়ে লেখা, আর আলোচ্য গল্পটি নিম্নমধ্যবিত্তের কথকতায় নির্মিত। যদিও ‘অন্ধগুলি’ও অন্য ধরনের গল্প। কিন্তু এর মূলেও রয়েছে সেই নিঃস্বতা-হীনতার যন্ত্রণা ও ভয়াবহ পরিণতি। এবং একজন যুবকের অনুভূতি ও তার মানবিকতা দেখান হয়েছে অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ভাষায়। তার মনের বৃত্তে প্রশ্ন জেগে ওঠে- এ রকম একজন যুবক স্থির সময় এবং অন্ধকারাচ্ছন্ন বৃত্ত বলয়ে শুধুই ঘুরপাক খেয়ে মরবে?’ আমার ব্যক্তিগত ধারণা ‘বৃত্তে’ সেই যুবকই আবার ‘উবুড় করা গামলার মতো’ গোল একটা দেয়ালে আটকা পড়ে অস্বাস্থ্য, অস্থিরতা সিদ্ধান্তহীনতা, ক্ষোভ আর নিষ্ফল স্বপ্নে দিনযাপন করছে।
এ গল্প যাকে নিয়ে আবর্তিত সে হচ্ছে রোকন। মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র সে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আত্মীয়স্বজনের চাপে এখানে ভর্তি হয়েছে। মেডিক্যাল সায়েন্সের ভারী বই শুয়ে পড়তে-পড়তে যখন আর পড়া হয় না লোডশেডিংয়ের জন্য তখন ‘গ্রে-র এনাটমি বইটা বুকে থেকে নামাল সে। পাশে রাখল উবুড় করে। একটা জগদ্দল পাথর যেন নামালো বুক থেকে। পাঁচ-ছ’ কেজি ভারী বলে নয়, বিতৃষ্ণাও আছে।’ যদিও ‘কী পড়বে, ভবিষ্যতে কী পেশা নেবে সে সম্পর্কেও তার মনোভাব স্পষ্ট না।’ তার নেশা, তার ইচ্ছা অন্য দিকে- গল্প, কবিতা আর পলিটিক্সের মধ্যে। তার হৃদয়ে, মগজে আলোড়ন তুলে এসব। কখনো ইচ্ছে হয় ‘গ্রামে গিয়ে সমবায় খামার-টামার গড়ে কাটিয়ে’ দেবে জীবন। কিন্তু সে যখন তার বাস্তবতার দিকে তাকায়, এগুলোর লক্ষ্য অর্জনের দিকে দৃষ্টি দেয়, তখন আর উৎসাহ, প্রেরণা পায় না। ইচ্ছে জাগে না। মন উদাস হয়ে যায়। বাস্তব পৃথিবীতে চোখ মেলে আবার। তখন আর ‘দেশ, মাটি আর মানুষে’র জন্য টিকিট কেটে ঈশ্বরদী যাওয়া হয় না। সেটাকে ‘অযথা খরচ’, ‘বাজে খরচ’ মনে হয়। তখন বোনের মুখ মনে পড়ে। তার ‘মাস্তানের ভয়ে স্কুল যাওয়া বন্ধ’ হওয়ার কথা, বিয়ের কথা মনে আসে। তার পরিবারের যে অবস্থা- ‘খাওয়া-দাওয়া যা হোক এদিক-সেদিক করেও চলে, লেখাপড়ার খরচ টেনেটুনে চলে না’, সেখানে তার ‘বহু দূরের আত্মীয়তার সুবাধে ফিরোজ চাচার বাড়িতে লজিং মিলেছে’। এই পরিবারের এখন সে-ই ভরসা- ‘তোর উপুরই সব ব্যাটা। উপুরে আল্লাহ, নিচে তুই। ইদং-মিদং করিসনি।’ এমন এক টানাপড়েনে, দ্বিধায়, অস্থিরতার যন্ত্রণায় দিন অতিবাহিত করার পরও সিরিয়াস হতে চায় সবার স্বার্থেই। কিন্তু লজিং বাড়ির মেয়ে মিলি- ‘কাঁচা শরীর। কাঁচা মন। কাঁচা আগুনের পুতুল’- তার সঙ্গ চায়, হয়তো ভেতরে ভেতরে সে রোকনকে ভালোও বাসে। অবশ্য তার আচরণে বিষয়টা প্রকাশিত। রোকনেরও ভালো লাগে তাকে, মিলির হাসি, প্রাণের স্ফুর্তি, রহস্যময়তার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকে রোকন। কিন্তু তার ভয় করে, দ্বিধার ছায়া ভেতরে প্রবেশ করে থামিয়ে দেয় তার মনকে। শুধু চিন্তার কীট তাকে কুরে কুরে খায়। বাইরের অন্ধকার তার মধ্যে ঢোকে, সম্মোহিত করে। আবার সেই অন্ধকারে তার ‘হাস-ফাস’ ধরে যায়। বাইরের মানুষের প্রতারণা- ‘শেষে ঠকিয়েই দিয়েছে তাহলে (মাছওয়ালা)। বিশ্বাসের এই প্রতিদান! -তাকে আলোড়িত করে যেমন, তেমনি ভাবির শ্লেষপূর্ণ কথা, মিলির আকর্ষণ তাকে নাড়া দেয় সমানভাবে।
এভাবে দিন যায় দিন আসে। কোনো পরিবর্তন নেই। প্রতিদিন একই রকম দৃশ্য- ‘পুবের আকাশ ফেটে লাল। ...সামনের রাস্তায় জীবনের গৎ-বাঁধা স্রোত। রাতভর এ স্রোত আর থামবে না। একই দৃশ্য রোজ, রোকন ভাবে, তার জীবনের মতো। সকালে কলেজ। বিকেলে টিউশনি। সন্ধ্যায় একটুখানি আড্ডা, রাত্রে ঘরে। মাঝে-মধ্যে দুয়েকটা মিছিল-মিটিং। এই একটা বৃত্তে পাক খেয়ে চলেছে তার জীবনের স্রোত।’ অর্থাৎ নাগরিক দৈনন্দিনতার বৃত্তে আবদ্ধ এক যুবকের দিনলিপি। কোনো ধরনের বৈচিত্র্য, নতুনত্ব ছাড়াই তাকে সময় পার করতে হয় একঘেঁয়েমিতা করে, তবুও তাড়াহুড়ো করে সাড়ে সাতটার ক্লাস ধরতে দৌড়াতে হয়।
বলা হয়ে থাকে, ছোটগল্প যুগ-যন্ত্রণার ফসল। ‘বৃত্তে’ আমরা এই যুগেরই যন্ত্রণায় আর্থিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবে আবদ্ধ মানুষ, ব্যক্তিক টানাপড়েনে, দোলাচলে, অস্থিরতায় আর অনিশ্চিৎ ভবিষ্যতের ভাবনায় খাঁচাবদ্ধ মানুষকে দেখি। যে খাঁচা/দেয়াল ভাঙে না।
২
কাক ও কারফিউ-এ নাজিব ওয়াদুদের গল্পের ভাষা উল্লেখ করার মতো। অন্যান্য গল্পে তো বটেই, ‘বৃত্তে’ও তার ভাষা, গল্পের বিষয়, চরিত্র ও পরিপার্শ্ব অনুযায়ীই হয়েছে। এর স্বাক্ষর পাওয়া যায় ‘বৃত্ত’র সমস্ত শরীরে। তার ভাষার বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায় এভাবে-
ক. বৃত্তায়িত মানুষের অস্থিরতা, ক্ষোভ, নিষ্ফল স্বপ্ন অত্যন্ত সাবলীল, স্বচ্ছ ও গতিশীল ভাষায় বিধৃত।
খ. নিম্নমধ্যবিত্তের পারিবারিক- অবশ্য নাগরিক, আবহাওয়ায় ব্যবহৃত শব্দ ও ভাষার মুন্সিয়ানা ব্যবহার।
গ. আঞ্চলিক ভাষার- বিশেষভাবে সংলাপে সফল প্রয়োগ।
ঘ. ব্যক্তির মনোজাগতিক সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, নিরাসক্ত এবং নৈর্ব্যক্তিক ভাষার বর্ণিত।
ঙ. ভাষা দুর্বোধ্যতা, কিংবা শব্দকাঠিন্য নেই। একটা ছন্দের দোলা আছে। পড়তে কোনো রকম বাধার সম্মুখীন হতে হয় না।
চ. গল্পের ভাষা পরিণত, উপভোগ্য এবং ইঙ্গিতময়।
ছ. কিন্তু কোথাও রহস্যময়তার চিহ্ন তেমন চোখে পড়ে না।
৩
‘বৃত্ত’ একটি সীমিত আয়তনের গল্প। এবং এর পারিপার্শ্বিকতা তেমন বিস্তৃত নয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ। আসলে আধুনিক বৃত্তাবদ্ধ মানুষের ক্ষুদ্র জীবনের পরিসরই এখানে দেখানো হয়েছে।
রোকন যেখানে বসবাস করে সেই বাসস্থান, তার মানুষ, মানুষের অনুভূতি, আচরণ, বিনোদনের উপকরণ, সর্বোপরি যে পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ে গল্পের শরীর গঠিত সেটা পাঠকের সামনে উপস্থিত তাৎপর্যপূর্ণভাবে। এ গল্পের পরিপার্শ্বের টুকরোগুলোর কোনো অংশই তুচ্ছ নয়। বরং ইঙ্গিতবহ। যে পরিবেশ-পরিপার্শ্বে রোকন দিনযাপন করছে সেখানে একজন যুবকের অবস্থা স্বাভাবিক কিংবা সুখপ্রদ হবার কথা নয়। তাই রোকন মানসিকভাবে অস্থির, বিপর্যস্ত। তাকে তার চারপাশ স্থির থাকতে দিচ্ছে না। নিয়ন্ত্রণ করছে তাকে। বৃত্তের অন্ধকারে দম বদ্ধ হয়ে কখনো সে বিদ্রোহী, আবার কখনো বিপ্লবী হতে চেয়েছে। কিন্তু চারপাশের দেয়ালে সে বন্দী। নিরুপায়। অসহায়। এ গল্পের পরিপার্শ্ব নির্মাণে গল্পকার কতটা সিদ্ধহস্ত তা দু-একটা উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে-
ড্রইংরুমে টিভি চলছে। এই এক জ্বালা! আজ ভালো নাটক, কাল ফ্যান্টাস্টিক ইংলিশ সিরিজ, পরশু ধারাবাহিক নাটক, তরশু ক্রিকেট শুরু হলো তো চলছে দু’তিন দিন। এ দিকে জুটেছে কলিকাতা দূরদর্শন বিষফোঁড়ার মতো। চুলোয় উঠেছে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া।
তবে এ গল্পের কলেবর বৃদ্ধির সাথে সাথে যদি পরিপার্শ্বের আরো ব্যাপ্তি ঘটান যেত তাহলে হয়তো গল্পটা আরো বেশি উপভোগ্য হতো।
৪
‘বৃত্ত’ গল্পের নামটি প্রতীকী। গল্পের ভেতরদেশেও প্রতীক, রূপক ও উপমার অনেক ব্যবহার রয়েছে। নাজিব ওয়াদুদের এ গল্পটি শুধু নয়, অন্যান্য গল্পেও আমরা দেখেছি তিনি একটি সাধারণ বিষয়কে, ঘটনাকে অবলম্বন করে প্রতীকের সাহায্যে জীবনের অনেক গভীরে প্রবেশ করেন, দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তরে চলে যান। এবং গল্পকে একটা স্তরে নিয়ে আসেন, অতঃপর থেমে যান, একটা নতুন মাত্রায় গল্পকে উপনীত করেন। অবশ্য সেটা করেন শিল্পসম্মতভাবেই। যেমন-
কী বিশাল এই অন্ধকারের জগৎ। অথচ কতই না কাছে সব। হাঁড়ির মতো গোল পৃথিবীটা কী অসীমতায় ছড়িয়ে পড়ে। আবার সঙ্কীর্ণতায় এমনি ছোট হয়ে আসে যে হাস-ফাঁস ধরে যায়। এই মুহূর্তে সে রকমই বোধ হচ্ছে রোকনের।
এখানে উপমা এবং প্রতীকের যুগপৎ ব্যবহারে গল্পের বিষয়ের সাথে একীভূত হয়ে গেছে এ লাইনগুলো।
দেখা যাচ্ছে ‘বৃত্ত’ কোনো সাধারণ গল্প নয়। বিষয় ও আঙ্গিক উভয় দিক থেকে গল্পটি সফলতার প্রান্তে পৌঁছেছে। কিন্তু কিছু-কিছু বিচ্যুতিও থেকে গেছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এক মানবিকবোধ আমাদের মনে জাগ্রত হয় গল্পটি পাঠের পর। আমরা বৃত্তের গল্প পড়ি, কিন্তু বৃত্ত ভাঙার স্বপ্ন জাগে। এখানেই এই গল্পের পূর্ণতা, সার্থকতা।
