অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

আশার জায়গা সৃষ্টি হওয়ার আগেই ফের বড় ধাক্কা খেল দেশের পুঁজিবাজার। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবস রোববার ঢাকা ও চট্টগ্রাম- দুই শেয়ারবাজারেই ব্যাপক দরপতন হয়েছে। বেশির ভাগ কোম্পানির শেয়ারদর কমার পাশাপাশি প্রধান মূল্যসূচকগুলোও উল্লেখযোগ্য হারে নেমে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, সূচকের পতনের সাথে লেনদেনও কমেছে। অর্থাৎ বাজারে নতুন করে বড় অর্থ প্রবেশের বদলে বিক্রির চাপই প্রাধান্য পেয়েছে।
দিনের লেনদেন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৪৮ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ কমে ৫ হাজার ৪৮২ দশমিক ৩৬ পয়েন্টে নেমেছে। একই সাথে ডিএসই-৩০ সূচক প্রায় ১৮ পয়েন্ট এবং ডিএসই শরিয়াহ সূচক ১০ পয়েন্ট কমেছে।
বাজারের ব্যাপ্তিই আজকের দুর্বলতার সবচেয়ে বড় ইঙ্গিত। ডিএসইতে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৮২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৯১টির শেয়ার ও ইউনিটের দর কমেছে। বিপরীতে দর বেড়েছে মাত্র ৬৬টির এবং ২৫টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় চার-পঞ্চমাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদরই কমেছে।
সূচকের সাথে লেনদেনেও চাপ
শুধু সূচকের পতন নয়, লেনদেনের চিত্রও বাজারের দুর্বলতা স্পষ্ট করেছে। রোববার ডিএসইতে মোট ৫৪২ কোটি ৯৮ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৭২৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। ফলে এক দিনেই লেনদেন কমেছে ১৮০ কোটি ১৩ লাখ টাকা।
বাজার বিশ্লেষণে সাধারণত সূচকের পতনের সাথে লেনদেন বেড়ে গেলে সেটিকে সক্রিয় বিক্রিচাপ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সূচক ও লেনদেন- দু’টিই একসাথে কমলে বোঝা যায়, ক্রেতারাও আগ্রাসী অবস্থানে নেই। আজকের বাজারে সেই চিত্রই দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ নতুন করে অবস্থান নেয়ার বদলে অপেক্ষা ও সতর্কতার কৌশল নিয়েছেন বলে বাজারের লেনদেনচিত্র ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এ দিকে লেনদেনে শীর্ষে ছিল সায়হাম টেক্সটাইল। কোম্পানিটির ১৮ কোটি ৭৭ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এরপর প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল ১৪ কোটি ৮৭ লাখ এবং মালেক স্পিনিং ১৩ কোটি ৬০ লাখ টাকার লেনদেন নিয়ে পরের অবস্থানে ছিল।
ভালো কোম্পানিও রেহাই পায়নি
আজকের বাজারে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়গুলোর একটি হলো তুলনামূলক ভালো লভ্যাংশ দেয়া কোম্পানির শেয়ারেও বিক্রির চাপ থাকা। ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৩৪টির দর বেড়েছে, কিন্তু ১৫২টির দর কমেছে। অর্থাৎ মৌলভিত্তি ও লভ্যাংশের বিচারে অপেক্ষাকৃত ভালো কোম্পানিগুলোও সার্বিক বাজারের নেতিবাচক প্রবণতা থেকে বের হতে পারেনি।
১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যেও একই চিত্র। এ শ্রেণীর ১৪টির দর বাড়লেও কমেছে ৫৯টির। অন্য দিকে ‘জেড’ শ্রেণীর কোম্পানির ১৮টির দর বাড়ার বিপরীতে কমেছে ৮০টির। মিউচুয়াল ফান্ডেও ছিল ব্যাপক দুর্বলতা- চারটির দর বাড়লেও কমেছে ২৭টির।
এর অর্থ, আজকের দরপতন কোনো একটি নির্দিষ্ট খাত বা কয়েকটি দুর্বল কোম্পানিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং বাজারজুড়েই বিক্রির চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
চট্টগ্রামেও একই চিত্র
ঢাকার মতো চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) আজ ছিল বড় পতন। লেনদেনে অংশ নেয়া ১৭১টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১১৪টির দর কমেছে। বিপরীতে দর বেড়েছে মাত্র ৪০টির এবং ১৭টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
সিএসইর সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই কমেছে ১৭১ পয়েন্ট। একই সাথে লেনদেন হয়েছে ১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের ১৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার তুলনায় ২ কোটি ৪৫ লাখ টাকা কম।
আস্থার ঘাটতিই বড় প্রশ্ন
সাম্প্রতিক বাজারচিত্রে ওঠানামা থাকলেও সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে দুর্বলতার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। গত সপ্তাহে ডিএসইএক্স ৪৬ দশমিক ৬৮ পয়েন্ট কমেছিল। একই সময়ে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৪ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা এবং দৈনিক গড় লেনদেন ১০ শতাংশের বেশি কমে যায়।
সেই ধারাবাহিকতায় অক্টোবরের প্রথম কার্যদিবসেই বড় পতন বাজারের জন্য স্বস্তিদায়ক বার্তা নয়। বিশেষ করে ডিভিডেন্ড মৌসুম, ভালো কোম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এবং পুঁজিবাজার সংস্কারের নানা উদ্যোগের মধ্যেও যদি বিক্রির চাপ অব্যাহত থাকে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই- বাজারে সমস্যা কি কেবল তারল্যের নাকি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কট আরো গভীরে?
এ মুহূর্তে বাজারের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন স্থিতিশীলতা। সূচকের একদিনের উত্থান-পতনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ধারাবাহিক লেনদেন, মৌলভিত্তিক কোম্পানিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা। তা না হলে কয়েক দিনের সাময়িক উত্থানও বড় ধরনের টেকসই বাজারে রূপ নেবে না।আজকের বাজারের সবচেয়ে বড় বার্তা তাই একটাই- সূচক শুধু পড়েনি, বাজারের মনও আজ অনেকটাই সতর্ক হয়ে পড়েছে।