- প্রথম ৩ ঘণ্টায় ৩২ ফিলিস্তিনি নিহত
- ফের যুদ্ধবিরতির আলোচনায় কাতার মিসর ও মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ফের অভিযান শুরু করেছে ইসরাইলি বাহিনী। গতকাল শুক্রবার গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর হামলার মধ্য দিয়ে শেষ হলো হামাস ও ইসরাইলের গত সাত দিনের যুদ্ধবিরতি। স্থানীয় সময় সকাল ৭টা (বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টা) থেকে ইসরাইলি বিমানবাহিনী ও স্থলবাহিনীর হামলা শুরু হয়। হামলা শুরুর প্রথম তিন ঘণ্টায় ৩২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
হামলার কিছু সময় আগে দেয়া এক বিবৃতিতে আইডিএফ বলেছে, যুদ্ধবিরতির শর্তানুযায়ী শুক্রবার যেসব বন্দীকে মুক্তি দেয়ার কথা হামাসের, তা এখনো সরবরাহ করেনি তারা। পাশাপাশি হামাসের বিরুদ্ধে ইসরাইলকে লক্ষ্য করে রকেট ছোড়ার অভিযোগও আনা হয়েছে আইডিএফের বিবৃতিতে।
গাজা উপত্যকার প্রধান শহর গাজা সিটি এবং উত্তর গাজার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, হামাস ও তার মিত্রদের সাথে ইসরাইলি সেনাদের সঙ্ঘাত ও গুলিবিনিময়ের শব্দে শুক্রবার ঘুম ভেঙেছে তাদের। গাজার উপত্যকার মধ্যাঞ্চল বা কেন্দ্রে অবস্থিত নুসেইরাত এবং বুরেইজি শরণার্থী শিবিরেও গোলা ছুড়েছে ইসরাইলি বাহিনীর ট্যাংকগুলো।

দেড় মাসেরও বেশি সময় যুদ্ধের পর অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নতি স্বীকার করে গত ২৫ নভেম্বর অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ ও হামাস। গত নভেম্বরের মাঝামাঝি যুদ্ধের অন্যতম মধ্যস্থতাকারী দেশ কাতারের মাধ্যমে ইসরাইলের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভা বরাবর একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছিল হামাসের হাইকমান্ড।
সেই প্রস্তাবে হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ইসরাইল যদি গাজা উপত্যকায় চার দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে, রাফাহ ক্রসিংয়ে অপেক্ষারত ত্রাণ, জ্বালানি ও মানবিক সহায়তা পণ্যবাহী ট্রাকগুলোকে প্রবেশ করতে দেয় এবং ইসরাইলি কারাগারগুলো থেকে অন্তত ১৫০ জন বন্দীকে মুক্তি দেয়, তা হলে নিজেদের হাতে থাকা বন্দীদের মধ্যে থেকে ৫০ জনকে ছেড়ে দেবে হামাস। সেই প্রস্তাব মেনে নিয়ে ২৫ নভেম্বর চার দিনের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে ইসরাইল। পরে যুক্তরাষ্ট্র, কাতার, মিসর, ইউরোপ ও অন্যান্য মধ্যস্থতাকারীর তৎপরতায় যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরো তিন দিন বাড়ানো হয়। যুদ্ধবিরতির ছয় দিন ২৫-৩০ নভেম্বর পর্যন্ত মোট ৯৪ জন বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে হামাস। বিপরীতে ইসরাইলের বিভিন্ন কারাগার থেকে ১৮০ জনকে ছেড়ে দিয়েছে ইসরাইলও। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জানিয়েছিলেন, হামাস যদি প্রতিদিন ১০ জন বন্দীকে মুক্তি দেয় তা হলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ একদিন করে বাড়ানো হবে। অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল- বিরতির এক একটি দিনে যেসব বন্দীকে মুক্তি দেয়া হবে- তাদের নামের তালিকা স্থানীয় সময় সকাল ৭টার (বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টা) আগে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করবে হামাস।

গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত হামাস এই শর্ত মানলেও শুক্রবার নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তারা সেই তালিকা সরবরাহ করেনি বলে জানিয়েছে আইডিএফ। তা ছাড়া এই দিন শেষ রাতে ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর হিলটের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে গাজা উপত্যকা থেকে কয়েকটি রকেট ছোড়া হয়েছে বলেও নিজেদের বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী। আগের দিন বৃহস্পতিবার জেরুসালেমে একটি বাসস্টপে বন্দুক হামলা চালিয়েছিল দুই ফিলিস্তিনি হামলাকারী। এতে ঘটনাস্থলেই দু’জন নিহত হন, আহত হন আরো আটজন।
তবে ফের লড়াই শুরু হয়ে গেলেও নতুন যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে বলে এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা জানিয়েছেন। কাতার, মিসর ও মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা এ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

গত ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের যোদ্ধারা ইসরাইলের ভূখণ্ডে অতর্কিত হামলা চালানোর পর ওই দিন থেকেই গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরাইলি বিমানবাহিনী। পরে ১৬ অক্টোবর থেকে অভিযানে যোগ দেয় স্থল বাহিনী।
ইসরাইলি বাহিনীর টানা দেড় মাসের অভিযানে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা উপত্যকা, নিহত হয়েছেন ১৫ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি। নিহত এই ফিলিস্তিনিদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা ১০ হাজারেরও বেশি। অন্য দিকে হামাস যোদ্ধাদের হামলায় ইসরাইলে নিহত হয়েছিলেন এক হাজার ২০০ জন ইসরাইলি ও অন্যান্য দেশের নাগরিক। ইসরাইলি ভূখণ্ডে হামলার চালানোর দিন এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে শত শত সামরিক-বেসামরিক মানুষকে হত্যার পাশাপাশি ২৪২ জনকে বন্দী হিসেবে গাজায় নিয়ে গিয়েছিলেন হামাসের যোদ্ধারা। এই বন্দীদের মধ্যে ইসরাইলিদের সংখ্যা ১০৪ জন। বাকি ১৩৮ জনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স, আর্জেন্টিনা, রাশিয়া ও ইউক্রেনের নাগরিকরা রয়েছেন।