ইরানের ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ বা অভিভাবক পরিষদ দেশটির সংসদে পাস হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিলকে অনুমোদন করেছে বলে

তেহরান ও ভিয়েনা থেকে পাওয়া প্রতিবেদনে জানা গেছে। এই বিলে বলা হয়েছে, ইরান সরকার এখন থেকে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার বা আইএইএর সাথে সবধরনের সহযোগিতা স্থগিত রাখবে।

ইরানের আধা সরকারি এবং দেশটির বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী বা আইআরজিসির সাথে সংশ্লিষ্ট তাসনিম বার্তাসংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অভিভাবক পরিষদের মুখপাত্র হাদি তাহান নজিফ জানিয়েছেন, এই প্রস্তাব অনুযায়ী, যতদিন না ইরানের জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিশ্চিত হচ্ছে এবং দেশের পরমাণু বিজ্ঞানী ও স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত আইএইএর সাথে সহযোগিতা স্থগিত রাখতে সরকার বাধ্য থাকবে।

এই বিল ইরানের সংসদ মজলিশ শুরার উন্মুক্ত অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে পাস হয়েছে। মোট ২২১ জন প্রতিনিধি এতে উপস্থিত ছিলেন এবং সবাই এই প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

বার্তাসংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, এই বিলে বলা হয়েছে, ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠী এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে ইরানের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হেনেছে। ১৯৬৯ সালের ভিয়েনা চুক্তির ৬০ নম্বর ধারার ভিত্তিতে সরকার এখন থেকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি এবং আইএইএর সাথে সই করা নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সবধরনের সহযোগিতা অবিলম্বে স্থগিত করবে।

এই বিল অনুযায়ী, দুইটি মৌলিক শর্ত পূরণ হলে তবেই এই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা যাবে। প্রথমত, জাতিসঙ্ঘ সনদের কাঠামোর মধ্যে এবং ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসারে, ইরানের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, পারমাণবিক কেন্দ্র ও বিজ্ঞানীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এনপিটির ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুসারে ইরানের স্বাভাবিক পারমাণবিক অধিকার, বিশেষ করে নিজ দেশে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার, পুরোদমে মেনে চলতে ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিলে আরো বলা হয়েছে, এই শর্তগুলো পূরণের নিশ্চয়তা ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদনে সাপেক্ষে নির্ধারিত হবে। তাছাড়া, সরকারকে প্রতি তিন মাস অন্তর এই শর্তগুলো পূরণের অগ্রগতি নিয়ে সংসদ ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে প্রতিবেদন পেশ করতে হবে।

ইয়াজদের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সালেহ জোকার একটি অতিরিক্ত প্রস্তাবও আনেন। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, এই আইন বাস্তবায়নে ব্যর্থতা বা গাফিলতির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে ইরানের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, ‘অবাক হওয়ার কিছু নেই।’

রাশিয়ার ভিয়েনা মিশনে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্থায়ী প্রতিনিধি মিখাইল উলিয়ানভ বলেছেন, ইরানের এই পদক্ষেপ ‘একেবারেই স্বাভাবিক’ এবং বর্তমান বাস্তবতার প্রতিফলন। তিনি তার টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছেন, ‘আইএইএর আওতাধীন পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবৈধ হামলার পর এই সিদ্ধান্ত একপ্রকার অনিবার্য ছিল।’

আইএইএর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি একদিন আগেই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ সংক্রান্ত স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জন্য দ্রুত ইরান পরিদর্শনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন।

জাতিসঙ্ঘে রাশিয়ার অবস্থান

জাতিসঙ্ঘে রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি ভ্যাসিলি নেবেনজিয়া নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যে ধরনের আগ্রাসন চালিয়েছে তা শুধু জাতিসঙ্ঘ সনদ ও আইএইএর সনদের লঙ্ঘন নয়, বরং পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির বাএনপিটি ওপর সরাসরি আঘাত। এই হামলা ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু শক্তি ব্যবহারের অধিকার, বিশেষ করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণের অধিকার, ক্ষুন্ন করেছে।

তিনি ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের পদক্ষেপকে এনপিটি ব্যবস্থার ওপর এক গভীর আঘাত হিসেবেও উল্লেখ করেন।

নেবেনজিয়া আরো বলেন, এনপিটির যে সদস্যদেশ এই আগ্রাসনের শিকার হয়েছে, তার ওপরে অন্য দুটি দেশ, যার মধ্যে একটি এনপিটির ডিপোজিটরি এবং অপরটি বহু দশক ধরে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামোতে যোগ দেয়নি, তারা এভাবে হামলা চালিয়ে চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এনপিটির ডিপোজিটরি বলতে সেই দেশগুলোকে বোঝানো হয় যারা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটির মূল রক্ষক বা ‘অভিভাবক’ রাষ্ট্র হিসেবে কাজ করে।

উল্লেখ্য, এনপিটি চুক্তির তিনটি ডিপোজিটরি রাষ্ট্র হলো, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়া।

ইরানের সিদ্ধান্ত এবং রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া ইঙ্গিত দেয়, পরমাণু ইস্যুতে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আবার বাড়ছে। তেহরান এখন শুধু প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে না, বরং আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তির কাঠামোর ভেতরেই এক নতুন শক্ত অবস্থান নিচ্ছে, যা ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও পরমাণু আলোচনার গতিপথকে প্রভাবিত করতে পারে।