পেছনে ভূশ্চিবাজার। প্রিয় জন্মস্থান। সামনে দীর্ঘ পথ। অচেনা অদেখা। এক নতুন পথ। মুক্তির পথ। পাড়ি দিতে হবে একাই। কোনো তাড়া নেই আমার। নেই পেরেশানি। নেই পিছুটান। কালো ঘুটঘুটে আঁধার জীবন ছেড়ে আলোতে এসেছি। ইসলামের সুশীতল ছায়াতলের সন্ধান পেয়েছি আলহামদুলিল্লাহ। এখান থেকে আর কোথাও ফিরে যেতে চাই না। পদস্খলিত হতে চাই না। আমৃত্যু মহান রবের গোলামি করে মানব কল্যাণে জীবনকে উপভোগ করতে চাই। মুসাফিরি জীবন আমার। আজ এখানে তো কাল ওখানে। সবাই চলছে যে যার হালতে এক ও অদ্বিতীয় অদৃশ্য সত্তা মহান রবের অপার করুণায়। বিসমিল্লাহি তাওয়াক্কালতু আলাল্লাহ বলে বেরিয়ে পড়েছি। প্রায় অর্ধ-কিলোমিটার পথ ইতোমধ্যে চলে এসেছি। রাস্তার দু’পাশে সারি সারি তাল গাছের ফাঁকে উঁকি দিচ্ছে সূর্য। সূর্যের বর্ণচ্ছটায় ধানের শিষের ডগায় নুয়ে পড়া কাচের মতো শিশিরবিন্দুগুলো যেন প্রতিবিম্ব হয়ে উঠছে। আর মায়াবী প্রকৃতির এই অবয়ব যেন বিমুগ্ধ করতে শুরু করেছে সবাইকে।

ক্যাচ ক্যাচ শব্দে একটা দুই চাকার গরুর গাড়ি পাশ দিয়ে যাচ্ছে। গরুর হাম্বা অথবা গলা ঝোলানো ঘণ্টার টুং টাং শব্দে হেলেদুলে নিশ্চয় কোনো ব্যবসায়ী বণিক মালামাল নিয়ে রওনা হয়েছে কোনো অচেনা শহরতলির উদ্দেশে। কিছুদূর যাওয়ার পর কী মনে করে হঠাৎ গাড়িটি থেমে যায়। গাড়োয়ান মাথা বাঁকিয়ে তাগাদা দেয়, ‘ও ভাইসাব কই যাবেন, আসেন। জলদি উঠে পড়েন গাড়িতে।’
আমি এদিক-ওদিক একবার ভালো করে তাকিয়ে নিই। তারপর কোনরকম ইতস্তত না করে চট করে গরুর গাড়িতে উঠতে উঠতে বলি, ‘আপাতত গন্তব্য লাকসাম রেল জংশন পর্যন্ত ভাইজান। তারপর মাওলা পাকের ইচ্ছায় দীর্ঘ সফর। বলা যায় যে দিকে যায়।’

‘জি জি উঠে পড়ুন, ঠিকঠাক করে বসুন। গাড়ি জংশনের দিকেই যাচ্ছে।’
পা বাড়িয়ে উঠতে যাব, ঠিক তখনি গাড়ির ভেতর থেকে ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধের গলার খক খক কাশির আওয়াজ শুনতে পাই। স্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে বৃদ্ধ খুব অসুস্থ। শুয়ে আছে। মাথার এক-তৃতীয়াংশ দেখা যাচ্ছে।
যাহোক মহান রবের কৃপায় আমার জায়গা হয়েছে সামনের দিকে চালকের ঠিক একটু পেছনে। বাম হাতের ছোট্ট ব্যাগখানা পাশে রেখে একটু আয়েশ করে বসার চেষ্টা করছি। গাড়ির পাটাতনটি সাধারণত বাঁশ বা কাঠ দিয়ে তৈরি করা হলেও বেশ মজবুত আর শক্তপোক্ত মনে হচ্ছে। ছইটি বেতের বোনা। খুপরির মতো করে ছইটিকে বিশেষ কায়দায় ঢেকে রাখা হয়েছে।
ভেতরে বৃদ্ধ চাচা ছাড়া আর কেউ আছে কিনা স্পষ্ট নয়। কেউ আছে বলেও বোঝা যাচ্ছে না। পবিত্র কুরআন মাজিদখানা বুকের সাথে লেপ্টে ধরে রেখেছি। এটাই আমার সাথে থাকা একমাত্র মহামূল্যবান সম্পদ। আমার রক্ষাকবচ। মহান রবের ইচ্ছায় পবিত্র এই মহাগ্রন্থ অধম এই মুসাফিরকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে। চোখ বুজে মহান রাব্বুল আলামিনের শোকর গুজার করতে লাগলাম। মনে মনে আওড়াতে থাকি, ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে যে নিয়ামত তুমি দান করেছ তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শক্তি দান কর। আর আমি যাতে তোমার পছন্দনীয় সৎকর্ম করতে পারি এবং আমাকে তোমার অনুগ্রহে তোমার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত কর।’ ক্যাচ ক্যাচ শব্দে গাড়ি দুলতে দুলতে এগিয়ে চলতে লাগল।

একটা অপরিচিতা নারী কণ্ঠের ‘উহু!’ শব্দে হঠাৎ চমকে উঠি আমি। একে তো অসমতল কাঁচা রাস্তা। এবড়োথেবড়ো। তার ওপর গরুর গাড়ি। চলাচলের সময় গাড়িতে মাঝে মধ্যে বড়সড় ধাক্কা অনুভূত হয়। এবারো হয়েছে তাই। যদিও এবারের ঝাঁকুনিটা বেশ জোরেশোরে লেগেছে। কিছুটা তন্দ্রার মতো লেগে আসছিল আমার। সারা রাতের নিদ্রাহীনতা, গত কয়েক দিনের মানসিক অবসাদ আর ক্লান্তিতে সামান্য চোখ বুজে আসে। কিন্তু শব্দটা কোথা থেকে আসে ঠিক বুঝতে পারছি না।
বেলা দ্বিপ্রহর। গাড়িটা এখন লোকালয় ছেড়ে অনেকটা জনমানবহীন ঢালু এলাকায় চলে এসেছে। বর্ষাঋতুতে এসব চরবেষ্টিত অঞ্চলগুলো পানিতে থৈ থৈ করে। এখন অবশ্য শীতের সময় বলে চতুর্দিকে শুধু হলুদ সরিষা। হলুদে হলুদে ঢেউ খেলে চলেছে তেপান্তর জুড়ে। জোহর নামাজের আজান শুরু হয়ে গেছে। অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে মুয়াজ্জিনের সুললিত কণ্ঠে হৃদয়ছোঁয়া আজানের ধ্বনি। আশপাশে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে নেই মসজিদ, বাড়িঘর। দেখা যাচ্ছে না কোনো মানুষজন। নামাজটা এই নির্জন প্রান্তরের সবুজ সতেজ গালিচার ওপর সেরে ফেলতে পারলে মন্দ হতো না। এই মুসাফিরের হিজরতের সময়টাতে এই নামাজ নিশ্চয় উত্তম বারাকাহ নিয়ে আসবে। আল্লাহর দুনিয়ায় সেজদা দেয়ার মতো পবিত্র মাটির অভাব নেই।

বিধাতা আমার মনের অস্থিরতা ও পেরেশানি বেশ বুঝতে পেরেছে বলা যায়। ‘অ্যাই রুখো রুখো’ বলে খুপরির ভেতর থেকে নারী কণ্ঠের স্পষ্ট আওয়াজ বের হয়ে আসে। এবার আর কোনো ভুল শোনা নয়। বুঝতে একটুও অসুবিধে হয়নি। ঢের বুঝতে পেরেছি গাড়িতে চতুর্থ আরো একজন আছেন। কণ্ঠের মাধুর্যতায় প্রমাণ করে, ভদ্রমহিলা সম্ভ্রান্ত পরিবারের একজন শিক্ষিতা ও পর্দানশিন নারী। ভদ্রমহিলা ফের বলে উঠে, ‘অ্যাই গাড়োয়ান রুখো। বাপুজি আর আমি নামাজ পড়বো। মিনিট ১০-১৫ বিরতি দেয়া হোক।’
গাড়োয়ান এক মুহূর্তও আর দেরি করেনি। তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে বলল, ‘জে আপুজি, তাই হবে। আপনারা নামাজ পড়ে নিন।’
ভদ্রমহিলা খুব সম্ভবত বৃদ্ধ চাচার মেয়ে হবে। বাপুজি বলে সম্বোধন করায় এই বিষয়ে আর কোনো দ্বন্দ্ব রইল না আমার। অজু থাকলেও আমি পুনরায় করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। তার আগে অবশ্য হালকা মেসওয়াক করে নিতে ভুল করিনি। ভদ্রমহিলা ও তার অসুস্থ পিতা খুপরির ভেতর নামাজ আদায় করে নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চাচা সম্ভবত শুয়ে শুয়ে আদায় করে নিবে। আমি গাড়ি থেকে নিঃশব্দে নিচে নেমে আসি। উন্মুক্ত খোলা আকাশের নিচে হাত পা ছড়িয়ে লম্বা একটা শ্বাস নিই। তারপর সামান্য দূরে সুবিধেমতো সবুজ দূর্বাঘাসের ওপর একটা তোয়ালে বিছিয়ে সালাত আদায় করে নিতে মনোনিবেশ করি। দিগন্ত বিস্তৃত সুবিশাল খোলা আকাশের নিচে মহান আল্লাহকে সেজদার সুখ অন্যরকম, বলে বোঝানো যাবে না। সালাত শেষান্তে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে সালাম ফিরিয়ে পরম করুণাময়ের নিকট দুই হাত তোলে নিজেকে কিছুক্ষণের জন্য সম্পূর্ণরূপে সঁপে দিই।

মুনাজাত শেষে এক অদ্ভুতরকমের শান্তি লাগছিল। কেমন যেন হালকা লাগছিল নিজেকে। পেছনে ফিরে দেখি গাড়োয়ানসহ গাড়ির অপরাপর সদস্যরা আমার জন্য অপেক্ষিত। নিশ্চয় ওদের সালাত আদায় অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে। নির্দিষ্ট সময় থেকে ৫ মিনিট সময় বেশি লেগে গেছে বলে একটু খারাপ লাগছে। তোয়ালেখানা চার ভাঁজে গুটিয়ে নিতে নিতে গাড়ির দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে চললাম।
গাড়ি আবার চলতে শুরু করল তার নিজস্ব চেনা ঢংয়ে। আর কিছুদূর সামনে গেলে হরিশ্চর চৌরাস্তার মোড়। তারপর বাঁয়ে ফয়েজগঞ্জ ও নশরতপুর পার হয়ে আমাদের গন্তব্যে প্রথম মকসুদ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন লাকসাম রেল জংশন। ‘কত লাকসাম কতো বাত্তি’ খ্যাত লাকসাম জংশনে গিয়ে যার যার মতো আমরা আলাদা হয়ে যাব।
বৃদ্ধ অসুস্থ চাচার জন্য খুব কষ্ট লাগছে। কিছুটা কী খারাপ লাগছে না ভদ্রমহিলার জন্যও? অসুস্থ পিতাকে একা সামাল দিয়ে কিভাবে গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছবে জানা নেই। মহান আল্লাহ ভালো জানেন ওরা কোথায় থেকে আসছে, কোথায় যাচ্ছে। একটা দীর্ঘশ্বাস মনের অজান্তে বেরিয়ে আসে।

সময় বড় নিষ্ঠুর হয়। সময় স্রোতের মতো হেঁটে যায় তার নির্দিষ্ট আল পথ ধরে। পথের স্মৃতি পথের ধুলোয় মিশে যায়। উদাসী চোখে বাইরে তাকিয়ে দেখি অদূরে রাস্তার মোড়ে একজন বৃদ্ধা একটা চটের ব্যাগ হাতে নিয়ে হেঁটে চলেছেন আর হাঁপিয়ে যাচ্ছেন। বারবার ব্যাগটি মাটিতে রাখছেন, আবার উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। মনে হচ্ছে বৃদ্ধার দেহের তুলনায় তার হাতের চটের ব্যাগটার ওজন প্রায় দ্বিগুণ বেশি। আরো দূরে একজন মধ্যবয়স্ক চাচা দ্রুত পায়ে বৃদ্ধার দিকে এগিয়ে এলেন। বৃদ্ধার হাতের ব্যাগটি মুহূর্তে নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। অবাক হয়ে সুন্দরতম দৃশ্যটি দেখতে দেখতে আমার মুখ থেকে সশব্দে বেরিয়ে আসে, সুবহানাল্লাহ, শোকর আলহামদুলিল্লাহ। পরক্ষণে মনের ভাবনায় নাড়া দেয়, আমি কি আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে যাচ্ছি না? মহান আল্লাহ কী চোখের সম্মুখের এই ঘটনা দ্বারা আমাকে কিছু একটা ইঙ্গিত করছেন? আমি কি পারি না অসহায় পিতা-মেয়েকে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে? মহান সুবহানাহু তায়ালা হয়তো আমাকে তাদের সফরসঙ্গী করেছেন কোনো বিশেষ একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম। ওদের সাধ্যমতো সাহায্য সহযোগিতা করতে হবে। গাড়োয়ান গাড়ির গতি হঠাৎ শ্লথ করে দেয়। গাড়ি লাকসাম জংশনে এসে উপস্থিত হয়।

শীতের বিকেল বলে মানুষের ভিড়-ভাট্টা তেমন একটা চোখে পড়ছে না। দোকানপাট অল্প-কিছু খুলেছে। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। সারা দিনে কয়েক পিস বনরুটি আর কলা খেয়ে আছি। মন ভরে একটু পানি পান করতে পারলে ভালো হতো। তবুও লাখো-কোটি শোকর মহান রাব্বুল আলামিনের। কিছু শুকনো খাবার কিনে নিতে হবে সুযোগ বুঝে। সালাতুল আসরের আজান পড়বে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে। গাড়োয়ান ইতোমধ্যে গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। অসুস্থ বৃদ্ধ চাচাকে নামানোর পাঁয়তারা চলছে। এই প্রথম চাচার পর্দানশিন মেয়েকে দেখতে পেলাম। তিনি পিতাকে সাহায্য করতে একটু আগে ভাগে নেমে পড়েছেন। অবশ্য তাকে দেখেছি বললে ভুল হবে। তার সমস্ত শরীর বোরকা-নেকাব দ্বারা আবৃত। মূলত ‘হিজাব বা পর্দা’ নারীর সৌন্দর্য ও মর্যাদার প্রতীক। নারীর সতিত্ব ও ইজ্জত-আবরুর রক্ষাকবচ। নারী-পুরুষ উভয়ের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার অতি সহজ ও কার্যকর উপায়। এ বিধান অনুসরণের মাধ্যমে হৃদয়-মনের পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব।

আমি গাড়োয়ানের পিছুপিছু এগিয়ে গেলাম। চাচাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে ভদ্রমহিলাকে বললাম, আপনি একটু বাঁয়ে সরে দাঁড়ান প্লিজ। ঘাবড়াবেন না, চাচাকে আমরা সতর্কতার সাথে নিচে নামিয়ে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।
কোনো কথা না বলে দৃষ্টি মাটির দিকে রেখে মেয়েটি পাশে সরে দাঁড়ায়। বৃদ্ধ চাচাকে নিচে নামাতে আমাদেরও তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। অসুস্থ হলেও মানসিকভাবে চাচাকে বেশ শক্তপোক্ত মনে হয়েছে। ধরাধরি করে উনাকে রেল জংশনের একটি খোলা বেঞ্চে বসিয়ে দিই আমরা। এরই মধ্যে গাড়োয়ানকে ভাড়া চুকিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি ভাড়া দিতে এগিয়ে গেলে এই প্রথম চাচা কথা বলে ওঠেন, ‘বাবা ভাড়ার জন্য তোমাকে ব্যস্ত হতে হবে না। চিন্তা করো না গাড়োয়ানকে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া দেয়া হয়েছে।’
সবাইকে সালাম ও মোবারকবাদ জানিয়ে গাড়োয়ান আমাদের থেকে বিদায় নেয়। এবার আমার বিদায় নেয়ার পালা। চাচাকে এখানে অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে মনে হলো। পুরো রাস্তা চাচাকে শুয়ে শুয়ে আসতে হয়েছে। এখন একটু বসতে পারায় হয়তো চাচার বেশ ভালো লাগছে। হঠাৎ চাচা আমাকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করে, ‘তা বাবা তুমি কোথায় যাবে?’
এই প্রশ্নের জবাব এই মুহূর্তে নেই। মুসাফিরের কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকতে নেই। কী উত্তর দেবো বুঝতে পারছি না। আমার গন্তব্য কোথায়, আমি যে নিজেই জানি না। আমি মুসাফির। চোখ বুজে ডানহাতে মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন মাজিদকে বুকের সাথে ঈষৎ চেপে ধরি।

চাচা কোনো উত্তর না পেয়ে ফের তাগাদা দেয়, ‘কী হলো বাবা! চুপ করে আছ কেন? বললে নাতো কোথায় যাবে তুমি?’
আমি চোখ খুলে হঠাৎ মনের অজান্তে মুখ ফসকে বলে ফেলি, ‘পুব দিকে যাবো । পুণ্যভূমি সিলেটের দিকে যাবো চাচা। আপাতত আমার গন্তব্য সে পর্যন্তই।'
‘আরেব্বাহ্ মারহাবা! আমাদের গন্তব্যও তো সেদিকে। আলহামদুলিল্লাহ, দারুণ হলো। একজন সাচ্চা নওজোয়ান সঙ্গী পাওয়া গেল। দুজনে বেশ জমে যাবে। কী বলো বাবা?’
আমার ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগলো, ইতস্তত করতে করতে জবাব দিলাম, ‘জি চাচা, জি ইনশাআল্লাহ।’
বৃদ্ধ চাচা মেয়ের দিকে তাকিয়ে সুপ্রসন্ন হৃদয়ে বলতে লাগল, ‘বেশ ভালো ছেলে মা। করিতকর্মা।’
আমি ফের মুখ খুললাম,
‘চাচা একটু ফুরসত দিলে একটু ওদিকে যেতাম। সামান্য কিছু কেনাকাটা ছিল।’
চাচা শশব্যস্ত হয়ে জানতে চায়,
‘কী কিনবে বাবা, খাবার?’
‘জী চাচাজি, ঠিক ধরেছেন। আসলে অনেক দূরের পথ তো...!’

চাচা মুখের কথা শেষ করার সুযোগ না দিয়ে বলতে লাগল, ‘তার আর কোনো প্রয়োজন নেই বাবা। আমাদের ব্যাগে পর্যাপ্ত খাবার মজুদ আছে। ওই যে দেখছো আমার মেয়ে। সেতো বলতে গেলে কিছুই খেতে চায় না। মা মরা একমাত্র মেয়ে আমার। এই বুড়ো বাবার অসুস্থতা নিয়ে দিনরাত পেরেশানি থাকে। সেবা-শুশ্রƒষা করে। আর আমি অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষ। মুখে খাবার তেমন রোচে না। তবুও মেয়ে জোর করে এক-আধটু খাইয়ে দেয়। এই যাত্রায় তুমি আমাদের একমাত্র মেহমান বাবা। খোদাতায়ালার মর্জি মোতাবেক তোমার মেহমানদারি থেকে শুরু করে সমস্ত দায়-দায়িত্ব আমাদের ওপর বর্তায়।’
‘শোকর আলহামদুলিল্লাহ চাচা। শুকরিয়া মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার। তিনি যা চাইবেন, তাতেই মঙ্গল।’
চাচার ইচ্ছা ও আন্তরিকতায় উদয়ন এক্সপ্রেসের তিনটি টিকিট দ্রুত সময়ের মধ্যে কেটে নিলাম। ট্রেন যেকোনো মুহূর্তে হুইসেল বাজাতে বাজাতে প্লাটফর্মে এসে উপস্থিত হবে। পুরো পয়সা চাচার গাঁট থেকে খরচ হয়েছে। অনেকটা বাধ্য হয়ে আমাকে নিতে হলো। একটি পয়সাও নিজ থেকে খরচ করতে দেয়নি চাচা। বুকে লেপ্টে থাকা পবিত্র কুরআন সবার অলক্ষ্যে চুমু খেলাম, আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এ কুরআন সবচেয়ে ভালো পথ দেখায়’। কুরআন এমন এক মোজেজা, যা শুধু দৈনন্দিন জীবনের চারিত্রিক শিক্ষাই প্রদান করে না, বরং মানবজাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস ও কারণও বর্ণনা করে থাকে।
বলতে না বলতে উদয়ন এক্সপ্রেস চট্টগ্রাম থেকে এসে এক নম্বর প্লাটফর্মে হুইসেল বাজাতে বাজাতে প্রবেশ করতে লাগল। আমরা সর্বপ্রথম সবার ব্যাগপত্রগুলো আগে আগে বগিতে রাখতে চেষ্টা করি। তারপর চাচাকে জড়িয়ে ধরে অতি সতর্কতার সাথে নির্ধারিত বগিতে গিয়ে উঠি। সহিসালামতে উনাকে আসনে নিয়ে বসাই। ততক্ষণে মেয়েটিও উঠে গিয়ে বাবার পাশে বসে। মহান রবের ইচ্ছায় আমি বসেছি চাচার ঠিক ওল্টোদিকে মুখোমুখি হয়ে।

সিলেটগামী উদয়ন এক্সপ্রেস ছেড়েছে বেশ অনেকক্ষণ হয়েছে। অনেক বগি জড়িয়ে বিরামহীন ছুটে চলেছে। চাচার পর্দানশিন মেয়ে বাবার সাথে জানালার পাশে বসেছে। দৃষ্টি বেশির ভাগ সময় জুড়ে বাইরের পৃথিবীর দিকে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আখাউড়ার গঙ্গাসাগর স্টেশনের কাছাকাছি এই মুহূর্তে ট্রেন। গাড়ি ছাড়ার পর আমরা কিছু শুকনো খাবার খেলেও, মেয়েটা কিছুই মুখে তোলেনি। এরই ফাঁকে অনিচ্ছাকৃতভাবে দু-দুবার তার চোখে চোখ পড়ে যায় আমার। তার চোখে শুধুই অতল বিষাদ। তার রূপ ঠিক সেরকম হালকা না, তারও বেশি কিছু। যে রূপ বাহ্যিকভাবে দেখার সামান্যতম সুযোগ নেই কিংবা দেখা যায় না। অনুভব করা যায় শুধু। যে রূপকে ঝলকানো বলে, এ রূপ সেরকম না। এ রূপ যেন স্নিগ্ধ দীপশিখা এবং তাকে ঘিরে আছে একটি সম্ভ্রম ও আভিজাত্যপূর্ণ গাম্ভীর্য। কালো চোখের তারা সকরুণ বিষণ, তথাপি মনে হয় বিদ্যুৎ চমকের মতো হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠতে পারে। কণ্ঠস্বরটি প্রায় বালিকার মতো মিষ্টি আর সুর-ঝংকৃত, তথাপি একটি বিষাদের স্পর্শ যেন রয়ে গেছে। এ দিকে চাচার মুখে খৈ ফুটেছে যেন। একেরপর এক কথা বলেই যাচ্ছে। এই মানুষটাকে দেখলে মোটেও বোঝার উপায় নেই সকাল থেকে গরুর গাড়িতে অসুস্থ শয্যাশায়ী ছিল। তবে আমি কৃতজ্ঞ বোধ করলাম এবং চাচার শিক্ষা এবং বিদ্যাবত্তার পরিচয় পেয়ে তাকে আমার শ্রদ্ধা না জানিয়ে পারলাম না। প্রকৃতপক্ষে রসিক বলতে যা বোঝায় তিনি কিছুটা তা-ই। ইতিহাস-ঐতিহ্য, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতির সমস্ত বিষয়েই তাঁর দখলের সীমা দিগন্তবিসারী। হঠাৎ আমাকে উদ্দেশ করে বলতে শুরু করলেন,
‘বুঝলে বাবা, সিলেট যাচ্ছ যেহেতু কিছু কথা তোমার জানা জরুরি। অবশ্য না জানলেও ক্ষতি নেই। আজকাল তো ইতিহাস চর্চা প্রায় উঠে গেছে...।’

আমি তাগাদা দিয়ে বললাম, ‘চাচা, শুনবো না কেন! অবশ্যই শুনব। আপনি বলুন।’
চাচা একনাগাড়ে কথা বলে যাচ্ছে শুধু। এ দিকে চাচার মেয়ে প্রথম দিকে একটু উশখুশ করলেও এখন অনেকটা সপ্রতিভ হয়ে আমাদের আলোচনা শুনে যাচ্ছে। দৃষ্টি এখনো ট্রেনের জানালা গলিয়ে বাইরে ঘুরপাক খাচ্ছে তার। সন্ধ্যা নেমেছে কিছুক্ষণ আগে। সালাতুল মাগরিব যে যার মতো করে আদায় করে নিয়েছি। এ দিকে কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে চাচা কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে পড়লেন। জানালার শিরশির মৃদু বাতাসে কখন যেন শিশুর মতো অঘোরে ঘুমিয়ে পড়লেন।
চাচা ঘুমিয়ে পড়ায় এক বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ে যাই দুইজন। ভিন্ন বাস্তবতার দুইজন অচেনা মানুষ আজ মুখোমুখি। অথচ কারো মুখে কোনো কথা নেই। রাতের নির্জনতা ক্রমেই বাড়তে থাকে। দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের এক ভিন্ন বাস্তবতায়। মহান রবকে বারবার স্মরণ করতে থাকি। ভবিতব্য নিশ্চয় তিনি ঠিক করে দিবেন। তিনি যে সবকিছু দেখছেন। জীবনের ঘটনাগুলো যতই আলাদা হোক না কেন, কোথাও যেন একটি মিল রয়েছে। জীবনের চাওয়া-পাওয়া ও না পাওয়ার রংগুলো একই রকম ধূসর আবার রঙিন, ঠিক যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। জীবনের প্ল্যাটফর্মের ভিড়ে প্রতিটি মানুষই মুসাফির। তাকে প্রতিনিয়ত ছুটে চলতে হয়, এগিয়ে যেতে হয় এক গন্তব্যহীন যাত্রায়।