নিজস্ব প্রতিবেদক

টানা দরপতনে অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের শেয়ারবাজার। এক দিকে প্রধান সূচক ধারাবাহিকভাবে কমছে, অন্য দিকে লেনদেনে অংশ নেয়া অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর নেমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের লোকসান বাড়ার পাশাপাশি বাজারের প্রতি আস্থার সঙ্কটও তীব্র হচ্ছে। 
গতকাল মঙ্গলবার সপ্তাহের তৃতীয় কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) প্রধান সূচক ২০ পয়েন্টের বেশি কমেছে। দিনটিতে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯০টি কোম্পানির মধ্যে ২৭০টির শেয়ারদর কমেছে। বিপরীতে দর বেড়েছে মাত্র ৭৯টির।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাভাবিক বাজারে উত্থান-পতন থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে অধিকাংশ শেয়ারের দর কমতে থাকলে তা বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করে। বর্তমানে বাজারে নতুন বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ যেমন কমছে, তেমনি বিদ্যমান বিনিয়োগকারীদের একটি অংশও নতুন করে বিনিয়োগের বদলে অপেক্ষার কৌশল নিচ্ছেন। ফলে বাজারে তারল্য থাকলেও তা শেয়ারদরকে স্থিতিশীল করার মতো শক্তি তৈরি করতে পারছে না। 
গতকাল ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২০ দশমিক ২৯ পয়েন্ট কমে ৫ হাজার ৪২৪ দশমিক ৯১ পয়েন্টে নেমে এসেছে। আগের কার্যদিবসে এ সূচক ছিল ৫ হাজার ৪৪৫ দশমিক ২০ পয়েন্ট। একই দিন ডিএসইএস সূচক ৪ দশমিক ৯৩ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৭৪ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ডিএসই-৩০ সূচকও ৪ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট কমে ২ হাজার ৭৭ দশমিক ৯ পয়েন্টে অবস্থান করছে। 
সূচকের পতনের বিপরীতে অবশ্য ডিএসইতে লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। গতকাল মোট ৫৬৪ কোটি ১৭ লাখ ৬০ হাজার টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৫৩৭ কোটি ১১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা; অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে প্রায় ২৭ কোটি টাকা। তবে লেনদেন বাড়লেও অধিকাংশ শেয়ারের দর কমে যাওয়ায় বাজারে ইতিবাচক কোনো বার্তা তৈরি হয়নি। 
গতকাল ডিএসইতে মোট ৩৯০টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট লেনদেনে অংশ নেয়। এর মধ্যে ৭৯টির দর বেড়েছে, ২৭০টির কমেছে এবং ৪১টির দর অপরিবর্তিত ছিল; অর্থাৎ লেনদেনে অংশ নেয়া প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৭০ শতাংশের শেয়ারদর কমেছে। বাজারের এই চিত্রই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিক্রির চাপ এবং আস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করছে।
এ দিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। গতকাল সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৬২ দশমিক ৯১ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ৫৫৭ দশমিক ৯৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। গতকাল ১৭৫টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টির দর বেড়েছে, ১১০টির কমেছে এবং ১৮টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। সিএসইতে মোট ১৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। 
বাজারের এই টানা পতনের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের প্রশ্ন উঠছে- নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সুফল তারা কখন পাবেন। বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ উপলক্ষে বাজার উন্নয়ন ও সংস্কারের নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বর্তমান দরপতন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেয়া হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। 
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে শুধু ভবিষ্যৎ সংস্কারের ঘোষণা যথেষ্ট নয়। বাজারে অনিয়ম, কারসাজি, অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি এবং ব্রোকারেজ হাউজের অননুমোদিত লেনদেনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দ্রুত ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সাথে ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির শেয়ার কেন বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণ হারাচ্ছে, সেটিও বিশ্লেষণ করা দরকার। 
এ দিকে গতকাল সায়হাম টেক্সটাইলের শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার ঘটনায় সতর্কবার্তা দিয়েছে ডিএসই। তথ্যানুযায়ী সেপ্টেম্বর মাসে কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ২৮ টাকা ৭০ পয়সা। ৪ অক্টোবর লেনদেন শেষে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪ টাকা ১০ পয়সায়; অর্থাৎ ১৮ কর্মদিবসে শেয়ারটির দর বেড়েছে ১৫ টাকা ৪০ পয়সা বা প্রায় ৫৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। 
প্রতিষ্ঠানটির অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধির কারণ জানতে ৪ অক্টোবর কোম্পানি কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চায় ডিএসই। জবাবে কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, শেয়ারদর বাড়ার মতো কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য তাদের কাছে নেই। এ ধরনের ঘটনায় বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে স্টক এক্সচেঞ্জ।
গতকাল দরপতনের দিনেও লেনদেনের শীর্ষে ছিল সায়হাম টেক্সটাইল। কোম্পানিটির ২৬ কোটি ২২ লাখ ৭৫ হাজার টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। লেনদেনের ২য় অবস্থানে ছিল প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল- কোম্পানিটির ২৬ কোটি ২৭ লাখ ২৮ হাজার টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে। তৃতীয় অবস্থানে থাকা এনভয় টেক্সটাইলের লেনদেন হয়েছে ১৩ কোটি ৭১ লাখ ৪৫ হাজার টাকার। 
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো কোম্পানির মৌলিক তথ্য বা ব্যবসায়িক পারফরম্যান্সে বড় পরিবর্তন ছাড়াই অল্প সময়ে শেয়ারদর অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেখানে বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ এ ধরনের শেয়ারে শেষ পর্যন্ত ছোট বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ বেশি দামে আটকে গিয়ে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে পারেন। 
অন্য দিকে বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা জোরদারে নতুন ডিজিটাল উদ্যোগ নিয়েছে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)। সংস্থাটি এমন একটি স্মার্ট মোবাইল অ্যাপ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা তাদের বিও হিসাবে শেয়ার ও নগদ অর্থের পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারবেন। বর্তমানে অ্যাপটির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে। 
সিডিবিএলের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কোনো বিনিয়োগকারীর পোর্টফোলিওতে পরিবর্তন ঘটলে মোবাইলে নোটিফিকেশন যাবে। ফলে তার অজ্ঞাতে শেয়ার বিক্রি বা অন্য কোনো অননুমোদিত লেনদেন হলে দ্রুত তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। অ্যাপের মাধ্যমে পোর্টফোলিওর বর্তমান বাজারমূল্য, করপোরেট ঘোষণা, লভ্যাংশসহ বিভিন্ন তথ্য জানার সুবিধাও থাকবে। 
বাজারে অতীতে কিছু ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গ্রাহকের অজ্ঞাতে শেয়ার বিক্রি এবং ভুয়া পোর্টফোলিও স্টেটমেন্ট দেয়ার অভিযোগ ও তদন্তের নজির রয়েছে। ফলে সিডিবিএলের এ ধরনের উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 
তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি শেয়ারবাজারের মৌলিক সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে। ভালো কোম্পানিকে বাজারে আসতে উৎসাহিত করা, আর্থিক প্রতিবেদনের মান উন্নত করা, কারসাজি শনাক্তে নজরদারি বাড়ানো এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা না গেলে শুধু ডিজিটাল অ্যাপ দিয়ে আস্থার সঙ্কট পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। 
এ দিকে বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, বাজারে দরপতনের সময় কম দামে শেয়ার কিনেও তারা স্বস্তি পাচ্ছেন না। কারণ বাজার ঘুরে দাঁড়ানোর নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন করে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেকে। ফলে এক দিকে শেয়ারের দাম কমছে, অন্য দিকে বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষার প্রবণতা বাড়ছে। এতে বাজারের স্বাভাবিক চাহিদা ও সরবরাহ ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। 
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতা শুধু সূচক বাড়ানোর ওপর নির্ভর করে না। একটি টেকসই বাজারের জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগকারীদের আস্থা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, ভালো কোম্পানির অংশগ্রহণ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা। এসব জায়গায় দৃশ্যমান উন্নতি না হলে সাময়িকভাবে লেনদেন বাড়লেও বাজারে স্থায়ী গতি ফিরবে না। 
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের বড় প্রত্যাশা- নিয়ন্ত্রক সংস্থা যেন শুধু দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে চলমান পতনের কারণ চিহ্নিত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়। একই সাথে অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি, কারসাজি কিংবা অননুমোদিত লেনদেনের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত ও শাস্তি নিশ্চিত করা হলে বাজারে আস্থার সঙ্কট কিছুটা হলেও কাটতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। 
তারা বলছেন, সূচকের পতন শুধু পর্দায় কয়েকটি সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয় নয়; এর সাথে জড়িয়ে আছে লাখো বিনিয়োগকারীর সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তা। ধারাবাহিক দরপতন চলতে থাকলে ক্ষতির পাশাপাশি বাজার থেকে বিনিয়োগকারীদের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার ঝুঁকিও বাড়বে। তাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে- পতনের এই চাপ সামলে কিভাবে শেয়ারবাজারে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা যায়।