ঋণের ওপর সুদহার কমানোর অলিখিত শর্তে এবারের বাজেটে ব্যাংকের করপোরেট কর কমিয়েছে সরকার। তাৎক্ষণিক প্রতিদান হিসেবে বিনিয়োগের ওপর ৯ শতাংশ এবং আমানতের ওপর ৬ শতাংশ সুদহার নির্ধারণের ঘোষণা দেন ব্যাংকের মালিকেরা। তীব্র সমালোচনার মুখে ঘোষিত সুদহার কার্যকর করার বিষয়ে কঠোর নজারদারির হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বাধ্য করা হয় একই ঘোষণা দিতে। কিন্ত ৯-৬ সুদহার নিয়ে এখনো ব্যাপক নয়ছয় চলছে। অভিযোগ উঠেছে, ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রায়ত্তসহ কিছু বেসরকারি ব্যাংক কার্যকর করলেও অনেক ব্যাংক এখনো তা করেনি। আবার যেসব ব্যাংক কমিয়েছে, তারা সব ক্ষেত্রে ৯ শতাংশে সুদহার নামায়নি। গাড়ি-বাড়ি কেনার ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, এলটিআরসহ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সুদহার এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে।
ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের (বিএবি) ঘোষণা অনুযায়ী গত ১ জুলাই থেকে সব ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণের কথা। গত মাসে আনুষ্ঠানিক বৈঠক করে বিএবি সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নেয়। তিন মাস মেয়াদি আমানত নেয়ার ঘোষণা দেয় সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে। এর পরপরই অর্থমন্ত্রী সব সরকারি ব্যাংকের এমডিদের নিয়ে বৈঠক করে সুদহার কমানোর ঘোষণা দেন। সিঙ্গেল ডিজিট সুদ কার্যকরের বিষয়ে সব ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেয় বিএবি। সর্বশেষ গত ২৭ জুন ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) এক বৈঠক থেকে মালিক পক্ষের নেয়া ঘোষণা কার্যকরের সিদ্ধান্তের কথা জানায়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সুদহার কমানোর ক্ষেত্রে বেশির ভাগ ব্যাংকই গড়িমসি করছে। এখনো আগের হারেই সুদ আরোপ করছে অনেক ব্যাংক। আবার যেসব ব্যাংক নতুন সুদ ঘোষণা করেছে সেখানেও রয়েছে নানা ফঁািক। বিএবির সিদ্ধান্তের আলোকে অনেকে সুদহার ঘোষণা করলেও শাখা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মৌখিকভাবে আপাতত ঋণ বিতরণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকসহ বেসরকারি কিছু ব্যাংক উৎপাদনশীল খাত হিসেবে বিবেচিত সব ক্ষেত্রে সুদ ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার উদ্যোগ নিলেও গাড়ি, বাড়ি, ব্যক্তিগত বা ভোক্তা ঋণে সুদহার এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদ্যমান মেয়াদি আমানতে উচ্চ সুদ থাকায় এখন সব ক্ষেত্রে সুদহার কমানো সম্ভব হচ্ছে না। বেসরকারি ইস্টার্ন ব্যাংক এখনো বড় ও মাঝারি শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ করছে সাড়ে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ সুদে। অন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সুদহার রয়েছে এ রকমই। মধুমতি ব্যাংক শিল্পের মেয়াদি ঋণ বিতরণ করছে সাড়ে ১১ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে। অন্য ক্ষেত্রেও সুদহার রয়েছে এ রকম।
৯-৬ সুদহার কার্যকর করা প্রসঙ্গে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর মালিকপক্ষ সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে আলোকে প্রত্যেক ব্যাংককে নিজ নিজ পরিচালনা পরিষদে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়বে এমডিদের ওপর। অনেকেই এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। বিএবির সিদ্ধান্তের আলোকে ঢাকা ব্যাংক গত পয়লা জুলাই থেকে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে এনেছে জানিয়ে তিনি বলেন, অন্য ব্যাংকগুলোও দ্রুত কার্যকর করবে বলে আমরা আশা করছি। ব্যাংকগুলো এটি কার্যকর করল কি না, সেটা তদারক করার দায়িত্ব বাংলাদেশ ব্যাংকের বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ঘাটতি পূরণে ১৮৫০ কোটি টাকা
এদিকে মূলধনের ঘাটতি মেটাতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারি ৯ ব্যাংককে নতুন করে এক হাজার ৮৫০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। ২৭ জুন অর্থ বিভাগের উপসচিব রেদোয়ান আহমেদ স্বাক্ষরিত এক পরিপত্র জারি করে এ টাকা বণ্টন করে দেয়া হয়। মূলধন ঘাটতি পূরণবাবদ সোনালী ব্যাংককে দেয়া হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা, একইভাবে জনতা ব্যাংককে দেয়া হয়েছে ৪০০ কোটি টাকা, রূপালী ব্যাংককে ৩০০ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া সরকারের বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংককে মূলধন ঘাটটি পূরণবাবদ ৪০০ কোটি টাকা, রাজশাহী কৃষি ব্যাংককে মূলধন ঘাটটি পূরণ ও সুদ ভর্তুকিবাবদ ১৯৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা ও গ্রামীণ ব্যাংককে (পরিশোধিত মূলধনের সরকারি অংশ হিসেবে) ২১ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে সরকারি কোষাগার থেকে টাকা দেয়া হয়। যদিও সরকারি ব্যাংকগুলোকে মূলধন ঘাটতি পূরণে এভাবে জনগণের করের টাকা দেয়ার তীব্র বিরোধিতা করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের দাবি, এ উদ্যোগ রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা এবং দুর্নীতিকে উৎসাহিত করবে।
চাপ বাড়ছে ব্যাংকের বাইরেও
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্সের (বিএবি) নেতারা সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সাথে এক বৈঠকে মিলিত হন। এ সময় তারা ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও যাতে সুদের হার কমায়, সে বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এর পরপরই ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিএলএফসিএ) নেতাদের সাথে একটি অনির্ধারিত বৈঠক করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। বৈঠকে ব্যাংকের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সুদহার কমানোর পরামর্শ দেন গভর্নর। এ জন্য সংগঠনের পক্ষ থেকে নিজেরা বসে সুদহার ঠিক করে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানানোর পরামর্শ দেয়া হয় বলে জানা গেছে।
সুদহার কমানোর সরকারি চাপে ক্ষুব্ধ আর্থিক প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, এমন চাপে ব্যাংকগুলো গ্রাহক থেকে চলতি, সঞ্চয়ী, মেয়াদিসহ বিভিন্ন ধরনের আমানত নিতে পারে। অথচ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তিন মাসের কম মেয়াদে কোনো আমানত নিতে পারে না। আবার ব্যাংকের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের পরিচিতি কম হওয়ায় আমানত সংরক্ষণে গ্রাহকরা তেমন আগ্রহ দেখান না। ফলে ব্যাংকের তুলনায় বেশি সুদ দিয়েও চাহিদা অনুযায়ী আমানত না পাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের তহবিল সংগ্রহে ধরনা দিতে হয় ব্যাংকে। আমানতের পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কার্যক্রম চালাতে হয়। বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আমানতের ২৩ শতাংশের মতো আসে ব্যাংক থেকে। আবার ব্যাংকের চেয়ে আমানতের গড় সুদহারও তুলনামূলক বেশি। ফলে ব্যাংকের তুলনায় সব সময় এসব প্রতিষ্ঠানের সুদহার বেশি থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানতে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠান তীব্র চাপে পড়বে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
তদারকি জোরদারে পরামর্শ
এদিকে ব্যাংকগুলোর ওপর শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও তদারকি কার্যক্রম জোরদার করার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সংস্থাটির বার্ষিক পর্যালোচনা সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকগুলোকে রেগুলেশন বা নিয়মকানুনে ছাড় দেয়ার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। আইএমএফের প্রতিবেদনে ব্যাংক খাত ছাড়াও সরকারের রাজস্বনীতি, অর্থনীতির বিভিন্ন শক্তিশালী দিক এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা করেছে আইএমএফ। এখনো পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও অস্থিরতার ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবারের দু’জনের পরিবর্তে চারজন সদস্য এবং ব্যাংক পরিচালকদের মেয়াদ ছয় বছরে থেকে বাড়িয়ে ৯ বছর করা হয়েছে, যা সুশাসনের ক্ষেত্রে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এ ছাড়া নতুন ব্যাংক দেয়ার উদ্যোগে আপত্তি জানিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি বলেছে, নতুন করে আরো ব্যাংকের লাইসেন্স দিলে তা এ খাতের তদারকি ও নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
ঋণের ওপর সুদহার কমানোর অলিখিত শর্তে এবারের বাজেটে ব্যাংকের করপোরেট কর কমিয়েছে সরকার। তাৎক্ষণিক প্রতিদান হিসেবে বিনিয়োগের ওপর ৯ শতাংশ এবং আমানতের ওপর ৬ শতাংশ...
