কিছুদিন আগে কাতারে তালেবানের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার জন্য বৈঠক করেছিল মার্কিন কূটনীতিকরা, যা আফগানিস্তানে শান্তির পথ তৈরি করবে বলে ধারণা করেছিলেন অনেকে।

তবে আফগানিস্তানে সহিংসতা থামেনি এবং এখনো আফগান সরকার আর তালেবানের মধ্যেও পরিষ্কার কোন সমঝোতা দেখা যাচ্ছে না।

কাবুলের চেরাহিকাম্বার ক্যাম্পের যেখানেই যাওয়া হোক না কেন, সবজায়গাতেই সংবাদকর্মীদের পেছনে পেছনে ছুটে বেড়াতে দেখা যায় শিশুদের।

যেখানে যুদ্ধের কারণে ঘরবাড়ি হারানো বেশ কয়েকহাজার মানুষ বাঁশ,কাঠের ঘরবাড়িগুলোয় বসবাস করে।

এদের অনেকেই কয়েক বছর ধরে এখানে বাস করছেন।

তারা যখন শুনতে পেয়েছেন যে, আমেরিকানদের সঙ্গে তালেবানের প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে, তখন তারা নতুন করে আশা দেখছেন।

বছরখানেক ধরে সেখানকার অস্থায়ী ক্যাম্পগুলোতে থাকা মানুষ আবার বাড়িতে ফিরে যেতে পারার স্বপ্ন দেখছেন। আবারো তাদের সন্তানরা স্কুলে ফিরে যেতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছেন।

গত জুন মাসে অপ্রত্যাশিতভাবে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এই আশাবাদ আরো বেড়েছে।

সেসময় তালেবান যোদ্ধা আর সরকারি সৈনিকদের যৌথ সেলফি তুলতেও দেখা যায়।

তখন তালেবানের প্রধান একটি দাবি মেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তারা কাতারে তালেবানের রাজনৈতিক দপ্তরে বৈঠক করেছে।

তালেবান অনেক দিন ধরেই দাবি করে আসছে যে, শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই আলোচনা হতে পারে, আফগান সরকারের সঙ্গে নয় - যাদের তারা পুতুল সরকার বলে মনে করে।

তবে যুক্তরাষ্ট্র বলছে, যখন পুরোদস্তুর আলোচনা শুরু হবে, সেটি হবে আফগানদের নেতৃত্বেই।

তালেবান কী চায়?

আলোচনাটি এখন পর্যন্ত গোপনে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সাবেক তালেবান কমান্ডার আকবর আগা। এই গ্রুপের প্রধান দাবিগুলো তিনি ব্যাখ্যা করছিলেন।

‘আমেরিকানদের অবশ্যই একটি সময়সীমা জানাতে হবে, যে কখন তারা আফগানিস্তান ছেড়ে যাবে। সেই সময়ে তালেবান আর আফগান সরকার একটি সমঝোতায় আসবে’, বলে জানান মি. আগা।

তিনি জানান, তার বদলে তালেবান এটা নিশ্চিত করবে যে আল-কায়েদা বা আর কোন চরমপন্থী গ্রুপকে আফগানিস্তানে ঘাটি গাড়তে দেয়া হবে না।

‘যতদূর আমি জানি, আল-কায়েদার মতো কোন গ্রুপকে আফগানিস্তানে প্রশ্রয় দেবে না তালেবান। সেই আমল এখন শেষ। তারা আর অন্য কোন দেশকে নিয়েই চিন্তা করে না।’

তবে নানা পক্ষের আলাপ আলোচনা সত্ত্বেও সহিংসতা অব্যাহত আফগানিস্তানে রয়েছেই।

দ্বিতীয় দফার যুদ্ধবিরতিতে কখনো সম্মত হয়নি তালেবান।

আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শুধুমাত্র গত একমাসেই সেনাবাহিনীর পাঁচশোর বেশি সদস্য নিহত হয়েছে।

বিমান হামলার সংখ্যাও অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে ন্যাটো আর আফগান বাহিনী।

জটিল ব্যাপার হলো, কেউ বুঝতে পারছে না আসলে কি বোঝাপড়া চলছে।

আহমেদ রশীদ নামক একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক জানান, সহিংসতা কমা না পর্যন্ত কোন রাজনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা তিনি দেখছেন না।

‘তালেবান আসলে কখনোই বলেনি যে, তারা আসলে কি চায়। তারা কখনোই পরিষ্কারভাবে খুলে বলেনি যে, তারা আংশিক হলেও রাজনৈতিক আলোচনায় আগ্রহী অথবা কখনো একটি যৌথ সরকার গঠন করতে পারে’, বলেন মি. রশীদ।

আফগানিস্তানের খুব কম মানুষই অবশ্য ভাবছে যে, আগামী এপ্রিলে নির্ধারিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এ বিষয়ে বড় কোন অগ্রগতি হবে।

তালেবান হয়তো ভাবতে পারে, একসময় আমেরিকান বাহিনী আফগানিস্তান থেকে অবশ্যই চলে যাবে। তাদের তখন শুধু সে সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে কখন পুরো দেশটিই তাদের হয়ে যাবে।

 

আরো পড়ুন: তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র গোপন বৈঠক

সিএনবিসি, ২৩ জুলাই ২০১৮

মার্কিন কর্মকর্তারা আফগানিস্তান তালেবানের সাবেক সদস্যদের সাথে গোপনে বৈঠক করছেন। এসব বৈঠক আফগানিস্তান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অজ্ঞাত স্থানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তিন সিনিয়র তালেবান কমান্ডার জানিয়েছেন, কাতারের দোহায় একটি হোটেলে সম্প্রতি একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অন্তত পাঁচ মার্কিন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। জানা গেছে, তালেবান প্রায়ই সাবেক কমান্ডার ও রাজনৈতিক নেতাদের আলোচক ও মধ্যস্ততাকারী হিসেবে কাজে লাগায়। আলোচনায় অংশ নেয়া আলোচকদের অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র বা আফগানিস্তানের হাতে কারাবরণ করেছেন এবং এখন তাদের কোনো সক্রিয়তা নেই।

দোহা বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র জানায়, বৈঠকগুলো ছিল খুব বন্ধুত্বপূর্ণ এবং আলোচনার সময় চা ও কুকি সরবরাহ করা হয়েছে। হোটেলের ভেতরে ও বাইরে নিরাপত্তা ছিল কঠোর। এমনকি হোটেলের কর্মীদেরও বৈঠকের কক্ষে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।
তালেবান প্রতিনিধিদলের সদস্যরাও কঠোর নিরাপত্তা চেয়েছিলেন। কারণ রাশিয়া, চীন ও আরব দেশের গোয়েন্দাদের কাছে পরিচিত হতে চান না। অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, ধরাপড়া এড়াতে তালেবান সদস্যরা দলবেঁধে যাতায়াত করেনি। এক অংশগ্রহণকারী বলেন, যখন তারা (মার্কিন) বৈঠকের স্থানে পৌঁছায়, আমরা তখন একজন করে রওনা দেই। দোহার হোটেল কক্ষটি বৈঠকের জন্য নির্বাচনের কারণ হচ্ছে তালেবান ও মার্কিন কর্মকর্তারা প্রথম দিকে ‘কেউ কাউকে বিশ্বাস করছিলেন না’।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এই ধরনের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। তবে তিনি জানিয়েছেন, আফগান সংঘাত নিরসনে উদগ্রিব ট্রাম্প প্রশাসন। প্রতিরক্ষা দফতরের এক মুখপাত্র জানান, আফগান নেতৃত্বে আফগানদের শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে ও সহযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের আফগান যুদ্ধের ইতি টানতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। এজন্য তারা তালেবানের সাথে সরাসরি আলোচনায় প্রস্তুতির কথাও কয়েকদিন আগে এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন। তবে এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত ছিল, আফগান সরকারকেও আলোচনায় রাখতে হবে। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ার হামলার পর আফগানিস্তানে তালেবানের উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক অভিযান শুরু করে। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে এই দীর্ঘ সংঘাতের সূচনা হয়। এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত প্রায় ২৪০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে।

ঈদুল আজহার আগে আবার যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা

এ দিকে আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি আগামী মাসে ঈদুল আজহার আগে তালেবানের প্রতি আবারো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিতে পারেন বলে একজন সরকারি মুখপাত্র জানিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট গনির প্রধান মুখপাত্র হারুন চাকানসুরি শনিবার কাবুলে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘কুরবানির ঈদকে সামনে রেখে একটি যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’ আগামী ২২ আগস্ট আফগানিস্তানে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে।
এ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না জানালেও ওই মুখপাত্র বলেছেন, সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব সম্পর্কে বিস্তারিত পরে জানানো হবে। এর আগে ঈদুল ফিতর উপলক্ষে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল আফগান সরকার ও তালেবান। গত ৯ জুন তালেবান ঘোষণা করেছিল, তারা আফগান সরকারের প্রস্তাবিত এক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সাড়া দিয়েছে। তবে তালেবানের প্রস্তাব মেনে ওই যুদ্ধবিরতি থেকে বিদেশী সেনাদের বাইরে রাখা হয়।

এরপর তালেবান ১৫ জুন থেকে ১৭ জুন পর্যন্ত তিন দিন তাদের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে। তারা জানায়, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ঘোষিত এ যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর বাড়ানো হবে না; যদিও প্রেসিডেন্ট গনি তার পক্ষ থেকে ৯ জুন ঘোষিত এক সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ পরে অনির্দিষ্টকালের জন্য বৃদ্ধি করেন। তবে তালেবান সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষিত ওই অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধবিরতি মানেনি এবং তারা ১৭ জুনের পর থেকে এ পর্যন্ত বহুবার সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে।