পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনিয়ার প্রত্যন্ত মিঙ্গুরার বাসিন্দা তরুণ নারী অধিকার কর্মী মালালা ইউসুফজাই। নারীদের শিক্ষায় প্রচারণা চালাতে গিয়ে স্থানীয় উগ্রবাদীদের গুলিতে আহত হয়েছিলেন তিনি। তাতেও দমে না গিয়ে পাকিস্তানের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের শিক্ষার অধিকারের বিষয়ে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন মালালা।

নারী শিক্ষায় প্রচারণায় তার অবদানের স্বীকৃতিতে ২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয় করেন তিনি। এর মাধ্যমে বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ পুরস্কারজয়ী হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেন মালালা ইউসুফজাই।

ব্রিটিশ ফ্যাশন ম্যাগাজিন ভোগের সাথে সম্প্রতি এক সাক্ষাতকার দিয়েছেন মালালা। ম্যাগাজিনটির জুলাই সংখ্যায় কভারও হয়েছেন তিনি। বুধবার ম্যাগাজিনটির ওয়েবসাইটে সাক্ষাতকারটি প্রকাশ করা হয়েছে।

সাক্ষাতকারে নিজের জীবন ও ভবিষ্যত সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয় নিয়েই আলোচনা করেছেন মালালা। এরমধ্যে প্রধান ছয়টি বিষয় এখানে উল্লেখ করা হলো।

বিয়ে নিয়ে চিন্তা করছেন না!

ভোগের সাথে সাক্ষাতকারে মালালা ইউসুফজাই জানান, বিয়ে নিয়ে তিনি কোনো চিন্তা-ভাবনা করছেন না। বরং এই বিষয় থেকে দূরে থাকতে চান তিনি।

তিনি বলেন, 'আমার দ্বারা বিয়ে হবে কিনা নিশ্চিত নই। তবে আমার বাবা-মা পছন্দ করে পারিবারিক আয়োজনে বিয়ে করেছিল।'

মালালা বলেন, 'আমি এখনো বুঝতে পারি না কেন লোকেরা বিয়ে করে। যদি কাউকে আপনার জীবনে পেতে চান, কেন বিয়ের কাগজে স্বাক্ষর করতে হবে, এটা শুধু বন্ধুত্বের ভিত্তিতে হবে না কেন?'

তবে বেশিরভাগ পাকিস্তানি মায়ের মতোই মালালার মা তাকে বিয়ে করায় জোর দিচ্ছেন।

মালালা বলেন, 'আমার মা বলছেন, এমন কথা উচ্চারণের সাহসও করো না! তোমাকে বিয়ে করতে হবে, বিয়ে একটি সুন্দর বিষয়।'

ভবিষ্যত রাজনীতিবিদ?

পাকিস্তানে রাজনীতি সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রভাবক। রাজনীতির মাধ্যমেই সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেয়া হয় দেশটিতে। মালালার জন্যও বিষয়টি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তবে রাজনীতিতে আসছেন কিনা, সে বিষয়ে সাক্ষাতকারে স্পষ্ট কিছু বলেননি তিনি।

মালালা বলেন, 'আমার মনে হয়, রাজনীতিতে প্রবেশের আগে আপনার জানা থাকা উচিত কি বিষয়ে আপনি কাজ করবেন, কার সাথে কাজ করবেন। পাকিস্তানে কোনো রাজনৈতিক দলেরই পরিচ্ছন্ন ইতিহাস নেই। আপনি কি তাদের পক্ষে দাঁড়াবেন নাকি দাঁড়াবেন না? রাজনৈতিক দলগুলোকে কি আপনি পরিবর্তন করবেন? নাকি নিজেই নিজের রাজনৈতিক দল তৈরি করবেন? ইমরান খান তা করছেন এবং এর জন্য তার ৩০ বছর সময় লেগেছে।'

মাথায় ওড়না আত্মপরিচয়ের প্রকাশ

সবসময় মাথায় ওড়না পরে থাকাকে সাক্ষাতকারে নিজের আত্মপরিচয়ের প্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন মালালা।

তিনি বলেন, 'আমাদের পশতুনদের এটি সাংস্কৃতিক নিদর্শন। এটি নির্দেশ করছে আমি কোথা থেকে এসেছি। মুসলিম বা পশতুন অথবা পাকিস্তানি মেয়ে হিসেবে যখনই আমরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরি, আমাদের বিবেচনা করা হয় অত্যাচারিত, নিরব বা পুরুষতান্ত্রিকতার শিকার।'

মালালা বলেন, 'আমি সবাইকে বলতে চাই, আপনার নিজের সংস্কৃতির মধ্যেই নিজের আওয়াজকে খুঁজে নিতে পারেন। নিজের সংস্কৃতির মধ্যেই সমতা খুঁজে নিতে পারেন।'

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে মানিয়ে নেয়া

নিজের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সম্পর্কেও সাক্ষাতকারে খোলামেলা আলোচনা করেছেন মালালা। তিনি জানান, পাকিস্তানের স্কুলে তিনি শীর্ষ সারির শিক্ষার্থী থাকলেও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নিজেকে সাধারণ মানের শিক্ষার্থী মনে হচ্ছে তার।

তবে তাতে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। মালালা বলেন, যদি তিনি উচ্চতর দ্বিতীয় শ্রেণীতেও উত্তীর্ণ হন, তাতে তিনি সন্তুষ্ট হবেন।

তিনি বলেন, 'প্রতিটি মুহূর্ত আমি উপভোগ করছি। কেননা আমার জীবনে এত কিছু আমি কখনো দেখিনি। আমার নিজের বয়সী এতো মানুষের সাহচর্য আমি কখনোই পাইনি।'

উগ্রবাদীদের হামলায় আহতের পর তার চিকিৎসার জন্য যাওয়া, বিশ্ব ভ্রমণ, বই প্রকাশ, প্রামাণ্যচিত্র তৈরি এবং অন্য বিভিন্ন সংশ্লিষ্টতা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে নিজের জন্য কিছু সময় পাওয়ার কথা জানান মালালা।

অ্যাকটিভিজম টুইটারেই সীমাবদ্ধ নয়

সাক্ষাতকারে নিজের টুইটার সংশ্লিষ্টতার বিষয়েও সরাসরি কথা বলেন মালালা ইউসুফজাই। তিনি জানান, অনেকেই চলমান বিভিন্ন ঘটনা ও ইস্যুতে তার টুইটারে বার্তা বা বিবৃতি না থাকার বিষয়ে সমালোচনা করেন। তবে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চেয়ে সরাসরি মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে কাজ করার বিষয়ে গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, 'বর্তমানে আমাদের অ্যাকটিভিজম টুইটের সাথেই সংশ্লিষ্ট। এই অবস্থার পরিবর্তন হওয়া উচিত, কেননা টুইটার সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ।'

ভবিষ্যতের ভাবনা

নিজের ভবিষ্যত সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত নন মালালা। সাক্ষাতকারে এই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, 'প্রতি রাতেই এই প্রশ্ন নিয়ে আমি ভাবি। বিছানায় শুয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় এই ভাবনায়। এরপর আমি কী করবো?'

নিজের জীবনে কী করতে চান, কোনদিকে এগুতে চান, সেই বিষয়ে তার অনিশ্চয়তার কথা জানান মালালা।

তিনি বলেন, 'আমি পরে কোথায় থাকবো? আমি কি ব্রিটেনেই থাকবো না পাকিস্তানে ফিরে যাবো নাকি অন্য কোনো দেশে যাবো? দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, আমি কার সাথে থাকবো? আমি কি নিজে নিজে একাকিই থাকবো? নাকি বাবা-মায়ের সাথে থাকবো? বর্তমানের বাবা-মায়ের সাথেই আমি আছি এবং তারা আমাকে ভালোবাসেন। এশিয়ার বাবা-মায়ের মতোই তারা চান সন্তানরা তাদের সাথে চিরকালই থাকুক।'

সূত্র : ডন