ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের পেহেলগাম হামলাকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তান একে অপরের বিরুদ্ধে বেসামরিক নানা বিধিনিষেধ ঘোষণার পরও কাশ্মিরের মানুষ কিছুটা স্বস্তি পেয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, পরিস্থিতি হয়তো এর চেয়ে খারাপ হবে না। কিন্তু গত সপ্তাহে নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর গুলি বিনিময়ের কারণে বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন এর কাছে বসবাসকারী মানুষ।
নিয়ন্ত্রণরেখার দু’পাশের মানুষের তাই নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে, মানুষ আতঙ্ক থেকে এখন বাঙ্কার সংস্কার করছে।
শনিবার (৩ মে) বিবিসি তাদের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের উরি সেক্টরের তুতমার গলি পোস্ট ও পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত লিপা সেক্টরের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর গত সপ্তাহে গুলি বিনিময়ের ঘটনা ঘটে। তবে এখনো পর্যন্ত ওই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এহসান-উল-হক শামি লিপা উপত্যকার বাসিন্দা। ওই অঞ্চলের জনসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার এবং সেখানকার বেশিভাগ মানুষই আইন মেনে চলেন।
নিয়ন্ত্রণরেখা থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এহসান-উল-হক শামির বাড়ি। ভারতীয় ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে ব্যাপক গুলি বিনিময়ে ২০১৯ সালে তার বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি জানান, একইভাবে ২০০২ ও ১৯৯৮ সালেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তার বাড়ি।
পেশায় আইনজীবী শামি বলেন, ‘ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের পেহেলগামের ঘটনার পর গত শুক্রবার ও শনিবার পাকিস্তান ও ভারতের সেনাবাহিনীর মধ্যে গুলি বিনিময় হয়েছে।’
‘শুক্রবার ও শনিবারের মধ্যবর্তী রাতে সাড়ে ১২টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত দু’দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে গুলি বিনিময় চলে। এরপর শনিবার রাতে ফের গুলি বিনিময় শুরু হয়। ওইদিন রাত ১০টায় গুলি বিনিময় শুরু হয়ে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত চললেও সাধারণ মানুষকে কিন্তু নিশানা হতে হয়নি,’ বলেন তিনি।
প্রসঙ্গত, ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর সবচেয়ে স্পর্শকাতর এলাকা উত্তর কাশ্মিরের কুপওয়ারা ও বারামুল্লা জেলায় অবস্থিত। শুক্রবার কুপওয়ারার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একটা নির্দেশ জারি করে জানান, কুপওয়ারার নিয়ন্ত্রণরেখা সংলগ্ন অঞ্চলে যেতে হলে আগে থেকে অনুমতি নিতে হবে।
আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
কুপওয়ারায় এখনো পর্যন্ত সীমান্তে গুলি বিনিময়ের কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে নিয়ন্ত্রণরেখার খুব কাছাকাছি যারা বাস করেন, তাদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
কুপওয়ারার কারনাহ সেক্টরের বাসিন্দারা ব্যক্তিগত ব্যয়ে ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার তৈরির কাজ শুরু করেছেন বা সেগুলো পুনর্নির্মাণ করছেন।
পেহেলগামের ঘটনার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টির সাথে সাথেই বাড়ির নিচে বাঙ্কার তৈরির কাজ যারা শুরু করেন, তাদেরই একজন পীরজাদা সৈয়দ।
তিনি বলেন, ‘সীমান্তে গোলাগুলির পরিণতি আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি। প্রাণহানি হয়েছে, অতীতে কৃষিকাজের অভাবের কারণে মানুষও অনাহারে মারা গেছে।’
‘আল্লাহ রহম করুন যেন কিছু না হয়, কিন্তু পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে যেকোনো সময় কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। সে কারণেই আমরা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার বানাচ্ছি যাতে কিছু হলে আমরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারি।’
কুপওয়ারার একাধিক বাসিন্দা বিবিসিকে বলেন, ‘অতিরিক্ত সামরিক তৎপরতা’ এবং রাতের আকাশে জেট বোমারু বিমানের আওয়াজ তাদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
কুপওয়ারার নিয়ন্ত্রণরেখার জিরো লাইনে অবস্থিত টোড গ্রামের এক বাসিন্দার কথায়, ‘২০১৭ সালে যখন গোলাবর্ষণ হচ্ছিল, তখন আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে একটা শেল এসে পড়েছিল এবং তার মৃত্যু হয়।’
‘কিন্তু ২০২১ সালে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনী যুদ্ধবিরতি মেনে চলতে রাজি হয়। তারপর গত চার বছর ধরে জীবন শান্তিপূর্ণ ছিল। এখানে কৃষিকাজ হচ্ছে, বাচ্চারা স্কুলে যাচ্ছে, ব্যবসা হচ্ছে। কিন্তু এখন আশঙ্কা হচ্ছে, আগের মতো পরিস্থিতি হয়ত ফিরে আসতে পারে।’
পীরজাদা সৈয়দ বলেন, ‘দু’দিন আগে নামবরদার এসে এখানকার বাসিন্দাদের বাঙ্কার পরিষ্কার করতে এবং তার চারপাশের আগাছা বা কাঠের জিনিসপত্র সরিয়ে ফেলতে বলেছিলেন। এ ঘোষণার কারণে সবাই হতবাক হয়েছে। কিন্তু বাঁচতে হবে তাই সকলে বাঙ্কার পরিষ্কার করতে বা সেগুলো পুনর্নির্মাণ করতে শুরু করে দিয়েছে।’
‘আমি বাঙ্কার পরিষ্কার করেছি’
এহসান-উল-হক শামি বলেন, ‘যখনই পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়, তখনই নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে বসবাসকারী মানুষের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়, দু’দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে গোলাগুলি চলতে পারে। এতে সাধারণত নিশানা হতে হয় সাধারণ মানুষকে।’
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক উত্তেজনার পরও প্রতি রাতেই আমরা ভাবতাম, এই হয়ত গোলাগুলি শুরু হবে। যেমনটা শুক্রবার ও শনিবার রাতে দেখা গিয়েছে।’
সেই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে এহসান-উল-হক শামি বলেন, ‘শুক্রবার ও শনিবারের মধ্যবর্তী রাতে শুরু হওয়া গোলাগুলিকে আমরা আকস্মিকই বলতে পারি। তখন রাত ১২টা বাজে, বাড়িতে ছেলেমেয়েরা ঘুমিয়ে ছিল। প্রথমে আমি আমার বৃদ্ধ মাকে বাঙ্কারে সরিয়ে নিয়ে যাই। তার বয়স হয়েছে এবং তিনি হাঁটাচলা করতে অক্ষম।’
তিনি জানান, ওই এলাকায় প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার রয়েছে। বাড়ির কাজে বাঙ্কার ব্যবহার করা হয়।
‘কিন্তু সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর আমি বাঙ্কার পরিষ্কার করেছি, যাতে গোলাগুলি চললে এটা ব্যবহারের উপযোগী থাকে,’ উল্লেখ করেন শামি।
‘সারা রাত ঘুমাতে পারিনি’
এহসান-উল-হক শামি বলেন, ‘বাঙ্কারগুলো বেশ মজবুত। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এটা বুলেট বা গোলা থেকে রক্ষা করতে পারলেও ভারী অস্ত্রের শেল সরাসরি বাঙ্কারে পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।’
‘আমরা যে বাড়িতে থাকি সেটা ২০০২ এবং ১৯৯৯ সালেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। আমরা নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর আছি। এ কারণে আশঙ্কা থেকে যায়, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেই পারি। অবশ্য এমনিতেও গুলি চললে কারো পক্ষে ঘুমানো সম্ভব নয়।’
তার মতো ওই অঞ্চলের অন্য বাসিন্দারাও বিনিদ্র রাতই কাটিয়েছেন। তার কথায়, ‘প্রায় পুরো এলাকার মানুষই সারা রাত জেগে ছিল। তবে আমাদের কাছে তথ্য আছে, এখন পর্যন্ত গোলাগুলিতে বেসামরিক জনগণের কোনো ক্ষতি হয়নি।’
‘বাঙ্কারগুলো আশ্রয় নেয়ার উপযোগী নয়’
ভারতের উরি সেক্টরেও নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কায় ভুগছেন মানুষ। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে এ সেক্টরের ভাটগ্রান ও চরন্দা এলাকায় ১৬টা বাঙ্কার নির্মাণ করা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, সেখানে বিদ্যুৎ সংযোগ ও পানির ব্যবস্থা নেই।
ভাটগ্রানের বাসিন্দা মহম্মদ কুদ্দুস বলেন, ‘কেউ কেউ নিজের খরচে বাঙ্কার তৈরি করেছেন, কিন্তু দরিদ্র মানুষরা যাবে কোথায়। এখন আমরা এই একই বাঙ্কারগুলো পরিষ্কার করব।’
‘আল্লাহ দয়া করুন, যাতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সব কিছু ঠিক থাকে আর গুলিবিনিময় বন্ধ হওয়ার পর জীবনযাত্রা আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়,’ বলেন মহম্মদ কুদ্দুস।
প্রসঙ্গত, ২০০৩ সালের নভেম্বর মাসে নিয়ন্ত্রণরেখায় যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু দু’পক্ষের সেনাবাহিনী তা পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর ২০২০ সালে লাদাখ সীমান্তে চীন ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে কাশ্মির উপত্যকা থেকে বিপুল সংখ্যক সেনা সরিয়ে লাদাখে স্থানান্তরিত করে ভারত।
এর কয়েক মাস পর ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যে পূর্বসম্মত যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত চুক্তি কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য আরো একটি চুক্তি হয়।
পেহেলগামের ঘটনার পর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সেই চুক্তি আবার ভাঙ্গা হয়েছে বলে অভিযোগ।
‘এলাকা ছাড়েননি লিপা সেক্টরের বাসিন্দারা’
বশির আলম আওয়ান ঝিলাম জেলা পরিষদের সদস্য। তিনি জানান, ওই সেক্টরে ভালো কৃষিকাজ হওয়ার কারণে সেখানে শস্য মজুত রয়েছে এবং বাকি প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের যোগানও রয়েছে। তাই চূড়ান্ত খারাপ পরিস্থিতিতেও তাদের খাদ্যশস্যের অভাব দেখা যায়নি।
তার দাবি, ‘অতীতে গোলাগুলি চলার কারণে লিপা সেক্টরে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সর্বশেষ গুলি চলেছিল ২০১৯ সালে। সেই সময় ব্যাপক গোলাগুলি চলেছিল, বেসামরিক নাগরিকরাও নিশানা হয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে দু’রাতে যে গুলি বিনিময় হয়েছে, সেখানে সাধারণ মানুষ নিশানা হয়নি।’
বশির আলম আওয়ান বলেন, ‘অতীতে প্রাণহানির পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতিও হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ওই এলাকা থেকে কেউ সরে যায়নি। নারী ও বাড়ির অসুস্থ সদস্যদের অন্যত্র স্থানান্তরিত করা হলেও পুরুষরা কিন্তু এখানে থেকে গিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘লিপা উপত্যকায় সরকারি প্রকল্পের আওতায় প্রায় প্রতিটা বাড়িতে বা দুই থেকে তিনটি বাড়ি মিলিয়ে একটা বাঙ্কার বানানো হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, লিপা ভ্যালির বাসিন্দাদের অনেকেরই আত্মীয় ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের কুপওয়ারা সেক্টরে বাস করেন।
তার মতে, দু’দেশের মধ্যে গুলি বিনিময়ের ঘটনা না ঘটলে, লিপা সেক্টরে পরিস্থিতি সাধারণত শান্তই থাকে।
বশির আলম আওয়ান বলেন, লিপা ভ্যালির রাস্তা আগে ভাল ছিল না। কিন্তু ২০২২ সালে রাস্তা মেরামতের পর ওই এলাকায় পর্যটনের প্রবণতা দেখা গিয়েছে।
স্থানীয়রাও পর্যটন ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন। ওই এলাকায় অন্তত ৩০টা নতুন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও গেস্ট হাউস তৈরি করা হয়েছে। বিপুল পরিমাণে পর্যটক আসাও শুরু হয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘বহু মানুষ পর্যটনকে তাদের কর্মসংস্থানের উৎস বানিয়েছে। এখন এসব গোলাগুলির ঘটনা ঘটায় পর্যটকরা ওই এলাকায় বেড়াতে যাবেন না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মানুষের কর্মসংস্থানের ওপর এর খুব খারাপ প্রভাব পড়বে।’
সিমলা চুক্তির অধীনে এসেছে নিয়ন্ত্রণরেখা
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত তিন হাজার ৩২৩ কিলোমিটার বিস্তৃত। এর মধ্যে ভারত অধিকৃত জম্মু ও কাশ্মিরের ৭৪৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৩৪ কিলোমিটার প্রশস্ত রয়েছে সীমান্ত, যাকে সবচেয়ে বিপজ্জনক বলে মনে করা হয়।
১৯৪৯ সালে জাতিসঙ্ঘের পক্ষ থেকে একে যুদ্ধবিরতি রেখা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু দু’দেশই সিমলা চুক্তির অধীনে একে নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি) বলে।
জম্মু, সাম্বা, কাঠুয়া সংলগ্ন সীমান্তকে ভারত ‘ইন্টারন্যাশানাল বর্ডার’ বলে আখ্যা দেয় আর পাকিস্তান সেটাকে ‘ওয়ার্কিং বাউন্ডারি’ বলে।
সাম্প্রতিক সময়ে দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তির আগে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে সাম্বা, কাঠুয়া, জম্মু, আরএস পুরা, রাজৌরি ও জম্মুর পুঞ্চে নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে অবস্থিত বসতি অঞ্চলে ১৯ হাজারেরও বেশি পাকা ভূগর্ভস্থ বাঙ্কার নির্মাণ করা হয়েছিল।
আর এস পুরার বাসিন্দা কাট্টু মহারাজ বলেন, ‘এখন এতটাই উত্তেজনা রয়েছে যে এখানকার মানুষ সব কাজ ছেড়ে এখন বাঙ্কার পরিষ্কার করছেন।’









