অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
দেশের পুঁজিবাজারগুলো বিদায়ী সপ্তাহে বেশ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে পার করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সপ্তাহটিতে ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেন ও সূচক দুুটোরই উন্নতি ঘটেছে। সরকারের পক্ষ থেকে শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়ায় আগের সপ্তাহের শেষদিকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে পুঁজিবাজার। এরই ধারাবাহিকতায় পুঁজিবাজারে গত সপ্তাহে শুরুটা ছিল বেশ ভালো। কিন্তু পরবর্তীতে সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা আবার পুঁজিবাজারে অস্থিরতা তৈরি করে। সপ্তাহের শেষদিকে তার প্রভাব ছিল বাজারে।
পুঁজিবাজারের নেতিবাচক আচরণের মধ্যে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এক সংবাদ সম্মেলনে পঁাঁচটি ব্রোকার হাউজের প্রতারণার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বিনিয়োগকারীদের একটি অংশের ক্ষতিপূরণ প্রদান করার পাশাপাশি বাজার উন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ করলে সাময়িকভাবে নেতিবাচক প্রবণতা কাটিয়ে ওঠে পুঁজিবাজার। এরই প্রতিফলন ছিল সাপ্তাহিক বাজার আচরণে। বৃদ্ধি পায় পুঁজিবাজারটির লেনদেন ও সূচক। 
ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ৪৬ দশমিক ১৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। পাঁচ হাজার ৫৩২ দশমিক ১৪ পয়েন্ট থেকে রোববার সপ্তাহ শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার সপ্তাহান্তে পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ৫৭৮ দশমিক ৩৩ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৯৮ ও ৮ দশমিক ৯৯ পয়েন্ট। তবে সপ্তাহের মোট পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে দু’টিতে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটলেও তিনটিতে বাজার আচরণ ছিল নেতিবাচক। 
সূচকের পাশাপাশি গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনেও কিছুটা উন্নতি ঘটে। আগে সপ্তাহে বাজারটির মোট লেনদেন ছিল দুই হাজার ৭৭৪ কোটি টাকা। কিন্তু গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেন দাঁড়ায় তিন হাজার ৯২৮ কোটি টাকা যা টাকার অঙ্কে এক হাজার ৮০২ কোটি টাকা বেশি। একইভাবে বাজারটির গত লেনদেন ৫৫৪ দশমিক আট কোটি টাকা থেকে পৌঁছে যায় ৭৮৫ দশমিক ছয় কোটিতে। তবে সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে এসে বাজার আচরণ খারাপের দিকে মোড় নিলে অবনতি ঘটে লেনদেনের। 
এ দিকে পুঁজিবাজারে আসার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশে সুজুকি মোটরসাইকেলের সংযোজক ও একমাত্র অনুমোদিত  পরিবেশক প্রতিষ্ঠান রেনকন মোটরবাইকস লিমিটেড। কোম্পানিটির পুঁজিবাজারে আসার বিষয়ে লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরি লিমিটেড উপদেষ্টা এবং সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট ইস্যু ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। সম্প্রতি রেনকন মোটরবাইকসের সাথে লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরি ও সিবিসি ক্যাপিটালের একটি চুক্তি সই হয়েছে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে কোম্পানিটি। 
এ চুক্তির আওতায়, লায়ন সিটি রেনকন মোটর বাইকসকে করপোরেট ও পুঁজিবাজারবিষয়ক পরামর্শ সেবা প্রদান করবে এবং সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইকুইটি ম্যানেজমেন্ট প্রস্তাবিত তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ার ব্যবস্থাপনা করবে। রেনকন মোটর বাইকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রোমো রউফ চৌধুরী এবং লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরির নির্বাহী পরিচালক এরশাদ হোসেন নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে রেনকন মোটরবাইকসের ঊর্ধŸতন কর্মকর্তা আহসান হাকিম, ফারহানা করিম, ইমরান জামান খান এবং আবু জাফর সিদ্দিক উপস্থিত ছিলেন। অন্য দিকে লায়ন সিটি অ্যাডভাইজরির প্রতিনিধিত্ব করেন আবদুল্লাহ আল ফয়সাল ও অন্যান্য কর্মকর্তা, আর সিবিসি ক্যাপিটাল অ্যান্ড ইকুইটি ম্যানেজমেন্টের প্রতিনিধিত্ব করেন রবিউল হোসেন।
যমুনা ক্যাপিটালের বিরুদ্ধে বিএসইসির তদন্ত কমিঠি
শেয়ারবাজারে শেয়ারপার্কিং, লেনদেন সফটওয়্যারে কারসাজি এবং গ্রাাহকদের অনিয়মতান্ত্রিক সুবিধা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্রোকারেজ হাউজ যমুনা ব্যাংক ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেডের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম তদন্ত করতে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)।
বিএসইসির মার্কেট ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ডিভিশন থেকে এ বিষয়ে তদন্তের আদেশ জারি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং শেয়ারবাজারে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম যাচাইয়ের অংশ হিসেবে এ তদন্ত করা হচ্ছে। 
জানা গেছে, যমুনা ব্যাংক ক্যাপিটালের বিরূদ্ধে গত ১২ জুলাই ও ১৮ আগস্ট কমিশনে পৃথক দু’টি অভিযোগ জমা পড়ে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম খতিয়ে দেখার উদ্যোগ নেয় বিএসইসি। এরই অংশ হিসাবে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অধ্যাদেশ, ১৯৬৯-এর ২১ নম্বর ধারা এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ১৭(ক) ধারায় দেয়া ক্ষমতাবলে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিএসইসির গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিতে রয়েছেন কমিশনের অতিরিক্ত পরিচালক মুহাম্মদ আল মাসুম মৃধা, সহকারী পরিচালক সৌরভ মল্লিক এবং মো: মারুফ হাসান। কমিটিকে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে কমিশনের কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে যমুনা ব্যাংক ক্যাপিটালের বিরূদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা, সম্ভাব্য অনিয়মে ধরন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হবে।
তদন্ত কমিটি যমুনা ব্যাংক ক্যাপিটালের গ্রাাহকদের মার্জিন ঋণ দেয়ার প্রক্রিয়া এবং ঋণ হিসাব পরিচালনায় আইন ও বিএসইসির নির্দেশনা যথাযথ মানা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করবে। অভিযোগ রয়েছে, স্পন্সর বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা থাকা শেয়ারের বিপরীতেও কিছু গ্রাহককে সুবিধা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া গ্রাহকের হিসাবের প্রকৃত অবস্থার তুলনায় অতিরিক্ত ক্রয়ক্ষমতা দেখানো, বাজারদরের ভিত্তিতে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো এবং শেয়ার না কিনেও অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেয়া হয়েছিল কি না এসব বিষয়ও তদন্ত করবে কমিটি।
এ ছাড়া কমিশন গ্রহণ, অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেয়া, অর্থ উত্তোলন এবং অতিরিক্ত ক্রয়ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে কোনো পক্ষ আর্থিক সুবিধা পেয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করা হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত পরীক্ষা করবে তদন্ত কমিটি। প্রতিষ্ঠানটির সফটওয়্যার, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা, লেনদেন ব্যবস্থা বা অন্যান্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থায় অনুমোদন ছাড়া কোনো পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
অভিযোগগুলোর সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালনা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা তদন্ত করবে কমিটি। একই সাথে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা যথাযথ ছিল কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হবে। তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায় এবং সম্ভাব্য আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি এসব ঘটনায় প্রতিষ্ঠান, গ্রাহক বা শেয়ারবাজারের কোনো আর্থিক বা নিয়ন্ত্রক ক্ষতি হয়েছে কি না, তাও যাচাই করা হবে। তদন্ত শেষে কমিশনে জমা দেয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হবে।