পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইরানকে আবারো আলোচনার টেবিলে ফেরাতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, আর এ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কয়েকটি বিষয়ে ইরানকে সাহায্য করার বিষয়ে আলোচনা করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। এর মধ্যে রয়েছে বেসামরিক পরমাণু প্রকল্প গড়ে তোলার জন্য প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার অর্থ সহায়তা, নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড় করা। বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রগুলো জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে ইরান-ইসরাইলের সামরিক সংঘাতের সময়েও যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা পর্দার আড়ালে ইরানের সাথে আলোচনা চালিয়ে গেছে। এমনকি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর চলতি সপ্তাহেও আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেছেন, বেশ কয়েকটি প্রস্তাব আলোচনায় উত্থাপিত হয়েছে। প্রস্তাবগুলো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। তবে একটি বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র অনড়, আর তা হলো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করা। যদিও ইরান বরাবরই বলে আসছে, এটি তাদের প্রয়োজন। দুটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, কমপক্ষে একটি প্রাথমিক খসড়া প্রস্তাবে ইরানের জন্য বেশ কয়েকটি প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

গত ১৩ জুন ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর মধ্য দিয়ে সংঘাত শুরু হয়। সংঘাতের মধ্যে ২১ জুন রাতে ইরানের ফরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহান পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এর ঠিক আগের দিন হোয়াইট হাউসে এক গোপন আলোচনায় বসেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও উপসাগরীয় অঞ্চলে দেশটির মিত্ররা। ওই বৈঠকে আলোচনা হওয়া বিভিন্ন তথ্য সিএনএনকে জানিয়েছে দুটি সূত্র।

আলোচনার বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের নতুন একটি পরমাণু প্রকল্প শুরুর জন্য ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা। তবে শর্ত হলো, এই প্রকল্পে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে না তেহরান। প্রকল্পগুলো বেসামরিক কাজে ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু এই প্রকল্পের কাজে ব্যবহৃত অর্থ সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবে না। ওয়াশিংটনের চায় মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদার দেশগুলোই এই ব্যয়ভার বহন করুক। ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তা ও প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত সূত্রগুলো সিএনএনকে এসব তথ্য জানিয়েছে।

সিএনএনের হাতে আসা খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রস্তাবিত অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মধ্যে রয়েছে, ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের করে নেয়া এবং বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে জব্দ থাকা ৬০০ কোটি ডলার ব্যবহারের অনুমতি দেয়া। মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ফোরদো পরমাণু স্থাপনা নতুন করে গড়ে তুলতে উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্র দেশগুলোর সহায়তা দেয়ার কথাও উঠেছে। তবে সেখানেও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে না ইরান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। তবে ইরান এই নতুন প্রকল্পে নিজের ফোরদোর মূল স্থাপনার জায়গাটিই ব্যবহার করতে পারবে কি-না, বা এই প্রস্তাব কতটা গুরুত্বের সাথে ভাবা হচ্ছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, ইরান চাইলে শান্তিপূর্ণ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে পারে। তবে সেই কর্মসূচির জন্য তারা নিজেরা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে না। যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব দিয়েছে, ইরান এর পরিবর্তে বিদেশ থেকে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আমদানি করতে পারে। উইটকফ সিএনবিসিকে বলেন, ‘এখন ইরানের সাথে আলোচনার বিষয় হবে- আমরা কিভাবে আপনাদের জন্য আরো উন্নত বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি গড়ে দিতে পারি, যেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুযোগ থাকবে না?’

এই প্রস্তাবগুলো ইরানের সামনে উপস্থাপন করার একটি সুযোগ আসতে পারে। বুধবার ট্রাম্প বলেন, ‘আগামী সপ্তাহে’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আলোচনায় বসবে। যদিও এমন আলোচনার বিষয়ে জানেন না ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাগেরি। এই আলোচনার সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আলোচনার সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো ঠিক করা হয়নি।

উইটকফের গোপন বৈঠকে গৃহীত শর্তাবলি নিয়ে, মূলত কাতারের মধ্যস্থতায়, গত কয়েকদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা চলছে। একটি সূত্র জানায়, এ সপ্তাহের শুরুতে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের নেপথ্যেও কাতার মুখ্য ভূমিকা রেখেছে। ভবিষ্যতে এই সংঘাত যাতে ফের শুরু না হয়, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে কাতার।

হামলার কারণে চুক্তি সহজ হবে, আশা যুক্তরাষ্ট্রের

ট্রাম্প প্রশাসনের আশা করছে, গত দুই সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহের পর ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে রাজি হতে পারে। পাশাপাশি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা থেকেও সরে আসতে পারে।

তবে ইরানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এর উল্টোও হতে পারে। ইরান সরকার এখন হয়তো ভাবতে পারে, তাদের জন্য পারমাণবিক অস্ত্র জরুরি। এ সপ্তাহের শুরুতেই ইরানের পার্লামেন্ট জাতিসঙ্ঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থা আইএইএর সাথে সহযোগিতা বন্ধের আইনে অনুমোদনও দিয়েছে।

ইসরাইলের হামলার আগে নতুন পারমাণবিক চুক্তির রূপরেখা তৈরির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পাঁচ দফা আলোচনা হয়েছিল। ষষ্ঠ দফায় আলোচনা হওয়ার প্রস্তুতিও চলছিল। কিন্তু ইরানে ইসরাইলি হামলার কারণে সেই আলোচনা ভেস্তে যায়।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে সতর্ক মন্তব্য করেছেন। আগামী সপ্তাহে ইরানের সাথে আলোচনার ঘোষণা দেয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা হয়তো চুক্তি স্বাক্ষর করব, বলতে পারছি না।’

তিনি আরো বলেন, ইসরাইল-ইরান সংঘাতের আগে তার প্রশাসন যে প্রতিশ্রুতি চেয়েছিল, এবারো সেই একই ধরনের প্রতিশ্রুতি চাইবে। ইরানকে পুরোপুরি ‘পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত’ দেখতে চান বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে উইটকফ বুধবার বলেন, একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর মতো ‘লক্ষণ’ দেখা যাচ্ছে। তিনি সিএনবিসিকে বলেন, ‘আমরা ইরানিদের সাথে আলোচনা করছি। একাধিক মধ্যস্থতাকারী আমাদের সাথে যোগাযোগ করছে। আমার মনে হয়, তারা প্রস্তুত।’

সূত্র : সিএনএন