বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরী পোশাক শিল্প। তিনটি রফতানিমুখী খাতের মধ্যে পোশাক শিল্পই অন্যতম। যেকোনো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা সে দেশের শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হলেও পোশাক শিল্পে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছে বহির্বিশ্বে। বেকার সমস্যা সমাধান, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের েেত্র এ শিল্পের অবদান ঈর্ষণীয়। রফতানি আয়ে এই সেক্টরটি অনবদ্য ভূমিকা পালন করলেও বিতর্ক কমছে না এ খাতের শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে।
দেশের তৈরী পোশাক শিল্পের বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৪৯ কোটি ডলার বা চার হাজার ১৮ কোটি টাকার পোশাক রফতানি করে বাংলাদেশ। এ েেত্র প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত বছরের জানুয়ারিতে রফতানি হয়েছিল ৪৮ কোটি ডলারের পোশাক। ২০১৭ সালে ৫০৬ কোটি ডলারের পোশাক রফতানি করেছিল বাংলাদেশ।
গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশ থেকে ৭০৫ কোটি ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। প্রবৃদ্ধি মাত্র দশমিক ৯২ শতাংশ। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলসের (অটেক্সা) পরিসংখ্যান থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
গত জানুয়ারিতে ১৮ কোটি ৮৬ লাখ বর্গমিটারের সমপরিমাণ কাপড়ের তৈরী পোশাক রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এ েেত্র প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৪৯ শতাংশ। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক রফতানির ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ গেছে বাংলাদেশ থেকে। গত ডিসেম্বরে যা ছিল ৬ দশমিক ৩১ শতাংশ।
সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর পাঁচ বছরের জন্য বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে অ্যালায়েন্স গঠিত হয়। উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্সের সদস্য তৈরী পোশাক কারখানার ৮৮ শতাংশ সংস্কারকাজ শেষ করেছে। এর মধ্যে শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ৮৪ শতাংশ সংস্কারকাজ অন্তর্ভুক্ত। তবে ৩২২ কারখানা তাদের সংশোধনী কর্মপরিকল্পনা (ক্যাপ) অনুযায়ী সব ধরনের সংস্কারকাজ সম্পন্ন করেছে। তৈরী পোশাক শিল্পে একসময় নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মজুরিবৈষম্য ছিল লণীয়। বর্তমানে এ মজুরির ব্যবধান প্রায় ৩ শতাংশ। এ খাতে কর্মরত পুরুষ শ্রমিকরা গড়ে সাত হাজার ২৭০ টাকা ও নারী শ্রমিকরা সাত হাজার ৫৮ টাকা মজুরি পান।
তবে এই বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে শ্রমিক-মালিকদের মধ্যে।
এ বছরের শুরুতেই তৈরী পোশাক শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি বাড়ানোর জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়। এর সুপারিশের পরই পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরিবিষয়ক সিদ্ধান্ত দেবে সরকার। তবে এ পর্যায়ে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবিতে মালিক ও শ্রমিকপরে প্রত্যাশার মধ্যে দেখা যাচ্ছে বিস্তর ফারাক। শ্রমিকদের বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যেও এ প্রশ্নে ল করা যাচ্ছে মতানৈক্য।
২০১৩ সালে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ধরা হয়েছিল পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা। প্রতি বছরই মূল্যস্ফীতিসহ বিভিন্ন কারণে বলতে গেলে সব খাতেই ব্যয় বেড়ে চলেছে। পোশাক খাতে বিদ্যমান এ সামান্য মজুরিতে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। পরিবর্তিত সময়ে শ্রমজীবীদের চাহিদাও বাড়ে। এ জন্য দেশের প্রধান মেনুফ্যাকচারিং খাতের শ্রমিকরা ন্যূনতম ১২ হাজার ২০ টাকা বেতন দাবি করছেন। কোনো কোনো শ্রমিক সংগঠন থেকে ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা ন্যূনতম বেতনের দাবিও উঠেছে। তবে ১২ হাজারের নিচে কেউ নিতে রাজি নন। তারা বলছেন, লোকসানে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের মজুরি প্রায় শতভাগ বাড়ানো সম্ভব হলে রফতানিমুখী পোশাক খাতেও একই হারে বাড়াতে হবে। শ্রমিকদের এমন বক্তব্যকে অসঙ্গত বলা যায় না।
অন্য দিকে বাংলাদেশ তৈরী পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) প্রস্তাবিত মজুরি দেখা যাচ্ছে শ্রমিকদের দাবি করা মজুরির প্রায় অর্ধেক। এর আগে কয়েক দফায় মজুরি বাড়ানো হয়েছে বটে; তবে শ্রমিকদের আন্দোলন ছাড়া কখনোই তা আদায় হয়নি। এগুলোয় সংঘটিত নানা অপ্রীতিকর ঘটনা খবর হয়েছে বিভিন্ন সময়। তা দেশের বাইরেও দ্রুত ছড়িয়েছে। এতে রফতানিমুখী এ খাতের ভাবমর্যাদা ভালো হয়নি।
সম্প্রতি তৈরী পোশাকশ্রমিকদের সর্বনি¤œ মোট মজুরি ছয় হাজার ৩৬০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করেছে কারখানা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরী পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনা করে এই মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানান বিজিএমইএ’র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান।
ন্যূনতম মজুরি কমিশনের তৃতীয় বৈঠকে এ প্রস্তাব করেন তিনি। সভায় উপস্থিত ছিলেন ন্যূনতম মজুরি কমিশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ আমিনুল ইসলাম। শ্রমিকপ থেকে উপস্থিত ছিলেন শ্রমিকনেতা বেগম শামসুন্নাহার ভূঁইয়াসহ অন্য ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিরা।
সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের জীবনযাপন ব্যয়, মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান, ব্যবসায়িক সামর্থ্য ও অন্যান্য আর্থসামাজিক বিষয় বিবেচনা করে নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ দিকে অবিলম্বে মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার দাবিতে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন পল্টনে নি¤œ মজুরি বোর্ড কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছে।
গার্মেন্ট শ্রমিকরা বলেন, রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশ অর্জনকারী শ্রমিকদের শ্রমে ও ঘামে গড়ে উঠেছে বিলিয়ন ডলারের এ শিল্প। মজুরি বৃদ্ধি শিল্প বিকাশের জন্য জরুরি। বিষয়টি আমাদের মালিকপ এখনো বুঝতে সম হয়নি। মালিক ও বায়ারদের (ক্রেতা) বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার লাভের এই ব্যবসার খুব সামান্য লভ্যাংশ দিলেই শ্রমিকরা উৎপাদনের চাকা আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারতেন।